somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডুমেলা বতসোয়ানা-১৮

০৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বতসোয়ানা পুলিশ
আগেরগুলো পড়তে চাইলে-ডুমেলা বতসোয়ানা-১৭

বতসোয়ানার আকাশে বিকালের শেষ আলোটুকু আজ আরো বেশি করে আলো ছড়াচ্ছে। কেমন যেন চিকমিক করা উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত বিকালের শেষ সময়টুকু। বতসোয়ানায় এখন বিকাল হলেও বাংলাদেশে রাত। এখন থেকে আরো চার ঘণ্টা পর বতসোয়ানায় রাত পৌনে ৯টা বাজবে। এই চার ঘণ্টা সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। বর্তমান এ গতির যুগে যেখানে এক একটি সেকেন্ড মহামূল্যবান, সেখানে চার ঘণ্টা অ-নে-ক সময়। এই সময় জুড়ে দুনিয়াব্যাপী কতো কাণ্ড ঘটে গেছে, কে তার খোজ রাখে। আমেরিকা ইরাকে কতো নিরীহ মানুষ হত্যা করলো, আফগানিস্তানে সহিংসতায় কতো লোক মারা গেল, প্যালেস্টাইনে ইসরেল কতো নিরীহ মানুষের ওপর বোমা মারলো, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণে দুনিয়ার দৃশ্যপট এখন কি রকম, দুনিয়া জুড়েই কতো রকম সহিংসতা, কতো ঘটনা-দুর্ঘটনা যে ঘটে চলেছে সময়ই তার স্বাক্ষী। বাংলাদেশ বতসোয়ানা থেকে সময়ের দিক দিয়ে চার ঘণ্টা এগিয়ে থেকে এ সময়ের মধ্যে কতো ঘটনা-দুর্ঘটনার অংশীদার হয়েছে তা নিশ্চয়ই অনুমান করতে কষ্ট হয় না।

বাংলাদেশের বর্তমান যা পরিস্থিতি, বতসোয়ানায় বসে আমার অনুমান বাংলাদেশ সময়ের দিক দিয়ে চার ঘণ্টা এগিয়ে থাকলেও ঠিক এই চার ঘণ্টার মধ্যেই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেকটা পিছিয়ে গেছে। গত ক’দিনের ইন্টারনেট ঘেঁটে পত্রিকাগুলো পাঠে আমার এ অনুমান। সত্যি বলতে কি এটা অনুমান নয় বাস্তবতা। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি বেশিদিন হয়নি, মাত্র তিন মাস। বাংলাদেশ থেকে আসার আগে আমি সে রকমই দেখে এসেছি। আন্দোলনের নামে হরতাল, ধর্মঘট, ভাংচুর। এখনো সে অবস্থাই চলছে। এ চার ঘণ্টা সময়ে বাংলাদেশে এ মুহূর্তে সম্ভাব্য কি কি ঘটতে পারে আমি ভাবতে বসি। রাজনীতির নামে বাংলাদেশে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে এ মুহূর্তে যা ঘটছে তা পত্রিকা না পড়েও চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়।

এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে বহু কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র পাওয়ার পর যখনই গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করলাম আমরা পেছন দিকে হাঁটতে থাকলাম। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র আমরা পুরোদমে রপ্ত করতে পারিনি। আমরা সবাই চাই ক্ষমতা অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে পাওয়ার। এ পাওয়ার দখলের লড়াইয়ে বাংলাদেশে এই চার ঘণ্টা নিশ্চয়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে তার অনুসারীদের সামনে বক্তব্য দিয়েছে, দলীয় অনুগতদের নিয়ে মিছিল-মিটিং করেছে। মিছিল-মিটিং শেষে পুলিশের সঙ্গে মারামারি করেছে, দেশের সম্পদ ভাংচুর করেছে, লুটপাট করেছে। নতুবা কোনো শ্রমিক বা পেশাজীবী দল কোনো না কোনো আন্দোলনের উসিলায় রাস্তাঘাট অবরোধ কিংবা যানবাহন ভাংচুর করে অফিস-আদালতের কাজকর্ম স্থবির করে দিয়েছে। ২০০৬-এর মে থেকে বিশেষ করে পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের এ মারমুখী আন্দোলন আমাদের অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যে কতোটা পিছিয়ে দিচ্ছে আমরা কি কখনো তা ভেবে দেখেছি? রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলেও তো আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। বতসোয়ানায় এসেছি তিন মাস হতে চললো। এই তিন মাসে এ পর্যন্ত আমি এ দেশের কোনো রাজনৈতিক দলের দাবি-দাওয়া নিয়ে কোনো মিটিং-মিছিল অনুষ্ঠিত হতে দেখিনি। এ দেশের লোকেরা রাজনীতি নিয়ে তেমন একটা মাথাও ঘামায় না। কিন্তু আমাদের দেশে কেন এমন হচ্ছে? এই যে এ ক’দিন ধরে বাংলাদেশে পোশাক শিল্পে যে নৈরাজ্য চললো, বর্তমানে রাজনৈতিক যে নৈরাজ্য চলছে তাতে করে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিকভাবে আমরা কতোটা পিছিয়ে পড়ছি তা কি আমরা বুঝতে পারছি না?

আমাদের দেশে পোশাক শিল্প এখন রফতানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। মোট রফতানি আয়ের ৭৬ ভাগ আসে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে। কিন্তু এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরকে কেন এভাবে অবহেলা করা হচ্ছে? শ্রমিকরা কেন আন্দোলনে যায় মালিক পক্ষ এবং সরকার পক্ষ নিশ্চয়ই জানে। বাংলাদেশে শ্রমিক পক্ষ বিশাল একটি পক্ষ। এদের কেউ দিনমজুর, কেউবা কোনো একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি নতুবা কোনো কারখানা বা ওয়ার্কশপের শ্রমিক কিংবা পরিবহন শ্রমিক, উৎপাদন শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক। এসব শ্রমিকের মজুরি আর কতোই বা। ন্যূনতম পাচশ’ থেকে আরম্ভ হয়ে হাজার দেড় বা দুইয়ের বেশি নয় নিশ্চয়ই। এ সামান্য আয় দিয়ে শ্রমিকরা কিভাবে জীবনধারণ করবে, বর্তমান বাজারদরে তা কি কেউ ভেবে দেখেছেন? লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে যে পোশাক শিল্প মোট রফতানি আয়ের ৭৬ ভাগ দখল করে আছে, সে পোশাক শিল্পে কতো লাভ হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। এ লাভের অংশ থেকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৬৬২ টাকা থেকে একটা সম্মানজনক অবস্থায় কি ইচ্ছা করলে মালিক পক্ষ এবং সরকার নিয়ে যেতে পারে না? এর জন্য কেন এতো রশি টানাটানি? বাংলাদেশ ছাড়া এতো সস্তা শ্রম বিশ্বের আর কোথাও আছে কি না সন্দেহ। একজন শ্রমিক পরিবার এ ন্যূনতম মজুরি দিয়ে পরিবার চালাতে পারবে কি না এ রকম একটি নিরপেক্ষ জরিপ পরিচালনা করে দেখা যেতে পারে, চার সদস্যের একজন শ্রমিকের সংসারে মাসিক ন্যূনতম কতো টাকা ব্যয় হয়। আমার ধারণা, কোনো না কোনো গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো সাংবাদিক শ্রমিকদের প্রকৃত অবস্থা ইতিমধ্যেই গবেষণাকারে কিংবা রিপোর্ট আকারে তুলে ধরেছেন। এগুলো যাচাই-বাছাই করে ন্যূনতম মজুরি শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী পুরোটা না হলেও কতোটুকু সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যায় সেটা সরকার এবং মালিক পক্ষকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে কিন্তু আমরা বতসোয়ানা দেশ থেকে সময়ের দিক দিয়ে এগিয়ে থাকলেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্রমেই পিছিয়ে যেতে থাকবো।

বতসোয়ানায় যখন বেলা পৌঁনে ১টা বাংলাদেশে তখন বিকাল পৌঁনে ৫টা। এ চার ঘণ্টা সময়ে অর্থাৎ বেলা পৌঁনে ১টা থেকে বিকাল পৌঁনে ৫টা পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল যদি কোনো না কোনো কারণে কোনো মিটিং-মিছিল আহ্বান করে থাকে সেখানে নিশ্চয়ই ছোট-বড় কোনো গণ্ডগোল হয়েছে, ভাংচুর হয়েছে, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান-মার্কেট বন্ধ থেকেছে। রাজপথ-বন্দর অচল থেকেছে। যানবাহন বন্ধ থেকেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। বতসোয়ানা থেকে সময়ের দিক দিয়ে এগিয়ে থেকেও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়াটা বাংলাদেশের জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনবে না। এ কথাটি কে কাকে বোঝাবে? একে অন্যের দোষারোপ করতে করতে আমরা বাক যুদ্ধে এগিয়ে যাবো। কিন্তু দেশ পিছিয়ে যাবে। বতসোয়ানা থেকে সময়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে থেকেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পিছিয়ে যেতে পারে না। এ জন্য আমাদের প্রকৃতই ছাড় দিতে হবে। সহনশীলতার মনোভাব নিয়ে আমাদের এগোতে হবে। আমরা নিজেরা কেন হানাহানি করে দেশকে পিছিয়ে দেবো? চার ঘণ্টা সময়ের মূল্য আমরা সবাই মিলে যদি দিই তাহলে কতোটুকু এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, আমাদের দেশের মানুষ কি তা বুঝতে পারে না? নাকি ক্ষমতালোভীদের ক্ষমতার লড়াইয়ের বলী হয়ে আমরা বতসোয়ানা দেশটি থেকে ক্রমেই পেছাতে থাকবো?

চলবে...
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×