সাইবার ক্যাফে এবং আমাদের কিশোর সমাজ
আমার গবেষণা কেন্দ্র ইএফএলবিডি অফিসের সাইবার ক্যাফেতে এক ঝাঁক কিশোর ছেলে ভিড় জমায় প্রায়ই। ছনটেক অগ্রদূত বিদ্যানিকেতনের সপ্তম এবং অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র সবাই। নেটে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটায়। নেটে বসে কি করে সেই প্রশ্নের সদুত্তর তারা দিতে পারে না। আমি তাদের সাথে কথা বলে বুঝেছি ওরা স্রেফ কৌতুহল বশতঃই নেটে বিচরণ করে। তথ্যের মহাসমুদ্রে তারা হারিয়ে যায় কি এক অজানা কৌতুহল থেকে।
তথ্যপ্রযুক্তির মহাসমুদ্রে এই বয়সের কিশোররা কি করবে ভেবে পাই না। তথ্যপ্রযুক্তির সম্ভাবনা বিষয়ে জাতীয়ভাবে আমাদের কোন নীতিমালা নেই। শিক্ষার মধ্যেও আমরা কম্পিউটার তথা তথ্যপ্রযুক্তির অবস্থানকে জোরদার করতে পারিনি। নবম শ্রেণী থেকে কম্পিউটার নামক একটি বিষয় রাখা হয়েছে ঐচ্ছিক হিসেবে। অনেক শিক্ষার্থী প্র্যাকটিকেল নাম্বার পাওয়ার লোভে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টি নেয়। কিন্তু প্রকৃত কম্পিউটার শিক্ষায় কতজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিখছে তা ভাববার বিষয়। আমরা তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের কথা বলি কিন্তু কোন দিক নির্দেশনা ঠিক করতে পারিনি। আমাদের ভাবনাগুলো সেমিনার-সিম্পোজিয়াম-টকশো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু তার বাস্তবায়নে আমরা উৎসাহী হই না। আমাদের কাজে নেমে পড়তে হবে।
সপ্তম-অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া এই কিশোর ছেলেরা কৌতুহল বশতঃ তথ্যপ্রযুক্তির মহাসমুদ্রে পড়ে গিয়ে হাবুডুবু খাবে। যেমন করে স্রেফ কৌতুহল থেকে মাদকের করাল গ্রাসে পতিত হয় আমাদের কিশোর এবং তরুণ সমাজ। মাদকের চাইতেও ভয়াবহ নেশার বস্তু হয়ে যেতে পারে ইন্টারনেট, যদি আমরা তাদের এ পথে বিচরণকে সুনির্দিষ্ট না করতে পারি। তখন তাদেরকে উদ্ধারের কোন পথ থাকবে না।
তথ্যপ্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার নামে ঢাকা শহরের সাইবার ক্যাফেগুলোতে কি ঘটছে তা একটিমাত্র উদাহরণ দিলেই যথেষ্ঠ হবে বলে মনে করি।
"দ্যা আহমেদ মামুন বলেছেন: মিরপুর স্টেডিয়ামের পাশে দু'টি সাইবার ক্যাফে আছে।
নাম আড্ডা।
এখানে ছেলেরা তার গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে ঢুকে ছোট কুঠুরি ঘরের মধ্যে।
দেখা গেছে এই কুঠুরি ঘরের মধ্যে অনেক কম্পিউটারই অচল।
তরপরেও ছেলে মেয়েরা ঘন্টার পর ঘন্টা কাটায়।
আগে বুকিং না দিলে সিট পাওয়া যায় না।
অনেকে লুঙ্গি পরে গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে ঢুকে পড়ে।
আড্ডা হল মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পেছনে।
বিশ্বাস না হলে ঘুরে দেখতে পারেন।
আমার অনেক বন্ধু এখন গার্ডেনে না গিয়ে তার গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ক্যাফেতে ডেট দেয়।"
এই কিশোরদের কম্পিউটার এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে একটি ফ্রি প্রশিক্ষণ দেওয়ার নিমিত্তে আমি একটি উদ্যোগ নিয়েছি। ওদের প্রত্যেকের ই-মেইল আইডি খুলে দিয়েছি। এখন থেকে ওরা নিয়মিত মেইলে পরষ্পরের সাথে যোগাযোগ রাখবে। ওদের অভিভাবকদের সাথেও একদিন সমন্বয় সভা করবো।
লেখাটি ব্লগে দেওয়ার পর সম্মানিত অনেক ব্লগারের কাছ থেকে অনেক উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য এসেছে। এই মন্তব্যগুলো আমাকে উৎসাহিত করেছে। গতকাল এই ৭ কিশোর অদম্য আগ্রহ নিয়ে কম্পিউটার বিষয়ে কিছু জানতে এসেছিল। গতকাল ছিল ওদের প্রথম ক্লাশ। শনি, সোম, বুধ এই তিনদিন আপাতত তাদের প্রশিক্ষণ দেবো।
আমি তাদের খব সহজভাবে কম্পিউটার বিষয়ে কিছু তথ্য দিয়েছি। ওদের কাছে কম্পিউটার এতদিন শুধু একটি গণনা যন্ত্রই ছিল। এখন কম্পিউটার তথ্যপ্রযুক্তির বাহন- এটি ওরা ভাবতে শিখেছে। একটি কম্পিউটারই যে একজন ব্যক্তির জীবন ভাবনাকে পরিবর্তন করে দিতে পারে তা জেনে ওরা উৎফুল্ল হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে ধারণ করে এই কিশোররা একদিন বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার যোগ্যতা অর্জন করবে। স্রেফ কৌতুহল থেকে হারিয়ে যেতে বসা বাংলাদেশের কিশোর সমাজ তথ্যপ্রযুক্তির জয়গান গেয়ে একদিন বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ আসনে বসাবে- এই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।
আপাতত আমরা আমাদের গবেষণা সহকারীকে দিয়েই প্রশিক্ষণের কাজটি চালাচ্ছি। আপনারা যদি কেউ সময় করে এই কিশোরদের মাঝে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে আপনাদের ভাবনা ছড়িয়ে দিতে চান তাহলে ইএফএলবিডি অফিসের নাম্বারে (৭৫৫৪৬৭৩) যোগাযোগ করুন। আপনাদের পরামর্শ এবং মতামত এই কিশোরদের সামনে এগিয়ে যেতে আরও প্রেরণা যোগাবে। আমার আগের পোস্ট পড়ে অনেকেই এই কিশোরদের প্রশিক্ষণদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপনারা সপ্তাহে ১ দিনও যদি সময় বের করে নিতে পারেন (যাঁরা ঢাকায় থাকেন) আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকবো।
ধন্যবাদ সবাইকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ দুপুর ২:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


