বর্তমান সরকার অনেক নতুন কাজের উদ্যোগ নিচ্ছে। কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ সেটা নিয়ে কথা বলাটা এখন অন্যায়। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির সবচেয়ে বড় বদ-কপাল হলো, যার হাতেই যখন ক্ষমতা থাকে, আমরা তখনি একদম অল্পব্দ হয়ে যাই। এটা আসলে আমাদের দোষ নয়, ক্ষমতারই দোষ হবে। আমাদের চিন্তার দরজাগুলো কীভাবে যেন বন্ধ হয়ে যায়। আমি একদম এক শ’ ভাগ নিশ্চিত, এই ক্ষমতাসীন লোকগুলোই যখন রিটায়ার করবেন, তখন একদম ভিল্পু একটি মানুষ হয়ে যাবেন। আর তখন অনেক ভালো ভালো কাজের কথা বলবেন। একদম ভুলে যাবেন, এই কিছুদিন আগেই তিনি ওই চেয়ারে ছিলেন; আর তখনি কাজটি করা সহজ ছিল। কোনো অফিসের কেরানি থেকে কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান, পাতি নেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সর্বত্র একই চিত্র। কিন্তু এটা কেন হয়, আমি জানি না। তবে জিনিসটি যে হয়, সেটা আপনারাও জানেন। এই সরকারেরও কেউ কেউ এখন এমন কিছু কাজ করছেন, আমি নিশ্চিত এরা যখন রিটায়ার করবেন, তখন তাদের চেহারা একদম পাল্কেল্ট যাবে। এমন একটি কাজ হলো ঢাকা শহরে পাতাল রেল করার চেষ্টা। ঢাকা শহরের যানজট কমানোর জন্য সরকার শহরের মাটির নিচ দিয়ে রেললাইন তৈরির পরিকল্কপ্পনা প্রায় পাকা করে ফেলেছেন এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, এটা নিয়ে জাতীয় পত্রপত্রিকায় তেমন কোনো লেখালেখিও হচ্ছে না। এর দুটো কারণ হতে পারে। এক. মানুষ ভয়ে কিছু বলছে না; আর দুই. সবাই এই পরিকল্কপ্পনার সঙ্গে একমত। তাই সবার নীরব সমর্থন রয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপারটি হলো, এই একই কাজটি যদি পহৃর্ববর্তী যোগাযোগমন্ত্রী করতে যেতেন তাহলে আমরা অনেকেই পত্রিকায় বলতাম, বেহুদা কথা বলছে। ঢাকা শহরের মাটির নিচে পাতাল রেল করার ব্যাপারে আমি এতটুকু একমত নই।
১. ঢাকা শহর কোনো পরিকল্পিত শহর নয়। পরিকল্কপ্পনা একটি হয়তো ছিল, কিন্তু সেটা কখনোই বাস্তবায়ন করা হয়নি। ডিআইটি থেকে রাজউক সবার কাজই তো দেখলাম। রাস্তাঘাট পরিকল্কপ্পনা মতো নেই; কেউ রাস্তা বাধা নিয়ে ভবন তৈরি করেছেন, কেউ খাল ভরাট করে জমি দখল করে নিয়েছেন, কেউ রাস্তার ওপর ফুটপাত খেয়ে ফেলেছেন, কিংবা মহৃল রাস্তাতেই গাড়ি পার্ক করার ব্যবস্থা করে নিচতলায় দোকান বসিয়েছেন। অন্যদিকে শহরের ঠিক পেটের ভেতর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, আর সেনানিবাস। মোট কথা, একটি পরিকল্পিত শহরের যে জিনিসগুলো থাকা দরকার, তার কোনো কিছুই ঢাকা শহরে নেই।
২. আমাদের বর্তমান নতুন ঢাকা হলো পুরান ঢাকার বর্ধিত অংশ। আমরা মাঝে মধ্যে নাক বাঁকিয়ে বলি, ওহ, ওটা তো পুরান ঢাকায়; ভাবখানা এমন যেন নতুন ঢাকা আসলেই কিছু একটা। কিন্তু নতুন ঢাকা তো এখন পুরান ঢাকার চেয়েও খারাপ অবস্থা। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানী, উত্তরা ইত্যাদি এলাকাগুলো তো এই পৃথিবীর যে কোনো ভালো শহরের আদর্শের মাপকাঠিতে বস্তিতুল্য। আগে যেখানে একটি পল্গটে একটি দোতলা বাড়ি ছিল, সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসায়ীরা ২০ থেকে ৩০টি অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়েছেন। আর পুরো শহরটিকে একটি বস্তিতে পরিণত করেছেন।
৩. ঢাকা শহরের তেমন কোনো পার্ক বা খেলার জায়গা নেই। এক চিলতে রমনা পার্কের কথা বলে আর লজ্জা দেবেন না, প্লিজ। পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানটাকেও খেয়েছি। একবার ভেবে দেখুন তো, আজকালকার বাচ্চাগুলো ঘরে বসে বসে ফার্মের মুরগির মতো সাস্থ্যবান হচ্ছে কি-না? কিন্তু আমরা ভিন্ন পরিকল্পনা করতে পারতাম। একটি প্লটে ৩০টি অ্যাপার্টমেন্ট না করে, উন্নত বিশ্বের মতো ১০টি প্লট নিয়ে একসঙ্গে একটা বিশাল কমপ্লেক্স তৈরি করতে পারতাম। সেখানে ভবনটি হতো ৩০ তলা। আর নিচে থাকত খেলার জায়গা, সুন্দর হাঁটাহাঁটি করার জায়গা, একটু খোলা আকাশ। আমরা সেদিকে না গিয়ে বানিয়েছি বস্তি।
৪. ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা বেড়েছে। এখন প্রায় দেড় কোটির মতো মানুষ। কিন্তু এই মানুষগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট সিস্টেম পরিকল্পনায় ছিল না। পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পয়ঃপ্রণালি, হাসপাতাল, স্কুল, টেলিফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদি আরো নাগরিক জীবনের বিভিল্পু বিষয়গুলোকে কখনোই সেভাবে তৈরি করা হয়নি। আবার অনেক ক্ষেত্রে চাইলেও সেটা করা যাবে না। কারণ কিছু জিনিস প্রথম থেকেই পরিকল্কপ্পনায় রাখতে হয়। সেটা ঢাকা শহরের জন্য করা হয়নি। তাই পাতাল রেল করলে হয়তো চলাফেরা একটু ভালো হবে; কিন্তু সেটাও বস্তিতে পরিণত হবে। কারণ বাকি সিস্টেমগুলো তো বস্তির মতো।
৫. ঢাকা শহরের কোনো ভবন সেফটি কোড মেনে করা হয়নি। এই মাত্র গতকাল একটি সেমিনারে এটা নিয়ে কথা বললেন জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। আল্লাহ না করুন, একটা ভালো ভূমিকম্প হলে আমাদের দেড় কোটি মানুষের মৃত্যুকূপ তৈরি হবে এই ঢাকা শহর। র্যাংগস ভবনের লাশের গল্পব্দ থেকেই আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের উদ্ধার কাজ কতটা কী হতে পারে।
৬. ঢাকা শহরে আমরা খুব বেশি একটা বাসে চড়ি না; তার একটি বড় কারণ হলো নিরাপত্তা। ঢাকা শহরের মতো ছোট শহরে গাড়ির শেষ নেই। একটি প্রাইভেটকার একজন যাত্রী বহনের জন্য কতটা জায়গা দখল করে নিচ্ছে। সেখানে আমরা যদি খুব ভালো বাস সার্ভিস চালু করতে পারতাম, তাহলে এই ট্রাফিক জ্যাম কখনোই থাকত না। প্রতি দশ মিনিট পরপর বাস। মানুষ সারাদিনের জন্য পাস কিনবে। যখন যেখানে খুশি উঠবে, আবার নেমে যাবে। পুরো বিশ্বেই এটা নিয়ম। আমরা সেটা করতে পারি না। সিঙ্গাপুর প্রতি বছর গাড়ির ট্যাক্স বাড়ায়। যার টাকা আছে, সে গাড়ি চড়ূক, কিন্তু দ্বিগুণ-তিনগুণ ট্যাক্স দিতে হবে। সেই ট্যাক্সের টাকায় নতুন বাস কেনা হবে। আমরা যেখানে ভালো একটা বাস সার্ভিস চালাতে পারি না, সেখানে পাতাল রেল কীভাবে চালাব?
৭. জাতিগতভাবে আমরা কখনোই কোয়ালিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। শুনতে একটু খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি যে, আমাদের দেশে এমন কোনো জিনিস নেই যেটা আমরা বলতে পারি, কোয়ালিটি। জাপান, কোরিয়া, জার্মানি, ব্রিটিশ এগুলো শুনলে যেমন একটা কোয়ালিটির কথা মাথায় আসে, আমাদের সেটা নেই। আমাদের মনোভাব হলো জোড়াতালি। যদি কাউকে জিজ্ঞেস করেন, ভাই এখানে জোড়াতালি মারলেন কেন? উত্তরে তিনি বলবেন, চলে তো। আমাদের পুরো জাতির হলো এ অবস্ট’া। চলছে তো। আমাদের কাছাকাছি দেশ ভারত আর চীন। এরাও একসময়ে কোয়ালিটি দিতে পারত না। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এরাও উঠে এসেছে। এখন চীন বা ভারতীয় গাড়ি শুনলে আর মুখ ভেংচি কাটে না কেউ। কিন্তু আমাদের কি তেমন কিছু আছে? অনেক না হোক, হাতেগোনা কি কিছু আছে? আমাদের শ্রমিকরা সৌদি আরব আর দুবাইতে গিয়ে উঁচু উঁচু ভবন তৈরি করে। কিন্তু নিজ দেশে কি নিজেরা কোনো পঞ্চাশতলা ভবন বানিয়েছি? কিংবা খুব বড় একটা ব্রিজ? নয়তো খুব ভালো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান?
তাহলে উপায় কী? ঢাকা শহর কি এভাবেই থাকবে? আর আমরা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় কাটাব? সময় ও টাকা দুটোই নষ্ট করব? এর উত্তর হলো, হ্যাঁ, ঢাকা শহর যা আছে তা-ই থাকবে। তবে পাতাল রেল করার জন্য যত হাজার কোটি টাকার বাজেট রাখা হয়েছে, সেটা দিয়ে আরেকটি ভিন্ন নতুন শহর তৈরি করা হবে। সেই শহরটি হবে ঢাকা থেকে একটু দূরে। সেটা কোনো এক্সিসটিং শহর হতে পারবে না। জমি কিনে একদম খোলা জায়গায় নতুন করে তৈরি করা হবে এই শহর। সেই শহরে প্রথমেই বানানো হবে প্রশস্ত রাস্তাঘাট, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, গ্যাস লাইন, সুয়ারেজ, পানি, টেলিফোন, ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট যাবতীয় জিনিস দিয়ে একটি আধুনিক শহর তৈরি করা হবে। যদি এমন শহর কেউ দেখে না থাকেন, তাহলে পাকিস্তানে গিয়ে ইসলামাবাদ দেখে আসুন, নয়তো মালয়েশিয়া। এই নতুন শহরে আগে থেকেই শুধু উঁচু ভবনের অনুমতি দেওয়া হবে। সঙ্গে থাকবে মাঠ, বাগান, নিরাপত্তা, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। কিন্তু শর্ত আছে একটি। ওই শহরে প্রবেশ করতে টোল দিতে হবে। যে কেউ ইচ্ছে করলেই ওখানে গিয়ে বস্তি বানাতে পারবে না। যত টাকায় পাতাল রেল করা যাবে, তার থেকে অনেক কম টাকায় এই নতুন শহরটি করা যাবে। সরকারকে শুধু দিতে হবে ইনফ্রাস্ট্রাকচার। আর বাকি জিনিসগুলো প্রাইভেট সেক্টরকে ছেড়ে দিলেই হবে। আর ওটাই হবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক শহর। বাংলাদেশে অনেক ভালো নগরবিদ আছেন। তারা এটি নিয়ে বিভিল্পু রকমের পরিকল্কপ্পনা দিতে পারেন। শুধু অনুরোধ থাকল, এটা নিয়ে যেন আবার বিশাল একটা আলোচনা পর্ব শুরু না হয়ে যায়; তারপর পুরো জিনিসটি ভেস্তে যায়। টু দ্য পয়েন্টে আলোচনা করে, একটি সঠিক কর্মপরিকল্কপ্পনা করে সামনে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ মানেই যেন ঢাকা শহর। নতুন এই শহরটি তৈরি হলে, আমাদের তীয় আরেকটি শহর হলো। মানুষের কাজের সুযোগও বাড়বে অনেক। বস্তির মানুষের মতো একটি জায়গায় কষ্ট করে সবাই না থেকে, দুটো বড় শহরে আমরা থাকতে পারি। এতে ঢাকা শহরের ওপর চাপও কিছুটা কমবে বৈকি।
===========================
জাকারিয়া স্বপন
লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ
দৈনিক সমকালে প্রকাশিত নিবন্ধটির লিংক
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ১২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




