
কুয়াশা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেবা প্রকাশনী থেকে আর কিশোরদের জন্য আর নতুন কোন বই বের হতনা।ব্যাপারটা খেয়াল করলেন এক লেখক।সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার কাজী আনোয়ার হোসেন কে অনুরোধ করলেন কিশোরদের জন্য একটা সিরিজ শুরু করার।কাজী আনোয়ার হোসেন অনুরোধ তো রাখলেন কিন্তু শর্ত জুড়ে দিলেন-"তবে আপনি ই শুরু করে দিননা?"
লেখক পড়ে গেলেন বিপদে এখন দুম করে কিশোরদের জন্য সিরিজ চালানোর জন্য কাহিনি কোথাথেকে আসবে???
ব্রাম স্ট্রোকারের "ড্রাকুলা"র অনুবাদ দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা এই লেখক ঠিক করলেন রবার্ট আর্থার জুনিয়রের বিখ্যাত “থ্রি ইনভেস্টিগেটরস”-এর অনুবাদ করবেন।অনুবাদ করতে গিয়ে দেখলেন,স্রেফ অনুবাদ করলেই চলবেনা।চরিত্র,কাহিনীতে অনেক রুপান্তর আনতে হবে।তো তিনি গল্পের পট বা মুল কাহিনি ঠিক রেখে বাকী সব পাল্টে ফেললেন।



মূল “থ্রি ইনভেস্টিগেটরস”-এর ৪৩টি বই, লিখেছিলেন ৫ জনে মিলে।আর্থার জুনিয়র শুরুটা করেছিলেন ১০টা গল্প দিয়ে,এরপর ১৩টি লেখেন উইলিয়াম আর্ডেন যার আসল নাম ছিল মাইকেল কলিন্স, ২টি লেখেন নিক ওয়েস্ট, ১৫টি লেখেন এম ভি ক্যারি বা ম্যারি ভার্জিনিয়া ক্যারি এবং ৩টি লেখেন মার্ক ব্র্যান্ডেল।



আর্থার জুনিয়রের ডিটেকটিভ-ক্রাইম গল্পগুলো রূপ নিল ক্রিস্টোফার পাইকের ভৌতিক-আধাভৌতিক,ফিকশন আর ভ্যাম্পায়ারের গল্পে!!!তবে এর মাঝেও দুই-একটা থ্রিলার প্রায়ই উঁকি মারতে দেখা যায় রকিব হাসান আর শামসুদ্দীন নওয়াবের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়।
মূল চরিত্র
আর্থার জুনিয়রের পিট ক্রোনশ-কে পরিবর্তন করে বানালেন আফ্রিকান আথল্যাথিক মুসা আমান।আর পরিবর্তন টা যে অনেকটায় তার প্রমাণ মুসার মুদ্রাদোষ- বাংলা বুলি 'খাইছে'।বাস্কেটবল কি দৌড়, রকি বীচের কার সাধ্য আছে ভোজনরসিক মুসা আমানকে হারানোর???আর খাওয়ার কথা নাই বা বললাম,যে ছেলের খাওয়ার বহর দেখে দোকানদার টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানায়,তাকে আরও কয়েক বোতল সোডা বিনামূল্যে দেওয়া উচিত।বাবা রাফাত আমান হলিউডের বড় টেকনিশিয়ান এবং মা মিসেস আমান গৃহিনী।মুসাকে ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করা, লনের ঘাস ছাটা এসব কাজ প্রায়ই করতে হয়। নিয়মিত ব্যায়াম করে আর পেশিশক্তিতে সবল। প্রয়োজনে প্রচন্ড শক্ত মাথা দিয়ে শত্রুর পেটে আঘাত করতে তার জুড়ি নেই। তার মাঝে মাঝেই নানারকম বাতিক জাগে।কিছুদিন পর তা মিটে গেলে আরেকটা শখে মন চলে যায়।দুনিয়ার কোন কিছুতেই ভয় না পাওয়া মুসা আমানকে কাবু করতে পারে শুধু একটি মাত্র জিনিস-ভুত।মোটামুটির দক্ষতার সাথে বিমান চালাতেও পারলেও বই পড়া তার খুবই অপছন্দের একটা কাজ।
মোটাসোটা শরীরের ছোটখাট চেহারার গোলগাল বাদামী চুলের খাটো নথি বব অ্যানড্রুজ-কে সামান্য পরিবর্তন করে রকিব হাসান রূপ দিলেন লম্বা, সোনালী চুলের কেতাদুরস্ত হ্যান্ডসাম রবিন মিলফোর্ড। চশমাটাও খুলে ফেলে দিলেন, সাথে যোগ করে দিলেন সামান্য আইরিশ ফ্লেভার।ব্যস হয়ে গেল পুরোদস্তুর চলমান জ্ঞানকোষ রবিন মিলফোর্ড।বাবা মিস্টার মিলফোর্ড একজন সাংবাদিক এবং মা মিসেস মিলফোর্ড গৃহিনী। রবিনের কাজ হচ্ছে তিন গোয়েন্দার সকল কেসের রেকর্ড রাখা বা নথি সংরক্ষণ করা। পাহাড়ে চড়ায় সে ওস্তাদ, কয়েকবার পাও ভেঙেছে একারণে। বই পড়তে খুব ভালোবাসে আর বই থেকে দ্রুত উদ্ধৃতি দিতে পারে। তিন গোয়েন্দার সবার মধ্যে সবচেয়ে কেতাদুরস্ত আর দেখতেও সুন্দর। রবিন রকি বীচ লাইব্রেরীতে একটি খন্ডকালীন চাকরীও করে। কিছুদিন অবশ্য একটি ব্যান্ডের দলের সঙ্গেও কাজ করেছে।তাছাড়া রবিনও বিমান চালাতে পারে,তবে সে অতোটা দক্ষ নয়।
অন্তত একটা বাঙালি চরিত্র না থাকলে পাঠক নিজেকে কাহিনীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে না, তাই দলনেতা জুপিটার জোনসকেই বানানো হলো বাঙালি।কিন্তু প্রচুর পরিবর্তন করে।কারণ বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা, মমতা-এগুলো ভিনদেশি চরিত্র পাবে কিভাবে???
জুপিটার জোনস হয়ে গেল জাবেদ পাশার বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আর কোঁকড়া চুলের নিচে লুকিয়ে থাকা অতিরিক্ত ব্যবহার করা মাথার অধিকারী একমাত্র ছেলে ‘কিশোর পাশা’।মাত্র ৭বছর বয়সে গাড়ি এক দুর্ঘটনার কারণে বাবা-মা দুজনকেই হারালে ও তার চাচা "পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ড"-র বিশাল পাকানো গোঁফধারী মালিক রাশেদ পাশা ও সবার কাছে তাকে নিজের ছেলে হিসেবে পরিচয় দেওয়া নি:সন্তান মেরি চাচী(মেরিয়ান পাশা) তাকে কখনো বাবা-মার অভাব বুঝতে দেননি।ছদ্মবেশ ধারণে পারদর্শী অভিনেতা মোটুরাম ওরফে কিশোর পাশা ইলেকট্রোনিক্সের কাজে ও বেশ পটু,তাই তাকে "ইলেক্ট্রোনিক্সের যাদুকর"ও বলা হয়।তার মুদ্রাদোষ হলো: গভীর চিন্তামগ্ন অবস্থায় সে ক্রমাগত নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে থাকে। তাছাড়াও সময় নাহলে কখনোই কাউকে কোনো কিছু বলতে চায় না!!! কোনো কোনো বইতে তার 'বাঘা' এবং 'টিটু' নামে দুটি কুকুরের নামও পাওয়া যায়। সে সাধারণত মেয়েদের ব্যাপারে আগ্রহী নয়,তবে পুরো সিরিজে এটা নানাভাবে মেনশন করা হয়েছে যে একমাত্র জর্জিনা পার্কারের সাথেই সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
পদ্ধতি:
পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে লোহা-লক্কড়ের স্তুপের নিচে পড়ে যাওয়ায় বেমালুম ভুলেই গেছেন কিশোরের চাচা। আর সেই সুযোগে বোরিস ও রোভার এর সাহায্যে তিন গোয়েন্দা সেই মোবাইল হোমের ভিতর তৈরি করে নিয়েছে নিজেদের হেডকোয়ার্টার।হেডকোয়ার্টারের স্থান খুব ছোট হলেও এতে রয়েছে ডার্করুম, যেখানে তিন গোয়েন্দা ছবি ওয়াশ করে থাকে; আছে নিজেদের বসার জন্য আলাদা জায়গা; টেলিফোন ও তাতে সংযোগ দেয়া লাল বাতি, যাতে হেডকোয়ার্টারের বাইরে থাকলে ঐ বাতির জ্বলা-নিভা দেখে তারা বুঝে নিতে পারে হেডকোয়ার্টারে টেলিফোন বাজছে; আছে পেরিস্কোপ, তিন গোয়েন্দা যার নাম দিয়েছে "সর্বদর্শন"; তবে "গোরস্তানে আতঙ্ক" বই-এ পেরিস্কোপের জায়গায় সিসি ক্যামেরা দেখা গেছে এছাড়া আছে নিজেদের তদন্ত করা কেস-রিপোর্টগুলো সংরক্ষণের জায়গা। এই গোপন হেডকোয়ার্টারে ঢোকার জন্য তারা তৈরি করে নিয়েছে আলাদা আলাদা গোপন পথ: "সবুজ ফটক এক", "দুই সড়ঙ্গ", "সহজ তিন", "লাল কুকুর চার" হলো সেসব গোপন পথেরই গুপ্ত নাম।কার্ড সম্পাদনা পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডেই তিন গোয়েন্দা একটি পুরোন ছাপার-যন্ত্রকে সারিয়ে নিয়ে নিজেদের কার্ড ছাপিয়ে নেয়।

কার্ডের উপরে শিরোনাম আকারে বড় করে লেখা থাকে "তিন গোয়েন্দা" কথাটি; তার ঠিক নিচেই থাকে তিনটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?); তার নিচে প্রথম সারিতে "গোয়েন্দা প্রধান:কিশোর পাশা", দ্বিতীয় সারিতে "গোয়েন্দা সহকারী:মুসা আমান", তৃতীয় সারিতে "নথি গবেষক: রবিন মিলফোর্ড" লেখা। কার্ডের গায়ে তিনটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেয়ার বুদ্ধিটা কিশোরের। এই তিনটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন একই সাথে তিনজন গোয়েন্দাকে প্রতীকায়িত করবে, আর রহস্যময়তা ও জিজ্ঞাসা ফুটিয়ে তুলবে। এছাড়া এই চিহ্ন (?) তাদের নিজেদের ট্রেডমার্ক হিসেবেও কাজ করে, কেননা যখনই তারা কোথাও বিপদে পড়ে যায়, তখনই এই চিহ্ন এঁকে নিজেদের উপস্থিতি বা অবস্থান জানান দিয়ে থাকে অন্যদের। এভাবে অনেকবারই তারা বিভিন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে।অবশ্য পরবর্তিতে তিন গোয়েন্দা তাদের কার্ডে প্রশ্নবোধক চিহ্নের স্থলে আশ্চর্যবোধক চিহ্ন (!) বসিয়ে নেয়। কিশোরের অভিমত, এই চিহ্ন দ্বারা নাকি আরো বেশি রহস্যময়তা ফুটিয়ে তোলা যায়। কার্ডের গায়ে এরকম চিহ্ন দেয়ার ক্ষেত্রে কিশোরের অভিমত হলো, এভাবে নাকি কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় এবং অপরিচিত ব্যক্তি কাছে চিহ্নগুলোর অর্থ বোঝানোর ছলে কিছুক্ষণ অতিরিক্ত সময় বের করে কথা বলা যায়, এতে তদন্তে অনেক সুবিধা হয়। তবে এই সব চিহ্ন অনেকের সন্দেহ জাগানোয় কিশোর কিছু দিনের জন্য চিহ্নগুলো উঠিয়ে দেয়।

অন্যান্য চরিত্র
গোলগাল চেহারার ভুড়িমোটা পুলিশ কন্সটেবল হ্যারিসন ওয়াগনার উইলিয়াম ফগর্যাম্পারকট ছিল প্রথম শত্রু।তবে টিটুর কামড় আর ক্যাপ্টেন রবার্টসনের দাবড় খেয়ে ফগ থুড়ি ফগর্যাম্পারকট কখনোই খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি।
গ্রিনহিলসের ছোটবেলার গোয়েন্দাগিরির স্মৃতি রকি বীচে আসার পরেও তাড়া করে ফেরাতে থাকল তিন গোয়েন্দাকে।তাই শেষ পর্যন্ত রহস্য খোঁজার জন্য রেন্টাল কোম্পানির সীমের বিচি আর শোফার হ্যানসনের সহায়তায় ঢুকতে হলো ডেভিস ক্রিস্টোফারের বিশাল স্টুডিওতে।তারপর সবুজ টর্চের ভূত তাড়িয়ে জোগাড় করতে হলো পুলিশ চীফ ইয়ান ফ্লেচারের সার্টিফিকেট। তাতেও সন্তুষ্ট হতে পারল না তিন গোয়েন্দা, খোঁড়া গোয়েন্দা “ভিক্টর সাইমন”-কে জোগাড় করতে হলো দেশ-বিদেশ ঘোরার জন্য, সাথে পাইলট ল্যারি কংকলিন ফ্রি।তবে একেবারে মুফতেও বলা যাবে না, রহস্য পাওয়ার জন্য মুসাকে চড়া মূল্য দিতে হলো নিসান জাং কিমের আজব সব রেসিপি খেয়ে!
ঝড়ের বেগে গোয়েন্দাগিরি চলছে, কেউ বাগড়া বাঁধাবে না তা কি হয়???শুঁটকি টেরিও তাই তার স্পোর্টসকার নিয়ে ঝড়কে টেক্কা দিতে যায় প্রতিবার।কিন্তু বিধি বাম, স্পোর্টসকারের পিছনে থাকা টাকি-কডির গুঁতোগুঁতিতে নিয়মিতই খাদের নিচে পড়তে হয়।তবে ডক্তর মুন ভালই ভুগিয়েছে।রবিন হুড খ্যাত শোফা অবশ্য তিন গোয়েন্দার শত্রু কোন কালেই ছিল না।কিন্তু বন্ধুত্বপুর্ণ ছিল এই কথা ও বলা যাবে না।যেতে হবে ক্যারিবিয়ানের দ্বীপে, প্রশান্ত মহাসাগরের অশান্ত জলে কিংবা রৌদ্রতপ্ত মরুভূমিতে।এমন সময় পুরোনো এয়ারক্র্যাফট নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন বেপরোয়া পাগল বৈমানিক আরব বেদুইন ওমর শরীফ।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০১৮ রাত ৩:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




