somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানচিত্র এবং প্রশ্ন ?

০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



একটু ভাবুন তো, মানচিত্র আসলে কী?
পৃথিবীর বুকের ওপর আঁকা কিছু রেখা। কিছু রেখা নির্ধারণ করে দেয় এই অংশটি একটি দেশের, ওই অংশটি অন্য দেশের। এই রেখার একপাশে জন্মালে আপনি একজন বাংলাদেশি, অন্য পাশে জন্মালে ভারতীয়, আরেক পাশে জন্মালে পাকিস্তানি, চীনা কিংবা আমেরিকান।
কিন্তু এই রেখাগুলো কে তৈরি করেছে?
প্রকৃতি? পৃথিবী নিজে? নাকি কোনো রাজা, সম্রাট, ঔপনিবেশিক শক্তি, রাজনৈতিক নেতা কিংবা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী?

আজকের পৃথিবীর মানচিত্র কয়েকশ বছর আগের মানচিত্রের মতো নয়। আবার কয়েকশ বছর পরের মানচিত্রও আজকের মতো থাকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
একসময় বিশাল সাম্রাজ্য ছিল। আজ সেগুলোর অস্তিত্ব নেই। একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের একটি অংশ ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হলো। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হলো।
একই ভূখণ্ড, একই নদী, একই পাহাড়, একই মাটি—কিন্তু রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জাতীয় পরিচয়ও পরিবর্তিত হলো।
তাহলে কয়েক শতাব্দী আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা কোন দেশের নাগরিক ছিলেন? তাঁদের জাতীয়তা কী ছিল?
আজ আমরা যে জাতীয় পরিচয় নিয়ে গর্ব করি, আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে সেই পরিচয়ের অস্তিত্বই হয়তো ছিল না।
আবার আজকের শিশুরা যে জাতীয়তা নিয়ে বড় হচ্ছে, ভবিষ্যতে তাদের নাতি-নাতনিরা হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক হবে।
তাহলে জাতীয়তা কি মানুষের প্রকৃত পরিচয়, নাকি একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দেওয়া পরিচয়?


মানুষ যুদ্ধ করে। মানুষ হত্যা করে। মানুষ নিজের জীবন দেয়।
কখনো একটি সীমান্ত রক্ষার জন্য, কখনো একটি ভূখণ্ড দখলের জন্য, কখনো একটি পতাকার জন্য, কখনো একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।
কিন্তু যে সীমান্তের জন্য আজ একজন মানুষ জীবন দিলেন, সেই সীমান্ত যদি আগামী পঞ্চাশ বছর পর পরিবর্তিত হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?
যে ভূখণ্ডের মালিকানা নিয়ে আজ হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সেই ভূখণ্ড হয়তো অন্য কোনো রাষ্ট্রের অংশ হবে।
যে জাতীয় পরিচয়ের জন্য আজ মানুষ গর্ব করছে, ভবিষ্যতে সেই জাতীয় পরিচয় হয়তো ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, একটি পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক রেখার জন্য মানুষের অপরিবর্তনীয় জীবন বিসর্জন দেওয়ার অর্থ কী?
মানুষের জীবন একবারই আসে। কিন্তু মানচিত্র বারবার পরিবর্তিত হয়।

পৃথিবীর সব নেতাই উন্নয়নের কথা বলেন, তাহলে আমরা বিভক্ত কেন?
প্রতিটি দেশের নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান ও রাজনৈতিক দল নিজেদের জনগণের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সুন্দর ভবিষ্যতের কথা বলেন।
প্রত্যেকেই দাবি করেন, তাঁরা মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করছেন।
যদি মানুষের কল্যাণই সবার মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে এই মানুষগুলোকে এতগুলো রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রয়োজন কেন?
এক দেশের মানুষ কেন অন্য দেশের মানুষের কাছে বিদেশি?
একই পৃথিবীর মাটি, পানি, বাতাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করার পরও কেন আমাদের মধ্যে এত রাজনৈতিক মালিকানা?
একটি নদী কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত বোঝে না। বাতাস পাসপোর্ট দেখে চলাচল করে না। সূর্যের আলো কোনো দেশের নাগরিকত্ব যাচাই করে না। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদও মানুষের আঁকা সীমান্ত মেনে তৈরি হয়নি।
তবুও মানুষ নিজের সুবিধামতো পৃথিবীকে ভাগ করেছে এবং সেই বিভাজনকে স্বাভাবিক, স্থায়ী ও পবিত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
আমরা জন্মের পর থেকেই শিখি—এই দেশ আমার, ওই দেশ অন্যের। এই পতাকা আমার, ওই পতাকা অন্যের। এই সীমান্ত আমার পরিচয়, ওই সীমান্ত অন্যের পরিচয়।
কিন্তু কখনো কি প্রশ্ন করেছি, পৃথিবীর মালিকানা নির্ধারণ করার অধিকার মানুষকে কে দিয়েছে?

জাতীয়তা কি জন্মের দুর্ঘটনা নয়?
একজন মানুষ কোথায় জন্মাবে, সেটি তার নিজের সিদ্ধান্ত নয়। সে কোন দেশের নাগরিক হবে, কোন পাসপোর্ট বহন করবে, কোন সীমান্তের ভেতরে তার জন্ম হবে—এসবের কোনোটিই তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
অথচ এই অনির্বাচিত জন্মস্থানই তার জীবনের অসংখ্য সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করে দেয়।
একজন শিশু উন্নত রাষ্ট্রে জন্ম নিয়ে সহজেই পৃথিবীর অনেক দেশে ভ্রমণের সুযোগ পায়। অন্যদিকে আরেকজন শিশু এমন একটি দেশে জন্মায়, যার পাসপোর্ট নিয়ে পৃথিবীর অনেক দরজা তার জন্য বন্ধ থাকে।
দুজনের জন্মই সমানভাবে মানবিক, দুজনের সম্ভাবনাও সমান হতে পারত। অথচ শুধু জন্মস্থানের রাজনৈতিক সীমানা তাদের মধ্যে অধিকার ও সুযোগের পার্থক্য তৈরি করে দেয়।
তাহলে জাতীয়তা কি সত্যিই মানুষের অর্জিত পরিচয়, নাকি জন্মের সঙ্গে পাওয়া একটি অনির্বাচিত রাজনৈতিক পরিচয়?
আমরা কি এমন একটি পৃথিবী কল্পনা করতে পারি না, যেখানে কোনো মানুষ তার জন্মস্থানের কারণে অন্য মানুষের তুলনায় বেশি বা কম স্বাধীন হবে না?

যদি কোনো দেশ না থাকত?
কল্পনা করুন, পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্র নেই। কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত নেই। কোনো জাতীয়তা নেই। কোনো পাসপোর্ট বা ভিসা নেই।
পৃথিবীর একজন মানুষ পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় যেতে পারে, বসবাস করতে পারে, কাজ করতে পারে এবং অন্য মানুষের সঙ্গে জীবন ভাগ করে নিতে পারে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইউরোপ কিংবা আমেরিকা—এসব আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না। থাকবে শুধু পৃথিবীর বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষ।
কেউ জন্মসূত্রে বিদেশি হবে না। কেউ অন্য দেশের মাটিতে শুধু তার জাতীয়তার কারণে অপরিচিত বা বহিরাগত হয়ে যাবে না।
একজন মানুষের পরিচয় হবে তার মানবিকতা, চিন্তা, কাজ, জ্ঞান এবং আচরণ দিয়ে; তার জন্মস্থানের রাজনৈতিক সীমানা দিয়ে নয়।
অবশ্যই এমন একটি পৃথিবী পরিচালনা করতে প্রশাসন, আইন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও স্থানীয় শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। কিন্তু এসব পরিচালনার জন্য কি অবশ্যই আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং জাতীয়তার প্রয়োজন?
আমরা কি একটি বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা কল্পনা করতে পারি না, যেখানে পৃথিবীর সব মানুষ সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে?

"মানচিত্র পরিবর্তিত হয়, রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়, জাতীয়তা বদলে যায়—কিন্তু পৃথিবী একই থাকে। তাহলে আমাদের আনুগত্যের কেন্দ্র একটি পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক রেখা হবে কেন, আমাদের একমাত্র পৃথিবী নয় কেন?"
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪১
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তোমার মুখের রেখা আঁকতে চেয়েছি।

লিখেছেন জায়েদ হোসাইন লাকী, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০



রাতটি ছিল নিকোটিনে ভেজা
ধোঁয়ার ভেতরে তোমার অবয়ব হঠাৎ উধাও হয়ে গেল
চাঁদ তখন লাল আর ঠিক আমার ফুসফুসের মতোই ক্লান্ত।
তুমি আলো হয়ে রইলে, আমি অবাধ্য আলোর ফসিল

আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ - ছোঁয়া

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৭

আজ বৃষ্টি তাকে প্রথম ছুঁয়েছে। ওর স্পর্শে তার সমস্ত সত্তা যেন হীরের মত স্বচ্ছ স্ফটিকে ছেয়ে গেছে। বৃষ্টি বলেছে, সে আকাশের কাছে গিয়েছিল। মেঘের কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কলকাতায় নিয়মিত যারা যাতায়ত করেন তারা এই প্রশ্নের মূখোমুখি হবেন প্রায়ই।

লিখেছেন ইমরান আশফাক, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৩

আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে যারা কলকাতায় যাতায়ত করে থাকেন তারা স্হানীয়দের কাছেকি এই প্রশ্নটির মূখোমুখী হয়েছেন নিয়মিতভাবে: দেশভাগের সময় বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ আর ভারতকে দেয়া হয়েছিলো খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৯


আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

×