সময়ের বিবর্তন ও যান্ত্রিক সভ্যতা বিকাশের ফলে বিলুপ্তির পথে আবহমান গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতির ধারক, দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ঐতিহ্যবাহী পালের নাও।
এক সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-ঝিল, এমনকি সমগ্র উপকূল জুড়ে নয়নাভিরাম শোভা বিস্তার করত বিচিত্র ধরণের পালতোলা নৌকা। ভাটির অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের সঙ্গেই ছিল নদী, সাগর আর পালের নাওয়ের নাড়ি ছেঁড়া সম্পর্ক। পালের নাওকে উপজীব্য করে যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা রচনা করেছেন তাঁদের অমূল্য সৃষ্টি কবিতা, ছড়া, গল্প, গান পালা ইত্যাদি। প্রখ্যাত শিলল্পীরা তৈরি করেছেন উঁচুমানের শিল্পকর্ম। শুধু দেশী কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী বা রসিকজনই নন বরং বিদেশী অনেক পর্যটকের মনেও অনুরণন সৃষ্টি করেছে পালের নাও।
বিভিন্ন আকার ও ধরণের নৌকাই ছিল দেশের সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পরিবহনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। আর এ সব নৌকা চালানোর জন্য পালের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। হাজারীপাল, বিড়ালীপাল, বাদুরপাল ইত্যাদি পালের ব্যবহার ছিল নৌকাগুলোতে।
পালেরনৌকার পাশাপাশি মাঝিদেরও বেশ কদর ছিল এক সময়। প্রবীণ মাঝিরা নৌকা চালানোর বিভিন্ন কলাকৌশল সম্পর্কে বেশ পারদর্শী ছিলেন। তাঁদের হিসেব রাখতে হত জোয়ার-ভাটার, বিভিন্ন তিথির এবং শুভ-অশুভ ক্ষণের। কথিত আছে- বিজ্ঞ মাঝিরা বাতাসের গণ্ধ শুঁকে বলে দিতে পারতেন ঝড়ের আগাম খবর। রাতের আঁধারে নৌকা চালানোর সময় দিক নির্ণয়ের জন্য মাঝিদের নির্ভর করতে হত আকাশের তারার ওপর। তাই আগেভাগেই শিখে নিতে হত কোন তারার অবস্থান কোন দিকে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্পন, যাত্রীবাহী গয়না, একমালাই নৌকা, কোষানৌকা, ছিপনাও, ডিঙিনৌকা, পেটকাটানাও, বোঁচানাওসহ বিভিন্ন ধরণের পালেরনাওয়ের ব্যবহার ছিল। ২০/২৫ বছর আগেও দেখা যেত, দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে মাঝিরা নৌকার পাল উড়িয়ে দিয়ে ঢেউয়ের তালে-তালে উদাত্ত্ব কণ্ঠে ভটিয়ালি সুরের মূর্ছনায় মুখরিত করে তুলছে দিক-দিগন্ত। উদাস করা ভরদুপুরে এমন দৃশ্য আকৃষ্ট করত সকলকেই।
যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে পালতোলা নৌকা, কদর নেই মাঝি-মাল্লাদেরও। নৌকায় পাল এবং দাঁড়-বৈঠার পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে ডিজেলচালিত ইঞ্জিন।
পটূযাখালীর গলাচিপা উপজেলার বদরপুর গ্রামের প্রবীণ মাঝি আবদুল বারেক (৭৬) জানান, আগের দিনে বরযাত্রী নেওয়া, নাইওরি' আনাসহ ান্যান্য মুভ যাত্রার আগে মাঝিদের ডেকে দিন-ক্ষণ ঠিক করা হত। এখন আর এ রীতি নেই।
মাঝেমধ্যে দুএকটা পালের নাও এখনো নদ-নদীতে দেখা যায়। তবে এক সময় হয়তো হারিয়েই যাবে আমাদের লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী পালের নাও। পরবর্তী প্রজন্মের শিশুরা ভুলে যাবে, 'পালের নাও, পালের নাও, পান খেয়ে যাও...' আত্যাদি ছড়া কাটতে। বিচিত্রিত রঙের পালের বাহারিতে ঝল-মল করবে না এ দেশের নদ-নদী, খাল-বিল।
[email protected]
হারিয়ে যাচ্ছে দেশের লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য পালের নাও
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
মানবতা, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে জাতীয় কবি নজরুলের চিরন্তন আহ্বান
বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগীতজ্ঞ, দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক। তাঁকে শুধু “বিদ্রোহী কবি” বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না;... ...বাকিটুকু পড়ুন
Humans are (not) from Earth- তবে কি আমরা মহাবিশ্বের ভৃত্য?

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ২

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।
একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/30393976|প্রথম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...
আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...
২০১০, এক-এগারোর পর থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত- যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, যারা গুম, নির্যাতন, কারাবাস, মামলা, চাকরি হারানো, পরিবার ভেঙে যাওয়া- সবকিছুর মূল্য দিয়েছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ভাবনা

আজ দেশজুড়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ২৪ -এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভ্ন্নি সময়ে বহু নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরেছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ছাড়াও নাম জানা-অজানা হাজারো ব্যাক্তি তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।