somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পানকৌড়ি-কিশোরী ও তীক্ষ্ণ শলাকা

২৫ শে ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ৯:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শীতের রোদেলা দুপুর। চারদিকে সুনসান নীরবতা। মেঠোপথের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বিশাল বদ্ধখাল। বদ্ধখালের এ জলাশয়টি শতবর্ষী। কালো কুচকুচে পাখনা ঝাপটিয়ে জলাশয়ের এপার-ওপারে চক্কর দিচ্ছিল কিশোরী পানকৌড়ি। পরিবারের সদস্যরা কেউ কেউ পেছনের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে আনমনে দেখছিল তার উচ্ছাস। এক সময় ঝুপ করে জলাশয়ের এক কোনে নীলচে জলে ডুব দিল সে। একটা পাবদা-পুঁটি ঠোঁটে নিয়ে পানিতে ভেসে উঠল। হাতে ক্যামেরা থাকলেও ১৮-৫৫ লেন্সে পানকৌড়ি-কিশোরীর দূরন্তপনার ছবি তোলা সম্ভব হল না।
অবাক আর বিষ্ময়ের সঙ্গে দেখছিলাম এ দৃশ্য। প্রায় মিনিট বিশেক পরে পানকৌড়ি-কিশোরীটি উগড় গিয়ে বসল খালের পাড়ে একটি হিজলগাছের ডালে। এবার আমার অনেকটা কাছাকছিই। একহার গড়ন, কালো কুচকুচে পালক, মায়াবী চোখ। এ যেন অরূপ সৌন্দর্যের সম্মিলন।
বাঁ দিক থেকে হিশ করে একটা শব্দ শুনলাম। চোখ ফিরিয়ে দেখলাম তিন-চারটি কিশোর দৌড়াচ্ছে। ওরা দৌড়িয়ে হিজলগাছটার নীচে গিয়ে থামল। কিছু বুঝতে না পেরে এগিয়ে গেলাম ওদের দিকে। ওদের মধ্য থেকে একটি কিশোর হিজলতলার কেয়াজঙ্গলে ঢুকল। এক মিনিটের মাথায় কিশোরটি বেরিয়ে এলো কেয়বন থেকে। ওর হাতে একটি তীরের মত লোহার তীক্ষ্ণ শলাকা। আর তীক্ষ্ণ শলাকাটি বিদ্ধ হয়ে আছে একটি পানকৌড়ির হৃদপিণ্ড বরাবর। কিশোরটি তীক্ষ্ণ শলাকাটি টেনে বের করতে না করতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল পানকৌড়িটি। আমার বুঝতে বাকি থকল না, এতক্ষণ আমি যে পানকৌড়ি-কিশোরীর উচ্ছল উড়ে বেড়ানো, জলকেলি, আহার খোঁজা এবং মায়াবী চোখের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে বিমোহিত ছিলাম, সেই কিশোরীকেই হত্যা করেছে চার কিশোরের একজন।
পনকৌড়ি-কিশোরীর হত্যাকারী কিশোরটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‌বাড়ি কোথায়।' ও হাতের ইশারায় দেখালো, বদ্ধখালের বাইরের দিকে আগনুমুখা মোহনায় একটি নৌকার বহর।
ওরা বেদে সম্প্রদায়ের। মুন্সগিঞ্জের লৌহজং থেকে এসেছে দল বেঁধে। নৌকার বহর নিয়ে। বহরের ২২টি নৌকার প্রায় সব কটিতেই কিশোর বয়সী ছেলেরা আছে। লোহার শলাকা সুচালো করে তীরের মত করে তৈরী করা এ ধরণের অস্ত্র দিয়ে ওইসব কিশোররা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বন-বাদাড়ে ঘুরে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি শিকার করছে।
বেদে-বহরের কাছে গিয়ে ওঁদের সরদার নয়া শেখকে ডাকলাম। বললাম, ‌এখনই নোঙ্গর তুলতে হবে। এ এলাকায় কোনো পাখি হত্যা করা যাবে না। দল বেধে বেদে বহরের সদস্যরা আমার কথার প্রতিবাদ করতে এলেন। আমি আমার কথায় অনড়। এক পর্যায় বহরের নোঙ্গর তুললেন বেদে সরদার। নৌকা বেয়ে তাঁরা এগিয়ে যাচ্ছিলেন আরো ভাটির দিকে। আমি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বেদে-বহরের ২২টি নৌকার ওপর দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম নদীর ওপারের ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের দিকে। এক সময় আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো পানকৌড়ি-কিশোরীটির জলকেলি, উচ্ছল উড়ে চলা, আহার খোঁজা। হিজলডালে বসে থাকা। মনে হল- হিজল-ডালে বসে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে পানকৌড়িটি। ওর মায়াবী চোখ বেয়ে নেমে আসছে আর্তনাদের অশ্রু।
আমি পেছনে ফিরলাম। বেলা গড়িয়ে এসেছে। এখনই ফিরতে হবে। বাঁ-হাত তুলে মুখ মুছতে গিয়ে টের পেলাম আমার দুচোখও ভিজে গেছে লোনা জলে। বুকের ভেতর কেমন যেন খালি-খালি লাগছিল। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল - একজন সঙ্গীকে হারালাম! কিছু সময়ের জন্য হলেওতো পানকৌড়ি-কিশোরীটি আমার সুখকর সময়ের সঙ্গী ছিল।
[email protected]
০১৭১৬-৩০১৫২৭
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১১:০৮
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছোট ব্যবসা, বড় আইডিয়া: প্রযুক্তি না নিলে পিছিয়ে পড়বেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৩



বাংলাদেশে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা (SMEs) মানেই হচ্ছে “চা খেতে খেতে বিজনেস প্ল্যান” - কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন শুধু চা আর আড্ডা দিয়ে ব্যবসা চলে না, দরকার প্রযুক্তির ব্যবহার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা হযরত রাসূল (সা.), হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ও অন্যান্য সাহাবার (রা.) সমালোচনা করে তাদের সাথে মুসলিম জাতির অপরাংশ কোন দিন ঐক্যবদ্ধ হবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৫৮




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আইএমএফ কেন ঋণের কিস্তি আটকে দিতে চায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৩


একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে: "যে ব্যক্তি অর্থনীতি বোঝে না, সে রাজনীতিও বোঝে না।" বাংলাদেশের গত কয়েক বছরের পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়, এই প্রবাদটি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ বিকেল Last Afternoon

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:০৫

এই পৃথিবীতে শেষ বিকেলে আমরা কেটে ফেলি দিনগুলো
আমাদের শরীর থেকে, আর গুনি সেই হৃদয়গুলো যা আমরা নিয়ে যাব
এবং যেগুলো যাব এখানে রেখে। সেই শেষ বিকেলে
আমরা কোনো কিছুকে বিদায় বলি না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন ইবনে রুশদ

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭



''অজ্ঞতা থেকে ভীতি তৈরি হয়,
ভীতি ঘৃণার সৃষ্টি করে আর ঘৃণা থেকে আসে হিংস্রতা। এটাই নিয়ম।''

– ইবনে রুশদ

ইবনে রুশদ হলেন একজন মুসলিম লেখক।
তিনি আরবী ভাষায় লিখতেন। তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×