শীতের রোদেলা দুপুর। চারদিকে সুনসান নীরবতা। মেঠোপথের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বিশাল বদ্ধখাল। বদ্ধখালের এ জলাশয়টি শতবর্ষী। কালো কুচকুচে পাখনা ঝাপটিয়ে জলাশয়ের এপার-ওপারে চক্কর দিচ্ছিল কিশোরী পানকৌড়ি। পরিবারের সদস্যরা কেউ কেউ পেছনের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে আনমনে দেখছিল তার উচ্ছাস। এক সময় ঝুপ করে জলাশয়ের এক কোনে নীলচে জলে ডুব দিল সে। একটা পাবদা-পুঁটি ঠোঁটে নিয়ে পানিতে ভেসে উঠল। হাতে ক্যামেরা থাকলেও ১৮-৫৫ লেন্সে পানকৌড়ি-কিশোরীর দূরন্তপনার ছবি তোলা সম্ভব হল না।
অবাক আর বিষ্ময়ের সঙ্গে দেখছিলাম এ দৃশ্য। প্রায় মিনিট বিশেক পরে পানকৌড়ি-কিশোরীটি উগড় গিয়ে বসল খালের পাড়ে একটি হিজলগাছের ডালে। এবার আমার অনেকটা কাছাকছিই। একহার গড়ন, কালো কুচকুচে পালক, মায়াবী চোখ। এ যেন অরূপ সৌন্দর্যের সম্মিলন।
বাঁ দিক থেকে হিশ করে একটা শব্দ শুনলাম। চোখ ফিরিয়ে দেখলাম তিন-চারটি কিশোর দৌড়াচ্ছে। ওরা দৌড়িয়ে হিজলগাছটার নীচে গিয়ে থামল। কিছু বুঝতে না পেরে এগিয়ে গেলাম ওদের দিকে। ওদের মধ্য থেকে একটি কিশোর হিজলতলার কেয়াজঙ্গলে ঢুকল। এক মিনিটের মাথায় কিশোরটি বেরিয়ে এলো কেয়বন থেকে। ওর হাতে একটি তীরের মত লোহার তীক্ষ্ণ শলাকা। আর তীক্ষ্ণ শলাকাটি বিদ্ধ হয়ে আছে একটি পানকৌড়ির হৃদপিণ্ড বরাবর। কিশোরটি তীক্ষ্ণ শলাকাটি টেনে বের করতে না করতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল পানকৌড়িটি। আমার বুঝতে বাকি থকল না, এতক্ষণ আমি যে পানকৌড়ি-কিশোরীর উচ্ছল উড়ে বেড়ানো, জলকেলি, আহার খোঁজা এবং মায়াবী চোখের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে বিমোহিত ছিলাম, সেই কিশোরীকেই হত্যা করেছে চার কিশোরের একজন।
পনকৌড়ি-কিশোরীর হত্যাকারী কিশোরটিকে জিজ্ঞেস করলাম, বাড়ি কোথায়।' ও হাতের ইশারায় দেখালো, বদ্ধখালের বাইরের দিকে আগনুমুখা মোহনায় একটি নৌকার বহর।
ওরা বেদে সম্প্রদায়ের। মুন্সগিঞ্জের লৌহজং থেকে এসেছে দল বেঁধে। নৌকার বহর নিয়ে। বহরের ২২টি নৌকার প্রায় সব কটিতেই কিশোর বয়সী ছেলেরা আছে। লোহার শলাকা সুচালো করে তীরের মত করে তৈরী করা এ ধরণের অস্ত্র দিয়ে ওইসব কিশোররা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বন-বাদাড়ে ঘুরে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি শিকার করছে।
বেদে-বহরের কাছে গিয়ে ওঁদের সরদার নয়া শেখকে ডাকলাম। বললাম, এখনই নোঙ্গর তুলতে হবে। এ এলাকায় কোনো পাখি হত্যা করা যাবে না। দল বেধে বেদে বহরের সদস্যরা আমার কথার প্রতিবাদ করতে এলেন। আমি আমার কথায় অনড়। এক পর্যায় বহরের নোঙ্গর তুললেন বেদে সরদার। নৌকা বেয়ে তাঁরা এগিয়ে যাচ্ছিলেন আরো ভাটির দিকে। আমি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বেদে-বহরের ২২টি নৌকার ওপর দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম নদীর ওপারের ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের দিকে। এক সময় আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো পানকৌড়ি-কিশোরীটির জলকেলি, উচ্ছল উড়ে চলা, আহার খোঁজা। হিজলডালে বসে থাকা। মনে হল- হিজল-ডালে বসে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে পানকৌড়িটি। ওর মায়াবী চোখ বেয়ে নেমে আসছে আর্তনাদের অশ্রু।
আমি পেছনে ফিরলাম। বেলা গড়িয়ে এসেছে। এখনই ফিরতে হবে। বাঁ-হাত তুলে মুখ মুছতে গিয়ে টের পেলাম আমার দুচোখও ভিজে গেছে লোনা জলে। বুকের ভেতর কেমন যেন খালি-খালি লাগছিল। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল - একজন সঙ্গীকে হারালাম! কিছু সময়ের জন্য হলেওতো পানকৌড়ি-কিশোরীটি আমার সুখকর সময়ের সঙ্গী ছিল।
[email protected]
০১৭১৬-৩০১৫২৭
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১১:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


