শাহবাগে ব্লগার এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের নের্তৃত্বে জেগে আছে তরুণ প্রজন্ম। তাঁদের সঙ্গে জেগে আছে সারা দেশ। তরুণ প্রজন্মের দাবি- একাত্তরের ঘাতক জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাসহ সকল কুখ্যাত খুনি রাজাকারদের ফাঁসি দিতে হবে। এরই মধ্যে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি গুপ্ত ঘাতকদের নৃশংস হামলায় নিহত হন শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ব্লগার স্থপতি রাজীব হায়দার। ব্লগার রাজীব হায়দার খুন হওয়ার পর তাঁর লেখা নিয়ে পানি ঘোলা করার চেষ্টা চলছে। বলা হচ্ছে- রাজীব নিজে একজন স্বঘোষিত নাস্তিক। জীবদ্দশায় রাজীব ইসলাম ধর্ম, হযরত মোহাম্মদ (সা.), পবিত্র কুরান নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন তাঁর লেখায়। কয়েকটি গণমাধ্যমে রাজীবের এসব লেখা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সারা দেশে ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠন প্রবিাদ কর্মসূচি পালন করে। ডাকা হয় হরতালও।
আসলে পুরো বিষয়টি নিয়ে সোজাসাপটা চিন্তা করলেই হয়।
প্রথমত : শাহবাগের কর্মসূচি থেকে কোনো ধর্মকে হেয় করে কোনো কথা বলা হয়নি। সেখান থেকে একাত্তরের মানবতা বিরোধীদের শাস্তি দাবি করা হয়েছে, পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। এ ক্ষেত্রে কথা হল মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন রাজাকাররা এ দেশে যে হত্যা, ধর্ষণ এবং লুটতরাজ করেছে তার বিচার করার সময় এসেছে, সুযোগ এসেছে। কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পর তরুণ প্রজন্মসহ সচেতন মহল মনে করে যে, ওই রায়ের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই শাহবাগ প্রজন্মচত্বর থেকে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি তোলা হয়েছে। কিন্তু ট্রাইবু্যনাল আইনে বাবি পক্ষের আপিল করার সুযোগ না থাকায় বিষয়টি নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তরুণ প্রজন্মের এ দাবি যে যথাযথ তা সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল উপলব্ধি করতে পেরে জাতীয় সংসদে ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনী এনেছে। এ ক্ষেত্রে এটাই প্রমাণিত- তরুণ প্রজন্মের এ উদ্যোগ সঠিক এবং সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এরকম আন্দোলনের যথেষ্টই প্রয়োজন ছিল।
জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি প্রসঙ্গে কথা হল- জামায়াত স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে দলীয়ভাবেই স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। বিষয়টি মনে রাখতে হবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবির অর্থ ইসলামের বিরোধিতা করা নয়। কারণ জামায়াতে ইসলামী এটা একটা দলের নাম (প্রোপার নাউন)। জামায়াতে ইসলামী মানে এই নয় যে ওই দলটিই ইসলামের তথা মুসলমানদের একমাত্র হর্তা-কর্তা। (বরং এ দলটির প্রবক্তা তাত্ত্বিক পাকিস্তানের নাগরিক সৈয়দ আবুল আলা মৌদুদীর বিভিন্ন মতামত নিয়ে খোদ পাকিস্তানেই যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। আমরা সে দিকে যাচ্ছি না)। আমাদের কথা হল- প্রজন্ম চত্বর থেকে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একটি দলকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়েছে যে দলটির নাম জামায়াতে ইসলামী। মুসলিম সমাজ বা ইসলামের বিরোধিতা করা হয়নি। আমরা আশা করি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দলীয়ভাবে জামায়াত ইসলামী যে অপরাধ, অন্যায় করেছে জাতীয় সংসদ/আদালত তা আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করবে।
দ্বিতীয়ত: ব্লগার রাজীব হায়দার সম্পর্কে বলা হচ্ছে- তিনি একজন স্বঘোষিত নাস্তিক। এ ক্ষেত্রে কথা হল- একজন হিন্দু বা অন্য ধর্মের অনুসারী যদি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে পারেন, তা হলে একজন মুসলিমও স্বেচ্ছায় নাস্তিকতা গ্রহণ করতে কেন পারবেন না! ধরেই নিলাম ব্লগার রাজীব নাস্কি ছিলেন্ তার মানে কি তিনি দেশপ্রেমিক হতে পারবেন না? ১৯৭১ সালে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, আদর্শ ও মতবাদ সম্পন্ন মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে। সে ক্ষেত্রে কেউ যদি নাস্তিকতায় বিশ্বাসী হয়ে থাকতেন তারপরও তিনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। দেশপ্রেম আর ধর্মবিশ্বাস একই মাপকাঠিতে মাপার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। ধরে নিলাম ব্লগার রাজীব হায়দার নাস্তিক ছিলেন এবং তিনি শাহবাগ আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। কিন্তু তিনি তো শাহবাগ প্রজন্মচত্বর থেকে অন্য কাউকে নাস্তিক হওয়ার আহ্বান জানাননি!
তৃতীয়ত: আমাদের বুঝতে হবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের বিচার করা হলে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলে তাতে ইসলাম ধর্মের কিছু যায় আসে না। বরং দলের নামের সঙ্গে 'ইসলামী' শব্দটা যুক্ত থাকায় জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র শিবির যে এক ধরণের ছদ্মবেশের আড়ালে ছিল সে আড়ালটি চলে যাবে। ওই দুটি সংগঠনের মুখোশ খুলে দেওয়া হলে বর্তমান এবং পরবর্তী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন হতে পারবে।
চতুর্থত: যারা ব্লগার এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে নাস্তিকতার অভিযোগ এনে মিছিল সমাবেশ করছেন, আপনারা কেন ভাবছেন না ইসলাম ধর্ম ঠুনকো কোনো জিনিস না। ইসলাম সম্পর্কে কোনো কেউ যদি কোনো কটুক্তি করেও থাকে তাতে ইসলাম ধর্ম মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে, বিষটি এমন না। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। সুতরাং ইসলাম ধর্মকে কলুষিত করার কোনো সুযোগ নেই। বরং ইসলামের আদলে থেকে যার ইসলাম ধর্মের ক্ষতি করছে, কুরান-হাদিসের অপব্যাখ্যা দিচ্ছে তাদের চিহ্নিত করা দরকার।
শেষত: জাফর ইকবাল স্যারের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি। শাহবাগে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, এক সময় রাজাকারকে প্রকাশ্যে রাজাকার বলা যেত না। তাই প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আহম্মেদ তাঁর নাটকে পাখির মুখে বলিছেন 'তুই রাজাকার'। আর এখন তরুণ প্রজন্ম এই চত্বরে রাজাকারদের নাম ধরে লাখো কণ্ঠে প্রকাশ্যে স্লোগান দিচ্ছে- 'ক'-তে কাদের মোল্লা- তুই রাজাকার, তুই রাজাকার।
উপসংহার: আমরা এগিয়েছি, অনেকটাই এগিয়েছি। অনন্ত সম্ভাবনার দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে আমরা আরো এগিয়ে যাব। এ প্রজন্মের উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টায় আমাদের পুরো জাতির শরীর থেকে ৪২ বছর ধরে বহন করা পচনশীল ক্ষত দূর হবে। আমরা দেখবো রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



