সমাজ বদলের প্রত্যয় ও দুই কবির মানসিক দীনতা
ফকির ইলিয়াস
===================================
এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে ভাষণ দিতে এসেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে সফরসঙ্গীদের বহরটি ছিল বেশ বড়। ছিলেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দও। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, তারা এসেছেন নিজ খরচে। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরসঙ্গী দলে তিনজন কবিও এসেছিলেন। এরা হচ্ছেন, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা ও মুহাম্মদ সামাদ।
এই তিনজন কবি যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসার আগে একটি সংবাদের শিরোনাম হয়েছিলেন। তারা সরকার কর্তৃক বরাদ্দ বিজনেস ক্লাস বিমান ভাড়া প্রত্যাখ্যান করে ইকোনোমি ক্লাস আসন নিয়েছিলেন। ফলে রাষ্ট্রের সাশ্রয় হয়েছিল প্রায় তেরো লাখ টাকা। বিষয়টি নন্দিত হয়েছিল দেশে-বিদেশে।
কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থাকার রেওয়াজটা বিশ্বজোড়াই চলমান। যে কোনো সুসভ্য গণতান্ত্রিক দেশের। রাষ্ট্রপ্রধান অন্যদেশে রাষ্ট্রীয় সফরে গেলে রাষ্ট্রের বিশিষ্টজনকে সফরসঙ্গী হিসেবে নিতেই পারেন। সেই ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনাও তিনজন কবিকে সফরসঙ্গী করেছেন। তবে বিশ্বসমাজের নিরিখে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পার্থক্য হচ্ছে এই, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা দলীয় মতবাদী বুদ্ধিজীবী কিংবা কবি সাহিত্যিকদেরকে রাষ্ট্রীয় সফরে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন। এর আগে ক্ষমতাসীন থাকাকালে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত কবি ফরহাদ মজহারকে চীন সফরে সঙ্গী করেছিলেন।
তবে খুবই অবাক করা বিষয় হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী তিনজন কবি এবারের নিউইয়র্ক সফরের সময় সরকারি তোষামোদির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। তাদেরকে যখন বিভিন্ন সমাবেশে কবিতা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তখন তারা সরকারি বাণীবন্দনায় ব্যস্ত থেকেছেন বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতার বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে। অন্য ভাষাভাষি কবিরা এমন সরকারি তোষামোদে সাধারণত ব্যস্ত হন না। তিন কবিকে নিয়ে বাংলাদেশের জাতিসংঘ স্থায়ী মিশনে আড্ডার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই আড্ডায় কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, তার সৌভাগ্য তিনি একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রধানের সফরসঙ্গী হয়ে জাতিসংঘ অধিবেশন দেখতে এসেছেন। নির্মলেন্দু গুণ আরো বলেন, এর আগে শামসুর রাহমান এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সফরসঙ্গী হয়ে। গুণ নিজেকে সৌভাগ্যবান দাবি করে বললেন, তিনি কোনো স্বৈরশাসকের সফরসঙ্গী হয়ে আসেননি। তার কথায় শামসুর রাহমানের প্রতি এক ধরনের তাচ্ছিল্যই প্রমাণ পেলো। অথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছে এই শামসুর রাহমান তৎকালীন দৈনিক বাংলার সম্পাদক পদে থাকাকালীন সাংবাদিক হিসেবে সরকারি আজ্ঞাবহ হয়েই জিয়াউর রহমানের সংবাদ কভার করতে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন।
তিন কবিকে নিয়ে আরেকটি আড্ডার আয়োজন করেছিল মুক্তধারা, নিউইয়র্ক। সেই আড্ডায় নির্মলেন্দু গুণকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বর্তমান সময়ে বাংলা কবিতার গতিপ্রকৃতি কি? এ সময়ে এই প্রজন্মের কারা ভালো লিখছেন? এর জবাবে গুণ বলেন, ‘আমার পড়াশোনা খুবই কম। আমি কারো লেখা পড়ি না। আমাকে উৎসর্গ করে অনেকে বই লিখে। সেগুলোও উল্টেপাল্টে দেখি না। খাটের নিচে ফেলে রাখি।’
একই প্রশ্নের জবাবে মহাদেব সাহা বলেন, ‘আমি যে কাগজে আমার লেখা ছাপা হয়, সেই পৃষ্ঠাগুলোতে চোখ বুলাই। অন্যের লেখা পড়ি না। আমাকে কেউ বই উপহার দিলে, উপহার পাতাটি ছিঁড়ে ফেলে সের দরে বইগুলো বিক্রি করে দেই। ঘুরে ফিরে বইটি লেখকের হাতে গেলে তিনি ব্যথিত হবেন ভেবে ঐ পাতাটি ছিড়ে ফেলে দেই।’
পাঠক, লক্ষ্য করুন, এই হচ্ছে সমকালের দুই কবির মানসিক দীনতা। আর এদের হাত ধরেই এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে এই প্রজন্ম, এই কবিতার মহাকাল। আমার সৌভাগ্য হয়েছে বিশ্ববরেণ্য বেশ কিছু ব্যক্তিত্বের সাহচর্য পাওয়ার যারা মনে প্রাণে বাংলা সাহিত্য, ভাষা ও ঐতিহ্যকে সম্মান এবং লালন করেন। এমন কিছু ব্যক্তির সঙ্গে দেখা-কথা হয়েছে যারা বাঙালি না হয়েও বাংলা ভাষা, কবিতা, সংস্কৃতিকে ধারণ করে চলেছেন মনেপ্রাণে। তাদেরই একজন ক্লিনটন বি. সিলি। মনে পড়ছে, ক্লিনটন বি. সিলিকে আমি যখন আমার লেখা বই উপহার হিসেবে দিতে চেয়েছি, তখন তিনি সানন্দে বলেছেন, ‘আপনার বই আমাকে আলোকিত করবে’। তার এই বিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রায় একই ভাষায় উষ্ণ আতিথেয়তা দেখিয়েছেন বাংলাভাষার আরেক বিদেশী প্রেমিক উইলিয়াম রাদিচে। ব্রিটেনে এই পণ্ডিত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যখন আমার প্রথম দেখা হয়, তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘নবীন লেখকদের লেখা আমি সম্মানের সঙ্গেই পড়ি। কারণ আমি মনে করি নবীনরাই কালে কালে নতুনের দরজা খুলে দেয়।’ বিশ্ব সাহিত্যের বড় বড় কবি সাহিত্যিকদের মাঝে এমন নাক সিটকানো ভাব সচরাচর দেখা যায় না। ব্যক্তি স্বাধীনতা কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি সৃজনশীল ভাবনা সাম্রাজ্যকে এমনভাবে অস্বীকার করে?
নির্মলেন্দু গুণ কিংবা মহাদেব সাহা অন্য কোনো গ্রন্থের মানুষ নন। তাদেরকে এই প্রতিবেশ, এই পরিবেশের সঙ্গেই বসবাস করতে হয়। যে গণমানুষের করের টাকায় সরকারি বড় বড় সফরগুলোর খরচ আসে সেই ট্যাক্সের টাকায়ই তারা বিদেশে এসেছিলেন। অথচ হরেদরে যেভাবে সমকালীন বাংলা কবিতা কিংবা সাহিত্যের মূল্যায়ন তারা করেছেন, এ দুই কবির কাছে কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। পরিশুদ্ধ পঠন-পাঠন ছাড়া কোনো মহান জ্ঞানীর জ্ঞানভাণ্ডারও শাণিত থাকে না। আর উদার মানসিকতা সব সময়ই আগুয়ান প্রজন্মকে মহৎ পথ দেখায়। এ কথাটি সকলেরই মনে রাখা দরকার।
------------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ/ ঢাকা / ৭ অক্টোবর ২০১০ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত
সমাজ বদলের প্রত্যয় ও দুই কবির মানসিক দীনতা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২৫টি মন্তব্য ২১টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
বালুর নিচে সাম্রাজ্য

(ডার্ক থ্রিলার | কারুনের আধুনিক রূপক)
ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
কাঁচের অট্টালিকাগুলো আলো জ্বেলে রাখে—যেন শহর নিজেই নিজের পাপ লুকাতে চায়।
এই আলোর কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে ছিল করিম গ্লোবাল টাওয়ার।
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন
জ্ঞানহীন পাণ্ডিত্য

এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বদেশ,
যে কিছু জানে না; সে-ই দেয় উপদেশ।
“এই করো, সেই করো;” দেখায় সে দিক-
অন্যের জানায় ভ্রান্তি, তারটাই ঠিক।
কণ্ঠে এমনই জোর, যে কিছুটা জানে-
সব ভুলে সে-ও তার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন
গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত এবং শরিয়া আইন হলো সকল পক্ষের সম্মতি বিশিষ্ট ইসলামী হুকুমতের আইন

সূরাঃ ৬ আনআম, ১১৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১৬। যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরন করে:... ...বাকিটুকু পড়ুন
গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন
মুহতারাম গোলাম আযমই প্রথম We Revolt বলেছিলেন !

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। দলটির দাবি, অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।