মানুষের প্রতি মানুষের প্রভাব বিস্তারিত হয় মূলতঃ দু'টি মাধ্যম দ্বারা- কথা ও কাজ। এ দু'টোর মধ্যে আবার কথার চেয়ে কাজের পরিধি অনেক ব্যাপক ও সূক্ষ্ম। কথার মারপ্যাঁচও কম পিছিয়ে নেই। শব্দের উঠানামা, লম্বা-খাটো করা, কানেকানে বলা, উপমায় ফেলে সরল সত্য অথবা জটিল মিথ্যার প্রকাশ; এসবই শব্দ বা কথা দ্বারা প্রভাবিত করা এবং হওয়ার কারুকাজ। অন্যদিকে কর্ম পর্যায় ভাবনা, ইশারা-ইঙ্গিত ইত্যাদি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নানাভাবে নেড়েচেড়ে কিংবা স্থির রেখে মনের ভাব অথবা ক্ষোভ অথবা ভালবাসা বুঝানোর প্রচেষ্টা মানুষের নিরন্তর অথচ স্বাভাবিক। মূলতঃ এসবের প্রভাবই আমাদের প্রতিক্রিয়া বা প্রতিকর্ম হিসেবে জগৎ সংসারে সক্রিয়।
একান্ত নিজ থেকে শুরু করে বিশ্বময়তায় সার্বিক ব্যাপারাদিতে কথা ও কাজের প্রভাবই আনতে পারে চাঞ্চল্যতা কিংবা স্থবিরতা। আর এই চাঞ্চল্যতা ও স্থবিরতা আনয়নকারী মাধ্যমসমূহের বেলায়ও সেই দু'টো মৌল নীতি কার্যকর অর্থাৎ, ভাল ও মন্দ অথবা সত্য ও মিথ্যা অথবা আলো এবং আঁধার। মানুষ কোন কর্ম নিজে নিজে সম্পাদনের বেলায় সর্ব প্রথম যা করে তা হলো চিন্তা, আর এ চিন্তার প্রারম্ভটা সূচিত হয় ইন্দ্রিয়সমূহের সংগ্রহ করা তথ্যকে ভিত্তি করে। তন্মধ্যে শ্রবণ ইন্দ্রিয় কথা শোনার মাধ্যমে একটা বিরাট অবদান রাখে। অর্থাৎ, ব্যক্তি ভাল বা মন্দ কথার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়েই কোন বিষয়ে ভালমন্দ চিন্তায় লিপ্ত হয় যার ফলাফল দাঁড়ায় অন্য কোন ভালমন্দ কথা অথবা কোন ভালমন্দ কাজ। এবার বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখলে শুধুমাত্র কথার ধরনগুলো বিশ্লেষিত হবার দাবী রাখে। কথার বেলায়ও মৌলিকভাবে দু'টো দিক সুস্পষ্ট- ভাল কথা ও মন্দ কথা।
ভাল কিংবা ভাল কথা বলতে আসলে কি বুঝায়? এ প্রশ্নে মানুষ নিজ নিজ স্বার্থ অথবা এ পর্যায়ভুক্তির মেরুকরণে দ্বিধাবিভক্ত হতে পারে, কিন্তু বিবেকের ন্যায়বিচারে তা ধোপে টেকে না কখনোই। পৃথিবীর মানুষ ভাল ও মন্দের পরিচয় লাভ করেছে মূলতঃ দু'টি মাধ্যম থেকে- ওহী এবং সুস্থ-স্বাভাবিক বিবেক। এবার উপরে বলা স্বার্থ প্রসঙ্গটি টানি- মানব সৃষ্টির সূচনায় আদম 'আলাইহিস্ সালামকে সিজদা করার জন্য আদিষ্ট হয়ে ইবলীস তা করলো না, ধরে নিলাম সে নিজের জন্য আদমকে সিজদা না করাটাকে ভাল মনে করেছে, অতঃপর আল্লাহ্ যখন তাকে এ জন্য পাকড়াও করলেন তখন কিন্তু যুক্তি দেখিয়েছে ঠিকই কিন্তু আল্লাহর আদেশ অমান্য করার মত মন্দকাজ যে সে করেছে, তা মেনে নিতে কোন রকম আপত্তি তুলতে পারেনি। সে ছিল জিনদের অন্তভর্ুক্ত আর মানুষ ও জিনদের জ্ঞান, বিবেক ও ইচ্ছার স্বাধীনতা সমপর্যায়ের।
এখানে ভাল-মন্দের ক্ষেত্রে আরেকটি পর্যায়ের অবতারণা হয়েছে, তা হলো প্রভুর আদেশ বা সন্তুষ্টিমূলক ব্যাপারাদি ভাল আর তার বিপরীত সব মন্দ। পাল্টা প্রশ্ন সৃষ্টি হবে যে, যারা মাটির পুতুল অথবা ত্রুটি-বিচ্যুতিপূর্ণ মানুষকে নিজেদের প্রভু বলে গ্রহণ করে নিয়েছে, তাদের সেসব প্রভুর আদেশ ও সন্তুষ্টি বিধানও কি ভালোর পর্যায়ভুক্ত হবে? তখনি ফিরে যেতে হবে আরেকটু গোড়ার দিকে যেখানে থাকবে, সত্য প্রভুকে চিনতে পারা, তাঁর বিধানাবলীর সত্যতা উপলব্ধি করা, তাঁর প্রেরিত পুরুষদের উপর আস্থাশীল হওয়া ইত্যাদি। মূলতঃ হক ও বাতিল, সত্য ও মিথ্যা, ভাল ও মন্দ এ জাতীয় বিষয়াদির পুরো অংশটাই দাঁড়িয়ে আছে ওহী তথা মানবজাতির স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান এবং স্রষ্টা প্রদত্ত সুস্থ-স্বাভাবিক বিবেকের উপর।
সুতরাং ভাল চিন্তাই পারে ভাল কথা বলাতে ও ভাল কাজের প্রকাশ ঘটাতে এবং সেসব সম্পাদন করাতে। প্রতিটি ভাল কথাই মানুষকে সুস্থ জীবন ও সচ্চরিত্রতার দিকে আহ্বান করে, আর সুস্থ জীবন ও সচ্চরিত্রতাই সুস্থ ও সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থার নিয়ামক। ঠিক একারণে যেমন ভাল কথার গুরুত্ব অপরিসীম, তদ্রূপ একই বিপরীতমুখী কারণে মন্দ কথাও ঠিক ততটাই নিন্দনীয়। প্রতিটি মন্দ কথাই জন্ম দিতে পারে মন্দ চিন্তার, প্রক্রিয়াকরণে হতে পারে আরো মন্দ কথার জন্মগ্রহণ, ব্যাপকতায় সাধিত হতে পারে মন্দ কর্ম যার পরিণতি শুধুই ধ্বংস আর অবক্ষয়। অতএব, কথার ভাল ও মন্দ পর্যায়গুলোর পার্থক্য উপলব্ধি করা, তা থেকে গ্রহণ ও বর্জনের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মত যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করা এবং নিজে সম্পাদন ও অপরকে সেসবের উপদেশ-পরামর্শ প্রদান করা সুষ্ঠু সমাজ দেহের প্রতিটি কোষ-কণিকা অর্থাৎ, প্রতিজন 'মানুষেরই' নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
(গতিশীল>>>)
ধারাবাহিকঃ এ পর্বের নাম-
দো'আপ্রাপ্ত (৩/১)=মানুষকে ভাল কথা শিক্ষা প্রদানকারী
পূর্ব পর্ব পড়ুন-
@ দো'আপ্রাপ্ত (২/৮)=আত্মীয়-পরিজনের উপর সৎ ও অসৎকর্মের প্রভাব
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০০৭ সকাল ৮:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



