somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার ( না ) দেখা মুক্তিযুদ্ধ এবং একটি উপলব্ধী-১

২৭ শে অক্টোবর, ২০১৩ রাত ২:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে সব ছবি দেখে কান্না পাওয়ার কথা, সেসব ছবি দেখে কেঁদেছি বহুবার। দ্য বুক অব ইলাই বা ইউ হ্যাভ গট মেইলের শেষ দৃশ্য দেখে বোকা বোকা আমার সেসব কান্নাগুলো ছাপিয়ে আজকের কান্নাটা একেবারেই আলাদা।

লেখার হাত আমার কখনই ভাল না। তাই ভয় হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের চিন্তাগুলো ভাগাভাগি করে নিতে। পাছে কেউ আমার এই দ্বৈনতা ধরে ফেলে। তবু আজ কিছুক্ষনের জন্য ভয় ভুলে দুটো লাইন না লিখে পারলাম না।

আজ সরকারী অনুদানে নির্মিত ছবি 'আমার বন্ধু রাশেদ' দেখছিলাম ( দেখব দেখব করেও এ ছবিটা এতদিন দেখা হয়নি। আমা এই আলসেমীর জন্য নিজের কাছেই নিজে ক্ষমাপ্রার্থী )। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে যারা অভিনয় করেছে তারা (যখন ছবিটা তৈরী হয় তখন) শিশুশিল্পী। মুক্তিযুদ্ধ কি, কেন, কিভাবে তা আবেগ দিয়ে বুঝে ওঠার বয়স হয়ত তখনও তাদের হয়নি। ছবির কয়েকটি দৃশ্যে তাদের কাঁচা অভিনয় হয়ত সমালোচকদের মন যোগাতে অক্ষম।

কিন্তু আনন্দের বিষয়, যে আমি সমালোচক নই। আমি নিত্যান্তই একজন সাধারন দর্শক। তাই রাশেদ চরিত্রে আফনান আর ইবু চরিত্রে রায়ান আমার মন ছুয়ে গেছে প্রতিটি ফ্রেমে।

এটা কোন ফিল্ম রিভিউ মুলক পোষ্ট না। কাজেই 'আমার বন্ধু রাশেদ'-এর শৈল্পিক মানের বিচার সমন্ধীয় জ্ঞ্যান ঝাড়তে যাবো। তাছাড়া ও কাজটা আমার দ্বারা এমনিতেও হয় না। এটা কেবলই একটি 'আত্নোপলব্ধী' মুলক পোষ্ট।

ছোটবেলায় গ্রীষ্মের ছুটিতে শীতের আলতো রোদে বসে নানীর কাছে বা ঘুমোতে যাওয়ার আগে বিছানায় শুয়ে মার কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছি। এটি ৮ বছরের বাচ্চার যতটুকু বোঝার ক্ষমতা ততটুকু দিয়েই বুঝেছি বা বুঝিনি। কিন্তু গল্পগুলো তখনই মনে গেঁথে গিয়েছিল।

একটা গল্প এরকম:

চট্টগ্রামের ইপিজেডে কাজ করতেন আমার নানা। সংসারের সদস্য সংখ্যা তখন পাঁচ। নানা-নানী আর তাদের তিন ছেলে-মেয়ে। আমার মেঝ মামার বয়স তখন চার কি পাঁচ( এই মামাই তখন সবচেয়ে ছোট)। খুলনায় নিজ গ্রাম ছেড়ে জীবিকার তাগিদেই চট্টগ্রামের পোর্ট কলোনীর বাসায় সংসার বেঁধেছিলেন আমার নানা আর নানী। (সব ডিটেইল আমার মনে নেই, অসংলগ্ন কথাও লিখছি প্রচুর। আগেই বলেছি লেখার হাত ভাল না। তাই ক্ষমাপ্রার্থী )।

একসময় যুদ্ধ শুরু হল। সংসার ফেলে তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে নানা-নানী গ্রামের বাড়ি খুলনায় পালিয়ে যাবেন। মরতে হলে নিজ ভিটাতেই মরব। হয়ত এমন মনোভাব থেকেই নানার এ সিদ্ধান্ত। পালানোর এক পর্যায়ে তারা আশ্রয় নিলেন বর্তমান কাস্টমস হাইজের আসে পাশে কোন একটা খালি বাড়িতে। একদিন চলে যায়, দুই দিন চলে যায়। লুকিয়ে আছেন তারা । বাইরের পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ যে লুকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। তাদের সাথে অবশ্য আরও বেশ কয়েকটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে সেই খালি বাড়িটিতে।

আমরা বলি শিশুরা অবুঝ। আসলে তা নয়। খারাপ কিছু একটা হচ্ছে এ শুধু বড়রাই নয় আমার সেই চার/পাঁচ বছরের মামাও বুঝেছিলেন। তাই নানীর কোলে মুখ গুজে চুপটি করে লুকিয়েছিলেন দিনের পর দিন। তবে ক্ষিদার জ্বালা এক সময় আর সহ্য হয়নি তার ( এখানে বলে রাখা ভাল আমার মেঝ মামা ছোট বেলা থেকেই পাউরুটি আর বাটারের বেশ ভক্ত। এটা নিয়ে আমরা হাসি ঠাট্টাও করি তার সাথে। বাটার মাখানো পাউরুটি দিতে পারলে মামার কাছে সাত খুন মাপ) । ক্ষিদের এক পর্যায়ে আমার এ মামাটি সহ্যের বাঁধ ভেঙ্গে সেই পাউরুটি আর বাটার চেয়ে বসলেন নানীর আছে।

আম্মী একটু পাউরুটি আর বাটার হবে।
না, বাবা এখন তো নেই।
আচ্ছা আম্মী শুধু পাউরুটি হবে পানি দিয়ে খাব।
না, বাবা এখনতো পাউরুটিও নেই।
আচ্ছা আম্মী তাহলে শুধু পানি দেন।

উত্তরে নানী কেঁদে ফেলেই বলেছিলেন, 'না বাবা খাওয়ার পানিও নেই'। নানী যখন আমাদের এ ঘটনাটা শোনাচ্ছিলেন তখনও তার চোখ দিয়ে দরদর করে পানি ঝড়ছিল। আর গল্পটা শুনতে শুনতে কেঁদেছিলাম আমরাও।

মুক্তিযুদ্ধ একজন বাংলাদেশীর কাছে (আমি সচেতনভাবেই বাঙালী না বলে বাংলাদেশী বলছি) কি তা একজন বাংলাদেশী ছাড়া কেউ বুঝবে না। আমার পূর্বপুরুষদের অনেক বড় বড় আত্নত্যাগ আর সংগ্রামের মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন অসংখ্য ছোট ছোট আত্নত্যাগ। যা আপতদৃষ্টিতে তুচ্ছ- অসংলগ্ন। কিন্তু আমাকে এই ছোট ছোট গল্পগুলোই সেই সব বড় আত্নত্যাগ আর সংগ্রামকে চিনতে শিখিয়েছে। তাই এগুলো আমার কাছে ফেলনা নয়।



এবার আসা যাক 'আমার বন্ধু রাশেদ' ছবিটি দেখে আমার উপলব্ধী প্রসঙ্গে ( যে কারনে আজকের এ লেখা )। আমার সেই মেঝ মামাটি এখনও পাউরুটি আর বাটার ভালবাসেন (আগেই বলেছি )। তার এই প্রিয় খাবারটি এখন তিনি তার দুই মেয়ের সাথে বসে খান। বড় মেয়ের বয়স ৯ আর ছোটটির ৫। আমি আমার এই দুই কাজিনকে প্রচন্ড ভালবাসি। অনেকটা অন্ধের মতোই। কিন্তু আমার মাঝে মাঝে ভয় হয় ওদের জন্য। ওরা কি জানে ওদের বাবা-মা, খালা-মামা বা চাচা-ফুফুরা কত বিভৎস আর অমানুষিক নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে আজ টিকে আছে? ওরা কি জানে ওদের অগ্রজদের সঠিক ইতিহাস?

আমার নানী আজ বেঁচে নেই। আমারা ( যারা নানীর কাছে যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতা গল্প শুনেছিলাম) আজ সবাই অন্য শহরে আছি। ওদের থেকে অনেক দুরে। তাহলে ওরা জানবে কি করে তাদের সঠিক ইতিহাস???

আমার মাকে মাঝে মধ্যে অবশ্য এসব গল্প তাদের শোনাতে শুনেছি। কিন্তু তাতে কতটুকু জানছে তারা? নাহ! তাও তো জানছে। এমন অনেক বাংলাদেশী আছে যারা এটুকুও জানেনি। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা মনে পড়ে গেল।

আমি তখন ক্লাস সিক্স এ পড়ি। সেটাও একটা শীতের সকাল। ক্লাস শুরুর আগে এসেম্বলির ঘন্টা বেজে উঠল। দোতলার ক্লাসরুম থেকে আমরা সবাই স্কুলের শরু সিড়িঘর দিয়ে হুড়মুড়িয়ে নিচে নামছি। মাঠে লাইন করে দাড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইব, দোয়া পড়া হবে। সিড়ি দিয়ে নামতে নামতেই কানে এলো এক সহপাঠি বলছে, 'কি না কি পতাকা। তার সামনে আবার দাড়ায় গান গাও। উফফ অসহ্য!' অবশ্য তার এ উক্তির পর থেকে আমি তাকে আর কখনই সহপাঠির মর্যাদা দিতে পারিনি । পরে ভেবে দেখেছি এ মেয়েটিকে দোষ দিয়ে কি হবে? দোষতো ওর বাবা-মার বা অভিভাবকের। বড়রা যদি আমাদের না শেখান নিজের দেশকে ভালবাসতে তাহলে আমরা কিভাবে শিখব?

প্রথমেই বলেছি আজ আমার বন্ধু রাশেদ ছবিটা দেখে আমি দরদর করে কেঁদেছি আর এ কান্না আমার চোখ থেকে না, এসেছে বুক থেকে। আমি ভাগ্যবতী কারন আমার অগ্রজরা আমাকে আমার দেশকে, আমার জাতীয় পতাকাকে আর আমার জাতীয় সংগীতকে ভালবাসতে শিখিয়েছেন। আমি তাদের কাছে চির ঋণী।


সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০১৩ দুপুর ১:৪১
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×