somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাইকোথ্রিলারঃ আমার সাইকোপ্যাথ বউ {সম্পূর্ণ}

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



।।এক।।
বর্তমান সময়।
মাঝে মাঝে কাজের মধ্যে ডুবে গেলে আমার হুশ থাকে না। এবারও তাই হল। নতুন ডিজাইনটা নিয়ে কথা বলার জন্য জিএম স্যারের চেম্বারে গিয়েছিলাম, কখন দুই ঘন্টা পেরিয়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি।
হুশ ফিরল যখন জিএম স্যার বললেন, হাসান, বাকি আলোচনাটা আমরা লাঞ্চের পরে করি।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সময়ের কাটা একটার ঘর পেরিয়েছে আরো দশ মিনিট আগেই।জ্বি আচ্ছা, স্যার-বলে ড্রইংগুলো নিয়ে বেরিয়ে এলাম।
রুমে ঢুকতে যাব, দেখি পিয়নটা দাঁড়িয়ে আছে।
-কিছু বলবা? জানতে চাইলাম।
-স্যার, আপনার একজন গেস্ট আসছে।
-আমার গেস্ট? তাও এই লাঞ্চ আওয়ারে?
-আসছে অনেকক্ষন আগে, আধাঘন্টাতো হইবই।
আধাঘন্টা ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।কে হতে পারে?
মিনিটখানেক চিন্তা করলাম। কারও নাম মাথায় এল না। বিয়ের পর বউকে নিয়ে নতুন শহরে শিফট করেছিলাম। যদিও পাঁচ বছর কেটে গেছে, তবে বলার মত হৃদ্যতা কারও সাথে গড়ে ওঠেনি এই সময়ে।
-কে? আমি জানতে চাইলাম
কোন জবাব এল না।
-উনি কোথায় এখন?
-ওয়েটিং রুমে বসায় রাখছি।
-নিয়ে আস আমার চেম্বারে।
-লাঞ্চের পর আসতে বলব?
-নাহ, এখনই নিয়ে আস। আধ ঘন্টাতো অপেক্ষা করেছে, আর না করাই।

-ওয়াশরুমে বেশ সময় লাগে মনে হয় আপনার।
ফ্রেশ হয়ে মাত্র ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছি, এমন সময় মন্তব্যটা এল। আমি টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে লোকটার দিকে তাকালাম।সাদা পাঞ্জাবী পায়জামা পরনে, মুখ ক্লিন শেভড, মাথার চুল পরিপাটি করে আচড়ানো।
বয়স কত হবে? আটত্রিশ-চল্লিশ? সম্ভাবনা বেশি।দুয়েকবছর এদিক সেদিকও হতে পারে।
-চিনতে পারেননি মনে হয়? লোকটা হাসিমুখে প্রশ্ন করল।
হায়, হায়, আমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, লকটাকে চিনতে পারিনি? ব্রেইনের ওপর প্রেশার দেয়ার চেষ্টা করলাম। লোকটাকে কোথাও দেখেছি-এটা নিশ্চিত। কিন্তু কোথায় কিংবা কখন-সেটা মনে পড়ছে না। লোকটার নাম কিংবা প্রফেশনও মনে পড়ছে না।
-আমি কামরুজ্জামান, চকবাজার থানার ওসি। নীলার ছোট ভাইয়ের বিয়েতে পরিচয় হয়েছিল।
যাক বাবা, একটা বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেল আমি ভুল করিনি। এই লোকের সাথে আমার আগে দেখা হয়েছে। কিন্তু এই পুলিশ ব্যাটার কি এমন দরকার পড়ল যে একেবারে অফিসে এসে হাজির। তাও আবার লাঞ্চ আওয়ারে।
-আপনাকে চা নাস্তা দেয়নি? আমি জানতে চাইলাম।
-একটা ছেলে জানতে চেয়েছিল কিছু খাব কিনা। আমি মানা করে দিয়েছি।কামরুজ্জামানের সংক্ষিপ্ত জবাব।
-সেকি, কেন? এই হেলাল। আমি পিয়ন ছেলেটাকে ডাক দিলাম।
-ব্যস্ত হবেন না, হাসান সাহেব। লাঞ্চের সময় আর চা খাব না।
-তাহলে লাঞ্চ করে যান। আমি জবাব দেই।
-আসলে আমার একটা দাওয়াত আছে, ড্রেসআপ দেখে আশা করি বুঝতে পারছেন। কাছেই আপনার অফিস, ভাবলাম কথাবার্তা বলে যাই।
কামরুজ্জামানের এপ্রোচটা ভাল লাগল। সরাসরি পয়েন্টে চলে আসতে চাইছে, খুব বেশি ভূমিকা না করেই। নো ননসেন্স ওসি মনে হচ্ছে।
-বসুন, মুখোমুখি কথা বলতেই ভাল লাগে আমার।
বসতে যাচ্ছিলাম, মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে- আমার সাথে এই ওসির কি কথা?
এমন সময় হেলাল এসে ঢুকল।মনে হয় ভাত খাচ্ছিল, ডাক শুনে খাওয়া শেষ না করেই চলে এসেছে। ঠিকমত হাতটাও ধোয়নি, আঙ্গুলের ফাকে কয়েকটা ভাত দেখা যাচ্ছে। গাধা কোথাকার।
-স্যার, ডাকছিলেন? জানতে চাইল হেলাল।
-আপাতত লাগবে না। আমি জবাব দিলাম।
-জ্বি, আচ্ছা। হেলাল বেরিয়ে গেল।
হেলালের বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন কামরুজ্জামান সাহেব। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হতেই আমার দিকে ফিরলেন, হাসান সাহেব।
-বলুন।
-আপনি কি বুঝতে পারছেন আমি কেন এসেছি?
-আই হ্যাভ নো ক্লু।
-তাহলে আপনাকে গোড়া থেকেই বলি।
-প্লিজ।
-আপনাদের এলাকায় গত পরশুদিন জাহিদ সাহেব খুন হয়েছেন।
-খুন?
-কেন? আপনি জানতেন না?
-আমি শুনেছি মারা গেছেন। কি হয়েছিল বা কিভাবে হয়েছিল-এসব কিছু জানা নেই আমার।
-আশ্চর্য, আপনার দুবাড়ি পরে একটা লোক খুন হয়ে গেল আর আপনি কিছুই জানেন না? ব্যাপারটা কেমন যেন এবসার্ড হয়ে গেল।
-দেখুন, আমি চকবাজারের স্থানীয় নই। চাকরীসূত্রে এই শহরে শিফট করা, অফিসের কাছে বলেই ওখানে বাসা নেয়া। আমি নিজে খুব বেশি মিশুক কিংবা সামাজিক নই। অফিস আর বাসার বাইরে খুব বেশি লোকজনের সাথে যোগাযোগও নেই আমার।এলাকার একজন মারা গেলে তার মৃত্যুর খবরটা হয়তে আমার কানে আসে, তবে ডিটেইলসে আমার কখনও আমার আগ্রহ নেই। তাছাড়া ...
-তাছাড়া কি?
-কিছু না। কামরুজ্জামান সাহেব।
-বলুন।
-আপনি আমার অফিসে কেন?
-কেন? আপনার অফিসে পুলিশের আসা কি মানা?
-মোটেই না। যদি বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাটের ডিজাইন করতে আসেন তাহলে মোস্ট ওয়েলকাম।তবে একজন আর্কিটেক্টের কাছে খুনের গল্প করতে আসা স্বাভাবিক কিছু না।
-তাও ঠিক।তাহলে কাজের কথাতেই আসি। কি বলেন?
-প্লিজ।
-জাহিদ সাহেবের স্ত্রীর ধারণা আপনার স্ত্রী এই খুনের সাথে জড়িত।
-হোয়াট?
-আস্তে, বাইরে লোকজন শুনতে পাবে।
আমি শান্ত হওয়ার চেষ্টা করি।
-কি সব আবোল তাবোল বলছেন?
-মোটেও আবোল তাবোল বলছি না। জাহিদ সাহেব খুন হয়েছেন, আমি উনার স্ত্রীর ধারণাটা আপনাকে বললাম।
-তা কেন আমার স্ত্রী লোকটাকে খুন করবেন?
-আই থিংক ইউ নো দ্যা মোটিভ।
-নো, আই ডোন্ট। প্লিজ এনলাইটেন মি।
-আপনি রেগে যাচ্ছেন।
-আনন্দে ধেই ধেই করে নাচার মত কোন ঘটনাতো ঘটেনি।
-তাও ঠিক।আচ্ছা আসি।
ওসি কামরুজ্জামান উঠে দাড়ালেন।
-কামরুজ্জামান সাহেব।
-বলুন।
-আপনি ঠিক কি কারণে এসেছেন এখানে?
-আপনি এখন রেগে আছেন, কারণ বললে বুঝতে পারবেন না।
-নিজেকে আমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান বলেই মনে করি। না বোঝার কোন কারণ দেখছি না।
-তাহলে সরাসরিই বলি। জাহিদ সাহেব খুন হয়েছেন, উনার স্ত্রীর ধারণা আপনার স্ত্রীই খুনটা করেছেন বা করিয়েছেন।মোটিভটা শুধু আপনি না, পুরো মহল্লাই জানে। সারকামস্টেনশিয়াল এভিডেন্সই সব কিছু নয়, অনেক কিছু আমরা গাট ফিলিং থেকেও বুঝতে পারি।
-তো?
-আই এম ট্রাইং টু হেল্প ইউ।
-কিরকম?
-মিডিয়া ট্রায়ালে যদি আপনার স্ত্রী দোষী সাব্যস্ত হয়?
-হোয়াট? মিডিয়া ট্রায়াল? ইউ আর সেইং দিস এজ আ পুলিশ ম্যান?
-আই এম ট্রাইং টু হেল্প ইউ।
-আমি কোন বিপদের মধ্যে নেই। তাহলে কিভাবে সাহায্য করবেন আমাকে?
-দেখুন, একটা ভিডিও ক্লিপ অনেক ভয়ানক জিনিস।ভাইরাল হলেই বিপদ।
-হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?
-আপনার টেবিলে রাখা চিরকুটে একটা একাউন্ট নম্বর দেয়া আছে। আপাতত পচিশ লাখ ট্রান্সফার করে দিন।
-গেট আউট ফ্রম মাই রুম।
ওসি কামরুজ্জামানের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি খেলে গেল। আজকে যাচ্ছি, তবে অচিরেই আমাদের আবার দেখা হবে। হয়ত সেদিন আপনিই আমাকে ব্রীফকেস ভর্তি টাকা দিতে চাইবেন।


।।দুই।।
বর্তমান সময়।
চুপচাপ নিজের চেয়ারে বসে আছি।ওসি কামরুজ্জামান হারামজাদাটা মাথা গরম করে দিয়েছে। কি করব বুঝতে পারছি না।
ফোনটা বেজে উঠল।
-হ্যালো।
-হাসান, তোমার লাঞ্চ কি শেষ? তাহলে ডিজাইনটা নিয়ে আমার রুমে চলে এসো। আই হ্যাভ এ ফিউ আইডিয়া।
জিএম স্যার।
দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালাম।শিট।কামরুজ্জামান চলে যাওয়ার পর প্রায় ঘন্টাখানেক কেটে গেছে।চুপচাপ বসে আছি, কখন এক ঘন্টা কেটে গেল-টেরই পাইনি।লাঞ্চ আওয়ার এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে, লাঞ্চও করা হয়নি।
-হাসান, শুনতে পাচ্ছ?
ওহ, শিট। জিএম স্যার এখনো লাইনে।
-জ্বি স্যার, আমি আসছি।
তাড়াতাড়ি ড্রইংগুলো নিয়ে স্যারের রুমে রওয়ানা দিলা।
-হাসান, তুমি ঠিক আছ? স্যার জানতে চাইলেন।
-জ্বি স্যার।
-মুখ দেখেতো মনে হচ্ছে না।
-জ্বি?
-গেস্ট কে ছিল?
-কেউ না স্যার।
-কেউ না? বেলাল বলল পুলিশ নাকি এসেছিল তোমার কাছে।
-বেলাল কে? আমি জানতে চাইলাম।
-বেলাল কে মানে? তোমার পিয়ন।
ওর নাম বেলাল? আমিতো ওকে হেলাল বলে ডাকি। ছেলেটাতো কোনদিন প্রতিবাদও করেনি।
-হাসান, কোন সমস্যা? সব ঠিক আছেতো?
-জ্বি স্যার, একদম।
-আর ইউ শিওর?
-জ্বি স্যার। ওই পুলিশের সাথে একটা দাওয়াতে পরিচয় হয়েছিল। উনি এমনিই দেখা করতে এসেছিলেন। সৌজন্য সাক্ষাত।
-বাহ, পুলিশও আজকাল সৌজন্য সাক্ষাত করতে অফিস পর্যন্ত চলে আসে! অদ্ভুত।
স্যারের কন্ঠে কি আমার জন্য দুশ্চিন্তা ছিল? নাকি উপহাস? বুঝতে পারছিলাম না। কোন জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলাম।
-হাসান।
-জ্বি স্যার।
-আমার মনে হচ্ছে তুমি কিছু নিয়ে বেশ স্ট্রেসের মধ্যে আছ। টেক দ্যা ডে অফ।


।।তিন।।
-তারপর বল, কি খাবি? চা? না কফি? রোমাল জানতে চাইল।
-চা-ই বল।কফি আর ভাল লাগে না।
-সেকি? কেন? তুই না বলতি কফির তুলনায় চা অনেক বেশি ওভাররেটেড।
-ভাই, আজাইরা ডায়লগ না মেরে ছেলেটাকে বল কফি নিয়ে আসতে।
রোমেল সম্ভবত বুঝতে পারল অপ্রয়োজনীয় কথা বলার মত মুডে আমি নেই। তার আর কোন জবাব না দিয়ে ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিল কফি আনতে আর নিজে ডুবে গেল কোন এক ক্লায়েন্টের সাথ ফোনালাপে।
এই সুযোগে পাঠককে বলে রাখি জিএম স্যারের সাথে মিটিং-এর পর আরো এক ঘন্টা কেটে গেছে। স্যারের কথা শুনে আমি আর দেরী করিনি, সাথেসাথেই বেরিয়ে গেছি অফিস থেকে, চলে এসেছি রোমেলের চেম্বারে। বিপদেআপদে সাধারণত ওর সাথেই শলাপরামর্শ করি। রোমেল শুধু আমার ছোটবেলার বন্ধুই নয়, আমার আইনজীবীও বটে।
মিনিট দশেক পরেই ছেলেটা চা নিয়ে ঢুকল।
ইতিমধ্যে রোমেলের ফোনালাপও শেষ। চায়ের চুমুক দিতে দিতে ও-ই প্রথম কথা বলল। হঠাৎ ফোন দিয়ে একেবারে চেম্বারে, তাও আবার অফিস আওয়ারেই। ঘটনা কি?
আমি দুপুরের পুরো ঘটনা খুলে বললাম।
-হুম, এই কামরুজ্জামান ব্যাটাকে আমি চিনি। ভয়াবহ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ, বেশ কয়েকজন রাঘববোয়াল থেকে ঘুষ খাওয়ার রেকর্ড আছে। পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড খুব স্ট্রং, এজন্য এখন পর্যন্ত নাইক্ষংছড়ি ট্রান্সফার ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে।কিন্তু এই ব্যাটা হঠাৎ তোর পেছনে লাগল কেন?
-বুঝতে পারছি না।
-হাসান।
-বল।
-নিজের আইনজীবির কাছে কোন তথ্য গোপন করিস না ভাই।
-রোমাল, তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু। তোর কাছে কবে কোন কথাটা গোপন করেছি আমি?
-তাও ঠিক। তবে একটা ব্যাপারে আমারও খটকা লাগছে।
-কোন ব্যাপারে?
-তোর দুই বাসা পরে একটা লোক খুন হয়েছে দুদিন আগে আর তুই কিছুই জানিস না।
-দেখ রোমেল, তুইতো আমার স্বভাব জানিসই। কোনকালেই আমি খুব একটা মিশুক কিংবা সামাজিক ছিলাম না।এই অজানা অচেনা শহরে শিফট করার পর নিজেকে আরো গুটিয়ে নিয়েছি। আশেপাশের কারও জীবন নিয়েই আমি খুব একটা মাথা ঘামাই না।
-তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু একটা লোক খুন হলে প্রতিবেশিরাতো সবার আগে জানার কথা।
-ভাই, গত পরশুদিন রাতে অফিস থেকে ফেরার পরই নাশিদ জানিয়েছিল জাহিদ সাহেব মারা গেছেন। আমি অতটুকুই জানতাম। আজ এই পুলিশ ব্যাটার কল্যাণে জানতে পারলাম মৃত্যুটা ন্যাচারাল ছিল না, খুন ছিল।
-ভাবী জানত না?
-নাশিদ কিভাবে জানবে? ওতো বাসা থেকেই বের হয় না। আর তাছাড়া জাহিদ সাহেবের পরিবারের সাথে আমাদের কোন যোগাযোগ নেই।
-ওকে ফাইন।আমাকে কিছু বেসিক তথ্য দে।
-বল কি জানতে চাস।
-জাহিদ সাহেবের স্ত্রী কি মামলা করেছেন?
-জানিনা।
-লাশের পোস্টমর্টেম?
-আই হ্যাভ নো ক্লু।
-ঠিক আছে, আমার কানেকশান আছে। মামলা হয়েছে কিনা, হলে বাদী কে, কাদের আসামী করা হয়েছে-এসব তথ্য আমি বের করে নিতে পারব।আশা করি পোস্টমর্টেম রিপোর্টও বের করে ফেলতে পারব।
-ভেরী গুড।
-তবে আমার ধারণা এখনো কোন মামলা হয়নি। হলেও সেখানে আসামী হিসেবে ভাবীর নাম অন্তত আসে নি।
-এত শিওর হচ্ছিস কিভাবে?
-দেখ, দেশের দুর্নীতিবাজ পুলিশদের কাজ করার কিছু প্যাটার্ন আছে। ভাবীকে মামলার আসামি করা হলে ওরা অনেক আগেই একটা ওয়ারেন্ট ইস্যু করিয়ে ভাবীকে গ্রেফতার করে ফেলত, নাহয় ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করত। তারপর তোর কাছে টাকা চাইত। যাতে তুই “না” বলতে না পারিস। যেহেতু গ্রেফতার না করেই তোর কাছে টাকা চেয়েছে, তারমানে ধরে নেয়া যায় আসামীর তালিকায় ভাবীর নাম নেই। আর যেহেতু পরশুদিন খুন হয়েছে, মনে হয় না এই অল্প সময়ের মধ্যে ওরা ভাবীকে ফাসানোর মত কোন সলিড এভিডেন্স যোগাড় করতে পেরেছে।
-আমার বউ নির্দোষ। তাহলে ওরা এভিডেন্স পাবে কোথা থেকে?
-তুই কি বাংলাদেশে থাকিস না? থাকলে এসব হাস্যকর প্রশ্ন করিস কেন? জাহালমের নাম শুনেছিস? কোনরকম প্রমাণ ছাড়াই ওরা একটা নির্দোষ লোককে তিন বছর জেল খাটিয়েছে।
-ওটাতো দুদকের কাহিনী।
-তোর কি ধারণা দুদক খারাপ আর পুলিশ ভাল? হাসাইলিরে ভাই।
আমি কোন জবাব দিলাম না, চুপ করে রইলাম। রোমালের কথা যদি সত্য হয়, তারমানে এই কামরুজ্জামান ব্যাটা ভয়াবহ দুর্নীতিবাজ আর ওর ব্যাকআপ খুব স্ট্রং। আর এই ব্যাটার চোখা পড়েছে এক্ষন আমার দিকে, আমার পরিবারের দিকে। কি করব আমি?
-হাসান, কিভাবছিস? রোমেলের প্রশ্নে বাস্তবে ফিরে এলাম।
-কি করব এখন?
-ভাবতে দে। আমার সোর্স দিয়ে আমি মামলার অবস্থা, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট-এসব তথ্য বের করছি।ইন দ্যা মিন টাইম তুই নরমাল লাইফ লিড কর। এমন কিছু করিস না যাতে কারও মনে কোন সন্দেহের উদ্রেক হয়। আর ভাবীকে সব জানিয়েছিস?
-এখনো কিছু বলিনি আমি।
-হোয়াট, ভাবীকে একটা খুনের মামলায় ফাসানোর চেষ্টা চলছে আর তুই এখনও তাকে কিছুই জানাসনি! কেন?
-রোমেল, তুইতো নাশিদের মানসিক অবস্থার কথা জানিসই। এই অবস্থায় আমি আসলে ওকে কোন টেনশান দিতে চাচ্ছি না।
-হাসান, সময়মত না জানালে পরে টেনশান আরো বেশি করতে হবে। তুই এখন জানা ভাবীকে।
-হ্যা, এখন বাসায় যাব। গিয়েই সব খুলে বলব ওকে।
-ওহ, আর একটা কথা।
-কি?
-কামরুজ্জামান তোকে কোন ভিডিওটার ভয় দেখাচ্ছিল?


।।চার।।
এক বছর আগে।
আমার এখনো মনে আছে সেদিন সকাল থেকে আকাশে মেঘ করেছিল। বর্ষাকাল ছিল তখন। আকাশে মেঘ করবে, বৃষ্টি হবে-সেটাই স্বাভাবিক।তবে ঠিক কতটা বৃষ্টি সেদিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল-সেটা আমরা নগরবাসীরা ধারণাও করতে পারিনি।
প্রতিদিনকার মত নামিরাকে স্কুলে নামিয়ে আমি অফিসে চলে গেলাম। নামিরা আমার মেয়ে, সাড়ে তিন বছর বয়স তখন, প্লে গ্রুপে পড়ে।
অফিসে পৌছালাম নয়টা বাজার পাঁচ মিনিট আগে। বৃষ্টি নামল ঠিক মিনিট দুয়েক পরেই। যে বৃষ্টি নামল তার কোন বর্ণনা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যখনই ওই দিনটার কথা ভাবি শুধু মনে পড়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে শুধু সাদা রঙ দেখা যাচ্ছিল। ঘন কুয়াশায় যেমন চারিদিক সাদা হয়ে যায়, আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টিতে আমাদের চারপাশ ঠিক সেরকম সাদা চাদরে ঢাকা পড়েছিল। কান পাতলে চারপাশে শুধু ঝমঝম শব্দ।
এমনিতে কাজে ডুবে গেলে সময়ের কোন হিসাব থাকে না আমার, তারওপর একটা প্রজেক্টের ডেট লাইন ছিল সেদিন। কখন দুঘন্টা পেরিয়ে গেছে-বুঝতেই পারিনি।
হুশ ফিরল ফোনের রিংটোনে। অচেনা নম্বর।
-হ্যালো, হাসান সাহেব।
-বলছি।কে বলছেন?
-আমি মিস সানজীদা, নামিরার ক্লাস টিচার।
-নামিরার ক্লাস টিচার। কোন সমস্যা হয়েছে নামিরার?
-নামিরা ঠিক আছে, সেটা নিয়ে টেনশান করবেন না। আসলে প্রচন্ড বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি উঠতে শুরু করেছে, এরকম চলতে থাকলে অল্পকিছুক্ষনের মধ্যেই রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যাবে।আমরা তাই আজ এক ঘন্টা আগেই স্কুল ছুটির ডিসিশান নিয়েছি। আপনাকে একটু কষ্ট করে আজ এক ঘন্টা আগেই আসতে হবে।
-ওকে, নো প্রবলেম। ফোনটা কেটে দিলাম।
জিএম স্যারকে বলে অফিস থেকে বের হতে সময় লাগল পাঁচ মিনিট। লিফটে উঠতে যাব, দেখি বন্ধ।
বাল। মুখ দিয়ে গালি বের হয়ে গেল।
সিড়ি ভেঙ্গে সাত তলা থেকে নেমে পুরাই বেকুব হয়ে গেলাম। গ্রাউন্ড ফ্লোর পানিতে ভেসে গেছে, আমার কোমর পানি হলেও এভারেজ বাঙ্গালীর জন্য বুক পানি ছিল-এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। রাস্তার অবস্থা আরো খারাপ-ড্রেনের পানির সাথে মিশে একাকার।
এই অবস্থায় এখান থেকে বের হওয়া সম্ভব না।বাধ্য হয়েই নাশিদকে ফোন দিলাম।
-হ্যালো, তুমি কি বাসায়?
-হ্যা। নাশিদের ছোট্ট জবাব।
-শোন, বাবুর স্কুল থেকে ফোন করেছিল।ওদের আজকে এক ঘন্টা আগেই ছুটি হবে। আমার অফিসের সামনে পানি উঠে ভয়াবহ অবস্থা, তোমাকে এখনই বাবুর স্কুলে যেতে হবে।
-আচ্ছা।ফোনটা কেটে দিল নাশিদ।

দুপুরের পরেই বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।সন্ধ্যার মধ্যেই পানি নেমে গিয়ে রাস্তাঘাট চলাচলের উপযোগী হয়ে গেল।
ড্রইংটা সাবমিট করে যখন বেরিয়েছি তখন বলতে গেলে চারদিক জনমানবশূন্য, অথচ একটু আগেই এশারের আযান হয়েছে।
একটা রিকশা নিয়ে বাসায় পৌছাতে সময় লাগল আধাঘন্টা। ঘড়ির কাটা তখন নয়টা পেরিয়েছে।
বাসায় ঢুকে দেখি নাশিদ একা বসে আছে ডাইনিং টেবিলে।তারমানে বাবু ঘুমিয়ে পড়েছে। ভালই হল। বউয়ের সাথে আজ একটা রোমান্টিক রাত কাটানো যাবে।
ব্যাগটা সোফার ওপর রেখে নাশিদের পাশে গিয়ে বসলাম।
একি? নাশিদের গালের ওপর শুকিয়ে যাওয়া কান্নার দাগ!
-কি হয়েছে? জানতে চাইলাম আমি।
-বাদ দাও। এড়িয়ে যেতে চাইল ও।
-বাদ দাও মানে? কি হয়েছে বলবাতো।
-দুপুরে ফোন করেছিলাম। ধর নাই কেন?
-দুপুরে?
পকেট থেকে ফোনটা বের করে বেকুব হয়ে গেলাম। ১১টা মিসড কল।কাজের চাপে সারাদিন ফোন চেক-ই করা হয়নি। শিট।
-আসলে...
-বাদ দাও।
অনেক জোরাজুড়ির নাশিদ যেটা বলল তাতে মাথায় আগুন ধরে গেল।পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে এরকমঃ নাশিদ বাবুকে স্কুল থেকে আনার জন্য বের হয়। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে ও কোন রিকশা পাচ্ছিল না। এমন সময় হঠাৎ দেখা পায় আমাদের প্রতিবেশী জাহিদ সাহেবের। উনি গাড়ি নিয়ে বাইরে কোথাও যাচ্ছিলেন।নাশিদকে একা দেখে উনি নামিরার স্কুলে নামিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। নাশিদও সরল মনে রাজি হয়।কিছু দূর যাওয়ার পরই জাহিদ হারামজাদাটা গাড়ি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়। নাশিদ গাড়ি ঘুরিয়ে মেইনরোডে যাওয়ার জন্য বললে জাহিদ জবাব দেয়, ওদিকে যাওয়া যাবে না, রাস্তায় পানি উঠেছে।
একটু পরেই জাহিদের উদ্দেশ্য পরিস্কার হয়ে যায়।একটা নির্জন রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে সে নাশিদেরর গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করে। নাশিদের ব্যাগে সবসময়ই একটা ছোট ছুরি থাকে। হঠাৎ সেটা বের করেই জাহিদের বাম হাতে একটা পোচ দিয়ে দেয় সে। এরপরই গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে।
-আমি তোমাকে তখন থেকেই ফোন করছিলাম। তুমি ফোন ধর নাই কেন?
আমার কাছে কোন জবাব ছিল না। রাস্তায় পানি দেখে আমি নাশিদকে বলেছিলাম বাবুকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে আর তাতেই কতবড় বিপদে পড়তে গিয়েছিল নাশিদ।
-কি হল? কথা বল না কেন?
-বাবু কোথায় এখন?
-ওর রুমে। ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।
-আর জাহিদ হারামজাদাটা কোথায়?
-আমি কিভাবে জানব? হঠাৎ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল নাশিদ।

এরপরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। জাহিদ হারামজাদাটা এক সপ্তাহ বাড়ি আসেনি।সম্ভবত মামলার ভয় পেয়েছিল। সপ্তাহখানেক পর যখন বুঝল আমি বা নাশিদ কেউই আইনী পদক্ষেপ নিচ্ছিনা, তখন বুক ফুলিয়ে সদর্পে এলাকায় ফিরে এল।
ওর ফেরার অপেক্ষাতেই ছিলাম আমি। আগে থেকেই ছেলেপেলে রেডি করে রেখেছিলাম।প্রথমদিনই বাড়ি থেকে বের করে পেটানো হল ওকে, সবার সামনে নাশিদের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করলাম।
মার এবং ক্ষমা চাওয়ার পুরো ঘটনাটাই ভিডিও করা হল। এরপর ছড়িয়ে দেয়া হল ফোন থেকে ফোনে।
আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল জাহিদকে অপমান করা, তার আসল চেহারা সবাইকে দেখানো। সেই ভিডিও একদিন ব্যবহৃত হবে প্রমাণ হিসেবে আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে-কে জানত ভবিষ্যতের কথা।



।।পাঁচ।।
বর্তমান সময়।
এডভোকেট রোমেলের চেম্বার।
-হাসান, এই ঘটনা তুই আমাকে আগে বলিসনি কেন?
-একটা লোক আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল, এটা কি জনে জনে বলে বেরানোর মত ঘটনা?
-জ্বি না, বলে বেরানোর মত ঘটনা না।তাই বলে তুই কোন আইনগত পদক্ষেপ নিলি না কেন? তুই না শিক্ষিত মানুষ?
-শিক্ষাদীক্ষার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। মাথা গরম ছিল, জাহিদকে পেটানো, ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা, ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয়া-সবই তাৎক্ষণিক আইডিয়া। ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করে করিনি।
-আর তার মাশুল হয়ত ভাবীকে দিতে হতে পারে।
আমি কোন জবাব দিতে পারি না। আমার অতীত অপরাধের জন্য কিছু না করেও আমার স্ত্রী ফেঁসে যাবে-এই ভাবনা আমাকে তখন থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
-রোমেল, হেল্প মি।
-তোর কাছে ওই ভিডিওটা আছে?
-ইউটিউবে আছে।
-হোয়াট? ইউটিউবে? কিভাবে? কে আপলোড করছে?
-আমিই একটা ফেক প্রোফাইল খুলে আপলোড করেছিলাম। ভেবেছিলাম সোস্যালি জাহিদ খুব হিউমিলিএটেড হবে।
-তোর কি মাথায় সমস্যা? এমনিতে একটা লোক যখন অপরাধ করছে তার বিরুদ্ধে কোন আইনানুগ ব্যবস্থা নিলি না, আবার সেই লোককে পিটিয়ে তুই নিজেই একটা অপরাধ করলি। আবার সেটা ভিডিও করে নিজেই প্রমাণটা পাবলিকের কাছে এক্সেসিবল করে দিলি।তোর মাথায়তো গু না, আরো খারাপ কিছু ঠাসা।
আমি চুপ করে রইলাম।
-দেখি, ভিডিওটা চালা।
আমি ইউটিউব থেকে ভিডিওটা প্লে করলাম। ছোট একটা ভিডিও, অল্প আলোর একটা রুমে জাহিদ ক্ষমা চাইছে নাশিদের কাছে। আমি ভিডিও করেছিলাম নাশিদের পেছন থেকে, যাতে ওর চেহারা দেখা না যায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ক্যামেরা ধরে রেখেছিলাম জাহিদের মুখের একেবারে সামনে, তাতে রক্তমাখা মুখটা স্পষ্ট ভেসে উঠেছে।ক্লিপটার অডিও কোয়ালিটি বেশ ভাল, “ভাবী, আমাকে মাফ করে দেন, এরকম ভুল আর জীবনে করব না”-জাহিদের কান্না স্পষ্ট শোনা যায়।
-তো, কি মনে হয়? এভিডেন্স হিসেবে কতটা স্ট্রং? আমি জানতে চাইলাম।
-পুরো ভিডিওতে ভাবীর চেহারা দেখা যায় নাই, একটা আমাদের জন্য পজিটিভ। তবে জাহিদের চেহারা স্পষ্ট দেখ গেছে, তার কণ্ঠস্বরও পরিস্কার।তার মুখে মারের দাগ, গাল ফেটে বের হওয়া রক্ত-সবই পরিস্কার দেখা গেছে।জাহিদকে নির্যাতন করা হয়েছিল-এই একটা ভিডিও দিয়ে ওরা খুব সহজেই প্রমাণ করা যাবে।
-তাহলে? আমি টেনশানে পড়ে যাই।
-আগেই এত টেনশান করিস না। আমাকে অভয় দেয় রোমেল।ভাবী বা তোর-কারোরই চেহারা নাই ভিডিওতে, তাছাড়া সে ভাবীকেও ভাবী বলেই ডেকেছে, নাম ধরে ডাকে নাই। সো ভিডিওর এই মেয়েটাই নাশিদ ভাবী-প্রমাণ করা অত সহজ হবে না।
-কিন্তু ভিডিওতে জাহিদতো একবার আমার নাম ধরে ডাকছে। আমি চিন্তিত মুখে বলি।
-হোয়াট? ভিডিওটা আবার চালাতো।
আমি দ্বিতীয়বার ভিডিওটা চালাই। দুই মিনিট একুশ সেকেন্ডে চিৎকার করে কাঁদতে দেখা যায় জাহিদকে। হাসান ভাই, আমাকে মাফ করে দেন। একই কথা দুবার রিপিট করেছে সে।
-এটা খুব খারাপ হয়ে গেল।তোর নাম স্পষ্ট শোনা গেছে।“চুপ কর, শুয়োরের বাচ্চা কোথাকার”-এটা কি তোর কন্ঠ?
-হ্যা।আমি ভয়ে ভয়ে জবাব দেই।
রোমেলের মুখ দেখেই আমি বুঝতে পারি ভেতরে ভেতরে কি পরিমাণ ক্ষেপে গেছে সে।
-দোস্ত, রাগ করিস না।ওই সময় যা কিছু করেছি, সবই হিট অফ মোমেন্টে।
-এই ভিডিও’র ফরেনসিক এনালাইসিস হলে খুব সহজেই প্রমাণ হবে এটা তোর কন্ঠ।
-তো এখন?
-এখন আর কি? কন্ঠ পাল্টা- ইডিয়ট কোথাকার।
আমি রোমেলকে সময় দেই-একটু মাথাটা ঠান্ডা হোক।
-হাসান, ভিডিওতে এক কোনায় একটা অল্প বয়সী ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। কে ওটা?
-আমার অফিসের পিয়ন। বেলাল না হেলাল-কি যেন নাম।
-কি যেন নাম আবার কি ধরণের কথা? নিজের অফিসের পিয়নের নামও জানিস না?
-আমিতো ওকে হেলাল বলেই ডাকতাম এতদিন।আজকে শুনলাম ওর নাম নাকি বেলাল।
-তোর চিকিৎসা করা। দিনকে দিন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছিস। ছেলেটা ওখানে কি করছিল সেই রাতে?
-যখন শুনলাম জাহিদ ফিরে এসেছে তখন আমিই হেলালকে বলেছিলাম ছেলেপেলে নিয়ে আসতে। ওরাই জাহিদকে ওর ঘর থেকে ওই পুরানো গোডাউনে তুলে নিয়ে আসছিল।
-ওরা মানে? কয়জন ছিল ওরা?
আমি হাতের চারটা আঙ্গুল দেখাই।
-তুই কি বুঝতে পারছিস এই চারটা ছেলেই তোর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পারে? ভাবীকে ওই ভিডিওর মেয়েটা বলে সনাক্ত করতে পারে।
-তাহলে কি করব?
-ছেলেগুলোর নাম ঠিকানা জানিস?
-না। আমি হেলালকে বলেছিলাম পোলাপান যোগাড় করতে, ও তাই করেছে। কাজ শেষে সবাইকে টাকা দিয়েছি।নাম পরিচয় জানার প্রয়োজনবোধ করিনি।
-কত দিয়েছিলি ছেলেগুলোকে?
-প্রত্যেককে এক হাজার করে।
-মাত্র? তাতেই ওরা একটা লোককে মেরে আধমরা করে দিল!
-সেটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এখন কি করব তা-ই বল।
-ছেলেগুলোকে শহর ছেড়ে চলে যেতে বল।টাকা দিয়ে, ভয় দেখিয়ে-যেভাবেই হোক এই ছেলেগুলো যাতে আদালত বা পুলিশের হাতে না পড়ে সেই ব্যবস্থা কর।আর ভিডিওটা ইউটিউব থেকে ডিলিট করে দে।
-ভিডিও ডিলিট করে কি লাভ? ওটা নিশ্চয়ই ওসি কামরুজ্জামান ডাউনলোড করে নিয়েছে।
-তা হয়ত নিয়েছে। কিন্তু কোন আইপি থেকে এই ভিডিও আপলোড করা হয়েছিল-সেটা ট্রেস করতে গিয়ে যদি ফাইনালি তোর কম্পিউটারের আইপি এড্রেস পায় পুলিশ, তাহলে কি ভাল কিছু হবে?
-একটা সমস্যা হয়ে গেছে দোস্ত। আমি কাচুমাচু হয়ে বলি।
-আবার কি?
-একটা ফেক জিমেইল আইডি খুলে ভিডিওটা আপলোড করেছিলাম। আইডি পাসওয়ার্ড কিছুই খেয়াল নাই এখন।
-ডিলিট করতে না পারলে রিপোর্ট কর। তবুও অনলাইন থেকে এই ভিডিও সরা। তুই কি ফেসবুকেও এটা আপলোড করেছিলি?
-না, তবে শেয়ার করেছিলাম। ফেক প্রোফাইল থেকে।
-ওটার আইডি পাসওয়ার্ড মনে আছে?
আমি না-সূচক মাথা নাড়ি।
-হাসান, তুই না শিক্ষিত ছেলে? এতবড় বলদামী কিভাবে করলি?
আমি আবার চুপ করে থাকি।
-তুই জাহিদকে পেটানোর পর সে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করেনি?
-না।
-কেন?
-এই ভিডিওটা ছাড়াও আর একটা ভিডিও আছে। ওটাতে জাহিদ রেপ এটেম্পটের কথা কনফেস করেছিল।
-ওটাও ইউটিউবে আছে?
-না, আমার পুরানো ফোনে আছে।বাসায়।
-গুড।ওটা আমাদের কাজে লাগবে।
-আর তাছাড়া ...
-তাছাড়া কি?
-তৎকালীন ওয়ার্ড কমিশনার আমার পরিচিত ছিলেন। ঝামেলা করে জাহিদ টিকতে পারত না।
-উনি এখন কোথায়?
-মাস ছয়েক আগের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হেরে গেছেন উনি। অনেকগুলো মামলা খেয়ে যতদূর জানি দেশছাড়া।
দুহাত দিয়ে মুখ চেপে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রোমেল। হতাশায় নাকি বিরক্তিতে-আমি বুঝতে পারি না।
-হাসান।
-হু।
-বাইরে এশারের আযান হচ্ছে। আপাতত বাসায় যা।হেলাল আর তার সাথীদের সাথে যোগাযোগ কর, ওরা যেন কোনভাবেই পুলিশের হাতে না পড়ে। আগামীকাল সকালে ফার্স্ট আওয়ারেই আমি মামলা হয়েছে কিনা, পোস্টমর্টেমের কদ্দূর কি হল-এসব খবর বের করার চেষ্টা করব। তুই আর ভাবী সাবধানে থাকবি।জাহিদের পরিবারের সাথে বা অন্য কারও সাথেই এই খুন নিয়ে আলোচনা করবি না।
-আর ভিডিওটা?
-আমার কিছু পরিচিত হ্যাকার পোলাপান আছে। ওদেরকে বলে দেখি। যদি তোর ফেক একাউন্ট হ্যাক করতে পারে তাহলেতো ভিডিওটা ডিলিট করে দিতে বলব। আর নাহয় রিপোর্ট করা ছাড়া কোন অপশন দেখছি না।হাসান।
-বল।
-এই ঝামেলা থেকে বের হওয়ার একটা শর্টকাট উপায় কিন্তু আছে।
-কি? আমি খুব উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করি।
-কামরুজ্জামানকে টাকা দিয়ে দিলেও কিন্তু ঝামেলা মিটে যায়।
-মাই ওয়াইফ ইজ নট গিল্টি।কামরুজ্জামানকে আমি এক পয়সাও দিব না।



।।ছয়।।
বাসায় পৌছালাম নয়টার সময়।নাশিদ চিন্তিত মুখে দরজা খুলে দিল।
-আজকে দেরী হল যে? বেশ উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চাইল ও।
-কিছু ঝামেলায় আটকা পড়েছিলাম।
-ঝামেলা মানে?
-পরে বলি? তুমি টেবিলে খাবার দাও, আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।
নাশিদ বুঝতে পারে আমি কোন কথা বলার মত মুডে নেই। চুপচাপ রান্নাঘরে চলে যায় ও, আমি কাপড় পাল্টে বাথরুমে ঢুকে পড়ি।

পনের মিনিট পর।
আমরা দুজন খেতে বসেছি। একসময় খাওয়ার সময় নাশিদ প্রচুর কথা বলত, ইদানীং প্রায় কিছুই বলে না।বাসায় ঢোকার সময়ই বলেছিলাম কিছু ঝামেলা আছে। ও জানে প্রয়োজন মনে করলে আমি নিজ থেকেই বলব, তাই তখন থেকে এ নিয়ে আর নাশিদ কোন প্রশ্ন করেনি।
-আজকে অফিসে পুলিশ এসেছিল। অবশেষে বাধ্য হয়েই আমি নীরবতা ভাঙ্গি।
আমার কথা শুনে নাশিদের খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ? কেন? অফিসের কোন ঝামেলা?
-না।
-তাহলে?
-ওই যে, ওই জাহিদ হারামজাদা।
-সেতো মারা গেছে গত পরশুদিন।
-মারা যায় নি, খুন হয়েছে।
-খুন?
-হ্যা, পুলিশতো তাই বলল।কেন? তুমি জানতা না?
-পাড়ায় লোকজনতো অনেক কিছুই বলাবলি করে, আমি সেসবে কান দেইনি।
-পাড়ার লোকজন মানে কারা?
-আমি জানিনা। পরশুদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, দেখি ওই বাড়ির সামনে এ্যাম্বুলেন্স, মানুষের জটলা। পরে বুয়ার কাছে ওই লোকটা মারা গেছে। তোমাকেওতো বলেছিলাম, মনে নেই?
-আছে। সেজন্যই জানতে চাইছিলাম জাহিদ সাহেবের খুনের ব্যাপারটা তুমি জানি কিনা।
-লোকটা মারা গেছে শুনেছি, কিন্তু খুন হওয়ার ব্যাপারটা আমি জানতাম না।সে খুন হলে পুলিশ তোমার কাছে যাবে কেন?
আমি আজকে সারাদিনের ঘটনা ওকে খুলে বললাম। ওসি কামরুজ্জামান, তার সন্দেহ, পঁচিশ লক্ষ টাকা দাবী, রোমেলের সাথে আমার আলাপ, সেই ভিডিও-কিছুই বাদ দিলাম না।
-এখন কি করবা? নাশিদ উদবিগ্ন কন্ঠে জানতে চায়।
-আপাতত রোমেলের পরামর্শগুলোই মেনে চলব। স্বাভাবিক জীবন যাপন করব যাতে কেউ আমাদের সন্দেহ না করে।
-আর তোমার অফিসের পিয়ন?
-ওই ছেলেটার স্বভাব আমি জানি। টাকা দিলে ও আর ওর সঙ্গীসাথী-সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।
-ভিডিওটা?
-নাশিদ বলেছে ইউটিউব থেকে সরিয়ে দেবে। ওর পরিচিত কিছু ছেলেপেলে আছে, ওরা পারবে কাজটা করতে।
-কিন্তু ওই অসি যদি আগেই ওটা ডাউনলোড করে নেয়?
-নিলে নিক না, ওখানে তোমার কিংবা আমার-কারোরই চেহারা দেখা যায় না।
মুখে বলে নাশিদকে সান্তবনা দেয়ার চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু আমি নিজেও সেটা বিশ্বাস করতে পারলাম না। ওই সময়ে রাগের মাথায় করা একটা ভিডিও এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হঠাৎ নাশিদ কাঁদতে শুরু করে।
-কি আশ্চর্য, কাঁদছ কেন? কিচ্ছু হবে না আমাদের। বলতে বলতে আমি নাশিদকে জড়িয়ে ধরি।
-সব আমার দোষ।
-তোমার দোষ হবে কেন?
-সেদিন যদি আমি জাহিদের গাড়িতে না উঠতাম, তাহলে আজ এই অবস্থা হত না। আর আমাদের মেয়েটাও বেঁচে থাকত।
নাশিদের কথা শুনে আমি বজ্রাহত হয়ে পড়ি। নামিরা বেঁচে থাকত মানে? তাহলে কি নামিরার মৃত্যুর জন্য জাহিদ দায়ী?
-দেখ নাশিদ, জাহিদ খারাপ লোক ছিল, তার নিয়তে সমস্যা ছিল। অন্যের স্ত্রীকে সে সম্মান করতে জানে না, তাই তাকে সেদিন মার খেতে হয়েছিল। কিন্তু আমাদের মেয়ে বেঁচে থাকত মানে কি? নামিরার মৃত্যুর জন্য কি জাহিদ দায়ী।
নাশিদ কোন জবাব দেয় না, দুহাতে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে থাকে।
-নাশিদ। আমি ওর দুহাত ধরে ঝাঁকুনি দেই।কথা বল।
-তোমার কি মনে আছে মাস তিনেক আগে তোমার জরিনা ফুফু আমাদের বাসায় থাকতে এসেছিলেন?
-হ্যা। কিন্তু এই পুরো ঘটনার সাথে উনার কি সম্পর্ক?
-উনি বলেছিলেন সন্তানের ওপর বিপদ আসে বাবা-মায়ের পাপের কারণে। সেদিন জাহিদকে রক্তাক্ত তুমি যে পাপ করেছিলে, আমি তোমাকে সাপোর্ট করে যে পাপ করেছিলাম-সেটার প্রায়শ্চিত্ত করেছে আমাদের নামিরা, ওর জীবন দিয়ে।
-আই থিংক ইউ আর মেন্টালি ডিস্টার্বড, ইউ নীড রেস্ট। চল শুয়ে পড়ি।
-না, তোমাকে শুনতে হবে।
আমি নাশিদের চেহারার দিকে তাকাই। মাস ছয়েক আগে ডেঙ্গুতে নামিরার মৃত্যুর পর থেকেই ওর আচার আচরণে কিছু অস্বাভাবিকতা, কথাবার্তায় অসংলগ্নতা আমি খেয়াল করেছিলাম, কিন্তু সেটা এত ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে-বুঝতে পারিনি।
-নাশিদ, চল আমরা শুয়ে পড়ি।তোমার বাকি কথা কাল সকালে শুনব। ঠিক আছে?
-না, তোমাকে এখনই শুনতে হবে।
আমি আবার নাশিদের মুখে তাকাই। ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, যা বলতে চায় তা আমাকে বলবেই, আজ, এক্ষুনি।
-ঠিক আছে, বল। আমি হতাশ হয়ে জবাব দেই।
-তোমার কি মনে আছে স্কুল ছুটির পর আমি প্রতিদিন বাবুকে আমাদের পেছনের পার্কটায় নিয়ে যেতাম?
-হ্যা।
-কয়েকদিন আগে আমি আবার পার্কটায় গিয়েছিলাম।
-একা?
-হ্যা।
-কেন? আমাকে বলতা, আমিও যেতাম তোমার সাথে।
-তোমার সময় কোথায়? বাবু মারা যাওয়ার পর থেকেই দেখছি তোমার কাজের চাপ বেড়ে গেছে। সারাদিন অফিসে, বাসায় আস শুধু খাওয়া আর ঘুমানোর জন্য।আমার সাথে কোথাও যাওয়ার সময় আছে তোমার?
আমি কিছু বলি না। নামিরার মৃত্যুর পর থেকে আসলে আমার বাসায় থাকতে ভাল লাগে না, বাসার যেদিকেই তাকাই সেদিকেই শুধু আমার সোনামইণিটাকে দেখি।সারা ঘরজুড়ে পিচ্চিটার ছোটাছুটি করার দৃশ্য চোখে ভাসে।এজন্যই কাজের বাহানায় অফিসে বসে থাকি, যতটা কম সময় বাসায় থাকা সম্ভব, ঠিক ততটা কম সময়ই বাসায় কাটাই।
-কি হল? কথা বল না কেন? আবার চিৎকার করে কেঁদে ওঠে নাশিদ।
এবারও কিছু বলি না আমি। ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকি নাশিদের দিকে। নাশিদ আমার সেই চোখে কিছু পড়তে পারে কিনা-জানি না আমি।
-হাসান।
-বল।
-সেদিন পার্ক থেকে আসার পর আমি দুপুরে ঘুমিয়েছিয়াম। স্বপনে কি দেখলাম জান?
-কি?
-দেখলাম বাবু আমাকে বলছে, আম্মু, আমার এখানে খুব কষ্ট। তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।
-তারপর?
-তখনই ঠিক করলাম আমি জাহিদের কাছে ক্ষমা চাইব?
-হোয়াট? ক্ষমা চাইবে? তাও আবার জাহিদের কাছে? কেন? কি ভুল করেছ তুমি?
-দেখ, জাহিদ একটা অপরাধ করেছে। আমাদের উচিত ছিল পুলিশের কাছে যাওয়া।তা না করে আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছি।তাতে লাভটা কি হয়েছে? তুমি কি জান জাহিদের যেদিন কোমা থেকে জ্ঞান ফেরে সেদিনই নামিরার মৃত্যু হয়?
-জানতাম না, এখন জানলাম। দ্যাটস জাস্ট কোইন্সিডেন্স।
নাশিদের ঠোঁটের কোণে আমি বিদ্রুপাত্মক হাসি দেখতে পাই। আমরা পুরো পরিস্থিতিটাই অন্যভাবে হ্যান্ডেল করতে পারতাম।
-শোন নাশিদ, যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে, সেটা আমরা পরিবর্তন করতে পারব না। তাছাড়া ওই সময়টায় অনেকেই ডেঙ্গুতে মারা গেছে। আমাদের ভাগ্য খারাপ, ওই অনেকের মধ্যে আমাদের মেয়েও একজন। তারমানে এই না যে জাহিদ নির্দোষ কিংবা আমরা দোষী। বর্তমানে আমাদের কি করা উচিত-সেদিকেই এখন ফোকাস করতে হবে আমাদের।
-শোন...
-আর কোন কথা না। চল ঘুমিয়ে পড়ব। সামনে কঠিন সময় আসছে।




।।সাত।।
অফিসে পৌছাতে দেরী হয়ে গেল। লিফটে ওঠার সময় দেখি সাড়ে এগারটা বাজে।নয়টা থেকে অফিস, আড়াই ঘন্টা লেট। অবশ্য জিএম স্যারকে বলে রেখেছি, আশা করি সমস্যা হবে না।
রুমে ঢুকতে যাব, দেখি রুমের সামনে জটলা।বেশ কয়েকজন পিয়ন আর আর আয়া উঁকিঝুঁকি দিয়ে রুমের ভেতর দেখার চেষ্টা করছে, সাথে দুয়েকটা অফিসারও আছে।
-এই, আমার রুমের সামনে কি? আমি চিৎকার করে উঠলাম।
ওরা সম্ভবত কেউই এতক্ষণ আমাকে খেয়াল করেনি, হঠাৎ আমাকে দেখে চমকে উঠল, পড়িমড়ি করে যে যেদিকে পারে ছুটে পালাল।
ঘটনা কি? আমার রুমের সামনে ওরা জটলা করেছিল কেন? ভাবতে ভাবতে দরজা ঠেলে রুমের ভেতর ঢুকলাম।
ভিজিওটর চেয়ারে আয়েশ করে বসে আছে কামরুজ্জামান, চকবাজার থানার ওসি।
আমকে রুমে ঢুকতে দেখেই বিশ্রী একটা হাসি দিয়ে দিল লোকটা।কেমন আছেন, হাসান সাহেব? বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে।
বাধ্য হয়েই হ্যান্ডশেক করলাম। ভাল। এই সকাল বেলা, আমার অফিসে?
-কি করব বলুন? আসতে হয়, আমরা আসতে বাধ্য হই।
-মানে?
-মানে খুব সহজ।আপনি যদি গতকাল...
ওসি কামরুজ্জামান কথা শেষ করতে পারলেন না, তার আগেই ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল।
-এক মিনিট।বলেই ফোনটা রিসিভ করলাম।হ্যালো।
-এসব কি হাসান? প্রতিদিন তোমার কাছে পুলিশ আসছে কেন? অপর পাশে জিএম স্যারের উত্তেজিত কন্ঠ।
-উনি এমনিই আসছেন, ব্যক্তিগত দরকারে।
-ব্যক্তিগত প্রয়োজন বাসায় থাকাই ভাল। আমি চাই না আমার অফিসে প্রতিদিন পুলিশ আসুক। লোকজন অনেক আজেবাজে কথা বলছে।ব্যাপারটা যা-ই হোক, দ্রুত সমাধান করে ফেল।
স্যার ফোন রেখে দিলেন।
আমি কামরুজ্জামানের দিকে ফিরলাম।বলুন, কি ব্যাপার?
-ব্যাপারতো আপনি জানেনই। এক্ষন আপনার ডিসিশানের অপেক্ষা।
-ন্যাকামি না করে যা বলবেন সরাসরি বলুন।
-ওকে ফাইন। দ্যা প্রাইজ জাস্ট ওয়েন্ট আপ।পয়ত্রিশ লাখ।
-এন্ড হোয়াই শুড আই পে ইউ?
-বিকজ আই হ্যাভ এভিডেন্স।
-এন্ড দ্যাট ইজ...
-এটা। কামরুজ্জামান পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখাল।নিঃশব্দে চালিয়ে দিল ভিডিওটা।
মিনিট তিনেকের ভিডিওটা শেষ হয়ে গেল একটু পরেই।
-তো এই ভিডিও থেকে কি প্রমানিত হয়?
-আপনি এবং আপনার স্ত্রী কিছু ভাড়া করা গুন্ডা দিয়ে জাহিদ সাহেবকে টর্চার করেছিলেন।
-এখানে আমি কোথায়? আর আমার স্ত্রী-ই বা কোথায়?
-তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। এখানে না আপনার, না আপনার স্ত্রীর চেহারা দেখা যাচ্ছে।তবে একটা ছেলে আছে যে ওখানে সেরাতে উপস্থিত ছিল আর আপনাদের দুজনকেই আইডেন্টিফাই করতে পারবে।বলতে বলতেই কামরুজ্জামানের মুখে একটা ক্রূর হাসি ফুটে ওঠে।
-কে?
-ইউ নো হিম ভেরী ওয়েল। মেক এ গেস।
-বেলাল।আমি চিৎকার করে ডাকি।
একটু পর নতুন একটা ছেলে ঢোকে। স্যার, ডাকছিলেন?
-বেলাল কোথায়? আমি জানতে চাই।
-উনিতো গতকালই চাকরি ছাইড়া দিছে।
-হোয়াট? যাও তুমি।
ছেলেটা বেরিয়ে যায়। আমি বেলালের নম্বর ডায়াল করি।
-আপনি যে নম্বরে ডায়াল করেছেন তা এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।
-শিট।
কামরুজ্জামান উঠে দাঁড়ায়। টাকা কবে, কোথায়, কিভাবে আর কার কাছে দেবেন-সেটা আমি দ্রুতই জানিয়ে দেব।খবরদার, পালানোর বা আত্মগোপনের চেষ্টা করবেন না।তাতে বিপদ শুধু বাড়বেই, কমবে না।
-কামরুজ্জামান সাহেব।
ওসি কামরুজ্জামান চলে যাওয়ার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আমার ডাক শুনে ফিরে তাকালেন।
-বলুন।
-বেলাল কি আপনার কাছে? নিরাপত্তা হেফাজতে?
-কেন? ছিনিয়ে নিএয়ার প্ল্যান করছেন নাকি?
এই প্রবল দুঃসময়েও কথাটা শুনে হাসি পায়।তা করছি না। জীবনতো আর সিনেমা নয়।
-আমার শুধু একটা প্রশ্ন আছে। হাইপোথেটিক্যাল প্রশ্ন।
-বলুন।
-ধরে নিচ্ছি, বেলাল আপনার নিরাপত্তা হেফাজতে।সে আপনার হাতে থেকে ওই ভিডিওতে আমাকে আর আমার স্ত্রীকে আইডেন্টিফাই করল। ওটাতো এক বছর আগেকার ঘটনা। ওখানে জাহিদ শুধু আহত হয়েছিল। তার খুনের সাথে আমাকে কিংবা আমার স্ত্রীকে কিভাবে লিংক করবেন?
কামরুজ্জামান তার মুখটা আমার মুখের কাছে নিয়ে আসে। একজন অপরাধী হিসেবে আপনি খুব নিম্নশ্রেণীর। ডু ইউ নো দ্যাট?
-হোয়াট?
-আপনি দেখি কিছুই জানেন না। খুনের আগের দিন আপনার স্ত্রী জাহিদ সাহেবের বাড়িতে গিয়েছিলেন। জাহিদ সাহেবের মা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে আপনার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন।রাস্তায় খুব হট্টগোল হয়েছিল। দুপুরবেলাতো, আপনি বোধহয় অফিসে ছিলেন।তাই জানেন না ব্যাপারটা।
ওসির কথা শুনে অবাক হয়ে যাই। নাশিদ গিয়েছিল জাহিদের বাড়িতে।কেন?
-আচ্ছা, আসি তাহলে।ওসি কামরুজ্জামান বিকট হাসি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।




।।আট।।
এক ঘন্টা পর।
বসে আছি রোমেলের চেম্বারে।কামরুজ্জামান চলে যাওয়ার পর আমিও বসে থাকিনি, সাথে সাথেই বেরিয়ে গেছি অফিস থেকে, চলে এসেছি এখানে।
-হাসান।
-হু।
-সব খুলে বল আমায়।
আমি সারা সকালের ঘটনা খুলে বলি।
-তাহলে তুই টাকা দিতে রাজি হয়েছিস?
-আমি হ্যা কিংবা না-কিছুই বলিনি।
-ন্যাকামি করবি না।তোর আর অপশন আছে?
-কেন নাই? ওই ভিডিও আর বেলালের সাক্ষ্য দিয়ে সে আমাদেরকে এক বছর আগের ওই পেটানোর ঘটনায় লিংক করতে পারবে। খুনের মামলায় লিংক করবে কিভাবে?
-তুই না বললি জাহিদের বাড়িতে সিসি ক্যামেরা ছিল?
-ওসি ব্যাটাতো সেরকমই দাবী করল। সে যদি সত্যি কথাও বলে তাওতো রাতের আধারে যে জাহিদের ঘরে ঢুকেছিল তার মুখ ঢাকা ছিল।
-হুম।আমিও মামলার আপডেট কালেকট করেছি।আসামী করা হয়েছে অজ্ঞাতনামা লোকজনকে।
-ফাইন, তাহলেতো নাশিদের কোন ভয়।
-পুরো কথা শেষ করতে দে। অজ্ঞাতনামা লোকজনকে আসামী করলে আরো বিপদ। পুলিশ যে কাউকে ধরে কোর্টে চালান করে দেবে।তোর কি ধারণা? তুই যদি ঘুষ দিয়েও দিস তারপর পুলিশ কি করবে?
-কি করবে?
-কয়েকটা ইনোসেন্ট লোককে গ্রেফতার করে কোর্টে চালান করে দেব। তারপর রিমান্ডে নিয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করবে। খুনটা যে-ই করে থাকুক সাফারার হবে ওই অসহায় লোকগুলো।
-আর আমি যে সাফার করছি?
-সেটা তোর নিজের দোষে।
জবাব দিতে গিয়েও থেমে যাই। কি দরকার এই পরিস্থিতিতে কথা বাড়ানোর?
-হাসান।
-বল।
-রাগ করিস না ভাই। আসলে মেজাজ সবসময় নিয়ন্ত্রন করা যায় না।ভাবীর অবস্থা কি?
-ওকে সব বলেছি কালরাতে।
-তারপর?
-খুব কান্নাকাটি করল। রাতে ওকে ওষুধ খাওয়াতে হয়েছে ঘুম পাড়ানোর জন্য।
-সকালের ঘটনা জানিয়েছিস ভাবীকে?
-হ্যা।
-তারপর?
-জানতে চাইলাম কেন সে জাহিদের বাসায় গিয়েছিল, ওখানে কি হয়েছিল, কেন আমাকে জানায়নি।
-কি বলল ভাবী?
-গতকাল রাতে যা বলল, তা-ই। সে জাহিদের বাসায় গিয়েছিল ক্ষমা চাইতে, আমরা নাকি তার সাথে অন্যায় করেছি।
-আর?
-সব শোনার পর জাহিদের মা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ওকে বের করে দিয়েছে।
-ভাবী আগে তোকে জানাল না কেন এসব?
-ওর ধারণা আমি রাগ করব, তা-ই।
-হাসান।
-হু।
-আমার ধারণা নামিরার মৃত্যুর পর থেকে ভাবী ডিপ্রেশনে ভুগছে।শী নিডস হেল্প।
-আমারও তাই ধারনা।
-এখন কি তাহলে বাসায় যাবি?
-নাহ।
-সেকি, কেন?
-বাসায় কেউ নাইতো।
-তাহলে ভাবী কোথায়?
-ওকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছি আমার শালার কাছে, সকালের ফ্লাইটে।
-কেন?
-মামলা যদি খারাপের দিকে যায় তাহলে ওকে বাইরে পাঠিয়ে দেব। লোক ঠিক করা আছে। সে-ই সব ব্যবস্থা করে দেবে।
-আর তুই?
আমি কোন জবাব দেই না, ঠোঁটের কোনে একটা হাসির ঢেউ এসে মিলিয়ে যায়। এই হাসির অনেক অর্থ হতে পারে।
-দেখ হাসান...
রোমেল ওর কথা শেষ করতে পারে না, তার আগেই আমার ফোনটা বেজে ওঠে।নাসির। আমার ছোট শালা।
-হ্যালো নাসির।
-আপুর সাথে আপনার কি নিয়ে কথা হয়েছিল হাসান ভাই?
-কেন?
-আপনার সাথে কথা বলার পরেই আপু ওর রুমে গিয়ে দরজা লক করে দেয়। আমরা অনেক ডাকাডাকি করার পরও দরজা খোলেনি ও। শেষ পর্যন্ত যখন দরজা ভেঙ্গে ঢুকলাম দেখি সিলিং-এর সাথে আপু ঝুলছে।
-এ।
-আপুকে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। ইফ এনিথিং হ্যাপেন্স টু মাই সিস্টার, আই উইল নট ফরগিভ ইউ।
আমার হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে যায়।ওপাশ থেকে সম্ভবত নাসির আমায় শাপ শাপান্ত করতে থাকে।
-কি হয়েছে, হাসান? রোমেল জানতে চায়।
-আমার সব শেষ...




।।নয়।।
নাশিদকে আমি অসম্ভব ভালবাসি, যেদিন থেকে চিনি সেদিন থেকেই ও আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। আমি মোটামুটি ভালবাসা ছাড়াই খুব নিষ্ঠুর একটা পরিবেশে জীবন কাটিয়েছি, আট বছর আগে নাশিদের সাথে পরিচয়ের আগ পর্যন্ত।সেই থেকে আমার জীবন ভালবাসায় পরিপূর্ণ। পাঁচ বছর আগে আমরা বিয়েও করে ফেলেছি।
নাশিদকে পেয়েই ঠিক করেছিলাম আমার পেছনের জীবনকে ভুলে যাব, তাই বিয়ের পরপরই সম্পূর্ণ নতুন শহরে শিফট করেছিলাম, কিভাবে করে যেন চমৎকার একটা চাকরীও জুটিয়ে নিয়েছিলাম।
চমৎকার কাটছিল আমাদের জীবন। বছরখানেকের মধ্যেই নাশিদের কোল জুড়ে এল নামিরা, আমাদের একমাত্র সন্তান।
ডায়রীর পাতা উলটে চললেন পিবিআই সিনিয়র ইন্সপেক্টর তায়েফ আরেফিন। গত একবছর ধরে জাহিদ হত্যাকান্ডের প্রধান সন্দেহভাজন হাসান আরিফের পিছু ধাওয়া করে চলেছেন, কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছেন না। কিভাবে যেন প্রতিবারই লোকটা খবর পেয়ে সটকে পড়ে, এবার সম্ভবত একেবারে শেষ মুহূর্তে খবর পেয়েছে, কোন কিছু সাথে নিয়ে পালাতে পারেনি, একাই পালিয়েছে। হাসান আরিফের ডেরায় পাওয়া ডায়রীটাই উল্টেপাল্টে দেখছিলেন তায়েফ সাহেব।
ডায়রীর মাঝখানে একটা ছবি পাওয়া গেল। স্বামী-স্ত্রী আর তাদের কোলে ছোট্ট একটা শিশু। হাসিখুশি একটা পরিবার। হাসান আরিফ, নাশিদ আরিফ আর তাদের একমাত্র সন্তান নামিরা। জাহিদ হত্যাকান্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর নাশিদ আত্মহত্যা করেন, যদিও বোনকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার জন্য ছোটভাই নাসির মামলা করেছিলেন দুলাভাইয়ের বিরুদ্ধে।
বছর খানেক আগে যখন তায়েফ সাহেব তদন্তের দায়িত্ব পান, মনে হয়েছিল খুব সাধারণ একটা প্রতিশোধের ঘটনা এটা। জাহিদের মা নাশিদকে অপমান করেছিলেন, তাই নাশিদ আর তার স্বামী মিলে জাহিদকে খুন করে প্রতিশোধ নিয়েছে।
ঘটনা এত সহজ নয়। এই ঘটনার বছরখানেক আগে জাহিদকে পেটানোর অভিযোগ আছে এই দম্পতির বিরুদ্ধে, যদিও কারণটা স্পষ্ট নয়।যে ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে এই দাবী করা হয় তাতে ভিক্টিম জাহিদের চেহারা স্পষ্ট হলেও হাসান কিংবা নাশিদ-কারও চেহারাই দেখা যায় না।
এই ঘটনার ফলে জাহিদ ছয় মাস কোমায় ছিলেন। অথচ জাহিদ বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কারও বিরুদ্ধেই না। না কোন মামলা, না কোন সাধারণ ডায়রী।সন্দেহজনক।
তায়েফ সাহেব আবার ডায়রীতে মনযোগ দিলেন।
নামিরার জন্মের পর আমাদের জীবনে কিছু বড় ধরণের পরিবর্তন এল। বাচ্চার দেখাশোনা করার জন্য নাশিদ চাকরীটা ছেড়ে দিল, আমি কিভাবে যেন আরো একটা প্রমোশন বাগিয়ে কোম্পানির চীফ ডিজাইনার হয়ে গেলাম।
জীবনের এই পর্যায়ে আমি সত্যি সুখী ছিলাম। নামিরা হাসির শব্দে প্রতিদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গে, প্রতিদিন নামিরা আর নাশিদকে চুমু খেয়ে আমি প্রতিদিন অফিসে যাই।
ছুটির দিনগুলোয় আমরা তিনজন মিলে ঘুরে বেড়াই, রাতে সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে খেতে যাই। সেখানে হয়ত নামিরার হাতের ধাক্কায় একটা প্লেট কিংবা গ্লাস ভেঙ্গে যায়। তা-ই দেখে আমরা তিনজনই হেসে উঠি।লোকজন আমাদের পুরো পরিবারকে পাগল ভাবে, আমরা সেসব থোড়াই কেয়ার করি।
আরো কয়েক পাতা এগিয়ে যান তায়েফ সাহেব।
সব ভালবাসার গল্পের শেষটা সুন্দর হয় না, আমদের গল্পওটা বোধহয় হবে না। দেশে মাহামারীর মত ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে, আমার ছোট্ট নামিরাও ডেংগুতে আক্রান্ত।
আমার ছোট্ট পরীটার মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেছিলাম একটা কেবিন যোগাড় করতে, পারলাম না। দেশে এখন এত ভিআইপি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত, তাদের ভীড়ে আমার নামিরাকে একটা কেবিন দেওয়া গেল না।
অফিসের কোন ঠিকঠিকানা নেই, সারাদিন হাসপাতালে পড়ে থাকি। নাশিদের অবস্থা আরো খারাপ। মেয়ের চিন্তায় ওর কপালে ভাজ পড়ে গেছে, জানি না কি অপেক্ষা করছে আমার ছোট্ট পরীটার জন্য।
দুই পাতা পরঃ
আজ আমার পরীটা চিরতরে ঘুমিয়ে গেল।
মাত্র এক লাইন লেখা এই পাতায়।
তায়েফ সাহেব কিছু হিসাব করতে বসে যান।জাহিদে পেটানোর ছয় মাস পর নামিরার মৃত্যু হয়, তারও ছয় মাস জাহিদ খুন হন।তায়েফ সাহেব ইতিমধ্যে নামিরার মৃত্যু পর্যন্ত ডায়রীতে পড়ে ফেলেছেন, কিন্তু তার আগে কোথাও জাহিদের উল্লেখ পাননি।
কেন?
মানুষতো সাধারণত ডায়রীতে সত্য কথাই লেখে। তাহলে এখানে জাহিদের উল্লেখ নেই কেন? নাকি রোমেলের কথাই সত্যি? হাসান কিংবা তার পরিবার হয়ত এসবে জড়িত নয়।
এমনও কি হতে পারে না হাসান ইচ্ছে করেই ডায়রীটা এখানে রেখে গেছে। তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। ডায়রী নিজের জীবনের ঘটনাগুলো সত্যমিথ্যা মিশিয়ে লিখেছে যাতে তিনি কনফিউজড হয়ে যান।
তায়েফ সাহেব বুঝতে পারেন না কি করবেন। বেশ কিছু পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে তিনি এগিয়ে যান আরো সামনে।
আজ নাশিদের দাফন হয়ে গেল। আমার যত ইচ্ছাই থাকুক, আমার মনটা যতই কাঁদুক, আমি যেতে পারিনি। আমার নাশিদকে আমি শেষ বিদায় দিতে পারিনি।নাসির আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছি, নিজের প্রানপ্রিয় স্ত্রীকে নাকি আমি আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছি!
নিজের একমাত্র শালা নাসিরের ওপর লোকটার ভালই ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।আবার পড়তে শুরু করন তায়েফ সাহেব।
আমি আর ওসি কামরুজ্জামান বসে আছে গাড়ির ব্যাকসীটে। কামরুজ্জামানের ইশারা পেয়েই ড্রাইভার গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
-আপনার গাড়িটা সুন্দর। নিজের নামে কেনা? আমি জানতে চাই।
-গিফট। কামরুজ্জামানের ছোট উত্তর।
-তাই?
-আমি অনেকেরই উপকার করি, তাই ভালবেসে অনেকে অনেক কিছু দেয়।এই যেমন আপনি দিচ্ছেন পয়ত্রিশ লাখ, এটাও তেমনি কারও না কারও ভালবাসার উপহার।আর কথা বাড়াবেন না। আমার ড্রাইভার কি ঘন্টার পর ঘন্টা বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকবে নাকি? জলদি জিনিস বের করেন।
আমি চারিদিকে তাকাই। সুনসান রাস্তার মাঝখানে গভীর রাতে দাঁড়িয়ে আছে একটা নম্বরপ্লেটবিহীন গাড়ি, যার কালোকাচঘেরা পেছনের সীটে বসে আছি আমি আর কামরুজ্জামান।সিগারেট খাওয়ার নাম করে ড্রাইভারটা বাইরে দাঁড়িয়ে চোখ রাখছে চারিদিকে। ভালই ব্যবস্থা।
আমি টাকাভর্তি ব্যাগটা এগিয়ে দেই। লোভে চকচক করতে থাকে কামরুজ্জামানের চোখ দুটো।
ব্যাগটা খুলেই কামরুজ্জামান টাকার বান্ডিল গুনতে শুরু করে। তখনও সে জানে না আমার স্লীভ থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা সার্জিকাল নাইফ, সোজা এগিয়ে যাচ্ছে তার গলা লক্ষ্য করে।
ডায়রীটা বন্ধ করে দেন তায়েফ সাহেব, উত্তেজনায় কাঁপতে থাকেন।বছর দুয়েক আগে চকবাজার থানার ওসি কামরুজ্জামানের লাশ পাওয়া গিয়েছিল মাহসড়কে একটা পরিত্যক্ত গাড়িতে।ড্রাইভিং সীটে ছিল নাম না জানা আরেক যুবকের লাশ। না কোন ক্লু, না কোন আই ইউটনেস, না কোন সিসিটিভি ফুটেজ।
তবে কি কামরুজ্জামানের খুনটা হাসান আরিফই করেছিল?




।।পরিশিষ্ট।।
এলার্মের শব্দে ঘুমে ভেঙ্গে গেল বেলালের। আজ তার নতুন চাকরীতে জয়েনিং। অবশেষে হাফ ছেড়ে বেঁচেছে সে।
ওসি কামরুজ্জামানের চাপে পড়ে হাসান স্যারের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে রাজি হওয়ার পর থেকেই তার জীবনটা নরক গুলজারে পরিণত হয়েছিল।ওসি কামরুজ্জামান নিজেও খুন হয়েছে, বেলালের সঙ্গী তিনটি ছেলেরও কোন খোজ কেউ পায়নি।
মাঝখান থেকে বেলালের চাকরীটা গেছে, পুলিশের ভয়ে পালিয়ে থাকতে হয়েছে।
গত সাত বছর ধরে হাসান স্যার নিখোঁজ, অবশেষে আদালত তাকে মৃত বলে মেনে নিয়েছে। সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেছে জাহিদ হত্যাকান্ড আর নাশিদ আত্মহত্যা মামলার কার্যক্রম।
বেলালেরও আর সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজিরা দিতে হয় না, পুলিশের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করা লাগে না।
বেলাল ইতিমধ্যেই নিজের নাম পরিচয় পালটে ফেলেছে। এই নতুন শহরে তাকে বেলাল নামে কেউ চেনে না।
নতুন শহর, নতুন পরিচয়, নতুন চাকরী, নতুন জীবন।
বেলাল অফিসের জন্য বের হবে এমন সময় তার মোবাইলটা বেজে ওঠে।এই নতুন সীমের নম্বরতো কাউকে দেয়া হয়নি। এই সকালবেলা তাহলে কে ফোন করল?
-হ্যালো।
-কেমন আছ, হেলাল?
বেলালের আত্মা কেঁপে ওঠে। এই পৃথিবীতে তাকে একজনই “হেলাল” বলে ডাকত!




======================================================================
আমার লেখা আরো কিছু সাইকোথ্রিলারঃ
======================================================================
সাইকো থ্রিলারঃ আমাদের নতুন পুরানো ঘর
সাইকোথ্রিলারঃ আমি অথবা সে কিংবা অন্যকেউ
সাইকোথ্রিলারঃ একশ তলায় আবার...


সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ১২:১২
১৩টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাঙের বিয়ে [শিশুতোষ ছড়া]

লিখেছেন ইসিয়াক, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ ভোর ৫:৫৬


কোলা ব্যাঙের বিয়ে হবে
চলছে আয়োজন ।
শত শত ব্যাঙ ব্যাঙাচি
পেলো নিমন্ত্রণ ।।

ব্যাঙ বাবাজী খুব তো রাজী ,
বসলো বিয়ের পিড়িতে
ব্যাঙের ভাইটি হোঁচট খেলো,
নামতে গিয়ে সিড়িতে ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় অগ্রসর তরুণ প্রজন্মকে 'খোলাচিঠি'

লিখেছেন , ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ সকাল ৮:৫৮


প্রিয় অগ্রসর তরুণ প্রজন্ম,

তোমরা যারা ডিজিটাল যুগের অগ্রসর সমাজের প্রতিনিধি তাদের উদ্দেশ্যে দু'লাইন লিখছি। যুগের সাথে খাপ খাইয়ে ওঠতে অনেক কিছু আস্তাকুঁড়ে ফেলতে হয়। সেটা কেবলই যুগের দাবি, চেতনার চালবাজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পত্রিকা পড়ে জেনেছি

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ১:২৮



খবরের কাগজে দেখলাম, বড় বড় করে লেখা ‘অভিযান চলবে, দলের লোকও রেহাই পাবে না। ভালো কথা, এরকমই হওয়া উচিত। অবশ্য শুধু বললে হবে না। ধরুন। এদের ধরুন। ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার ভারত ভ্রমণ নিয়ে অপ-প্রচারণার ঝড়

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:১০



বাংলাদেশের প্রতিবেশী হচ্ছে ২টি মাত্র দেশ; এই ২টি দেশকে বাংগালীরা ভালো চোখে দেখছেন না, এবং এর পেছনে হাজার কারণ আছে। এই প্রতিবেশী ২ দেশ বাংলাদেশকে কিভাবে দেখে? ভারতর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা -মেলা

লিখেছেন পদাতিক চৌধুরি, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ রাত ৯:০৭







উপরে মূল কবিতার স্ক্রিনশট:-

মেলায় এসেছে খুশি এনেছে নিজের সঙ্গে,
বেরোও সবাই ঘর থেকে বসে আছো কেন ঘরে?
মেলার দিনে সবাই থাকে আনন্দে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×