somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুটি ডিমের চুরি, একটি জাতির আয়না

০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানুষটি দুটি ডিম চুরি করেছে।

কেউ বলবে—"আরে, মাত্র দুটি ডিম! এ নিয়ে এত কথা?"

হ্যাঁ, কথা আছে। কারণ সভ্যতা কখনো কোটি টাকার দুর্নীতি দিয়ে ভাঙতে শুরু করে না। তার পতন শুরু হয় দুটি ডিম, একটি মিথ্যা, একটি প্রতারণা, একটি অন্যায় সুবিধা আর একটি নষ্ট বিবেক দিয়ে।

সেদিন একজন নারী যানজটে আটকে থাকা একটি পিকআপ ভ্যান থেকে নিঃশব্দে দুটি ডিম তুলে নিলেন। হয়তো তাঁর কাছে সেই দুটি ডিমের আর্থিক মূল্য তেমন কিছুই ছিল না। কিন্তু তিনি যা নিয়ে গেলেন, তা ডিমের চেয়ে অনেক বড়।

তিনি নিয়ে গেলেন একজন পরিশ্রমী মানুষের প্রাপ্যের একটি অংশ।

আর যদি আশপাশে কোনো শিশু সেই দৃশ্য দেখে থাকে, তবে সে আরও বড় একটি শিক্ষা পেল—চুরি সব সময় রাতের অন্ধকারে হয় না; দিনের আলোতেও হয়। সুন্দর পোশাক পরা মানুষও অন্যের জিনিস নিজের করে নিতে পারে। ধরা না পড়লে অন্যায়ও যেন স্বাভাবিক।


শিশুরা বই পড়ে যতটা শেখে, তার চেয়ে অনেক বেশি শেখে বড়দের আচরণ দেখে।

তারা আমাদের কথার চেয়ে আমাদের কাজকে বেশি বিশ্বাস করে।

আপনি যদি তাকে প্রতিদিন সততার গল্প শোনান, কিন্তু সুযোগ পেলে অন্যের অধিকার কেড়ে নেন, তাহলে আপনার বক্তৃতা নয়—আপনার হাতই তার শিক্ষক হয়ে যায়।

সেদিন চুরি হয়তো ছিল মাত্র দুটি ডিমের।

কিন্তু হারিয়ে যেতে পারে একটি শিশুর সরল বিশ্বাস—যে বড়রা সৎ, মানুষ অন্যের কষ্টের মূল্য বোঝে, সমাজে ন্যায় বলে এখনও কিছু আছে।

আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি—বাংলাদেশে দুর্নীতি এত গভীরে গেল কীভাবে?

উত্তরটি হয়তো খুব জটিল নয়।

দুর্নীতি কোনো সরকারি অফিসে জন্ম নেয় না।

ঘুষের ফাইল, টেন্ডারের কারসাজি, ব্যাংক লুট কিংবা অর্থপাচার—এসবের বীজ অনেক আগেই বপন হয়ে যায়। যখন একটি শিশু দেখে, অন্যের প্রাপ্য থেকে একটু কম দিয়ে দেওয়া যায়; ওজনে সামান্য কম দিলেও চলে; গৃহকর্মীর প্রাপ্য আটকে রাখলেও খুব সমস্যা নেই; কর ফাঁকি দেওয়াকে বুদ্ধিমত্তা বলা হয়; সুযোগ পেলে একটু "ম্যানেজ" করাই যেন জীবনের নিয়ম।

সেখান থেকেই জন্ম নেয় একটি বিপজ্জনক দর্শন—

"সুযোগ পেলে সবাই করে।"

এই একটি বাক্যই একটি জাতির নৈতিক পতনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘোষণা।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছি, কিন্তু বিবেকের বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে পারিনি।

আমরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়িয়েছি, কিন্তু তাকওয়া ও আমানতদারিকে সামাজিক শক্তিতে পরিণত করতে পারিনি।

আমরা সন্তানদের জিপিএ শিখিয়েছি, কিন্তু সব সময় শেখাতে পারিনি—অন্যের একটি টাকাও আমার নয়।

আমরা ইতিহাস নিয়ে যুদ্ধ করি, রাজনীতি নিয়ে বিভক্ত হই, মতাদর্শ নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক করি। অথচ আমাদের পায়ের নিচে যে চরিত্রের মাটি প্রতিদিন একটু একটু করে সরে যাচ্ছে, সেদিকে তাকানোর সময় নেই।

একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সব সময় যুদ্ধ লাগে না।

একটি জাতিকে ধ্বংস করতে যথেষ্ট—যদি মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, "ছোটখাটো অন্যায় কোনো অন্যায় নয়।"

না, এটি দুটি ডিমের গল্প নয়।

এটি এমন এক সমাজের গল্প, যেখানে অনেক মানুষ এখনও মনে করে—ধরা না পড়লে চুরি, চুরি নয়।

একদিন এই "মাত্র দুটি ডিম" বড় হয়ে দাঁড়ায় ঘুষে, প্রতারণায়, ক্ষমতার অপব্যবহারে, ব্যাংক লুটে, কর ফাঁকিতে, ভেজাল খাদ্যে, নকল ওষুধে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়া অবিশ্বাসে।

কারণ দুর্নীতি আচমকা জন্মায় না।

দুর্নীতি বড় হয়।

আর তার প্রথম বিদ্যালয় কোনো দপ্তর নয়—পরিবার, সমাজ এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট আপস।

তাই প্রশ্নটি দুটি ডিমের নয়।

প্রশ্নটি হলো—আমরা আমাদের সন্তানদের কী উত্তরাধিকার দিয়ে যাচ্ছি?

সম্পদ, না সততা?

চাতুর্য, না চরিত্র?

কারণ অর্থ হারালে মানুষ আবার উপার্জন করতে পারে।

ক্ষমতা হারালে আবার ফিরে পেতে পারে।

কিন্তু একটি জাতি যদি তার চরিত্র হারায়, তবে হারিয়ে যায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৫৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সৌদি আরব যেভাবে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:২২



সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর এবং দ্রুততম ঘটনা। বিশ শতকের প্রথমার্ধেও যে দেশটি ছিল মূলত যাযাবর বেদুইন, পশুপালন এবং সীমিত হজের আয়ের ওপর নির্ভরশীল একটি চরম... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘ছুটি’র স্মৃতি

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০

(প্রায় দু’মাস আগে লেখা। তখন গ্রীষ্মকাল হলেও ঢাকায় কয়েকদিন পরপর বৃষ্টি হতো। এখনকার মত “ঘাম ঝরে দরদর” ধরণের গরম ছিল না। রাতগুলো তুলনামূলকভাবে বেশ ঠাণ্ডা থাকতো।)

আজ খুব ভোরে (শেষরাতে)... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে কারণে এবারের বিশ্বকাপও আর্জেন্টিনার ঘরেই উঠবে B-)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৪



কারণ আর্জেন্টিনা দুর্দান্ত, মেসি-মার্তিনেজরা অপ্রতিরোধ্য। আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচেই একছত্র আধিপত্য দেখিয়ে জয়লাভ করে প্রবল বেগে ফাইনালের দিকে ধ্বাবিত হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে গতবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

হোমিওপ্যাথি হচ্ছে একটি ধাপ্পাবাজ কিবিরাজি চিকিৎসা পদ্ধতি এর বৈজ্ঞানীক কোন ভিত্তি নেই

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:০৪



হোমিওপ্যাথি যে একটি ভাঁতাবাজি চিকিৎসা পদ্ধতি তা আমি আগেও জানতাম কিন্তু আমি কখনো এর বিরুদ্ধে কথা বলিনি বা কোথাও কিছু লিখিনি- তবে আজ কি মনে করে চ্যাটজিপিটির কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লবের শরিকরা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৪১

যারা বিপ্লব আনে, তারা বিপ্লব টেকায় না। যারা বিপ্লব টেকায়, তারা শরিকদের টেকায় না। ১৯৭৯ সালে ইরানে খোমিনি ক্ষমতায় এসেছিল বামদের কাঁধে চড়ে। কমিউনিস্ট, সেকুলার, নারীবাদী—সবাই শাহের বিরুদ্ধে এক কাতারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×