কিছু ভিডিও মানুষ দেখে, তারপর ভুলে যায়। কিছু ভিডিও চোখের সামনে থেকে সরে গেলেও বুকের ভেতর আটকে থাকে। বারবার মনে করিয়ে দেয়, আমরা যে সমাজে বাস করি, সেই সমাজে মানুষের মর্যাদা কি সত্যিই সবার জন্য সমান? নাকি মানুষের পরিচয়, তার অধিকার, এমনকি তার জীবনের মূল্যও নির্ধারিত হয় তার পকেটের সামর্থ্য আর হাতে থাকা ক্ষমতা দিয়ে?
সুমি আক্তারকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি তেমনই এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাদের। ভিডিওটি দেখার পর থেকে একটি বিষয় বারবার মনে হচ্ছে—একজন শ্রমিকের শরীর যখন আর কাজ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে, তখনও কি তার ওপর কাজের দাবি চাপিয়ে দেওয়া যায়? আর সেই মানুষটি যখন কাজ করতে করতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে, তখনও কি চারপাশের মানুষের বিবেক নির্বিকার থাকতে পারে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং প্রকাশিত ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, সুমি আক্তার অসুস্থ ছিলেন। তবু তাঁকে কাজে যেতে হয়েছিল। তিনি ছুটি চেয়েছিলেন, কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ছুটি চাওয়ার কারণে তাঁকে ধমক দেওয়া হয়েছিল। বাড়ি ফিরে অসুস্থ শরীর নিয়েই ছেলেকে জানিয়েছিলেন, শরীর খারাপ হলেও কারখানা তাঁকে ছুটি দিচ্ছে না, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করতে হবে।
একবার ভাবুন তো, কথাগুলো কতটা অসহায়ত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারে! একজন অসুস্থ মা তাঁর সন্তানকে জানাচ্ছেন, শরীর আর চলছে না, অথচ তাঁকে কাজ করতে হবে। কারণ তাঁর কাজ থামলে হয়তো আয় থামবে, সংসারের হিসাব থমকে যাবে, পরদিনের খাবারের নিশ্চয়তা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
অথচ অসুস্থ শরীরটাও তো তাঁর নিজের। তাঁরও ব্যথা আছে, ক্লান্তি আছে, বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। তাঁরও ইচ্ছা হতে পারে, একদিন কাজের চাপ থেকে মুক্ত হয়ে সন্তানের পাশে শুয়ে থাকবেন। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ব্যক্তিগত ইচ্ছার চেয়ে অনেক সময় বড় হয়ে দাঁড়ায় বেঁচে থাকার বাধ্যবাধকতা।
সুমি কি স্বেচ্ছায় অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজে গিয়েছিলেন, নাকি জীবিকার তাগিদ তাঁকে বাধ্য করেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বুঝতে হবে। যে মানুষটি দিনের কাজের মজুরি, চাকরি হারানোর ভয় কিংবা পরিবারের নিত্যদিনের খরচের হিসাব নিয়ে বেঁচে থাকেন, তাঁর কাছে অসুস্থতা সব সময় বিশ্রাম নেওয়ার যথেষ্ট কারণ হয়ে ওঠে না। কারণ অসুস্থ শরীর নিয়ে বাড়িতে থাকলেও সংসারের খরচ থেমে থাকে না।
এখানেই একজন শ্রমিকের অসুস্থতা আর একজন সচ্ছল মানুষের অসুস্থতার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। একজন অসুস্থ হলে চিকিৎসক দেখিয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন। অন্যজনকে হয়তো অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজে হাজির হতে হয়। দুজনের শরীর একই রকম, ব্যথার অনুভূতিও একই রকম; কিন্তু সেই ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার সামর্থ্য সমান নয়।
একটি সমাজের নিষ্ঠুরতা বোঝার জন্য সব সময় কাউকে হত্যা করতে হয় না; কখনো কখনো একজন অসুস্থ মানুষকে বিশ্রামের অধিকারটুকু না দেওয়াই যথেষ্ট।
ভিডিওর যে অংশটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে, সেটি আরও অস্বস্তিকর। প্রকাশিত বর্ণনা অনুযায়ী, বিকেল পাঁচটা এক মিনিটে একজন কর্মকর্তা সুমির কাছে যান। ভিডিওতে তাঁকে সেলাই মেশিনে আঘাত করতে এবং সুমির হাতের কাপড় সরিয়ে দিতে দেখা যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর কয়েক সেকেন্ড পর সুমি মেঝেতে পড়ে যান।
ভিডিওর দৃশ্যগুলো যদি প্রকাশিত বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে এখানে শুধু একজন শ্রমিকের অসুস্থ হয়ে পড়ে যাওয়ার ঘটনা নেই। আছে কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার ব্যবহার, আচরণের প্রশ্ন এবং একজন মানুষের বিপন্ন অবস্থার প্রতি সহমর্মিতার প্রশ্নও।
তবে ভিডিওর দৃশ্য দেখে কারও চিকিৎসাগত অবস্থা, মৃত্যুর কারণ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। এসব নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য। কিন্তু এই সতর্কতা আমাদের মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না: একজন অসুস্থ শ্রমিককে কেন কাজে থাকতে হলো, এবং তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল?
ধরা যাক, সুমির নির্ধারিত কর্মসময় ছিল বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। তাহলে পাঁচটা এক মিনিটে তিনি কাজ করছিলেন কেন? এক মিনিটের ব্যবধান হয়তো কারখানার হিসাবের খাতায় তেমন কিছু নয়। কিন্তু সুমির মতো একজন অসুস্থ শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাজ কি তখনো শেষ হয়নি? তাঁকে কি অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বলা হয়েছিল? নাকি অন্য কোনো পরিস্থিতিতে তিনি মেশিনে কাজ করছিলেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই আসা উচিত। দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাজ শুধু উৎপাদনের হিসাব দেওয়া নয়; কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব।
কিন্তু আমাদের সমাজে উৎপাদনের হিসাব যতটা গুরুত্ব পায়, উৎপাদনকারী মানুষের শরীর ও মনের হিসাব ততটা গুরুত্ব পায় কি?
একটি পোশাক কারখানার প্রতিটি পোশাকের পেছনে থাকে অসংখ্য শ্রমঘণ্টা। কাপড় কাটা থেকে সেলাই, আয়রন থেকে প্যাকিং—প্রতিটি ধাপে মানুষের শ্রম জড়িয়ে থাকে। সেই শ্রমের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান পণ্য তৈরি করে, ব্যবসা পরিচালনা করে, বাজারে প্রতিযোগিতা করে, মুনাফা অর্জন করে। অথচ উৎপাদনের এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকা মানুষটিই যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন তাঁর জন্য কতটুকু জায়গা থাকে ব্যবস্থাপনার বিবেচনায়?
আমরা পোশাকশিল্পের সাফল্য নিয়ে গর্ব করি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান—সবই গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু সেই অর্জনের পেছনে যাঁদের শ্রম রয়েছে, তাঁদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা না গেলে সাফল্যের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কারখানার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থাকতে পারে, ক্রেতার নির্ধারিত সময়সীমা থাকতে পারে, শিপমেন্টের চাপ থাকতে পারে। কিন্তু কোনো লক্ষ্যমাত্রাই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। কোনো ক্রেতার সময়সীমা একজন শ্রমিকের অসুস্থতাকে অস্বীকার করার বৈধতা দেয় না। আর কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা একজন কর্মকর্তাকে সহকর্মী বা অধস্তন শ্রমিকের সঙ্গে অমানবিক আচরণের অধিকার দেয় না।
সমস্যাটা কেবল মালিক আর শ্রমিকের মধ্যকার দূরত্বে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় এই দূরত্ব আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে মাঝের ব্যবস্থাপনার স্তরে—যেখানে কিছু মানুষ সীমিত ক্ষমতা পেয়ে ভুলে যান, ক্ষমতাটি তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি একটি দায়িত্ব।
একজন কর্মকর্তা হয়তো প্রতিষ্ঠানের মালিক নন। কারখানার নীতিনির্ধারকও নন। তাঁর নিজেরও চাকরির চাপ থাকতে পারে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির ভয় থাকতে পারে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। কিন্তু এসব চাপ তাঁকে একজন শ্রমিকের প্রতি অসম্মানজনক আচরণের দায় থেকে মুক্ত করে না।
বরং যাঁরা সরাসরি শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করেন, তাঁদের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি মানবিকতা প্রত্যাশিত। কারণ একজন শ্রমিকের অসুস্থতা, ক্লান্তি কিংবা পারিবারিক সংকটের প্রথম খবরটি অনেক সময় তাঁদের কাছেই পৌঁছায়। তাঁরাই চাইলে সমস্যাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন, প্রয়োজন হলে কাজ বন্ধ করে তাঁকে বিশ্রামের সুযোগ দিতে পারেন।
কিন্তু যখন দায়িত্বের জায়গায় কর্তৃত্ব বড় হয়ে ওঠে, তখন অধস্তন মানুষটি আর মানুষ থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন শুধু একটি উৎপাদন ইউনিট, একটি শ্রমঘণ্টা কিংবা একটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের মাধ্যম।
এটাই ক্ষমতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ। এখানে মানুষ নিজেকে বড় ভাবতে শুরু করেন, কারণ অন্য একজন মানুষ তাঁর নির্দেশ মানতে বাধ্য। তিনি ভুলে যান, যে শ্রমিককে তিনি ধমক দিচ্ছেন, সেই শ্রমিকও তাঁর মতোই ক্ষুধা অনুভব করেন, অসুস্থ হন, পরিবারকে ভালোবাসেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন।
পদমর্যাদা মানুষের দায়িত্ব বাড়ানোর কথা। অথচ কখনো কখনো সেটিই মানুষের ভেতরকার বিনয়টুকু কেড়ে নেয়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক অবস্থান কিংবা পেশাগত সাফল্য—এসবের উদ্দেশ্য কি কেবল নিজেদের অবস্থান উন্নত করা? নাকি এগুলোর সঙ্গে বিবেক, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধেরও সম্পর্ক রয়েছে?
একজন মানুষ অনেক ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন, বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারেন, ভালো বেতন পেতে পারেন। কিন্তু যদি তিনি অন্য একজন মানুষের অসহায়ত্ব বুঝতে না পারেন, তাহলে তাঁর অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ঘাটতি থেকেই যায়। শিক্ষিত হওয়া আর মানবিক হওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমটি অর্জন করা যায় প্রতিষ্ঠানের সনদে, দ্বিতীয়টি প্রতিদিনের আচরণে প্রমাণ করতে হয়।
সুমি আক্তারের ঘটনাটি তাই শুধু একজন কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয় নয়। এটি আমাদের কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। একজন শ্রমিকের অসুস্থতা জানার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়? ছুটির আবেদন কীভাবে বিবেচিত হয়? উৎপাদনের চাপের মধ্যে মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে কি? কোনো কর্মকর্তা সীমা অতিক্রম করলে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয় কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় নির্ধারণের পাশাপাশি আমাদের বুঝতে হবে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ছিল কি না।
সুমি আক্তারের কর্মস্থল হিসেবে আগামী অ্যাপারেলসের নাম সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের কাছে তাই প্রত্যাশা, তারা যেন ঘটনাটি নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেয়, নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করে এবং সংশ্লিষ্ট সব তথ্য প্রকাশ করে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে ছিলেন, সুমির অসুস্থতার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ জানত কি না, তাঁর ছুটির আবেদন কীভাবে বিবেচিত হয়েছিল এবং ঘটনার পরপর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
শুধু একটি বিবৃতি দিয়ে দায় শেষ করা যায় না। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে অসুস্থ শ্রমিকের চিকিৎসা, বিশ্রাম, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে। শ্রমিকের অধিকার কেবল কাগজে লেখা থাকলে হবে না; বাস্তবে সেই অধিকার কার্যকর করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। শ্রম অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শ্রমিকের সঙ্গে অন্যায় হলে তাঁর পরিবারের পক্ষে যেন ন্যায়বিচার চাওয়া অসম্ভব হয়ে না পড়ে, সেই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই তৈরি করতে হবে।
আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায়—সুমি আক্তারের সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে?
একজন শ্রমিকের অসুস্থতা বা কর্মক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা শুধু সেই ব্যক্তির জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অভিঘাত গিয়ে পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। যে সন্তান মায়ের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে, তার জীবনে হঠাৎ তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যায় না। মায়ের চিকিৎসা, সংসারের ব্যয়, পড়াশোনা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা—সবকিছু একসঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ঘটনার প্রকৃতি ও দায় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। তবে সুমির পরিবার যাতে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বিচার পাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় একা পড়ে না যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া উচিত। সুমির সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাময়িক আবেগের সঙ্গে হারিয়ে না যায়।
কারণ আমাদের সমাজে একটি দুঃখজনক প্রবণতা আছে। কোনো ঘটনা ঘটলে কয়েক দিন আলোচনা হয়, প্রতিবাদের ভাষা তৈরি হয়, ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তারপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ঘটনাটিকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু যাঁর জীবনে ঘটনাটি ঘটে, তাঁর জন্য সেটি কয়েক দিনের বিষয় নয়। তাঁর জীবন, সংসার, ভবিষ্যৎ—সবকিছুতেই তার দীর্ঘ ছায়া থেকে যায়।
সুমি আক্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করা সহজ। কঠিন হলো সেই ক্ষোভকে জবাবদিহি, শ্রমিকের অধিকার এবং কর্মক্ষেত্রের সংস্কার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রূপান্তর করা।
আমি এই ঘটনার মাধ্যমে কাউকে আগেভাগেই অপরাধী ঘোষণা করতে চাই না। কোনো প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা কিংবা সব মালিককে এক কাতারে দাঁড় করানোও ন্যায়সংগত নয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার—কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য তার শ্রমিকদের প্রতি দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না। আর পদমর্যাদা কখনোই কাউকে অন্য মানুষের মর্যাদা হরণ করার অধিকার দেয় না।
আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে, অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পথে একজন অসুস্থ শ্রমিকের জন্য বিশ্রামের অধিকারটুকু নিশ্চিত করা না গেলে, সেই অগ্রগতির মানবিক মূল্য কোথায়?
যে দেশে একজন মানুষ নিজের শরীরের অসুস্থতার চেয়েও চাকরি হারানোর ভয়কে বড় করে দেখতে বাধ্য হন, সেখানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ ছবি আঁকা যায় না।
যে কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের অসুস্থতা উৎপাদনের গতিকে থামিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে, অথচ তাঁর শরীর ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ব্যবস্থাপনাকে বিচলিত করে না, সেখানে সমস্যা শুধু একজন ব্যক্তির নয়; সমস্যা সেই মানসিকতার, যেখানে মানুষকে তার শ্রমের মূল্য দিয়ে বিচার করা হয়, মানুষ হিসেবে তার মূল্য দিয়ে নয়।
সুমি আক্তারের ভিডিওটি দেখার পর আমার মনে যে প্রশ্নটি জেগেছে, সেটি খুব সাধারণ, অথচ খুব জরুরি—এই দেশ কি শুধু ক্ষমতাবানদের জন্য?
না, এই দেশ শুধু মালিকের নয়, কর্মকর্তার নয়, বড় পদে থাকা মানুষের নয়। এই দেশ সেই শ্রমিকেরও, যিনি দিনের পর দিন সেলাই মেশিনে বসে অন্যের ব্যবসার জন্য পোশাক তৈরি করেন। এই দেশ সেই মায়েরও, যিনি নিজের অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে কাজে যান। এই দেশ সেই সন্তানেরও, যে মায়ের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে।
সুমি আক্তারের প্রতি ন্যায়বিচার মানে শুধু একটি ঘটনার তদন্ত নয়। এর অর্থ এমন একটি কর্মপরিবেশের দাবি তোলা, যেখানে কোনো শ্রমিককে অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হওয়ার ভয় বহন করতে হবে না; যেখানে ছুটি চাওয়া অপরাধ নয়; যেখানে কর্মকর্তা হওয়া মানে মানুষকে ভয় দেখানোর ক্ষমতা নয়, বরং দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা।
আমরা যদি সত্যিই সভ্য হতে চাই, তাহলে আমাদের কারখানার দেয়ালে শুধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা, দক্ষতার চার্ট আর মান নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা টাঙালে চলবে না। সেখানে মানুষের মর্যাদাকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি কারখানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তার যন্ত্রপাতি নয়, তার ভবন নয়, এমনকি তার উৎপাদনক্ষমতাও নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো সেই মানুষগুলো, যাঁদের শ্রমে প্রতিষ্ঠানটি দাঁড়িয়ে থাকে।
সুমি আক্তারের ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছে। সেই আয়নায় আমরা শুধু একজন অসুস্থ শ্রমিককে দেখি না; দেখি আমাদের কর্মসংস্কৃতি, আমাদের ক্ষমতার ব্যবহার, আমাদের সামাজিক বৈষম্য এবং আমাদের বিবেকের অবস্থান।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু সেই আয়নায় নিজের সমাজের নিষ্ঠুর মুখটি দেখে চোখ ফিরিয়ে নেব? নাকি এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার দাবি জানাব, যেখানে একজন শ্রমিকের জীবন, অসুস্থতা, সম্মান এবং অধিকার—সবকিছুরই মূল্য আছে?
সুমি আক্তারের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। সত্য প্রকাশিত হোক। দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। তাঁর পরিবার ন্যায়বিচার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাক।
আর আমাদের মনে থাকুক একটি কথা—শ্রমিক কোনো যন্ত্র নয়। তাঁর শরীরেরও সীমা আছে, তাঁরও মর্যাদা আছে, তাঁরও একটি জীবন আছে। উৎপাদনের হিসাবের বাইরে সেই জীবনটুকুকে দেখতে শেখাই একটি সভ্য সমাজের প্রথম শর্ত।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





