বর্তমান যুগে আমার মতো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের দাড়ি রাখা মনে হয় অপরাধ। আপনি বলতে পারেন, এটা তো ধর্মের কাজ, এটা অপরাধ হতে যাবে কেন?? কেন এটা অপরাধ??
মুখে দাঁড়ি হলেই আমাদের ভাবনারা একটা গতি পেয়ে যায়, এ হলো "হুজুর"।
হুজুর" ই একমাত্র এমন একটা শব্দ যেটা দ্বারা একজন মানুষকে সম্মান করা যায় অপরদিকে তাকে অপমান, অপদস্থ ও ছোটও করা যায় । যে এ নাম ধরে ডাকে এবং যাকে ডাকা হয় একমাত্র তারাই বুঝে কি উদ্দেশ্য ছিলো ঐ সম্বোধনের পিছনে!!
একটা ছেলের দাড়ি রাখা শুরু হয় পরিবারের অমতে। তাদের ভয়ের কারণ একটাই। দাড়ি রাখলে পুলিশে ধরে নিয়ে যায়, এই সেই।উনাদের আর কি দোষ বলুন!! পরিবারের কেউ বিপদে পড়ুক, সেটা কে চায় বলুন?
তারপর আসি আত্মীয়দের কথায়। দাড়ি রাখার পরে হঠাৎ একদিন কোন আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার পর আপনি কেমন আছেন জিজ্ঞেস না করেই বলে উঠে "ওমা! দাড়ি রাখছো কেন? তুমিতো এখনও ছোট। দাড়ি রাখলে তো বিয়ের সময় মেয়ে পাবেনা, এই সেই! "
দাড়িওয়ালা রা বন্ধু-বান্ধব, ক্লাসমেট, বড় ভাইদের দ্বারা প্রায়ই humiliate হওয়া লাগে। আড্ডাতে যখন ওদের এন্ট্রি হয়, তখনই সবাই বলা শুরু করে, " এই দেখ জঙ্গি আসছে, তালেবান আসছে।" তারপর তার কোন বন্ধু, তাকে অন্যদের সাথে পরিচয় দেয়ার শুরুতেই বলবে, " এ হচ্ছে জঙ্গি, মিঃ বাংলাভাই। আবার অনেক সময় তো লাদেন বলেও পরিচয় দেয়! "
তারপর নতুন করে কেউ দাড়ি রাখলে বলে, কিরে তোর তো ছাগইল্যা(!!) দাড়ি উঠছে। নাউজুবিল্লাহ!! দাড়ি, মহানবী (স) এর আদর্শ। দাড়ি নিয়ে মজা করা মানে উনাকে অপমান করা। বুঝলাম আপনি নেহাৎ মজা করেই এসব বলেন, কিন্তু মজা করার আর কি অন্য কিছু নাই?
বাস্তব কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলি। একবার লোকাল বাসে করে যাতায়াতের সময় বাসের হেল্পার বলে , “এই হুজুর, ভাড়াটা দেন”। হাফ ভাড়া দিয়ে "স্টুডেন্ট" বলতে চাইলে বলে উঠল , “হুজুর, আবার কীয়ের ইশটুডেন্ট”। তারপর আমার আইডি কার্ড চাইলো। আমি দেখাতে নারাজ ছিলাম কারণ আমার কয়েক সীট সামনে আরেকজন দাড়ি ছাড়া সে ও হাফ ভাড়া দিয়েছে, কিন্তু তখন তার কাছ থেকে আইডি কার্ড চায়নি!
সেদিন ক্লাসে এক প্রফেসর স্যার ক্লাস নেয়ার মাঝখানে গুটিকয়েক দাড়িওয়ালা ছাত্রদের বলল, " তোমরা এই অল্প বয়সে দাড়ি রাখছো কেন? দাড়ি রাখলে যে স্মার্ট দেখা যায় না তোমাদের! বরং বুড়া বুড়া লাগে। এখন লাইফকে ইনজয় করার সময়, সো স্মার্ট হও আর ইনজয় কর। "
আমি সব সময় ঐ ভাবে পাঞ্জাবি টুপি পরিনা কিন্তু আমার ক্লাসে কিছু বন্ধু আছে যারা টুপি পান্জাবী পড়ে সাথেও দাড়ি ও আছে। প্রায় সবাই ওদের ' হুজুর ' নামে ডাকে। তাদের যে একটা নিজস্ব নাম আছে, এটা যেন ওরা ভুলেই গেছে।
তারপর সামান্য কিছুতেই বলে উঠে, " ঐ তুইনা হুজুর ,ছি!ছি! তুই হুজুর হয়ে এই কাজ করতে পারলি!! ইত্যাদি। সব চেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে যখন একজন হুজুর বা হুজুররুপী কোন মানুষ একটা ভুল করে ,তখন সাধারণেরা সম্পন্ন হুজুর জাতীটাকে দোষারূপ করে।(হুজুর ও তো একজন মানুষ। তার ভুল কি হতে পারেনা??)
আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দাড়িওয়ালাদের দেখলেই , তাদের যোগ্যতা বিচারের আগেই " হুজুর" উপাধি দিতে দেরি হয় না।আপনার তো কোন অধিকার নেই কাউকে মাপার আগেই বিচার করা লোকটি কেমন।
তারপর এক বন্ধুর কথা বলি। ভার্সিটিতে ১ম দিন ডিপার্টমেন্ট হেডের সাথে দেখা করতে গেল। বেচারা রুমে ঢুকতেই ম্যাডাম বলল, " এই ছেলে তুমি আবার বোমা-টোমা আনছো নাকি সাথে?" বলেই মুচকি হাসা করলো!
একটু ভেবে দেখুন, দাড়ি রাখা নিয়ে পারিবারিক চাপ, বন্ধুদের নিরুৎসাহিতা, সমাজের বিরুপ আচরণের ফলে দিনশেষে তাদের কি অবস্থা হয়???
আচ্ছা কোন দিন কোন নেশাকারী বা মাদকসেবী কে বলেছেন, সে গাঁজাখোর, মদখোর, সিগারেট খোর?
বলেন না! কেন বলেন না জানেন? কারণ এটা ওই ব্যক্তির আত্মসম্মানে লাগবে। আর আপনার সময় ভালো হলে কয়েক ঘা খেয়েও ফেলতে পারেন।
আর একটা ছেলে যখন দাড়ি রাখছে, তখন কেন আপনাদের চুলকানি শুরু হয় দাড়ি নিয়ে? ভালো জিনিসের এপ্রিশিয়েশন করতে শিখুন।।
যে খারাপ কাজ( যদিও এটার তার ব্যক্তিগত ব্যাপার) করছে তাকে কিছু বলছেন না। আর যে ভালো কাজ করছে তাকে অপদস্থ করছেন!
এটা কেমন বিবেক আপনার?
অনেক অনেক সামাজিক ব্যাধির মধ্যো এটাও একটা উল্লেখযোগ্য সামাজিক ব্যাধি, যে একজন পুরুষ দাড়ি রাখলে মানুষ তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অার যারা খুনী, ধর্ষক, ও জুলুমকারী তাদেরকে সবাই পেছনে গালাগালি করলেও সামনাসামনি ঠিকই বাপ বা গুরু ডাকে । কারন ওদের বাপেরা ওদেরকে ঠিক মতো **** দিতে পারে । অার দাড়িওয়ালারা নীতিনৈতিকতা, ধর্মজ্ঞান, নম্র ও বিবেকসম্পন্ন হওয়ার কারনে সমাজের নোংরা শ্রেণীর ওই মানুষগুলো তাদের উপর চেপে বসে ।
অার অাজ সমাজ ভালো মানুষকে মূল্যায়ন করতে পারেনা বলেই মানুষ ভালো হওয়ার অাশা ছেড়ে দিয়ে খারাপ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামতেছে,, যার ভবিষ্যৎ পরিনাম খুবই ভয়াবাহ । কারন একটা সময় যখন সমাজ থেকে ভাল মানুষ শেষ হয়ে যাবে তখন মানুষরুপি ওই ভেড়ার দলগুলো বুঝবে ভালো অার মন্দের তফাত কি!!
হ্যা, একটা বিষয় আমি, আমরা সকলেই মিডিয়া থেকে জানছি যে জঙ্গি গোষ্ঠীর অধিকাংশই দাড়িওয়ালা। কিন্তু হলি আর্টিজানের ঘটনার কথা কি বলবেন?
ওখানের অপরাধীদের মধ্যে কয়জনের দাড়ি ছিল?
আশার কথা হলো দাড়ি রেখে যে শুধু হেয়ই হয়েছি তা নয়!অনেক জায়গায় এমন সম্মান পেয়েছি,যার যোগ্য আমি ছিলাম না। তাই দিনশেষে ওই ভালো অনুভূতিগুলোর কথা চিন্তা করেই, দাড়ি রাখা নিয়ে কতিপয় মানুষের বুলি শুনে আর কষ্ট হয় না।
সবশেষে বলতে চাই দাড়ি, পোশাক এগুলো সবার ব্যক্তিগত বিষয়।এগুলো নিয়ে সমালোচনা না করাই উচিত।
" দাড়িওয়ালা মানুষরা খারাপ হয়না,
খারাপ হয় খারাপ মানুষেরা "
বিঃ দ্রঃ আমার এই পোস্টের উদ্দেশ্য কিন্তু কোন দাড়ি না রাখা ব্যক্তিকে হেয় করানো নয়! নিজের অনুভুতি গুলোকে প্রকাশ করছি যাতে
কতিপয় ব্যক্তিদের বিবেক জাগ্রত হয়।



অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

