ছোটবেলায় সিনেমা হলে শো শুরু হওয়ার আগে একটা বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ত--"মদ্যপান সংসারে অশান্তি ডেকে আনে"। সঙ্গে নির্বাক ছবিটা থাকত এইরকম---একজন পুরুষ মানুষএর পর্দা জোড়া একটা হাফ ছবি---তার গা'য়ের রং নীল, এবং চোখদুটো টকটকে লাল। আর তার বুকের কাছে একটি ঘোমটা দেয়া ত্রস্ত মহিলার ছবি যার দুহাতে দুদিক থেকে দুটো ভয়ার্ত বাচ্চা। সিনেমার সবাক যুগে এমন একটি নির্বাক ছবির বিজ্ঞাপন সরকার কর্তৃক প্রচারিত।
বিজ্ঞাপনটা কতদূর দৃষ্টিআকর্ষণ করত দর্শকের জানিনা--তবে আমি বিলক্ষণ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। কারণ ততদিনে আমার ধারণা হয়ে গিয়েছিলো জিনিষটা মিষ্টি জাতীয় সরবৎএর কাছাকছি। কিন্তু ক্রমে জেনে গেছি এটা টক মিষ্টির ব্যাপার নয়---এটা নেশা। যা মানুষকে অন্যরকম করে তুলে। পাড়ার এক মদ্যরসিকের রাত বিরেতে নানা পারফর্মেনসের কল্যানে আমরা উঠতি অনেকেই জেনে গেছি নেশা এক বিষম বস্তু। মজার বস্তুও বটে।
মদ' বাঙালি জীবনে ইলিশের মত আবহমানের কিছু নয়। তবু তথাকথিত বাঙালি আধুনিকতার এক মোক্ষম উপাচার বিশেষ। সেই ইয়ংবেঙ্গল ডিরোজিওর হাত ধরে এই উত্তেজক পানীয়টি বাঙালি জীবনে জাঁকিয়ে বসেছে। এটাকে অন্য অর্থে কলোনীয়াল ঘুষও বলা যেতে পারে । আর এই ঘুষ ক্রমে কীভাবে একাট আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠে তা অবশ্য অন্য কথা ।
বলা হয় হিন্দু ধর্মের যাগযজ্ঞে সোমরস নামক সুরা বা মদের প্রচলন ছিলো। এখনও মা কালীর পুজোয় কারণবারি অর্থাৎ মদ অপরিহার্য। শিবঠাকুরের আরাধনায় গাঁজার প্রচলন রয়েছে। এসব থাকলেও গড়পরতা বাঙালিজীবনে অন্তত প্রাকবৃটিশ যুগে এই সব নেশার সাধারণ প্রচলন ছিল বলে শোনা যায়না। তবে যা ছিলো তা সবই প্রায় নেশার দেশজ সংস্করণ মাত্র । সেগুলোর ভোক্তাও ছিলো সমাজের নিম্নকোটির মানুষ। বিশেষত পেশাগতভাবে যারা মেথর ডোম চন্ডাল। অর্থাৎ তাদের কাজের প্রকৃতিই তাদের নেশা করাতে বাধ্য করতো । সাধারন বাঙালির নার্ভে ঐ সব জীবিকা কখনই খাপ খায়নি। ফলে আফিং গাঁজা সিদ্দি কিছুটা ভদ্রস্থ হলেও তরলগুলো নেহাৎই ছিলো পতিত জনের মধ্যে।
ইসলামে মদ নিষিদ্ধ। ফলে অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হওয়ার কারণে কিনা জানিনা বাংলাদেশে মদ নিষিদ্ধ। আমার বার দুয়েকের সে দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি । শুনেছি সেখানে নেশা বস্তুর বিকল্প হিসেবে কাশির সিরাপ বা হোমিওপ্যাথি ওষুদের জন্য ব্যবহৃত অ্যালকোহল খাওয়া হয়ে থাকে । তবে এই বঙ্গে মদের একটা ব্যাপক প্রচলন আছে । গভর্নমেন্ট প্রচুর এর থেকে আবগারি শুল্ক আয় করেন। শোনা যায় ভারতের মধ্যে নাকি বাঙালিরা তুলনামূলক অনেকবেশী মদ নির্ভর। অবশ্য কথাটায় আমার খুব একটা বিশ্বাস নেই। কারণ দক্ষিণভারত থাকতে আর কারও পক্ষে এই কৃতিত্ব নিয়ে নেয়া সম্ভব নয় ।
অন্তত এই বঙ্গের শিল্প সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত বাঙালিরা মদ্যপানটাকে অনেকটা রিচ্যুয়াল হিসেবেই নিয়ে নিয়েছেন। ৫০/৬০/৭০ এর দশকে কলকাতা শহরের বিখ্যাত অন্যতম দেশিমদের দোকান "খালাসিটোলা"অনেকটা তীর্থের মর্যাদা পেয়েছিলো। বিশেষত শনিবারের সন্ধ্যায় সেখানে কাকে না পাওয়া যেত। ৫০/৬০ এর বিখ্যাত কবি লেখকদের সেখানে যেমন পাওয়া যেত তেমনি পাওয়া যেত হাংরি লেখকদেরও। আসলে পূর্বসুরি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋত্বিক ঘটক এই দুই সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনে মদ একটা বিষয় হয়ে যায়। যার প্রভাব থেকে পরবর্তী প্রজন্ম নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেনি । তবে ইদানিং এইসব দেশীমদের ঠেকে তেমন হয়তো দেখা যাবেনা । কারণ গ্লোবালাইজেশনের জোরে কবি লেখকরাও বিলিতি মদের বার গুলোতে দুদন্ড বসে কিছু সৃষ্টিশীল চিন্তা ভাবনা করতে পারছেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০১০ রাত ৮:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


