মহান আল্লাহ্ বলেন-
“এদের কি এমন কোন শরীক রয়েছে, যারা তাদের জন্য এমন কোন বিধান রচনা করে নিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি।” -সূরা শুরা, আয়াত ঃ ২১
এই আয়াতানুযায়ী যে কেউ বিধান দিবে সে মহাপাপ শিরকে লিপ্ত হবে। আর বিদ’আহ্ যেহেতু একটি বিধান তাই বিদ’আতও একটি শিরক্। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ বলেন,
“নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা কখনো (সে গুনাহ) মাফ করবেন না (যেখানে) তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা হয়, এ ছাড়া অন্য সব গুনাহ (যা বড় কুফরীর নিু পর্যায়) তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার বানালো সে সত্যিই (আল্লাহর ওপর) মিথ্যা আরোপ করলো এবং একটা মহাপাপে (নিজেকে) জড়ালো।” (সূরা নিসা ৪ ঃ ৪৮)এখানে আয়াতটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে যে, শিরকের গুনাহ্ আল্লাহ্ কখনো ক্ষমা করবেন না। তাহলে এখন আমাদের জানা দরকার, এই ভয়ানক ও গুরুতর পাপটির কি ধরণের শাস্তি হবে।
মহান আল্লাহ্ বলেন-
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে তার উপর আল্লাহ্ জান্নাত হারাম করেছেন। তার বাসস্থান জাহান্নাম আর এরূপ যালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” -সূরা মায়েদাহ্, আয়াত ঃ ৭২অতএব, আয়াতটি শিরককারীদের জন্য জান্নাত হারাম ঘোষণার মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছে, শিরকে লিপ্ত ব্যক্তিরা মুসলিম নয় কাফির। কারণ, মুসলিমের জন্য জান্নাত হারাম হয় না। অর্থাৎ বিদ’আতীরা মুসলিম নয়। বরং তারা কাফির। যেহেতু প্রত্যেকটি বিদ’আতই শিরক।মহান আল্লাহ্ বলেন,
আজ আমি দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছি। (সূরা মায়েদাহ্-৫ ঃ ৩)
এই আয়াতটি বিদ’আতীরা বিশ্বাস করেনা। কারণ, তারা যদি আয়াতটি বিশ্বাসই করত যে, আল্লাহ্ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন তাহলে তারা বিদ’আহ্ করতো না। যারা আল্লাহর আয়াতকে বিশ্বাস করেনা তারা অবশ্যই কাফির।
হাদিস থেকে প্রমাণ
রসূলুল্লাহ্ (দ.) বলেছেন,
আমার উম্মাহ্ হতে একদল লোক ক্বিয়ামাতের দিন আমার সামনে (হাউজে কাউসারে) উপস্থিত হবে। এরপর তাদেরকে হাউজ থেকে আল্লাদ করে দেয়া হবে। তখন আমি বলব, হে রব ! এরা আমার উম্মাত তখন আল্লাহ্ বলবেন তোমার পরে এরা দ্বীনের মধ্যে কী সব নতুন বিষয় সৃষ্টি করেছে এ ব্যপারে নিশ্চয়ই তোমার জানা নেই। নিশ্চয়ই এরা দ্বীন থেকে পিছনের দিকে ফিরে গিয়েছিল।” -সহীহ্ বুখারী, তা.পা. হা. ৬৫৮৫, ৬৫৮৬, আ.প্র. হা. ৬১২৭, ৬৫৮৬, ই.ফা.বা. হা. ৬১৩৫
লক্ষ্য করুণ দ্বীন থেকে যারা পিছনে ফিরে যায় শারীয়াহ্’র পরিভাষায় তাদের মুরতাদ বলা হয়। হাদিসে “ইরতাদ্দু” শব্দ ব্যবহার হয়েছে। আর শব্দটি হচ্ছে বহুবচন একবচন হল “ইরতাদ্দা”। মুরতাদ শব্দটি “ইরতাদ্দা” শব্দ থেকে এসেছে। যার আভিধানিক অর্থ হল- ফিরে যাওয়া, মুরতাদ (স্বধর্ম ত্যাগী) হওয়া (আল-মু’জামুল ওয়াফী, পৃঃ ৫৩)। আর “মুরতাদ” তাকেই বলা হয় যে ইসলাম গ্রহন করার পর কাফির হয়ে যায়। তাই এই হাদিস অনুযায়ী বিদ’আতীরা কাফির।আর যারা বিদ’আতীদের বানানো আ’মালের উপর আ’মাল করে তারা কি তাদের রবের আসনে বসায়নি ? অবশ্যই বসিয়েছে।
রসূল (দ.) আদী বিন হাতীম (রা.) খ্রিষ্টান থাকা অবস্থায় যখন তাঁর গলায় ক্রুশ দেখলেন তখন কুরআনের আয়াত পড়লেন-
“তারা তাদের আলিম ও দরবেশদের রব বানিয়ে নিয়েছে।” (সূরা তওবা, ৯ ঃ ৩১) তখন আদী বিন হাতীম (রা.) বললেন-
“আমরা আমাদের আলিমদের রব বানাইনি।” রসূল (দ.) বললেন, “তোমাদের আলিমরা হারামকে হালাল বললে মানতে না আর হালালকে হারাম বললে মানতে না? ” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, মানতাম।” রসূল (দ.) বললেন “ঐভাবেই তোমরা তাদের রব বানিয়েছ।” (-হাসান, মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযি, হা. ৩০৯৫)
এই হাদিস অনুযায়ী যারা বিদ’আহ্ করেছে তৈরী করেছে তারা হারামকে হালাল করে অবশ্যই নিজেদেরকে রবের আসনে বসিয়েছে। এবং যারা তাদের ফাতওয়া মেনেছে তারাও তাদেরকে রব মেনেছে। তাহলে, সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, যারা বিদ’আতী আ’মালকে হালাল ফাতওয়া দিয়েছে তারা নিজেদেরকে রবের আসনে বসিয়ে কাফির হয়েছে এবং যারা তাদের ফাতওয়া মেনেছে তারাও তাদের রব মেনে কাফির হয়েছে।
হুযাইফা ইবনু ইয়ামান (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা রসূলুল্লাহ্ (দ.)-কে কল্যাণের বিষয়াবলী জিজ্ঞেস করত। কিন্তু আমি তাঁকে অকল্যানের বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম এ ভয়ে যে, অকল্যাণ আমাকে পেয়ে না বসে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্’র রসূল (দ.) আমরা তো জাহিলিয়্যাত ও অকল্যাণের মাঝে ছিলাম। এরপর আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে এ কল্যাণের মধ্যে নিয়ে আসলেন। এ কল্যানের পর আবারও কি অকল্যাণ আসবে ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তবে এর মধ্যে কিছুটা ধুম্রজাল থাকবে। আমি প্রশ্ন করলাম, এর ধুম্রজাল কিরূপ ? তিনি বললেন, এক জামা’আত আমার তরীকা ছেড়ে অন্য পথ ধরবে। তাদের থেকে ভাল কাজও দেখবে এবং মন্দ কাজও দেখবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সে কল্যাণের পর কি আবার অকল্যাণ আসবে ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। জাহান্নামের দিকে আহ্বানকারী এক স¤প্র্রদায় হবে। যে ব্যক্তি তাদের আহ্বানের সাড়া দেবে, তাকে তারা জাহান্নামে নিক্ষেপ করে ছাড়বে। আমি বললাম, হে আল্লাহ্’র রসূল ! তাদের কিছু স্বভাবের কথা আমাদের বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, তারা আমাদেরই লোক (অর্থাৎ তারা মুসলিম দাবীদার হবে) এবং আমাদের ভাষায়ই কথা বলবে (অর্থাৎ তারা কুরআন এবং হাদিস দিয়ে কথা বলবে)। আমি বললাম, যদি এমন অবস্থা আমাকে পেয়ে বসে, তাহলে কী করতে হুকুম দেন ? তিনি বললেন, মুসলিমদের জামা’আত ও ইমামকে আঁকড়ে থাকবে। আমি বললাম, (এই সকল দল ছাড়া) যদি তখন মুসলিমদের কোন জামা’আত ও ইমাম না থাকে ? তিনি বললেন, তখন সকল দল ত্যাগ করো সম্ভব হলে কোন গাছের শিকড় কামড়িয়ে পড়ে থাকবে, যতক্ষণ না সে অবস্থায় তোমার মৃত্যু উপস্থিত হয়। (সহীহ্ বুখারী, কিতাবুল ফিতনাহ্, তা.পা. ৭০৮৪, ই.ফা.বা. ৬৬০৫, আ.প্র. ৬৫৯১)এই হাদিসটির প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করুন। রসূলুল্লাহ্ (দ.) কে যখন হুযাইফা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন যে, আরো অকল্যাণ কি আসবে ? তখন রসূলুল্লাহ্ (দ.) বললেন, হ্যাঁ আসবে। সেই অকল্যাণকারীরা জাহান্নামের দিকে আহবান করবে। তাদের পরিচয়ে রসূলুল্লাহ্ (দ.) বলেছেন, তারা আমাদেরই মতো মুসলিম দাবীদার হবে এবং কুরআন হাদিস দিয়ে কথা বলবে। তাহলে একটি বিষয় বুঝা দরকার, কুরআন হাদিস দিয়ে কথা বললে সেইসব কথা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করা হয় কিভাবে! মূলত, এই দলটি কুরআন এবং হাদিস উদ্ধৃতি দিবে ঠিকই কিন্তু তার অপব্যাখ্যা করবে। আর যারা কুরআন এবং হাদিসের অপব্যাখ্যা করে তারাই মূলত বিদ’আতী। যেহেতু রসূলুল্লাহ্ (দ.) এবং তাঁর সাহাবীগণ যেভাবে কুরআন-হাদিস বুঝেছেন সেইভাবে তারা ব্যাখ্যা দেয় না বরং তারা কুরআন এবং হাদিসের ব্যাখ্যা নিজস্ব মনগড়া অনুযায়ী দেয়। আর এই সকল বিদ’আতীদের সম্পর্কে যখন হুযাইফা (রা.) রসূলুল্লাহ্ (দ.) কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন রসূলুল্লাহ্ (দ.) বললেন, তাদেরকে বাদ দিয়ে মুসলিম জামা’আত এবং তাদের ইমামকে আঁকড়ে ধরার জন্য। “এই সকল বিদ’আতীদেরকে বাদ দিয়ে মুসলিম জামা’আত এবং তাঁদের ইমামকে” আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দ্বারা বুঝা যায়, বিদ’আতীরা মুসলিম নয়। কারণ, যদি বিদ’আতীরা মুসলিম হতো তাহলো রসূলুল্লাহ্ (দ.) বলতেন বিদ’আতীদের তুলনায় ভালো মুসলিমদের আঁকড়ে ধরতে। কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (দ.) বিদ’আতীদের এবং মুসলিমদেরকে আলাদা ভাগ করেছেন, অর্থাৎ রসূলুল্লাহ্ (দ.) বিদ’আতীদের বাদ দিয়ে মুসলিমদের আঁকড়ে ধরার কথা দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, বিদ’আতীরা মুসলিম নয়।
শিক্ষা ঃ
১। বিদ’আহ্ মহাপাপ শিরক হওয়ায় মৃত্যুর পূর্বে তাওবাহ্ না করে গেলে আল্লাহ্ এই অপরাধ ক্ষমা করবেন না।
২। বিদ’আতী কাফির-মুশরিকদের জন্য জান্নাত হারাম
৩। বিদ’আতীদের হাদিসে কুদসিতে “মুরতাদ” ঘোষনা করা হয়েছে। আর “মুরতাদ” তাকেই বলা হয় যে কি’না একবার ইসলাম গ্রহণের পর আবার কাফির হয়ে যায়।
৪। যে বিদ’আহ্ তৈরী সে নিজেকে রবের আসনে বসায়।
৫। যে বিদ’আহ্ করে সে রব মেনেছে যে ঐ বিদ’আহ্কে তৈরী করেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

