somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নির্বাচন, গণভোট ও গণপরিষদ: প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক জট

২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সাম্প্রতিক আলোচনায় যে প্রস্তাবিত প্রক্রিয়াটি সামনে এসেছে, তা প্রথম শুনলে কিছুটা ধোঁয়াটে মনে হলেও ভেতরে ঢুকলে বিষয়টি বেশ স্পষ্ট এবং একই সঙ্গে গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করে। সংক্ষেপে পুরো বিষয়টি ধাপে ধাপে গুছিয়ে দেখা দরকার।

প্রস্তাবিত রূপরেখা কী বলছে

আলোচিত কাঠামো অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি মোটামুটি চারটি ধাপে বিভক্ত:

১. নির্ধারিত তারিখে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

২. নির্বাচনের পর একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ওই গণভোটে যদি সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়, তাহলে নির্বাচিত সংসদ প্রথম ১৮০ দিন সংসদ হিসেবে নয়, বরং গণপরিষদ হিসেবে বসবে।

৩. গণপরিষদের প্রধান দায়িত্ব হবে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা এবং সেই অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা।

৪. সংশোধিত সংবিধানে সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট।

এই জায়গা পর্যন্ত শুনলে বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব বলে মনে হয়। কিন্তু মূল জট তৈরি হয় এখান থেকেই।

সাংবিধানিক সমস্যা কোথায়??

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে যে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন, তাঁরা নির্বাচিত হবেন বর্তমান এককক্ষবিশিষ্ট সংসদের সদস্য হিসেবে। অর্থাৎ, তাঁদের ম্যান্ডেট দেওয়া হবে একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে।

কিন্তু সংশোধিত সংবিধানে যদি সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়ঃ এককক্ষ সংসদের জন্য নির্বাচিত সদস্যরা কীভাবে সংশোধিত সংবিধানের অধীনে নিম্নকক্ষের সদস্য হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণ্য হবেন? ভোটাররা তো তাঁদের দ্বিকক্ষ সংসদের নিম্নকক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে ভোট দেননি।

সংবিধান ও প্রতিনিধিত্বের মৌলিক নীতিমতো, এটি একটি গুরুতর বৈধতার সংকট। প্রতিনিধিদের ক্ষমতা ও অবস্থান নির্ভর করে যে কাঠামোর অধীনে তাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, সেই কাঠামো বদলে গেলে নতুন করে ম্যান্ডেট নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

এই যুক্তি থেকে স্বাভাবিকভাবেই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়ঃ সংশোধিত সংবিধানের অধীনে নতুন সংসদ নির্বাচন ছাড়া বৈধ সংসদ গঠন সম্ভব নয়।

সরকার গঠন নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়টি এখানেই। প্রস্তাবিত প্রক্রিয়া অনুযায়ীঃ নির্বাচনের পর সঙ্গে সঙ্গে সরকার গঠিত হবে না।

গণভোট, গণপরিষদে রূপান্তর, সংবিধান সংশোধন এবং নতুন সাংবিধানিক কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমতা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হবে না।


অর্থাৎ, নির্বাচন হলেও একটি দীর্ঘ সময় ধরে দেশ কার্যত নির্বাচিত সরকারের বাইরে থাকবে। কে বা কোন কাঠামোতে এই সময় রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করবে, সে প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর এখানে অনুপস্থিত।

গণতন্ত্রে নির্বাচন মানেই জনগণের ম্যান্ডেট হস্তান্তর। সেই হস্তান্তর যদি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত থাকে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।


তাহলে ভুল বোঝা হয়েছে কি?

উপরে বর্ণিত কাঠামো যদি সত্যিই এভাবেই প্রস্তাবিত হয়ে থাকে, তাহলে এটি ভুল বোঝাবুঝির ফল নয়। বরং এই প্রক্রিয়ার ভেতরেই গুরুতর সাংবিধানিক অসংগতি ও ক্ষমতার শূন্যতার ঝুঁকি রয়েছে। সংস্কার ও সংবিধান সংশোধন প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই পথ যদি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ম্যান্ডেটকে ঝুলিয়ে রাখে এবং অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত করে, তাহলে সেটি সংস্কারের চেয়ে সংকটই বেশি তৈরি করবে।

সংবিধান পরিবর্তন একটি গভীর রাজনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়া। এর জন্য স্পষ্ট রোডম্যাপ, সময়সীমা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতি সম্মান অপরিহার্য।

নির্বাচন করে সরকার না গঠন করা, আবার সংশোধিত সংবিধানের অধীনে নতুন নির্বাচন ছাড়া সংসদ বৈধ নয়, এই দ্বৈত ফাঁদে পড়লে পুরো প্রক্রিয়াটিই বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

এই বাস্তবতাগুলো উপেক্ষা করে এগোলে প্রশ্নটা আর থাকবে না কে ভুল বুঝেছে; প্রশ্নটা হবে, প্রক্রিয়াটাই কি আদৌ টেকসই?


সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নিষিদ্ধতার ভেতরেও রাজনীতির স্পন্দন।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:১৪



ফের রাজনীতির মঞ্চে ফিরে আসার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। আর বাংলাদেশের রাজনীতি যাদের চেনা, তারা জানেন- এখানে কোনো অধ্যায় সহজে শেষ হয় না। এখানে পতন মানেই প্রস্থান নয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু দ্বিতীয় রিফাইনারি (ERL-2) টা করে দেখান , সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গতকাল নাটকীয়তায় ভরা একটা দিন আমরা পার করলাম । রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন ঝড় বয়ে গেল। পুরো সোশ্যাল মিডিয়া যেন দুই ভাগে ভাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ও আমরা কেনো ক্ষমা চাইবো‼️আমরা’তো বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:১৫



লাল বদরদের আমরা কেন কোনোদিন বিশ্বাস করবো না, পছন্দ করতে পারবো না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রচন্ড ঘৃণা করবো, তার একটা ভালো উদাহরণ এই স্ক্রীনশটটা।

সব মানুষ একই রাজনৈতিক আদর্শে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুরস্ক-কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও কাদের মোল্লাদের প্রেতাত্মার পুনরুত্থান

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৩১


বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, "বাংলাদেশ থেকে জামাতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে কাজ করতে হবে"। "নির্মূল" শব্দটি সম্পূর্ণভাবে দূর করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন, কলেরা বা ম্যালেরিয়া নির্মূল করা, কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিপদ

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


বিপদ নাকি একা আসে না—দলবল নিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। প্রবাদটির বাস্তব এবং কদর্যরূপ যেন এখন মৃণালের জীবনেই ফুটে উঠেছে। মাত্র মাসখানেক আগে বাবাহারা হলো। পিতৃশোক কাটার আগেই আবার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×