somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হামুদুর রহমান কমিশনে ইয়াহিয়া খানের জবানবন্দি

০৯ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৭১ সালের মার্চ ছিল পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় সময়গুলোর একটি। পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান পরবর্তীতে হামুদুর রহমান কমিশনের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে সেই সময়কার রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়ী করার চেষ্টা করেন।

ইয়াহিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দাবি শেখ মুজিব তখন ইতিমধ্যেই “বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা”র সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন এবং পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরে কোনো সমাধান মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।

এই জবানবন্দিতে ইয়াহিয়া নিজেকে একজন “অসহায় কমান্ডার” হিসেবে তুলে ধরেন এবং শেখ মুজিবকে পাকিস্তান ভাঙার পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিত্রিত করেন।

নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অচলাবস্থা
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এর ফলে সাংবিধানিকভাবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের অধিকার শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে চলে আসে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি, এই বাস্তবতাকে সহজে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।

১৯৭১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ঘোষণা দেন যে তাঁর দল ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবে না। এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যায়। অবশেষে ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়, যা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন।

ঢাকায় ইয়াহিয়া খানের আগমন
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৪ বা ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকা পৌঁছান। তাঁর ভাষ্যমতে, তখন ঢাকায় কার্যত পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়েছিল। সরকারি ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিল এবং প্রশাসনের অনেক ক্ষেত্রই আওয়ামী লীগের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেন।

মার্চের বৈঠকঃ দুই ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান
ইয়াহিয়ার জবানবন্দি অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে শেখ মুজিব কয়েকটি মৌলিক রাজনৈতিক দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন। তিনি দাবি করেন যে জাতীয় পরিষদের দুটি পৃথক অধিবেশন হতে হবে, একটি পূর্ব পাকিস্তানের সদস্যদের নিয়ে এবং অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যদের নিয়ে। ইয়াহিয়া খানের মতে, এটি কার্যত পাকিস্তানকে একটি কনফেডারেশনে রূপান্তরের প্রস্তাব ছিল। এক পর্যায়ে মুজিব নাকি মন্তব্য করেনঃ
“বাঙালিরা আর আগের মতো পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে পারবে না।” ইয়াহিয়ার ভাষ্যে এটিই ছিল বিচ্ছেদের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

ইয়াহিয়ার দাবিঃ ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব
জবানবন্দিতে ইয়াহিয়া খান দাবি করেন যে তিনি শেখ মুজিবকে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, শেখ মুজিবকে সমগ্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করার বিষয়েও তিনি আগ্রহী ছিলেন।
এছাড়া তাঁকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর) করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল বলে ইয়াহিয়া দাবি করেন।

সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তিনি তিনটি বিকল্প দেন—
এককভাবে সংবিধান তৈরি করা, ছোট দলগুলোর সাথে সমঝোতা করা অথবা ভুট্টোর দলের সাথে জোট সরকার গঠন করা। কিন্তু ইয়াহিয়ার মতে, শেখ মুজিব এসব প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।

অবিশ্বাসের রাজনীতি
ইয়াহিয়া খানের জবানবন্দিতে একটি বিষয় বারবার উঠে আসে—শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উপর আস্থা রাখতেন না। মুজিবের আশঙ্কা ছিল, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও সেনাবাহিনী প্রকৃত ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না।
এই অবিশ্বাস রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করে।

২৫ মার্চঃ সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত
ইয়াহিয়া খানের দাবি অনুযায়ী, আলোচনার সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন।
২৫ মার্চ রাতে শুরু হয় সামরিক অভিযান যা ইতিহাসে অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচিত। সেই রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। শেখ মুজিবের পালিয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল ছিলো কিন্তু আশ্চার্যজনকভাবে সে পালিয়ে যায় নাই। গ্রেপ্তারের সময় তার একটাই বক্তব্য ছিলো, আমার বিনিময়ে হলেও হত্যাজজ্ঞ থামানো হোক।

ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা
হামুদুর রহমান কমিশনের সামনে ইয়াহিয়া খানের এই বক্তব্য মূলত তাঁর নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে ব্যাখ্যা করার একটি প্রচেষ্টা বলে অনেক গবেষক মনে করেন। বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদদের মতে, পাকিস্তানের সামরিক শাসন, দীর্ঘদিনের বৈষম্য এবং নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি, এই সব কারণ মিলেই শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত মার্চ ১৯৭১-এর ব্যর্থ আলোচনা শুধু একটি রাজনৈতিক সংকটের সমাপ্তি ছিল না; সেটিই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনার প্রাক্কাল।


সূত্র:
Hamoodur Rahman Commission Report (1974)
BBC / Dawn archives on the report
Roar Media: Hamoodur Rahman Commission Report analysis
Wikipedia: Hamoodur Rahman Commission Report
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৩৩
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষকের মর্যাদা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:২৩


কবিতাটার কথা কি মনে আছে? বাদশাহ আলমগীর একদা প্রভাতে গিয়ে দেখলেন, শাহজাদা এক পাত্র হাতে নিয়ে শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে, আর শিক্ষক নিজ হাতে নিজের পায়ের ধূলি মুছে সাফ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মীয়তা বজায় রাখা ইসলামে ফরজ

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:১৪

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) একটি মৌলিক নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। এটি কেবল সামাজিক শিষ্টাচার নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশিত ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুরআন ও হাদীসে বারবার আত্মীয়তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ ইলিশ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:২৬


ইলিশ!ইলিশ!! রূপালী ইলিশ, কোথায় তোমার দেশ? 
ভোজন রসিকের রসনায় তুমি তৃপ্তি অনিঃশেষ। 

সরষে- ইলিশ, ইলিশ-বেগুন আরও নানান পদ
যেমন তেমন রান্না তবুও খেতে দারুণ সোয়াদ

রূপে তুমি অনন্য ঝলমলে ও চকচকে।
যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৯

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×