somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উগ্র মতাদর্শ বৃদ্ধির বিপদ আমরা বুঝতে পারছি?

১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আড়াই দশক ধরে আমরা একটা জোয়ার দেখছি। নীরবে, ধীরে ধীরে উঠে আসা এক জোয়ার। ধর্মীয় উগ্রপন্থার জোয়ার। কখনো গোচরে, কখনো অগোচরে। রাজনীতির মঞ্চে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে, ফেসবুকের টাইমলাইনে, প্রবাসে বসা আমাদের তরুণদের মনে। এই জোয়ার আমাদের সমাজের ভিত্তি ক্ষয় করে দিচ্ছে প্রতিদিন। প্রশ্ন জাগে একটাই—আমরা কি জলবায়ু পরিবর্তনের মতো এই উগ্র মতাদর্শের জোয়ারেও তলিয়ে যাব?

আমাদের ভৌগোলিক সৌভাগ্য একবার ছিল। স্থলবেষ্টিত নই আমরা। দীর্ঘ উপকূল দিয়ে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেই সুবিধাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় হুমকি। ১৯৪৭ সালে যখন ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলো, তখন কেউ ভাবেনি সমুদ্রপৃষ্ঠের কথা। নদীর প্রবাহ, প্রকৃতির ভাষা—সব উপেক্ষিত হয়েছিল ধর্মীয় বিবেচনায়। এখন সেই সমুদ্র আমাদের গ্রাস করতে আসছে। বিশাল এলাকা চলে যাবে পানির নিচে। সীমান্ত আর সমুদ্রের মাঝখানে আটকে থাকা কোটি মানুষ—তারা যাবে কোথায়? দেশভাগের রাজনৈতিক হিসাবে এই প্রশ্নগুলো ছিল না। কিন্তু আজ এগুলোই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।

আমাদের আশা ছিল অনেক। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত নতুন প্রজন্মের ওপর। ভেবেছিলাম, তারা গতানুগতিক ভারতবিরোধী বক্তব্যে জড়াবে না। বরং বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। যখন প্রতিবেশী বড় ও শক্তিশালী, তখন আমাদের কৌশল হওয়া উচিত আরও দক্ষ, আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া—পাকিস্তানকে বিকল্প মিত্র ভেবে রোমাঞ্চিত হওয়া নয়। কিন্তু যা দেখছি, তা হতাশাজনক। পশ্চিমা শিক্ষিতদের মধ্যেও অনেকে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে। ভারতকে শিক্ষা দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। ন্যূনতম ভূগোল ও রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন দেশপ্রেমিক মানুষের পক্ষে এমন ভাবনা কি সম্ভব?

তারা উপেক্ষা করছে যে বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে—যা পাকিস্তান নিজেও স্বীকার করে। পৃথিবীতে এমন জাতি খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে, যেখানে একটি গোষ্ঠী বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে নিজেদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধকে এভাবে অপমান করতে পারে! ভেবেছিলাম শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম ভারত-পাকিস্তানের বিভাজন ও হীনম্মন্যতার রাজনীতি পরিহার করবে। অন্তত পশ্চিমা গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী হবে।

এখন যা দেখছি তা আরও উদ্বেগজনক। তাদের অনেকেই ভূরাজনীতির হিসাবে পশ্চিমের দিকে ঝুঁকছে, অথচ সাংস্কৃতিক প্রশ্নে পাকিস্তানপন্থাকেই আঁকড়ে ধরছে। তাদের মানসপটে যেন ভারতকে সরিয়ে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানোর এক সুপ্ত বাসনা কাজ করছে।এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর সংকেত। গত কয়েক দশকে পশ্চিমে শিক্ষিত একটি অংশ পোশাক ও জীবনযাত্রায় আধুনিক হলেও সাংস্কৃতিক প্রশ্নে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তিকেই সমর্থন দিচ্ছে। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এই গোষ্ঠী জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বাহ্যিক আধুনিকতা গ্রহণ করলেও সাংস্কৃতিক মননকে প্রকৃত অর্থে আধুনিক করতে পারেনি।

ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন উপাচার্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রশ্ন হলো, এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় তারা কি অক্সফোর্ডের শিক্ষার কোনো প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন? বরং তারা যে ধর্মীয় উগ্র ডানপন্থার অনুমোদন দিচ্ছেন, তা পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় না। অবাক হয়ে দেখি, বিদেশে থাকা অনেক বাংলাদেশি মনে করেন পাকিস্তানিরা তাদের প্রতি বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারা বোঝার চেষ্টা করেন না—পাকিস্তানিরা এখন কেন আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে।

গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগতি করেছে। সেই অগ্রগতিই আমাদের এই সম্মান ও অগ্রাধিকার এনে দিয়েছে। আরও কিছু অগ্রগতি হলে ভারতও আমাদের গুরুত্ব দিতে বাধ্য হতো। শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরিসরে পাকিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে। আন্তর্দেশীয় বন্ধুত্ব দানের বিষয় নয়—এটি অর্জিত হয় অগ্রগতি ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তির মাধ্যমে। আমরা যদি সেই ভাবমূর্তি ধরে রাখতে ব্যর্থ হই, অন্যান্য দেশ আমাদের স্বাগত জানাবে না।

দীর্ঘদিন পশ্চিমা দেশে থেকেও অনেকের এই উপলব্ধি হয় না—এটি আমাকে বিস্মিত করে। পশ্চিমা দেশে বসে যারা দেশের ধর্মীয় চরমপন্থাকে সমর্থন করেন, তারা বুঝতে পারেননি যে মাতৃভূমিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকার রক্ষিত না হলে, পশ্চিমা সমাজেও তারা অবিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। পশ্চিমা সামাজিক পরিসরে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণ শুধু সাদা-কালো চামড়ার পার্থক্য নয়; এটি মূলত জাতিগত ভাবমূর্তির প্রশ্ন।

চীনের সঙ্গে পশ্চিমাদের যতই প্রতিযোগিতা বা দ্বন্দ্ব থাক, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতায় চীনারা পাকিস্তান তো বটেই, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় অনেক বেশি অগ্রগণ্য। কেন? শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য? মোটেই না। সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতায় সাংস্কৃতিক অগ্রগতির গুরুত্ব অর্থনৈতিক অগ্রগতির চেয়েও বেশি। চীনারা জাতিগতভাবে ধর্মীয় চরমপন্থা অনুমোদন করে না। এ ক্ষেত্রে নেহরুর ভারতের তুলনায় মোদির ভারতও অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে। আফগানিস্তানের দিকে তাকান—আমরা কি সেই ধর্মীয় চরমপন্থা চাই? আমাদের অর্থনীতি যখন প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তখন কি আমরা এমন ভাবমূর্তি বহন করতে পারি? অর্থনৈতিক সংকট কাটানো যতটা কঠিন, সাংস্কৃতিক সংকট কাটানো তার চেয়েও বেশি দুরূহ।

সম্প্রতি অনেকে দাবি করছেন, ইসলামী ডানপন্থি ছাত্র সংগঠন ও তাদের নেটওয়ার্ক শিক্ষায় ভালো করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাপা হয়েছে? ডানপন্থি শিক্ষা বাংলাদেশে নতুন নয়। হ্যাঁ, তাদের কেউ কেউ মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পড়েছে এবং ভালো বেতনের চাকরি করছে। তবু প্রশ্ন থাকে: এই ধর্মীয় ডানপন্থি স্নাতকদের মধ্যে কতজন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে আলোকিত করেছে শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ বা কূটনীতিক হিসেবে? আমরা ক'জনের নাম বলতে পারব?

নিজেদের শিক্ষার পরিবেশ ও মান ধ্বংস করে ক্যাম্পাস যুদ্ধ জেতার তাৎপর্য কী, যদি তা আন্তর্জাতিক প্রভাব না আনে? বৈশ্বিক দক্ষতা ছাড়া জাতীয়তাবাদ একটি ফাঁপা বুলিমাত্র—দেশে করতালি পেলেও বিদেশে আমাদের শক্তি গুরুত্বহীন করে তোলে। ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে আমাদের বিরাজমান সমস্যার সমাধান হবে—এই বিশ্বাস মারাত্মক ভুল। ভারতের সঙ্গে কোনো সমস্যা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে কখনও সমাধান হবে না।

এই মানসিকতা শুধু আত্মঘাতী নয়, এটি গভীরভাবে বিভ্রান্তিকর ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি অপমানজনক। আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করা উচিত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে, সে জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের তরুণদের একটি বড় অংশ এই সত্যটি ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের ভুল অগ্রাধিকার আমাদের হতাশ করে। ধর্মীয় চরমপন্থার এমন উত্থান, আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ অন্ধকার ভবিষ্যতের কথাই বলে। তবে ধর্মীয় চরমপন্থার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে—থাকা উচিত।

আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতি করেছি, তা পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক মানের করতে না পারলে এই ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। আমরা একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক দিকে জলবায়ুর জোয়ার, অন্য দিকে উগ্রবাদের জোয়ার। দুটোই আমাদের গ্রাস করতে চায়। একটার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ কম, কিন্তু অন্যটার ওপর আছে। প্রশ্ন হলো: আমরা কি সেই নিয়ন্ত্রণ নেব? নাকি নীরবে তলিয়ে যাব দুই জোয়ারের মাঝখানে? উত্তরটা আমাদের হাতে। এখনও।

আলতাফ রাসেল: পিএইচডি গবেষক, অর্থনীতি বিভাগ, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
[email protected]

সমকাল: উগ্র মতাদর্শ বৃদ্ধির বিপদ আমরা বুঝতে পারছি?

সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৪৭
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুভি "হক" : ডিভোর্সীর হক আবার কি জিনিস, খায় না মাথায় দেয়! :P

লিখেছেন সোহানী, ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৫



একটা ঘটনা শেয়ার করি। আমার কলিগ মারিয়া, মধ্য বয়সী সিঙ্গেল মাদার। চৈাদ্দ ও সাত বছরের দু'টো বাচ্চা তাঁর। স্কুল জীবনের সুইটহার্টের সাথে পনেরো বছর সংসার করার পর ডিভোর্সের পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মা ও খোকার রাজ্যপাট

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪১


নদীর তীরে কাশের বন সেথায় ছোট্ট কুঁড়েঘর,
আমি থাকি মা-ও থাকে আর কেউ নেই আপন-পর।

ঘরের পাশে বাঁশের বন তার ওপারে সুদূর মাঠ
সেই মাঠেতে কাটে দিন সভা-সদ বিহীন রাজ্যপাট।

শান্ত শীতল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগাররা সব কোথায় গেল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৩১

ব্লগাররা সব কোথায় গেল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ব্লগাররা সব কোথায় গেল, ব্লগটা কেন শূণ্য?
কে বলেছে এমন কথা, ব্লগ লেখায় নাই পূণ্য?

ব্লগাররা সব কোথায় গেল, ব্লগটা রেখে খালি?
শূন্য কেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

উগ্র মতাদর্শ বৃদ্ধির বিপদ আমরা বুঝতে পারছি?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৪৪


আড়াই দশক ধরে আমরা একটা জোয়ার দেখছি। নীরবে, ধীরে ধীরে উঠে আসা এক জোয়ার। ধর্মীয় উগ্রপন্থার জোয়ার। কখনো গোচরে, কখনো অগোচরে। রাজনীতির মঞ্চে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে, ফেসবুকের টাইমলাইনে, প্রবাসে বসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

এটা মানুষ নাকি রাক্ষস?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৯


প্রিয় পাঠক, আজ আপনাদের সামনে এমন এক ব্যক্তির গল্প তুলে ধরব, যার কীর্তিকলাপ শুনে আপনি নিজেকে প্রশ্ন করবেন — এটা আসলেই মানুষ, নাকি পৌরাণিক কোনো রাক্ষস? না, এটা কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×