somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ষ্টেশন ভাগাভাগি' র গল্প

২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শৈশব থেকে পথ হারিয়েছি বহুবার, তবুও আশ্চর্য এক কারনে নতুন পথের সন্ধানে নামতে হয় বারংবার। খেলার সাথী বন্ধুমহল কিংবা অগ্রজ অনেকেই বেশ নির্ভার থাকেন আমার দেখানো পথে। তাদের ভাবনায় থাকে, rআমি ঠিক চিনে নেবো। পথিক, পথ পথের পরিবেশ। সবসময় ই আমাকে টানে, গ্রামের মেঠোপথ থেকে পাহাড়ি ঢাল, রাজপথের কিনারা অথবা অলিগলি। হেটে যেতে আমার ক্লান্তি নেই।

মুম্বাই তে যে বাসায় ছিলাম, সেখান থেকে বম্বের বিখ্যাত চোল বা মাইলখানেক লম্বা বস্তি' র পথ নজরে আসত। সে ছিল আলাদা এক জীবনের চিত্র, কাক ডাকা ভোরে সেখানে শুধু কাক ই ডাকত। কর্ম চাঞ্চল্য বিহীন নিশ্চুপ, একজন মানুষের মাপের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে নীরবতা ভীষণ শব্দে বাজত। দিনমান কিছু আসা যাওয়া, সন্ধ্যার পর হত জমজমাট। আমি বম্বে তে গিয়েছিলাম এই সিজনে, গনপাতি পাপ্পা, নভরাত্রি। সন্ধ্যা থেকে ফুল ভলিউমে বাজত বিভিন্ন গান আর শেষ হত মাঝ রাতে। হরিয়ানার গুরগাঁও এ ১১ তলার ব্যালকনি ছুঁয়ে চলে যেত হাইওয়ে। বিচিত্র রঙের ট্রাক, আগ্রা তাজমহল জয়পুর গামী পর্যটক বাহী যানবাহন। এক হুলুস্থুল ব্যাপার সারাক্ষণ ।

বর্তমান আবাসনের রূপ রঙ গন্ধ সবকিছুই আমার আগের সব অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা ! ব্যতিক্রম বলি, অন্য রকম বলি অথবা আলাদা ! এই ভিন্নতাটুকু দিয়েছে ব্যালকনির দিগন্তে রেলওয়ে স্টেশনের সুবাস। কখনো ভোরের নিস্তব্ধতা খানখান করে বেজে উঠে ট্রেনের বাঁশি, আর সাথে ঝিকঝিক করে থেমে পরার গল্প। মাঝ দুপুরের শব্দটা যেন এলিয়ে পরা এয়োতির আঁচলের মত কোমল। একেকদিন মাগরিবের আজানের সাথে পাল্লাদিয়ে ছোটে সে রেলগাড়ি ঝমাঝম। মাঝরাত্তিরে' র সুর সবসময় বিদায় ঘণ্টার মত। সমস্ত চরাচর কে বিষণ্ণ করে ছোটে। প্রতিটি স্টেশনের কোলাহলের আলাদা গল্প থাকে সব সময় ই।


গেলো বর্ষায় ইলশেগুঁড়ির মাঝে প্যাচপ্যচে কাঁদায় সন্ধ্যার আলো কেটে বাড়ি ফিরছিলাম, বাসার ঠিক দুই প্লট সামনে একটা ঝালাই এর দোকানের আবছা অন্ধকারে কে যেন বসে বাঁশি বাজাচ্ছিল ! এমন হৃদয় বিদীর্ণ করা সে টান আহা ! ঠিক সেই মুহূর্তে শেষ বাঁশিতে সান্ধ্য ট্রেন বিদায় নিচ্ছিল, মসজিদের আজান ! সব সুর মিলিয়ে এমন একটা আবহ করলো না !! কেমন একটা সব পেয়ে ও কিছুই না পাওয়ার হাহাকার। হয়ত সে কিশোর দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে মা বাবা আত্মীয় পরিজন ছেড়ে এখানে এসেছে, হয়ত ট্রেনে হুইসেল তাকে ফিরতি ডাক দেয়। এই অনুভবকে শূন্যতার বোঝা মনে হয়! সব সুর শেষে মনে হল - এমন একটা দুটো মহার্ঘ্য মুহূর্তের জন্যই আসলে বেঁচে থাকা আনন্দের।

দূরের পথ যাত্রার যে স্টেশন ভাগাভাগী করে নেয়া, এই অপেক্ষার সময়টুকু বিরক্তি মাখানো আনন্দের! বিরক্ত ধুলো ঘামে কর্কশ বাঁশিতে। আনন্দ ! ছুটির আনন্দ কোলাহল হাসিতে। এইতো সেদিন রাতের ট্রেনে গ্রামে যাচ্ছিলাম, একেবারে স্টেশন ঘেঁষে বাসা, ফোনে মেসেজ দিয়ে খবর নেয়া সবকিছুর পর ও বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে হল। চট্টগ্রাম, সিলেট মুখি উচ্ছ্বসিত তরুণ দল, ছুটিতে ফেরা সামরিকবাহিনীর সদস্য। ছোট ছোট আলদা ভাগ হয়ে যাওয়া কিছু পরিবার। পৃথিবীর তাবৎ দাঁয় থেকে মুক্ত নিঃসঙ্গতা। আর সবচাইতে ভালোলাগে, অপেক্ষায় অপেক্ষায় মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়া শিশুর প্রশান্তি! মাঝে মাঝে শব্দে হুট করে চমকে জেগে উঠে, সে বিস্ময় ক্যামেরা বন্দী করার মত। দূরের অন্ধকারে মাঝেমাঝে পাখিদের ডানা ঝাপটানো, চায়ের উঠা বাষ্প কিছু জায়গায় বিচ্ছিরি রকমের ধোঁয়া ছুটিয়ে ধূমপায়ী দল।


যেদিকে এসে আমাদের বগি থামার কথা, তার একটু আগেপিছু করে অপেক্ষা করছিলাম এর মাঝে সদ্য ঘুম ভাঙা ভীষণ মুডি মুডে হালকা আলোর স্টেশনের সমস্ত মায়া নিয়ে ছোট্ট এক ফুলটুসি এসে দাড়ল আমার ঠিক পাশেই। ভ্যাপসা গরম যেখানে বসার ব্যবস্থা আছে সেখানে ফ্যান নেই , আর ফ্যানের নীচে নেই বসার জায়গা। ভাব জমানোর অনেক চেষ্টা করেছি সফল হয়নি, এরপর শুধু দু একটা ছবি নিয়েই খুশি হতে হল। আরেকজন আমার পিছনে বসে ছিলন , উনি একজন ৭/৮ বছর বয়সী ভদ্রলোক। বাবা মা এবং মাত্রই এক্কাদোক্কা হাঁটতে শেখা ছোটবোন সাথে। চকলেট ,কোক এর সদ ব্যবহারের মাঝে ঝনঝন করে এসে থেমে যাওয়া ট্রেন বিকট শব্দে নিজের উপস্থিতি জানান দিলেন। সাথে সাথে ভদ্রলোকের মাথায়, না না কানে হাত। একটু ধাতস্থ হয়ে বলতে শুরু করলেন - ট্রেন তোকে আমি ছাড়বো না, একদম ছাড়বো না। এত সাহস আমাকে ভয় দেখাস !! বলতে বলতে খিলখিল হাসি। জান্নাত একদম জান্নাত। ঠিক পাশের বেঞ্চে বসা দুই কিশোর নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সেলফি টিকটিক কতশত কিছু জমা থাকে আজকাল ফোনে, সেই ফোন নিয়েই ব্যস্ত। এমন সব খুনসুটি, খুঁটিনাটি একসময় এগিয়ে নিয়ে এলো আমাদের ট্রেন, হুড়মুড় করে সব ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেদের নির্ধারিত বগির কাছে এসে দাঁড়ালাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:১১
২১টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার কথা : তৃতীয় পর্বের পর

লিখেছেন সুম১৪৩২, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৩০



“আসলে উনি কে…?”
এই শিরোনামের একটি লেখা দিয়েই আমার লেখালেখির শুরু।
সামুতে।
এটার পর, আমি এই গল্পের কয়েকটা পর্ব লিখেছিলাম। মোট তিনটি । শেষ পর্বটির নাম ছিল—“পশ্চিম পাড়ার পথে”।

গল্পটার সময়কাল ১৯৯০ সাল।
রহস্য আছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধ ভাঙার আওয়াজ আজ আর কেন আ্ওয়াজ করছেনা ?

লিখেছেন সূচরিতা সেন, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৩০



সত্যি করে বলছি মাঝে মাঝে ভাবি এটা কি সেই বাঁধ ভাঙার আওয়াজ ? একটা সময় যে বাঁধ ভাঙা আওয়াজের
একটাই পরিচয় ছিল,বিশ্বের সব থেকে বড় বাঙলা ভাষীর ব্লগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভালোবাসা নাও, হারিয়ে যেও না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:২৯



মুনা, আজ ঢাকায় শীতের তীব্রতা কিছুটা কম।
যদিও অনেকের কাছে এই শীত টুকুই অনেক শীত। আমার আবার শীত কম। তুমি শুনলে অবাক হবে এই শীতে আমি পাতলা একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান - বাংলাদেশ

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:০০

ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। একেবারে উথাল পাথাল অবস্থা। যেকোন সময়ে সরকার পতন হয়ে যেতে পারে।
এর আগে কয়েক বছর আগেও এমনটা হয়েছিল, হিজাব ইস্যু নিয়ে লোকজন সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শীতার্ত একটি শিশু ও দুটি কুকুর

লিখেছেন ইসিয়াক, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩২


রাত বাড়ে যত তাপমাত্রা নামে তত,
পা ফাটে, ঠোঁট ফাটে গভীর হয় ক্ষত।

একটা শিশু কাঁপছে শীতে ছাতিম গাছটার নীচে।
দুটো কুকুর গা ঘেঁষাঘেসি করে তাকে ছুঁয়ে আছে।

শীতার্ত সবাই তারা,সমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×