
মুম্বাই তে যে বাসায় ছিলাম, সেখান থেকে বম্বের বিখ্যাত চোল বা মাইলখানেক লম্বা বস্তি' র পথ নজরে আসত। সে ছিল আলাদা এক জীবনের চিত্র, কাক ডাকা ভোরে সেখানে শুধু কাক ই ডাকত। কর্ম চাঞ্চল্য বিহীন নিশ্চুপ, একজন মানুষের মাপের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে নীরবতা ভীষণ শব্দে বাজত। দিনমান কিছু আসা যাওয়া, সন্ধ্যার পর হত জমজমাট। আমি বম্বে তে গিয়েছিলাম এই সিজনে, গনপাতি পাপ্পা, নভরাত্রি। সন্ধ্যা থেকে ফুল ভলিউমে বাজত বিভিন্ন গান আর শেষ হত মাঝ রাতে। হরিয়ানার গুরগাঁও এ ১১ তলার ব্যালকনি ছুঁয়ে চলে যেত হাইওয়ে। বিচিত্র রঙের ট্রাক, আগ্রা তাজমহল জয়পুর গামী পর্যটক বাহী যানবাহন। এক হুলুস্থুল ব্যাপার সারাক্ষণ ।
বর্তমান আবাসনের রূপ রঙ গন্ধ সবকিছুই আমার আগের সব অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা ! ব্যতিক্রম বলি, অন্য রকম বলি অথবা আলাদা ! এই ভিন্নতাটুকু দিয়েছে ব্যালকনির দিগন্তে রেলওয়ে স্টেশনের সুবাস। কখনো ভোরের নিস্তব্ধতা খানখান করে বেজে উঠে ট্রেনের বাঁশি, আর সাথে ঝিকঝিক করে থেমে পরার গল্প। মাঝ দুপুরের শব্দটা যেন এলিয়ে পরা এয়োতির আঁচলের মত কোমল। একেকদিন মাগরিবের আজানের সাথে পাল্লাদিয়ে ছোটে সে রেলগাড়ি ঝমাঝম। মাঝরাত্তিরে' র সুর সবসময় বিদায় ঘণ্টার মত। সমস্ত চরাচর কে বিষণ্ণ করে ছোটে। প্রতিটি স্টেশনের কোলাহলের আলাদা গল্প থাকে সব সময় ই।
গেলো বর্ষায় ইলশেগুঁড়ির মাঝে প্যাচপ্যচে কাঁদায় সন্ধ্যার আলো কেটে বাড়ি ফিরছিলাম, বাসার ঠিক দুই প্লট সামনে একটা ঝালাই এর দোকানের আবছা অন্ধকারে কে যেন বসে বাঁশি বাজাচ্ছিল ! এমন হৃদয় বিদীর্ণ করা সে টান আহা ! ঠিক সেই মুহূর্তে শেষ বাঁশিতে সান্ধ্য ট্রেন বিদায় নিচ্ছিল, মসজিদের আজান ! সব সুর মিলিয়ে এমন একটা আবহ করলো না !! কেমন একটা সব পেয়ে ও কিছুই না পাওয়ার হাহাকার। হয়ত সে কিশোর দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে মা বাবা আত্মীয় পরিজন ছেড়ে এখানে এসেছে, হয়ত ট্রেনে হুইসেল তাকে ফিরতি ডাক দেয়। এই অনুভবকে শূন্যতার বোঝা মনে হয়! সব সুর শেষে মনে হল - এমন একটা দুটো মহার্ঘ্য মুহূর্তের জন্যই আসলে বেঁচে থাকা আনন্দের।
দূরের পথ যাত্রার যে স্টেশন ভাগাভাগী করে নেয়া, এই অপেক্ষার সময়টুকু বিরক্তি মাখানো আনন্দের! বিরক্ত ধুলো ঘামে কর্কশ বাঁশিতে। আনন্দ ! ছুটির আনন্দ কোলাহল হাসিতে। এইতো সেদিন রাতের ট্রেনে গ্রামে যাচ্ছিলাম, একেবারে স্টেশন ঘেঁষে বাসা, ফোনে মেসেজ দিয়ে খবর নেয়া সবকিছুর পর ও বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে হল। চট্টগ্রাম, সিলেট মুখি উচ্ছ্বসিত তরুণ দল, ছুটিতে ফেরা সামরিকবাহিনীর সদস্য। ছোট ছোট আলদা ভাগ হয়ে যাওয়া কিছু পরিবার। পৃথিবীর তাবৎ দাঁয় থেকে মুক্ত নিঃসঙ্গতা। আর সবচাইতে ভালোলাগে, অপেক্ষায় অপেক্ষায় মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়া শিশুর প্রশান্তি! মাঝে মাঝে শব্দে হুট করে চমকে জেগে উঠে, সে বিস্ময় ক্যামেরা বন্দী করার মত। দূরের অন্ধকারে মাঝেমাঝে পাখিদের ডানা ঝাপটানো, চায়ের উঠা বাষ্প কিছু জায়গায় বিচ্ছিরি রকমের ধোঁয়া ছুটিয়ে ধূমপায়ী দল।
যেদিকে এসে আমাদের বগি থামার কথা, তার একটু আগেপিছু করে অপেক্ষা করছিলাম এর মাঝে সদ্য ঘুম ভাঙা ভীষণ মুডি মুডে হালকা আলোর স্টেশনের সমস্ত মায়া নিয়ে ছোট্ট এক ফুলটুসি এসে দাড়ল আমার ঠিক পাশেই। ভ্যাপসা গরম যেখানে বসার ব্যবস্থা আছে সেখানে ফ্যান নেই , আর ফ্যানের নীচে নেই বসার জায়গা। ভাব জমানোর অনেক চেষ্টা করেছি সফল হয়নি, এরপর শুধু দু একটা ছবি নিয়েই খুশি হতে হল। আরেকজন আমার পিছনে বসে ছিলন , উনি একজন ৭/৮ বছর বয়সী ভদ্রলোক। বাবা মা এবং মাত্রই এক্কাদোক্কা হাঁটতে শেখা ছোটবোন সাথে। চকলেট ,কোক এর সদ ব্যবহারের মাঝে ঝনঝন করে এসে থেমে যাওয়া ট্রেন বিকট শব্দে নিজের উপস্থিতি জানান দিলেন। সাথে সাথে ভদ্রলোকের মাথায়, না না কানে হাত। একটু ধাতস্থ হয়ে বলতে শুরু করলেন - ট্রেন তোকে আমি ছাড়বো না, একদম ছাড়বো না। এত সাহস আমাকে ভয় দেখাস !! বলতে বলতে খিলখিল হাসি। জান্নাত একদম জান্নাত। ঠিক পাশের বেঞ্চে বসা দুই কিশোর নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সেলফি টিকটিক কতশত কিছু জমা থাকে আজকাল ফোনে, সেই ফোন নিয়েই ব্যস্ত। এমন সব খুনসুটি, খুঁটিনাটি একসময় এগিয়ে নিয়ে এলো আমাদের ট্রেন, হুড়মুড় করে সব ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেদের নির্ধারিত বগির কাছে এসে দাঁড়ালাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



