somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মিঃ পারফেক্ট হওয়া জাপানিদের জীবন যন্ত্রণা।

১৬ ই নভেম্বর, ২০২২ রাত ১১:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

উদীয়মান সূর্যোদয়ের দেশ! প্রযুক্তিগত উন্নয়নের রোল মডেল! পৃথিবীর সব চাইতে সভ্য জাতি! এমন অনেক ভূষণে ভূষিত বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু দেশ জাপান। জাতিগত ভাবেই জাপানীরা ভীষণ সুশৃঙ্খল, সৌন্দর্য প্রিয়। যাকে বলা যায় ডেডিজ ব্লু আইড বয় বা মায়ের ভালো ছেলেদের দেশ। বিজ্ঞান ও উন্নত প্রযুক্তির শীর্ষে থাকা এই দেশকে নিয়ে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। শৈশব থেকে তাদের কে কঠিন কঠোর নিয়মতান্ত্রিক ভাবে গড়ে তোলা হয়,যা আমাদের পাঠ্য বইতে জাপানি শিশুদের নম্রতা ভদ্রতা, জাপানী শিক্ষা ব্যবস্থার উৎকর্ষতার উদহারন দেয়া আছে। শৈশবে জাপানী মেয়েদের পায়ের সৌন্দর্য রক্ষায় লোহার জুতা পায়ে দিতে হত সে ইতিহাস ও আমরা জেনেছি। আধুনিক জাপান এই চূড়ান্ত আধুনিকতার যাত্রাপথে নিজেদের স্বকীয়তার অনেককিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে, প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মত জাপানী জীবন যাত্রা যত' না মানবিক তারচেয়ে বেশি যান্ত্রিক " অনুভূতি শূন্য জীবন ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। গুডবয় বা মিস্টার পারফেক্ট উপাধি পেতে তাদের কালের বা সময়ের গর্ভে নৈবদ্য সাজাতে হয়েছে কিছু মানবিক আবেগ অনুভূতির।

কি আশ্চর্য এই মানব জীবন! এই সভ্যতা ! নিজেদের সভ্য মানুষ হিসেবে প্রমাণ করতে বেছে নিতে হচ্ছে যন্ত্রণা দায়ক যন্ত্র জীবন। জাপানি' রা কাঁদতে ভুলে গেছেন, কাজের চাপের ক্লান্তিতে পারিবারিক আড্ডা ভাবের আদান প্রদানের অনীহা বাড়ছে। সবচাইতে পরিছন্ন শহর উপাধি পেতে তাদের শিশুদের দিতে হয় নিয়মিত স্কুল শেষে বাড়তি শ্রম। অনেক তরুণ দীর্ঘ সময় কাজ শেষে বাড়ি যাবার সময় আগ্রহ হারিয়ে অফিসিয়াল পোশাকে রেল বা বাস স্টেশনে রাত কাটাচ্ছেন। কারন পরের দিনের রুটিন ও সেই একঘেয়ে ক্লান্তিকর এবং নিরানন্দ মনে হয় তাদের কাছে। আর এসব বিভিন্ন প্রয়োজনে এই যান্ত্রিক যাপিত জীবনে এসেছে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় শব্দের প্রচলন, এবং প্রচলিত সেসব সামাজিক সমস্যাগুলো ঘিরে পুঁজিবাদ অর্থনীতির সফল উদহারন হিসেবে গড়ে উঠেছে বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য।

ফুটোকোরঃ

জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, এরা হচ্ছে এমন শিশু যারা স্বাস্থ্য বা অর্থনৈতিক কারণে ৩০দিনের বেশি স্কুলে যেতে চায় না। এই শব্দটি অনেক সময় 'অনুপস্থিত, গরহাজির, স্কুলের প্রতি ভয় অথবা স্কুলকে প্রত্যাখ্যান - ইত্যাদি শব্দে বর্ণনা করা হয়।তবে গত কয়েক দশকে ফুটোকোর সম্পর্কে ধারণা বদলেছে। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত স্কুলে না যাওয়া- তখন একে বলা হতো টোকোইয়োশি- অর্থাৎ প্রতিরোধ করা।
বিষয়টিকে মানসিক অসুস্থতা হিসাবে দেখা হতো। আর মানসিক অসুস্থতা মানে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন মেডিসিন! তাই নয় কী ?
গত কয়েক দশকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির হার আশংকা জনক হারে কমেছিল। ফুটোকোর বৃদ্ধি পাওয়ায় আশির দশক থেকেই জাপানে স্কুল ফ্রি মুভমেন্ট শুরু হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এরপর নতুন ​​করে ভাবনায় আনেন বিকল্প স্কুল যেগুলো স্বাধীনতা ও ব্যক্তি চাহিদার ওপর গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত হয়। কুমন ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গুলো গড়ে উঠে। বাসার স্কুলের পাশাপাশি জাপানের বাধ্যতামূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে এসব স্কুল একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প ব্যবস্থা। যদিও এসব স্কুলে শিশুদের স্বীকৃত কোন শিক্ষা সনদ দিতে পারে না।



হিকিকোমোরিঃ

হিকিকোমারি হচ্ছে সামাজিক সকল কার্যক্রমে থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, কঠিন ভাবে নিজেকে প্রত্যাহার বলা চলে। ​​​​জাপানে এই শব্দটি প্রায়শই উচ্চারিত হয় পরিবারের অভিভাবকদের মাঝে, যেখানে একজন কিশোর বা সদ্য তরুণ নিজেকে নিজেদের গৃহবন্দী করে একাকী জীবন বেছে নেয় - বেশ কয়েকমাস বা বছরের জন্যে স্কুল / কলেজ বা যে কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া বা কাজ করা থেকে বিরত রাখে। সাথে পরিবারের কারো সাথে ভাবের আদান প্রদান অথবা সামাজিক যে কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। একটা সময়ে আবার সে হয়ত ফিরে আসে সাধারণের মাঝে। এই হিকিকোমারি জন্ম দিচ্ছে আরেক শ্রেণীর যারা নিজেদের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিচ্ছেন রাবার বা সিলিকন নির্মিত পুতুল। এমনি একজন হিকিকোমারি হচ্ছেন আকিহিতো কন্দো যে কিনা পেশায় টোকিওর একটা স্কুলের প্রশাসনিক বিভাগে কর্মরত।


আকিহিতো বর্তমানে বিয়ে করেছেন "হাসতুন মিকু" কে হাসতুন মিকু জাপানের খুবই জনপ্রিয় একটি অ্যানিমেশন চরিত্র। এবং জাপানের সবচেয়ে বিখ্যাত পপ তারকা। সফল হও, বিয়ে কর, বাচ্চা নাও, পরিবার গঠন কর, এবং সুখি মানুষ হিসেবে মারা যাও! সমাজের যে সেট করা সুখি হবার মানদণ্ড আকিহিতোর কাছে তা অকার্যকর। আকিহিতো বাস্তবে নারীদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন না, কারন হচ্ছে উনি কখনোই নারীদের ভালোবাসা পান নাই। " মেয়েরা আমাকে কখনো পছন্দ করত না , কর্মস্থলে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করত, আমার ছোটখাট ভুলে আমার উপর চিৎকার করত, আমি সুপ্রভাত বললে তা না দেখার ভান করত"। এরপর আকিহিতো হিকিকোমারি হয়ে যখন কাজ থেকে বিরতি নেয় তখন অনলাইনে পরিচয় হয় মিকুর সাথে, সেখানে প্রেম , ভালোবাসা এবং বিয়ের সিদ্ধান্ত। মিকু তার জীবন রক্ষাকারী, জীবনে আনন্দ ফিরিয়ে এনেছে, স্বাভাবিক জীবন দান করেছে।

জাপানের অনেক পুরুষ তাদের মানুষরূপী সঙ্গীদের নিয়ে অনেক খুশী এবং অনেকে বলছেন তারা আর কখনো কোনো মানুষের কাছে ফিরে যাবেন না। প্রতি বছর দেশটিতে প্রায় দুই হাজারের মতো 'সেক্স ডল' বিক্রি হয়, দাম অন্তত ছয় হাজার ডলার। মানুষের তৈরি এসব সঙ্গীদের সাথে মানসিক বন্ধনও গড়ে তুলেছেন অনেক ক্রেতা।

মাসায়ুকি নামে আরেকজন জাপানী সিলিকন ডল ক্রেতা তার মায়ূ ডল কে নিয়ে সুখী। "জাপানি মেয়েরা নির্মম হৃদয়ের, স্বার্থপর। পুরুষেরা চায় এমন কেউ তার পাশে থাকুক যে তার পাশে থাকুক, কাজ থেকেআসার পর যার সাথে সুন্দর সময় কাটানো যায় এমন কেউ। সিলিকন ডলের সাথে আমি তেমনটা করতে পারি" এবং "আমি ভাবতেই পারিনা আর কোনো মানুষের সাথে থাকার কথা। মায়ুকে নিয়ে আমি কবরে যেতে চাই"-বলছিলেন।



বয়স্কদের দেশ জাপানঃ


পারিবারিক ভাবে বিছিন্ন পুরুষেরা, একাকীত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই নাকি সিলিকন ডলের দিকে ঝুঁকছেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ গন। সিলিকন ডলে তারুণ্য কেটে গেলে ও বৃদ্ধ বয়সে নিঃসঙ্গতা থেকে পরিত্রাণ পেতে অনেকেই ইচ্ছে করেই কারাগারে যেতে চায় ছোটখাট অপরাধ করে। ৬৫ বছরের বেশি অনেকেই বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। হিরোশিমার একটি বাড়িতে বসবাস করেন ৬৯ বছর বয়সী তোশিও তাকাতা। বেশ কিছুদিন কারাগারে থাকার পর তিনি সম্প্রতি মুক্ত হয়েছেন। কারাগারে যাবার জন্য তিনি ইচ্ছে করে আইন ভঙ্গ করেছেন। এর কারণ হচ্ছে, তিনি বিনা খরচে একটি থাকা-খাওয়ার জায়গা খুঁজছিলেন। সেটি কারাগার হলেও মন্দ নয়। মি: তোশিও বলেন "আমি এখন পেনশনের উপর নির্ভরশীল। আমার অর্থ ফুরিয়ে গেছে। সেজন্য আমি ভাবলাম যদি কারাগারে থাকি তাহলে হয়তো বিনা খরচায় থাকতে পারবো,। কারাগারে যাবার জন্য তিনি একটি বুদ্ধি বের করলেন। রাস্তার পাশ থেকে একটি বাইসাইকেল নিয়ে সেটি চালিয়ে সোজা পুলিশের কাছে গিয়ে হাজির হন।" পুলিশের কাছে গিয়ে বললাম, আমি এটা চুরি করেছি।" এতে কাজ হলো। এটা ছিল মি: তোশিওর প্রথম অপরাধ, যখন তাঁর বয়স ছিল ৬২ বছর। জাপানের আদালতে ছোট-খাটো চুরির বিষয়গুলোকে বেশ গুরুত্ব সহকার গ্রহণ করে। ফলে মি: তোশিওকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হলো। অথচ তোশিও ছবি আঁকতে ভালোবাসেন!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৭০ বছর বয়সী এক নারী বলেন, " আমি আমার স্বামীর সাথে থাকতে পারিনি। আমার এখন কোথাও থাকার জায়গা নেই। সুতরাং আমার একমাত্র উপায় ছিল কোন কিছু চুরি করে কারাগারে যাওয়া। "তিনি বলেন, " ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে যারা ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না , তারা অপরাধ করছেন। কারণ, তাদের খাবার নেই, টাকা নেই।" চুরি হওয়া অধিকাংশ জিনিসপত্রের দাম তিনি হাজার ইয়েন বা ২০ পাউন্ডের কম। 'উইথ হিরোশিমা' নামের একটি সংস্থার পরিচালক কানিচি ইয়ামাদা মনে করেন, বৃদ্ধদের অপরাধ প্রবণতা তৈরি হাবার বিষয়টি মানসিক সমস্যার সাথে সম্পর্কিত। এর সাথে আর্থিক কোন সম্পর্ক নেই।

বৃদ্ধরা অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তারা একাকীত্ব সহ্য করতে পারছেন না।" সাধারণত মানুষ অপরাধ করেনা, যদি তাকে দেখাশোনা করার কেউ থাকে," বলছিলেন কানিচি ইয়ামাদা। তার মতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি একটি অজুহাত মাত্র। তাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে একাকীত্ব। যারা প্রচণ্ড একাকীত্বে ভুগছেন, তারা বারবার অপরাধ করার মাধ্যমে কারাগারে যেতে চাইছেন। কারণ সেখানে তারা সঙ্গী খুঁজে পাবেন।


রুই-কাৎসুঃ

জাপানী রুই- কাৎসু শব্দের মানে হচ্ছে কান্না আনা! প্রথাগতভাবে জাপানীরা কাঁদেন না। কাঁদা জাপানী সংস্কৃতিতে নিষিদ্ধ।রুই-কাৎসু পদ্ধতি ব্যবহার করে মানুষকে নিজের নিরাপদ আবহে কাঁদতে শেখাচ্ছেন হিদেফুমি ইওশিদা। কান্না শিক্ষার এই শিক্ষক সাত বছরের ওপর জাপানীদের কাঁদতে সাহায্য করছেন। হিদেফুমি ইওশিদা মনে করেন কষ্ট চেপে রেখে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছেন জাপানের মানুষ।
যেহেতু চোখের পানির অসাধারণ কষ্ট লাঘবের ক্ষমতা আছে।তাই যে যত পারেন তত ক্লায়েন্টদের জোরে জোরে কাঁদতে বলেন এই শিক্ষক।

ঐতিহাসিক ভাবেই আত্মহত্যার সূচকে এগিয়ে আছেন জাপানীরা, জাপানী নারী পুরুষ নির্বিশেষে আত্মহত্যা প্রবণ। কারন হিসেবে বিভিন্ন গবেষণায় সংবাদে উঠে এসছে - এবং করোনা কালীন সময়ে সেটা আশংকা জনক হারে বৃদ্ধি পায়। টোকিও'র টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ওয়াতুরু নিশিদা বলেন, "বিষণ্ণতা এবং আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ বিচ্ছিন্নতা বা একা থাকার প্রবণতা।" "জাপানে একসময় বৃদ্ধ অভিভাবকদের দেখাশোনা করতো তাদের সন্তানরা, তবে বর্তমানে সেরকমটা হয় না বললেই চলে। বৃদ্ধাশ্রম বা হাসপাতালে একাকী মৃত্যুবরণের ঘটনা দিন দিন বাড়ছেই।"


ডু নাথিং রেন্ট অ্যা ম্যানঃ

সোজি মোরিমোত ৩৮ বছর বয়সী একজন জাপানীজ বর্তমানে সবচাইতে ব্যস্ত কিছুই না করা একজন হিসেবে। সমস্ত জীবন সোজি সহপাঠী এবং সহকর্মীদের মাঝে একজন ব্যাক বেঞ্চার এবং দর্শক সারিতে ছিলেন। বন্ধু সহকর্মী শিক্ষক সবার কাছেই এই উপাধি পেয়েছেন যে কিছুই করে না। সমালোচকরা বলতেন কিছু তো কর ভাই ! জীবনের এক পর্যায়ে সে নিজেকে কিছুই না করা হিসেবে মেনে নিয়ে টুটারে বিজ্ঞাপন দিলেন " ​​​​"Do Nothing Rent-a-Man," এরপর তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। কেনো ? সেটা আমি আপনি সবাই জানি !!

এদেশের মহিলারা অন্যরা কী ভাবছে এবং অন্যদের যাতে তাকে বোঝা মনে না করেন সে বিষয়ে চিন্তা করতে থাকে, যা কিনা ক্লান্তিকর। তাই এই আবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে অনেকেই এই ডু নাথিং ম্যান কে ভাড়া নিয়ে থাকেন।
লোকেরা আমাকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে," তিনি বলেছিলেন। "কিছু লোক একাকী। কেউ কেউ একা কোথাও সুন্দর আকর্ষণীয় স্থানে যেতে লজ্জা পায় - তারা চায় যে কেউ তাদের সাথে অনুভূতি ভাগাভাগি করুক।
একজন ভদ্র মহিলা প্রায় দিন ই শুধু টুকটাক গল্প আর কফি খাবার জন্যে দুই ঘণ্টার জন্যে বুক করেন। এ যেন নিজ ভূমে পরবাসের মত, নিজের অন্যদের কাছে ইমেজ রক্ষার্থে মুখোশ নিয়ে জীবন যাপন। সোজিও কে একবার একজন পুরুষ হায়ার করেছিলেন যিনি তার নিজের মায়ের চোখে অপরাধী ছিলেন এবং সংশোধন কেন্দ্রে তাকে পাঠানো হয়েছিলো। সেই ছেলেটি তাকে রান্না করে খাওয়াতে এবং গল্প করতে কিছু সময়ের জন্যে ভাড়া করেছিলেন।


রেন্ট অ্যা ফ্যামেলি কোম্পানিঃ

পাছে লোকে কিছু বলে !
ইশ পরীক্ষায় এমন খারাপ করলি ? প্রতিবেশী রা কী বলবে ?
এমন পরিবারে আত্মীয়তা করলেন ? না জানি সমাজে, লোকে কী বলবে!!!
এই কথাগুলো আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, পরিবারে নিত্যদিন ই শুনে আসছি। আপনি কী মনে করেন কেবল আমাদের সোসাইটি বা দেশে ই এই ভাবনার অথবা অন্যে কী ভবলো সেটাকে বড় করে দেখার চল আছে ?

অন্যেরা কী মনে করে জাপানিরা সেটা নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন থাকে। জাপানি সংস্কৃতি অতিথিপরায়ণ। অন্যের মতামত ও মূল্যবোধকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। " কিন্তু খারাপ দিকটা হলো যে আমরা নীতি নৈতিকতা নিয়ে বেশি চিন্তা করি এবং অন্যেরা কী মনে করবে সেটা নিয়েও উদ্বিগ্ন থাকি" আর এমন সব ভাবনা উদ্বিগ্নতা থেকে জাপানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন রকমের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। তেমন একটি প্রতিষ্ঠান ​​'ফ্যামিলি রোমান্স' ! প্রতিষ্ঠাতা - ইশি নামে ৩৫ বছর বয়সী একজন জাপানি যুবক। বর্তমানে এই 'ফ্যামিলি রোমান্স' কোম্পানিতে কর্মীর সংখ্যা ২,২০০। তাদের কাজ হলো যেসব পরিবার ভেঙ্গে গেছে সেসব পরিবারে পিতা, মাতা, ভাই বোন, কাজিন, চাচা মামা, খালা ফুপু, দাদা দাদী নানা নানীসহ বিভিন্ন আত্মীয়ের ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করা। তবে সবচাইতে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে বাবার চরিত্র।


এ দেশে প্রতি বছর দুই লাখ বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। ফলে অনেক পরিবারেই আছে শুধু একজন। সেখানে পিতা কিম্বা মাতাকে একা একাই সন্তানকে বড়ো করতে হয়। ইশি বলছেন, এসব পরিবার সমাজে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। এবং তার কোম্পানি এসব পরিবারের চাহিদা মেটাতে চেষ্টা করে। যদিও এই কাজ করতে আদর্শ কোন মডেল নেই যা সব পরিবারের বেলাতে একইভাবে কাজ করবে। "কেউ কেউ আছে তারা খুব নম্র ও ভদ্র ব্যক্তিকে পিতা হিসেবে চায়। কেউ কেউ পিতা হিসেবে চায় খুব কঠোর একজন মানুষ। আবার কেউ চায় সম্ভ্রান্ত কাউকে। কাস্টমারের চাহিদা অনুসারে আমরা তাদের পিতা সরবরাহ করতে পারি।"
তবে এই কাজটা করতে গিয়ে যা তার কাছে সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে সেটা হলো পিতার ভূমিকা পালন করার পর ওই শিশুটিকে বিদায় বলে তার কাছ থেকে চলে আসা। "ওই বাচ্চাকে বোঝানো খুব একটা সহজ কাজ নয়। একটা বাচ্চাকে কাঁদতে দেখলে ভীষণ কষ্ট হয়।


কর্মীরা ক্লায়েন্টদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও তার ব্যবসা পরিচালিত হয় পরস্পরের প্রতি সমঝোতা ও আস্থার ভিত্তিতে। উভয়পক্ষের মধ্যে যেসব সীমাবদ্ধতা আছে সেগুলোও তাদের মেনে চলতে হয়। যেমন তারা চুমু খেতে পারে না, যৌন সম্পর্ক করতে পারে না। হয়তো শুধু হাত ধরতে পারে।
৩০ ধরনের সার্ভিস দেওয়া হচ্ছে এখানে বর্তমানে। এবং প্রত্যেকটি সার্ভিসের জন্যে আছে আলাদা গাইডলাইন ও নীতিমালা। সেবার জন্যে একজন ক্লায়েন্টকে প্রতি চার ঘণ্টায় ১৮০ ডলার দিতে হয়। সাথে আছে পরিবহন ভাড়া ও খাবার দাবার। একজন একাকী বড় করা বাচ্চাদের মায়ের জন্য বেশ উচ্চ মূল্যের অবশ্যই, তবুও চাহিদার কমতি নেই। বাচ্চার ভবিষ্যৎ ভেবে অনেক মা এই খরচ টুকু মেনে নেন।


ফ্যামিলি রোমান্স কোম্পানির স্লোগান হচ্ছে: বাস্তবতা থেকেও সুখ বড় !
ইশির ৩৫ জন সন্তানের মধ্যে আছে ২০ বছর বয়সী এক কন্যা যিনি সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে ইশিই তার আসল পিতা। যেসব সমাজে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সমস্যা আছে সেখানে এধরনের সার্ভিসের চাহিদা অনেক তার মনে "আমরা যা হতে চাই তা হওয়া খুব কঠিন এবং সেটা খুলে বলাও আরো বেশি কঠিন। সমাজের যদি এরকম সার্ভিসের দরকার না হতো তাহলে সেটা ভাল হতো কিন্তু বাস্তবতা তো সেরকম নয়।"


ঠিক এই বাস্তবতা কে সামনে নিয়ে জাপান সরকার ​​দেশের আশংকাজনকভাবে কমে আসা জন্মহার ঠেকাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির পেছনে অর্থ ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেয়। লোকজন যাতে তাদের পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে বের করতে পারে, সেজন্যে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে কাজে লাগানো হবে।



ডিম্বাণু সংরক্ষণে সরকারি সহায়তাঃ ​​​​

জাপানে রাজধানী টোকিওর উপকন্ঠে উরায়াসু শহরের নারীরা যাতে নিজেদের সময় ও সুবিধামত বাচ্চা নিতে পারে তার জন্য নগর কর্তৃপক্ষ অভিনব এক সরকারি উদ্যোগে তাদের ডিম্বানু হিমঘরে জমিয়ে রাখার ব্যাপারে অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশ্বের কোনো দেশে জন্মহার বাড়াতে এটাই এধরনের প্রথম উদ্যোগ। তিনবছরের এক পরীক্ষামূলক প্রকল্পে সরকারি কোষাগার থেকে এই উদ্যোগের জন্য সাড়ে আট লক্ষ ডলার সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

বিশ্বে যেসব দেশে জন্ম হার সবচেয়ে কম, জাপান তার একটি। সেখানে জন্ম হার কমছে বহু বছর ধরে, ফলে এখন জাপান মূলত প্রবীণদের দেশে পরিণত হয়েছে। এই ডিম্বাণু জমা রাখার প্রসেস ১০ থেকে ১৪ দিন লাগতে পারে, এবং তা দশ বছর পর্যন্ত বরফে জমা রাখা যাবে। ডিম্বাণু জমা রাখার এই সুবিধা নিয়ে অনেকেই ২০ থেকে ২৪/ ২৮/ ৩০ বছরের মাঝে নিজেদের ডিম্বাণু ফ্রোজেন ব্যাঙ্কে জমা রাখছেন। পরে সুবিধা মত ৩০/ ৩৮/ ৪০/ ৪১ বছর বয়সে সন্তান ধারণ করছেন। কেউ হয়ত বর্তমানে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত , কারো এই মুহূর্তে পছন্দের সঙ্গী নেই, কেউ বা বর্তমানে বেকার। এমনি সব নানাবিধ কারনে , জাপানী মেয়েরা সন্তান ধারণ ও জন্মদান থেকে দূরে থাকছেন।

এবং সর্বশেষ ব্যবসায়িক সেবা !!!!!


জুহাতসুঃ

এই জাপানি শব্দের অর্থ বাষ্পীভবন বা হাওয়া হয়ে যাওয়া। যেসব লোক উদ্দেশ্যমূলকভাবে লুকোতে চায় তাদেরকে বোঝাতেও এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এভাবে লুকিয়ে যাওয়ার পিছনে অনেক কারন থাকে। প্রেমে ব্যর্থতা , ব্যবসায়িক ঝামেলা , পরিবারের মাঝে মনমালিন্য , ঋণ পরিশোধ না করা, ভালোবাসা বিহীন বিয়ে। এমন নানা কারন। চাকরি হারানো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝড়ে পরা।

এদের মাঝে একজন সুগিমোতো ! তিনি বলেন, যে ছোট্ট শহরে তিনি ছিলেন তার পরিবারের কারণে সেখানে সবাই তাকে চিনতো। কারণ তাদের ব্যবসা স্থানীয় লোকজনের কাছে বেশ পরিচিত ছিল। পরিবারটি আশা করছিল যে সুগিমোতো এই ব্যবসার হাল ধরবেন। কিন্তু এই দায়িত্ব নিয়ে সুগিমোতো এমন চাপের মধ্যে পড়েন যে তার মধ্যে মানসিক অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং তিনি খুব দ্রুত চিরদিনের জন্য ওই শহরে ছেড়ে চলে যান। কোথায় যাচ্ছেন সে কথাও কাউকে বলেন নি।

কারণ যা-ই হোক না কেন, তারা তখন এমন কিছু কোম্পানির কাছে যান যারা তাদেরকে উধাও হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করে। এধরনের কাজকে বলা হয় "রাতে সরে যাওয়ার" সার্ভিস। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে "জুহাতসু" হয়ে যাওয়ার গোপন প্রক্রিয়াকেই অনুমোদন করা হয়। যেসব লোকজন উধাও হতে চান তাদেরকে গোপনে জীবন থেকে সরে যেতে সাহায্য করে এসব কোম্পানি। এমনকি গোপন স্থানে তাদের থাকারও ব্যবস্থা করে দেয়।


​​জাপানে বিবাহ বিচ্ছেদের হার খুব কম ছিল। ফলে অনেকেই ডিভোর্সের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে একদিন হঠাৎ করেই তাদের স্বামী বা স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যায়। দেশটিতে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিরা তাদের পরিচয় না দিয়েও মুক্তভাবে এটিএম থেকে অর্থ তুলতে পারেন। এছাড়াও পালিয়ে যাওয়া এই ব্যক্তি যদি গোপন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো ক্যামেরাতে ধরাও পড়েন, তার পরিবারের সদস্যদের ওই ভিডিও দেখতে দেওয়া হয় না।

"অন্য কোনো কারণ না থাকলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করবে না- যেমন কোনো অপরাধ বা দুর্ঘটনা। পরিবারগুলো চাইলে হয়তো ব্যক্তিগত গোয়েন্দাদের অর্থ দিয়ে কাজে লাগাতে পারে। অথবা পারে শুধু অপেক্ষা করতে। এর বাইরে কিছু করার নেই।"

তথ্যসূত্রঃ
Hikikomori, A Japanese Culture-Bound Syndrome of Social Withdrawal? A Proposal for DSM-V
Japanese city helps women freeze eggs to boost birth rate Published
Meet Japan's very busy "Do Nothing Rent-a-Man"
টোকিওর তরুণ বিয়ে করলেন অ্যানিমেশন চরিত্রকে
জাপানে বহু শিশু স্কুলে যেতে অনাগ্রহী
সিলিকন ভালোবাসায় মগ্ন জাপানিরা
জাপান: যে দেশে বৃদ্ধরা ইচ্ছে করে কারাগারে যেতে চায়
জাপান কেন আত্মহত্যা প্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত?
জাপানের মানুষ কাঁদে না, তাই মানুষকে কাঁদতে শেখাচ্ছেন যে শিক্ষক
পরিচিত গন্ডি থেকে চিরদিনের জন্য ডুব দিতে মানুষকে সাহায্য করে যেসব কোম্পানি

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ গুগোল।

ফিচার পোষ্টঃ জানা অজানা!






সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই নভেম্বর, ২০২২ সকাল ১১:২৬
৩০টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রবাস ডাইরিঃ ২য় পর্ব

লিখেছেন মুহাম্মদ তমাল, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ রাত ১:০৮



স্বপ্ন সত্যি হবার এক বছর।
আগস্ট ২০২২,
গতবছরের এই অগস্ট মাস ছিলো জীবনের কঠিনতম মাস গুলির একটা।
কতটা বিষণ্ণা, মর্মান্তিক, কঠিন ছিলো এই মাস এটা আমি জানি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেদিনও বৃষ্টি ছিল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ রাত ১:৩৯

ছবিঃ আমার তোলা।

ওরা আসে। হ্যাঁ অবশ্যই আসে।
গভীর রাতে। তখন চারিদিক অন্ধকার। ঝিঁঝিঁ পোকা সমানে ক্লান্তিহীন ভাবে ডাকতেই থাকে। পাতায় পাতায় ঘষা লেগে মিহি একটা শব্দ হয়। বইতে থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিদায় বেলায় - ২৬

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ সকাল ১০:৪৮

ভিন্ন সময় বিভিন্ন যায়গায় বেড়াতে গিয়ে বেশ কিছু সূর্যাস্তের ছবি আমি তুলেছি আদিতে, এখনো তুলছি সুযোগ পেলেই। সেই সমস্ত সূর্যাস্তের ছবি গুলি বিভিন্ন সময় ফেইসবুকে শেয়ার করেছি। সেখান থেকে ৫টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

৮ম শ্রেণি পাশ নারী প্রধানমন্ত্রী হতে পারলে হিরো আলম কেন এমপি হতে পারবে না?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ১:০৫


বগুড়া ৪-৬ আসনে নির্বাচন হলো। সম্ভাবনা জাগিয়েও হিরো আলম স্বল্প ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। ওনার অভিযোগ ভোট গণনায় কারচুপি হয়েছে। ওনাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ওনি বলছেন, ওনার মতো অশিক্ষিত লোককে স্যার সম্ভোধন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্ক্সের অবৈধ সন্তান.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ বিকাল ৩:৫১

মার্ক্সের অবৈধ সন্তান.....

শ্রেণি-সংগ্রামের তত্ত্বকথায় যিনি প্রবাদপুরুষ, তিনি বাড়ির পরিচারিকার কাছ থেকে ‘ফায়দা’ নেবেন, চরম শত্তুরেও তা মানতে চাইবে না। কিন্তু ইতিহাসের বড় একটা অংশ বলছে, ঘটনা কতকটা তা-ই। সময়টা ১৮৫০।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×