somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বেলা যে যায়... : ০৩

০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ১০:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাঝ রাত্রিতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে অদ্ভুত সব চিন্তা এসে ভিড় করে। বহু বছর আগে একবার হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল, তখন হয়তো রাত তিনটে-সাড়ে তিনটে হবে। চোখ খুলতেই দেখি আমার স্ত্রী ঘুমুচ্ছে। মুখটা ঠিক আমার চোখ বরাবর। জানালা গলে পূর্ণিমার আলো লেপ্টে আছে ওর গালে। দেখতে ওকে অন্য জগতের কোনো মানবী মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমার মনে হঠাৎ উদয় হলো এই সময় যদি ওর নাক-মুখ বালিশ দিয়ে চেপে ধরি তাহলে কি হবে? ও মরে যাবে!
তারপর?

সবাই খুব কান্নাকাটি করবে হয়তো। কিন্তু কেউ ঘুণাক্ষরে কল্পনাও করতে পারবে না ওকে আমি হত্যা করেছি। বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছি। এই উদ্ভট চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিলাম ভোর হওয়া পর্যন্ত। সেদিন জায়নামাযে হঠাৎ খুব কান্না পেয়েছিল, নিজেকে খুব নিকৃষ্ট আর ভয়ংকর মনে হচ্ছিল। পরে আমার স্ত্রী মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিল, “মা’র কথা মনে পড়ছে? যিয়ারত করে আসবে?”
সেদিন তাকে কোনো জবাব দিইনি।

আজও ঘুম ভাঙতেই উদ্ভট এক চিন্তা পেয়ে বসল। আত্মজীবনী লিখলে কেমন হয়? এই তো একা আছি, লেখালেখির এই তো সুযোগ। আজকাল আত্মজীবনী নিয়ে খুব আলোচনা-সমালোচনা হয়। আমার জীবনী নিয়েও কি তেমন কিছু হবে? মনে হয় না। রসকষহীন মানুষ আমি। জীবনী লিখতে বসলেই হয়তো তত্ত্বকথা লিখে ভরিয়ে ফেলবো। প্রাণহীন, তামাশাহীন ওই তত্ত্বকথা পড়বে টা কে? তার চেয়ে যদি নিজের কোনো নষ্টামি তুলে ধরি, কোনো নারী-কেলেংকারী কিংবা খুন-টুন জাতীয় কিছু, তাহলে হয়তো কিছু পাঠক পাওয়া যাবে। খুব আলোচনা-সমালোচনা পাওয়া যাবে। বইয়ের কাটতিও হয়তো বেড়ে যাবে।

ধুর ছাই! এই সুবহে সাদিকের সময় কোন ভুতে যে পেয়েছে কি সব অবান্তর ভাবনায় সময় ক্ষেপণ করছি!

মুয়াজ্জিন মাইক দিয়ে ডেকে দিচ্ছেন সবাইকে। ফজরের আযানের আগে এই কাজটা তিনি নিষ্ঠার সাথে নিয়মিতই করেন। নামাযের সময় হয়েছে, ঘুম থেকে জাগতে বলেন। মুয়াজ্জিনের এত ডাকাডাকির পরও আমরা ছ’সাত জন বুড়ো আর দু-চারজন ছোকরাই কেবল জেগে উঠি।
আমিও হয়তো উঠতাম না। যদি না শেষের বাঁশির প্রহর গুণতাম!

আরিফ নামায সেরে কুর’আন নিয়ে বসে। কি সুমধুর সুরে সুললিত কন্ঠে যে তিলাওয়াত করে! আমি বসে বসে শুনি। ওর কন্ঠটা ভারী মিষ্টি। ছেলেবেলায় ওকে হিফজখানায় ভর্তি করিয়েছিল ওর বাবা। আজগরের খুব শখ ছিল একমাত্র ছেলেটা হাফেজ হবে, ওর জানাযা পড়াবে। আরিফ হাফেজ হতে পারেনি ঠিক, তবে বাবার জানাযা ঠিকই পড়িয়েছিল।

২২ পারা পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। তারপর আরিফের মাথায় কোন শয়তান যে ভর করলো, পালিয়ে গেল হিফজখানা থেকে। ওর বাবা কত দূর দূরান্ত থেকে ওকে ধরে নিয়ে আসত, পেটাতো। আবার দিয়ে আসত হেফজখানায়। কিন্তু আরিফের তখন কুকুরের লেজের চেয়েও ভয়ংকর অবস্থা। কুকুরের লেজ তো তা-ও চোঙের ভেতর সোজা থাকে, আরিফের সে অবস্থাও ছিল না। সাধারণ চড়-থাপ্পর থেকে বেদম মারেও কিছু হলো না। রশি দিয়ে বেঁধে, গাছের সাথে বেঁধে পেটালেও যেনো তার কোনো বিকার নেই। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বোঝালেও হয় না, মেরে ফেলার ভয় দেখালেও কিছু হয় না। কিছুতেই কিছু হয় না।

হিফজখানার হুজুররা কি মারটাই না দিলেন! তাও ওর বোধ হলো না। শেষ পর্যন্ত আজগর হাল ছেড়ে দিল। ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিল। সেখানেও সে পড়বে না। তিন-চার বছর মতো হবে বোধহয় টো টো গিরি করেই কাটিয়ে দিল। অনেকে চিকিৎসা করতে বললেন। একটা মাত্র ছেলে। আজগরও তাই যেভাবেই হোক ছেলে সুস্থ করতে পীর-ফকির থেকে বড় বড় নিউরো ও মানসিক ডাক্তার পর্যন্ত সবার শরণাপন্ন হয়েছিল। কোনো ফল হয়নি। শহরে ডাক্তার দেখাতে আসলে ওরা আমার বাসাতেই উঠত। খুব দুঃখ করে বলত, “ভাইজান, আল্লাহ আমাকে একটাই ধন দিয়েছেন। সেটা নিয়েও তিনি আমাকে এত বড় পরীক্ষায় কেন ফেললেন?” আমি চুপ করে থাকতাম। ওর কান্না দেখতাম। এছাড়া আর কী-ই বা করার ছিল আমার?

একবার তো মজার এক কান্ড করে বসেছিল আজগর। ছেলেকে আমার কাছে এনে বলেছিল, “ওর মাথায় হাত রাখেন ভাইজান। আপনার মতো পবিত্র মানুষের ছোঁয়া ছাড়া আমার ছেলেটা ঠিক হবে না।”
চোখে পানি চলে আসলেও আড়াল করে হেসে উঠেছিলাম। “কি সব পাগলামি করিস তোরা!” বললেও মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম। মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলার মতো শক্তি আমার তখনো ছিল না, এখনো নেই। চাইলে আমার মনুষ্য সত্ত্বার নোংরা অংশটার স্বীকারোক্তি হয়তো করা যায়। কিন্তু সে সাহসও আমার নেই। এই ঢের ভালো আছি। মানুষ আমাকে শুদ্ধ ও সাচ্চা ভাবুক!

আরিফের উড়নচন্ডী ভাব আরো বছর খানেক ছিল। তারপর জাদুমন্ত্রের মতো সব ঠিক হয়ে গেল একদিন। আরিফ একটা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষা দিল। ফাযিল নাকি কামিল, ওদের হিসাব আমি ঠিক বুঝি না; পাশ করলো। ছেলের জন্য আজগর চমৎকার একটা মেয়েকে বৌ করে আনলো। ক্ষেত-খামার, ব্যবসা নিয়ে ভালোই আছে এখন আরিফ।

আজগর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিশ্বাস করত, আমি মাথায় হাত রেখেছিলাম বলে তার ছেলের কপালে এমন শান্তি আর সমৃদ্ধি জুটেছে। আরিফ আর তার বৌয়ের বিশ্বাসও তার ব্যতিক্রম কিছু বলে মনে হয় না।

একটু পর আরিফের বউ হয়তো চা-মুড়ি নিয়ে হাজির হবে। সেসব খেতে খেতে আমি ভাবনার মহাসমুদ্রে ডুবে যাবো। সেই সমুদ্রে যদি তলিয়ে যেতে পারতাম! সাঁতরে যদি তীরে আর না ভিড়তে হতো!

ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে পাখির কলরব শুনি, মোরগের ডাক শুনি। আরিফের সুমিষ্ট তিলাওয়াত শুনতে শুনতে আঁধারের উপর ধীরে ধীরে সূর্যটা কেমন প্রভাব ছড়ায় তা দেখি। হিম ঠান্ডায় ভোরের আত্মপ্রকাশ দেখাটা কত যে আনন্দদায়ক, শহুরে জীবনে কোনোদিন বুঝতে পারিনি!

বেলা যে যায়... : ০১
বেলা যে যায়... : ০২
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ১০:৫২
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হে কাক! কালো কাক!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:১৭



আমার জীবনে আমি কোনো দিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারিনি। কিন্তু রাস্তা ঘাটে এই কাজটি করতে অনেককেই দেখেছি। আজ পান্থপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, তখন আমার প্রস্রাব পেলো। রাস্তায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নোটবুকের প্রথম পাতা

লিখেছেন  ব্লগার_প্রান্ত, ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:২৬



সব ঋতুতেই সন্ধ্যেবেলাটা স্বর্গীয়। সূর্যের শেষ আলোটুকু মেঘেরা ভাগ করে নেয়।সেই আলো, একেকদিন একেক রংয়ের।আজ বিকেলে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় দাঁড়ালাম। একটা ছোট্ট দোয়েল, একটু পরপর সতর্ক হয়ে শিস দিচ্ছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাহরা তাবাসসুম রোজা (পরী)

লিখেছেন সনেট কবি, ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:০৫



যাহরা তাবাসসুম রোজা(পরী) থাকে
পিতা রাজীব নুর ও মাতা সুরভীর
স্নেহের ছায়ার তলে। অন্তরে গভীর
রয়েছে তাদের কন্যা, সুপ্রিয় সন্তান।
পরীর নির্মল কান্তি সারল্যের তাকে
করেছে গ্রহণযোগ্য নয় যে অস্থীর
অযথা চঞ্চলতায়।ভাল আপুজীর
মাঝে আছে অনুপমা গুণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি কেন মুসলিম?

লিখেছেন সনেট কবি, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ সকাল ৭:১১



আমি কেন মুসলিম? কারণ আমার
বিশ্বাস, ইসলামের সব কথা ঠিক,
এর বিপরীত কিছু নয়তো সঠিক,
সেজন্য মানি না আমি সেরকম কিছু।
তুলনা করেছি আমি অন্যের কথার
কিছুতে আমার মন ফিরেনি সে দিকে
ইসলাম মান্যতায় থেকে প্রাত্যহিক
ঘুরিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট্ট সোনামনিদের জন্য ছড়ায় ছড়ায় বাংলা অক্ষর পরিচয় (ইসলামী ভাবধারায় লেখা), পর্ব-০১

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ সকাল ৯:৫৬



ছোট্টমনিদের জন্য সচরাচর বাজারে যেসব বই পাওয়া যায়, মনোপুত হয় না। আমার এই প্রচেষ্টাও খুব যে ভালো কিছু হয়েছে, তাও মনে হয়নি। আসলে এটা প্রাথমিক প্রচেষ্টা। পরামর্শ এবং সহযোগিতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×