somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাঁওতাল পল্লীতে

২৯ শে নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাঁওতাল পল্লীতে
-------------------------------------------------

(পর্ব-৩)

মৃদু হেসে বাবা নেন পানি খান। হাসির কারনে তার ঠোট দুটো যতটুকু ফাক হয়েছে তাতেই তার সাদা ঝকঝকে দাতগুলো দেখা যাচ্ছে।জি আচ্ছা বলে তার হাত থেকে গ্লাসটি নিজের হাতে নিয়ে নিলাম। গ্লাসে এক চুমুক দিয়ে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে তৃষ্ণা নিবারন করে মনে হলো মরুভূমিতে পানি ঢালছি।কত জনম ধরে এখানে কোন বৃষ্টির দেখা নেই সব খা খা করছে।বাবা এই নেন গরিব গো বাড়িতে শুধু খালি পানিই খাইবেন। এই চাল ভাজা টুকু খান। আমরা গরিব মানুষ বাবা, এর বেশি ঘরে কিছু নাই।আমার সাথের বন্ধুরা সবাই হা করে এসব দেখছে। কারো মুখে কোন কথাই নেই।কথা থাকবে কি করে ওদের মতে আমি তো ভিন গ্রহের কারো বাড়িতে অতিথিয়তা গ্রহন করছি।সেখানে ওদের সামিল হওয়ার প্রশ্নই আসে না।বাটি হাতে নিয়ে দু মুঠ চাল ভাজা মুখে পুরে চাবাতে চাবাতে বাটিটা ওনার হাতে দিয়ে বললাম, নিন আর খেতে পারছি না। কিন্তু পেট তো ভিন্ন কথা বলে। সেই সকাল ৭ টার সময় বাড়িতে একটু নাস্তা করে বেরিয়েছিলাম।পথে কলেজের পিকনিক আয়োজকদের তরফ থেকে একটা পাউরুটি, একটা লাড়ু,আর একটা কলা সকালের নাস্তা হিসেবে পেয়েছি সবাই।সে নাস্তা তো সেই গাইবান্ধা পার হতে হতেই সাবাড়।তারপর পেটে আর কিছু পড়েনি।এখন বিকাল ৩ টার কাছাকাছি। এতোক্ষন না খেয়ে পেট খালি চো চো করছে।কিন্তু উপায় নেই জঙ্গলে তো আর শহরের মতো খাবারের দোকান নেই যে মন চাইলেই কিছু কিনে পেটের রাক্ষস টাকে ঘুমাতে পাঠাবো।পাবোই বা কি করে এখানে একটা লজেন্স যে কিনবো সে রকম দোকানও কোথাও দেখলাম না।পেট ভরাতে হলে আবার সেই বন বিভাগের স্পটে যেতে হবে। কেননা ওখানেই আমাদের জন্য খাবার রান্নার সব বন্দোবস্ত করা হয়েছে।গেলেই গরম গরম প্লেটে ঢালবে,আর তাতেই পেটের রাক্ষস ক্ষান্ত।সেতো এই জঙ্গলের ঐ--- পাড়ে।

যাই হোক বাটিটা ওনার হাতে দিয়ে বললাম আর খাবো না।উনার প্রশ্ন এই দুই মুঠ খেয়েই কি হয় বাবা আর একটু নেন।আমি না না আর না, বলে গ্লাসের বাকী অর্ধেক পানিটুকু গলায় ঢাললাম। আমার ফেরত দেওয়া চাল ভাজা উনি তখন বাকিদের খেতে বলতেই সব না না করে উঠলো।না না আমরা খাবো না।কয়েকজন তো আমার দিকে এমন ভ্রু কুচকে বারবার তাকাচ্ছে যেন আমার সাথে ওদের কয়েক জন্মের শত্রুতা।

এবার আমরা সাঁওতাল পাড়ার অন্য বাড়িতে যেতে চাইলে বাড়ির অন্য এক সাঁওতাল পুরুষ জানালো এখন পাড়াতে কেউ খুব একটা নেই।সবাই জমিতে আর জঙ্গলে কাজে গেছে।তারাও কাজে গেছিলো দুপুরে খাবারের জন্য বাড়িতে এসেছে।এখন খাওয়া শেষে আবার সবাই জঙ্গলে আর জমিতে কাজে যাবে।ওদের কথা শুনে এটা নিশ্চিত হলাম যে, সাঁওতাল পুরুষ নারী সবাই খুব কর্মঠ।ঘরে বসে থাকার মতো মানুষ এরা নয়।অবশ্য সে প্রমান সাঁওতাল পাড়ায় আসার আগেই তো দেখেছি।মাঠে আর জংগলে সবাই কিভাবে কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। জঙ্গলে আসার সময় জেনেছিলাম সাঁওতালরা নাকি খুবই ভয়ংকর,এরা আমাদের মতো বাঙ্গালীদের দেখতে পারে না।দেখলেই বড় বড় দা নিয়ে তেড়ে আসে। কিন্তু এখানে এসে এদের অতিথিয়তা দেখে মনেই হচ্ছে না আমরা অন্য একটা জাতির বাড়িতে পারমিশন ছাড়াই ঢুকে ওদের দেয়া চাল ভাজা গিলছি আর ওরা আমাদের দেখে কিছুই বলছে না।বরং তারা আমাদের ভালো কিছু খাওয়াতে পারলো না বলে আফসোসের শেষ নেই। এবার তাদের ঝামেলা আর না বাড়িয়ে আমরা বিদায় নিলাম। সাঁওতাল বাড়ির বাইরে এসে ছবি তোলার লোভ আর সামলাতে পারছি না।সাথে ৩০ নেগেটিভ ওয়ালা ফিল্মের ক্যামেরা নিয়েগিয়েছি কি সাধে।সেতো ছবি তুলবো বলেই নাকি! এখানে একটা ঘটনা আছে।ক্যামেরা আমার, ফিল্মও কিনে নিয়ে গিয়েছি আমি, কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর রাসেল আর রনি ভাগ বসালো। ওদের কথা ওরাও ছবি তুলবে আলাদা আলাদা করে।কিন্তু ওদের কাছে কোন ক্যামেরা নেই।তাই আমার এখান থেকে ওদের দুজন কে ৭টা ৭টা করে ১৪ টা ধার দিতে হলো।অবশ্য ১৪ টা ছবি তোলার বিপরীতে পরে টাকা দেওয়ার চুক্তিতেই কেবল রাজি হয়েছিলাম।

সাঁওতাল বাড়ির বাইরে ঘরের দেওয়ালে যেসব কারুকার্য খচিত লতাপাতা, পাখি আকা ছিলো সেগুলোর সাথে দাড়িয়ে কয়েকটা ছবি তুললাম।ওরাও ছবি তুললো বিভিন্ন স্টাইলে দাড়িয়ে।তবে গ্রুপ ছবির চাইতে একক ছবিই তোলা হলো বেশি। কেননা সবাইকে যে হিসাবের মধ্যেই ছবি তুলতে হবে।আমরা সাঁওতাল পাড়ার অন্য বাড়িগুলোতে আর গেলাম না, সোজা আবার সেই মাটির সরু রাস্তা ধরে জঙ্গলের দিকে হাটা শুরু করলাম।তবে এবারের যাত্রা ঠিক জঙ্গলের অন্য পথে মানে দূর থেকে দেখাই যাচ্ছে জঙ্গলের ও ধারে একটা উচু পাড় বাধানো পুকুর।

একটু এগতোই বাঙ্গালীদের মতো শাড়ি পরিহিত এক সাঁওতাল মহিলার সাথে দেখা।তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন যে আমরা কোথা থেকে এসেছি? বিপুলের দোলনের উত্তর আমরা বগুড়া থেকে পিকনিকে এসেছি।আর এখানে সাঁওতাল পাড়া বেড়াতে এসেছি।তিনি বললেন ও আপনাগো সাথে তালে আরো অনেকে আছে।চার্চ এর ঐদিকে দেখলাম আরো কয়জন।আপনাগো পিকনিকেরই হইবো।চার্চ ----? মানে এখানে চার্চ ও আছে আমাদের বিস্মিত প্রশ্ন? মহিলা উত্তর দিলো হুম ঐ যে পুকুর পাড় দেখতাছেন না,? ওর ঐ পাড়ে আমাগো চার্চ আছে।তার মানে আপনারা সবাই খ্রীষ্টান? প্রশ্নটি আমার অজান্তেই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো।হুম আমরা যারা এই পাড়াই আছি তারা সাবাই খ্রীষ্টান। আগে আছিলাম না।এখন সগলেই খ্রীষ্টান হইছে।এতোক্ষন কিন্তু আমাদের মাথায় এ প্রশ্ন আসেনি তারা কোন ধর্মের।কিন্তু এখন এই মহিলার কাছে জানতে পারলাম এরা সবাই খ্রীষ্টান ধর্মের।কিন্তু সেই সাথে এটাও জানা হলো এরা আগে অন্য ধর্মের ছিলো।কিন্তু এখন খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহন করেছে।কিন্তু আগে কোন ধর্মের ছিলো সেটা জিজ্ঞেস করার কথা বেমালুম ভূলে গেলাম।কারন আমাদের চোখের সামনে তখন খ্রীষ্টান চার্চ দেখার প্রবল আগ্রহ বারবার দৃশ্যপট হয়ে ভেসে চলছে।এর আগে কখনো খ্রীষ্টানদের উপাসনালয় বা চার্চ দেখার সৌভাগ্য হয়নি।আর দেরি না করে ওনার থেকে চার্চে যাবার রাস্তাটা দেখিয়ে নিয়ে সোজা সেদিকে হাটা শুরু করলাম।

পুকুরের পাড় পার হয়ে আমরা আরেকটা রাস্তার দেখা পেলাম।সেটেও সেই আগের রাস্তার মতোই সরু অজগর সাপের মতো আঁকাবাঁকা আর মাটির ধূলোর কারখানা।আমরা সেই রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোতেই চার্চের মাথায় স্থাপিত যোগ চিহ্নের মতো দেখতে পেলাম।যেটা একদম চার্চ টা ঠিক কোথায় সেটাই নির্দেশ করছে। চার্চের চারিদিকে কাটাতার দিয়ে ঘেরা।কাটাতার গুলো বেয়ে বেয়ে অসংখ্য বিভিন্ন প্রজাতির লতাপাতার গাছ একধরনের সবুজ দেয়ালের সৃষ্টি করেছে।দেখে মনে হবে কোন সুদক্ষ কারিগর ওগুলো কাটাতারের সাথে ঝুলে দিয়েছে।---------------

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:০১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাবলিগে গিয়ে যা শিখলাম না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, তখন আমার কয়েকজন বন্ধু তাবলিগ করত। তাবলিগের প্রতি আমার কখনোই আগ্রহ ছিল না। তবে ওরা নিজেরা রান্না করত, আর আমি রান্না করতে পছন্দ করি। তাই একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×