
এ সময়ের প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণ, কোন সংকটে কি বললেন তার জন্য দেশবাসী তাকিয়ে থাকে না। জন মানুষের কাছে তার বক্তব্য গুরুত্ব বহন করে না। কেন এমন দৈন্যদশা তাঁর। দেশের প্রধান কবিকে কেন জনগণ একটুকুও গুরুত্ব দিতে চায় না? তার কারণ তিনি নিজেকে হালকা করতে করতে ওজনহীন করে ফেলেছেন। কোন কবি পুরস্কারের প্রত্যাশা করতেই পারেন কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার জন্য এতোটা হাপিত্তেশ করতে পারেন না। হাজারোভাবে আনুগত্য প্রকাশ করার পরেও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তাকে পুরস্কার আদায় করে নিতে হয়। ব্যক্তিত্ব গঠন করতে দেশের সকল কবিই ব্যর্থ হয়েছেন। দেশে প্রভাববিস্তারকারী কোন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক বা বুদ্ধিজীবীও নেই। গ্রীসের দার্শনিকদের প্রভাব দেখেছি। সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দিতে গিয়ে কী বিপুল আয়োজনই না করতে হয়েছিল। সেই রেশ আজও রয়েছে। ইউরোপের লেখক ও দার্শনিকদের প্রভাব দেখেছি। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো, হেনরিক ইবসেন, জ্য পল সাত্র, সিমন দ্য বোভোয়ার, বার্রা।রন্ড রাসেল, আলবেয়ার কাম্যু, দার্শনিক জন লক, ফ্রান্সিস বেকন, জাঁ জাক রুশো, ভলতেয়ার, ইমানুয়েল কান্ট, কার্ল মার্ক্স, ফ্রেডরিক হেগেল, ফ্রেডরিক নিৎশে, সিগমুণ্ড ফ্রয়েড এবং আরো শত শত লেখক-দার্শনিক, বিজ্ঞানী বিপুল শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। তাদের বিপুল প্রভাবেই ইউরোপ বদলে গিয়েছিল।
জ্যঁ পল সার্ত্রের কথাই বলি। একজন দার্শনিক ও লেখক হিসেবে কেমন প্রভাব বিস্তার করতেন সমাজে? প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়াতেন, প্রয়োজনে নিজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও। রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা পেয়েছেন কিন্তু আপোষ করেন নি। আলজেরিয়ার সাথে অন্যায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সার্ত্রসহ ১২১ জন বুদ্ধিজীবী ফ্রান্সের যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে আলজেরিয়ার স্বাধীনতার জন্য সমর্থন দিয়েছিলেন। তারা গ্রেফতারও হয়েছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জোয়ারে প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ড জেনারেল দ্য গল, সার্ত্রকে সম্মানের সাথে চিঠি লিখতে বাধ্য হয়েছিল। তাকে এক নজর দেখার জন্য বা তাঁর পাশে একটু হাঁটার জন্য মানুষ চেষ্টা চালিয়ে যেতো। তার বাসস্থান থেকে সকালে পত্রিকা কেনার জন্য বের হলে সাধারণ মানুষের সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অনেক বুদ্ধিজীবীও তার সঙ্গ পাওয়ার জন্য, একটু কথা বলার জন্য তার চারপাশে ভীর জমাতো। সার্ত্রের পাশে হাঁটাও অনেক গর্বের মনে করতেন তারা। সার্ত্র কোন এনভেলপের উপর কমল রেখেছিলন সেটা দখলের জন্যও কাড়াকাড়ি পড়ে যেতো। সিগারেটের পরিত্যক্ত পাছা নিয়ে একটি ঘটনা রয়েছে। কেউ একটি সিগারেট খেয়ে তা জ্বলন্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল। সার্ত্র তা জুতো দিয়ে মাড়িয়ে নিভিয়ে দিয়েছিলেন। সাথে সাথেই একজন ভাস্কর তা নিয়ে নেন এবং একটি ভাস্কর্যে তা ব্যবহার করেন। ফ্রান্স ভ্রমণের সময় এক সন্ধ্যায় সোভিয়েত রাষ্ট্রনেতা ব্রেজনেভ এর দাওয়াত ছিল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হাউজে। একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পলাতক বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ছিল সার্ত্রের। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন ফ্রান্সের বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ। সারা বিশ্বের শতাধীক রেডিও ও টিভি ক্যামেরা প্রচার করে সেই অনুষ্ঠান। প্রেসিডেন্ট হাউজের অনুষ্ঠান মিডিয়ার কাছে গুরুত্ব হারিয়েছিল। সার্ত্রের লোভ ছিল না। তিনি ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কারও প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি প্রতিষ্ঠান বিরোধী ছিলেন এবং মনে করতেন এতে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশিত হবে। তিনি মারা গেলে সুবিশাল শোকমিছিলে হেঁটেছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ। অথচ তিনি ছিলেন নাস্তিক, বিয়ে না করেই থাকতেন লেখিকা সিমন দ্য বোভোয়ারের সাথে। ফ্রান্সের মানুষের উপর এতোটাই প্রভাব বিস্তার করতে সার্ত্রে। এমন প্রভাব আমরা আরো অনেক লেখক/দার্শনিক এর মধ্যেও দেখি।
আসুন আমরা এবার তুলনা করি আমাদের লোভী ও নতমস্তকে অনুগত থাকা লেখক/বুদ্ধিজীবীদের সাথে। আমাদের ইনারা জনমানুষের কথা বলেন না, জনমানুষও তাদের কাছে নিজেদের আগামীকে উপলব্ধি করে না। ইনারা মানুষের মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার কথাও বলেন না। ইনারা ভাবেন নিজে কি কি সুবিধা পেলেন না আর অমুকে অতিরিক্ত কি কি সুবিধা পেল। কে কে সরকারী অনুদানের টাকা আত্মসাৎ করতে সক্ষম হলেন তারা খুশি আর যারা পারলেন না তা অসুখি বোধ করেন। জনগণ ইনাদের কেন সম্মানের আসনে বসিয়ে মাথার তাজ করে রাখবেন তা আর খুঁজে পান না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

