
ভাস্কর্য ও মূর্তির মধ্যে একটি আভিধানিক পার্থক্যতো রয়েছেই। মূর্তি বলতে মাটি, পাথর, ধাতু, সিমেন্ট বা কাঠ দিয়ে তৈরি দেবতার অবয়বকে বুঝানো হয় যাকে পূজা করা হয়। এর অন্য নাম হল- বিগ্রহ বা প্রতিমা। ভাস্কর্যও মাটি, পাথর, ধাতু, সিমেন্ট বা কাঠ দিয়ে তৈরি এমন শিল্পকর্মকে বুঝায় যার মূল উদ্দেশ্য কোন ব্যক্তিত্ব-ঘটনাকে তুলে ধরে সৌন্দর্যতা বৃদ্ধি। ভাস্কর্যে দেবতার অবয়ব থাকলেও তা পূজা করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয় না। যেমন ইন্দোনেশিয়াতে হনুমানের ভাস্কর্য রয়েছে যা সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটিকে মূর্তি বা বিগ্রহ বলা যায় না।
আমাদের ধর্মগ্রন্থে ছবি তোলা বা সংগ্রহকে হারাম করা হয়েছে। মূর্তি বা ভাস্কর্যকেও হারাম করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়- ছবি বা মূর্তিতে যেহেতু প্রাণ দেয়া যায় না সেহেতু এগুলো নির্মাণ করা যাবে না। আল্লাহ কেয়ামতের দিন বলবে, এগুলোতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করো। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, কোন প্রাণির বেঁচে থাকার জন্য প্রাণ বলতে কিছু লাগে না অর্থাৎ প্রাণ বলতে কিছু নেই। আবার এখন অধ্যয়ন করতে হলে প্রাণির ছবি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে বহিরাবয়ব ছাড়াও প্রতিটি অঙ্গ-প্র্ত্যঙ্গের এবং হাড়ের ছবিও দেখতে হয়। আবার পাসপোর্ট ও ভিসার জন্য ব্যক্তির ছবি/প্রতিকৃতি অপরিহার্য। এমনকি হজে যাওয়ার জন্যও ছবি তুলতেই হয়। সমাজ এগিয়ে যাওয়ার কারণে ধর্মকে আপোষ করতেই হয়।

এখন পৃথিবী জুড়েই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা হয়। আমাদের সামনেও প্রধাণ দুটি দাবি হল- বাকস্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার। বিশ্বজুড়ে ৪৩০০টি ধর্মের মানুষের এবং বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের বিভিন্ন রকমের কৃষ্টি-কালচার রয়েছে। মানুষের অধিকার রয়েছে নিজনিজ সংস্কৃতি লালন-পালন করার। হিন্দুরা মূর্তি পূজা করে। ফলে তাদের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে যে কোন দেবদেবীর মূর্তি প্রকাশ্যে তৈরি করার। যদি কেউ বিশালাকার একটি মূর্তি সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে আইনানুযায়ী তার নিজ ভূমিতে স্থাপন করে তবে অন্য ধর্মের কারোই অধিকার থাকে না তাতে বাঁধা দেয়ার। যদি সেখানে পূজার নামে তীব্র শব্দ দূষণ করে বা অন্যকোনভাবে আইন লংঘন করে তবেই আমাদের দায়িত্ব পড়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো বা প্রতিবাদ করা। আমাদের দাবি- ধর্ম হোক ব্যক্তিগত বিষয় যেখানে রাষ্ট্র জড়িত থাকবে না।
ভাস্কর্যের বিষয়টা যেহেতু সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে জড়িত তাই রাষ্ট্রই নগরকে সুন্দর করার জন্য ভাস্কর্য নির্মাণ করবে। কোন ব্যক্তিকে সম্মান জানানোর জন্য বা কোন ঐতিহাসিক ঘটনা বা বিষয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ভাসস্কর্য দেখে স্বাধীনতা বিরোধীদের ভাল লাগবে না। আমাদের দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য দেখে বিএনপি সমর্থকদের ভাল লাগবে না আবার জিয়ার ভাস্কর্য দেখলে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভাল লাগবে না। তাই বলে একগোষ্ঠীর উচিৎ নয় প্রতিপক্ষ দলের ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলা বা তৈরিতে বাঁধা দেয়া। উচিৎ হল- প্রতিপক্ষের ভাস্কর্যের সৌন্দর্যতা নিয়ে আলোচনা করা এবং সুযোগ তৈরি করে দেয়া। কিছু নৈতিক বিষয় থাকেই- যেমন: স্বাধীন বাংলাদেশে আইউব খানের ভাস্কর্য তৈরি করা যায় না। সমাজের কিছু মানুষ রয়েছে ভাস্কর্য বিরোধী- ওই প্রাণ প্রতিষ্ঠার যুক্তিতে ধর্মীয় কারণে। তারা তাদের মত প্রকাশ করতেই পারে। অন্য পক্ষ বিজ্ঞানের কথা, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যতার কথা বলবে। যাদের ভাস্কর্য পছন্দ নয় তারা নিজেরা ভাস্কর নির্মাণ করবে না এবং ভাস্কর্যের সৌন্দর্যতা উপভোগ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। এতে কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু যারা ভাস্কর্যের সৌন্দর্যতা উপভোগ করতে চায় তাদের বাঁধা দেয়া যায় না। রাষ্ট্রকে নগরের সৌন্দর্যতা বৃদ্ধির করা ভাবতেই হয়। এখন বিশ্বের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য, পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য রাষ্ট্রগুলো ভাস্কর্য নির্মাণ করে।
ভাস্কর্য আমাদের রাষ্ট্রের নাগরিকদের কোন ক্ষতি করে না। অথচ মাদক, ন্যায় বিচার, শিশু বলাৎকার, অধিকারহীনতা, ভোটাধিকার প্রয়োগ ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কথা বলা দরকার। এসব জরুরী বিষয় নিয়ে অনেকেই কথা বলেন না, দাবি তুলেন না। অথচ এক ভাস্কর্য যা কোন ব্যক্তিই এড়িয়ে যেতে পারে তা নিয়ে হিংষা্ত্মক ঘটনা ঘটাচ্ছেন, হুমকি দিচ্ছেন। বিশ্বের সকল দেশেই মুসলিমদের বসবাস রয়েছে। ইউরোপ বা আমেরিকা, চীন-জাপান-কোরিয়া ইত্যাদি কোন দেশের ভাস্কর্য নিয়ে কি কথা বলতে পারেন?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

