
তারকা/সেলিব্রেটিদের মধ্যে আন্তঃধর্মে বিয়ে অহরহই হয়। তারা নিজ ধর্মে-গোত্রে বিয়ে করলেই যে তা টিকে যায় বা সুখের হয় তা নয়। বিয়ের জন্য নারীর ধর্মগ্রহণ বেশি নেই। অগ্রগণ্য মাইকেল মধুসূদন দত্ত খৃস্টান নারী বিয়ে করতে গিয়ে নিজে ধর্মই বদলে ফেলেন। বনিবনা হয়নি। সেই স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদের পরেও তিনি আবারও খৃস্টানই বিয়ে করেন। এই বিয়েটা আমৃত্যু টিকে ছিল ভালভাবেই। মাইকেল আর স্বধর্মে ফিরে আসেন নি। তার উত্তরপুরুষ এখনো খৃস্টান। ভারতের টেনিস তারকা লিয়ান্ডার পেজ তাঁর বংশধর। ইন্দিরা গান্ধী প্রেমিক পার্শি ধর্মের ফিরোজ জাহাঙ্গীর খানকে বিয়ে করতে চাইলে পিতা জওহরলাল নেহরু প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক হলেও এই বিয়ে মেনে নিতে চাননি। তাই স্বয়ং মাহাত্মা গান্ধী ফিরোজের পিতার দায়িত্ব পালন করেন। তখন ফিরোজ ‘গান্ধী’ টাইটেল গ্রহণ করেন এবং বিয়ে হয় হিন্দু রীতিতে। তারা গ্রহণ করেন মাহাত্মা গান্ধীর পদবী! ধর্ম বদল না করে স্বামীর পদবী গ্রহণের উদাহরণও রয়েছে। অর্থনীতিবিদ স্বদেশ বোসকে বিয়ে করে নুরজাহান বেগম নিজের নাম ধারণ করেন নুরজাহান বোস। তিনি বিধবা ও এক সন্তানের জননী ছিলেন। স্বামীর পদবী গ্রহণ একেবারেই হিন্দুরীতি। তবে তারাও কেউ ধর্ম বদল করেননি। এজন্য তাদের বাম রাজনৈতিক দল থেকে বহিস্কার করা হয়। হিন্দু স্বামীর পদবী গ্রহণ করেছেন কলকাতার বাংলা ছবির নায়িকা লোকসভার সদস্য নুসরাত জাহান (ডাক নাম রুহি)। শাড়ি ব্যবসায়ী হিন্দু নিখিল জৈনকে বিয়ে করার পর তিনি এখন নুসরাত জাহান রুহি জৈন। প্রথম দিন অগ্নি সাক্ষী রেখে বিয়ে করলেও দ্বিতীয় দিন বিয়ে করেন খৃস্টান রীতিতে। বিয়ের পরে তিনি সিঁদুর পরলেও নিজেকে মুসলিম দাবি করেন।
ধর্ম বদল না করেই সংসার করার উদাহরণই বেশি। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বিয়ে করেন অষ্ট্রিয়ান ক্যাথলিক খৃস্টান এমিলি শেঙ্কলকে। তারাও ধর্ম বদল করেননি। সুভাষের সাক্ষাৎকার নিতে এসে তাঁর সহকারী হন এবং শেষে স্ত্রী। অনেক মৌলবাদীই কাজী নজরুলের বিষয়ে অন্ধ। তিনি মুসলিম নার্গিস আসার খানমকে বিয়ে করে সংসার করার আগেই বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন হিন্দু প্রমীলা দেবীকে। তারা কেউই ধর্ম বদল করেননি। মার্কসবাদী ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে বিয়ে করেন শেরে বাংলার নাতনি নাসিমা বানুকে এবং যারযার ধর্ম নিয়ে ছিলেন। কবি সুফিয়া কামালের মেয়ে মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বিয়ে করেন আইনজীবী ব্রাহ্মণ সুপ্রিয় চক্রবর্তীকে। তাদের কন্যা দিয়া সুদেষ্ণা বিয়ে করেছেন খ্রিস্টানকে। ধর্ম তাদের জীবনে কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। ড. কামাল হোসেনের মেয়ে সারা হোসেন বিয়ে করেন বৃটিশ সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী ডেভিড বার্গম্যানকে। প্রখ্যাত নজরুল সংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগম বিয়ে করেন সরকার, গীতিকার ও গায়ক কমল দাশগুপ্তকে। ধর্ম তাদের পছন্দের মানুষকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি। তারা ব্যক্তিগত জীবনে ধর্ম পালন করেন না। নারীদের ক্ষেত্রে স্বামীর ধর্ম গ্রহণ করার নজিরও রয়েছে। বলিউডের জনপ্রিয় মুসলিম অভিনেত্রী নার্সিগ ধর্ম বদলে বিয়ে করেন অভিনেতা সুনীল দত্তকে। নিজের নাম নেন নির্মলা দত্ত। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যেও এমনটা রয়েছে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিয়ে করেছিলেন ভারতীয় গুজরাটি রমণী শিলা ঠাকুরকে। তিনি নাম নেন শিলা ইসলাম। এজন্যই সৈয়দ আশরাফ একবার বলেছিলেন, আমি হিন্দুও নই, মুসলিমও নই। অর্থাৎ তিনি মানুষ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়ও বিয়ে করেন আন্তঃধর্মে- তাঁর স্ত্রী ক্রিস্টিন ওভারমায়ার।আন্তঃধর্ম বিয়ে বিচিত্র রকম বিষয় রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে?
আমার বন্ধু অসীম কুমার বর্মন ও হোসনে আরা অষ্ট্রেলিয়ার আদালতে আবেদন করেন যে, বাংলাদেশে তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। ওখানে একজন সংখ্যা লঘু হিন্দুর পক্ষে মুসলিম মেয়ে বিয়ে করে বাস করা সম্ভব নয়। কিন্তু আদালত সংখ্যা লঘু রামেন্দু মজুমদারের মুসলিম ফেরদৌসী মজুমদারকে বিয়ে করে ঢাকায় থাকাকে উদাহরণ হিসেবে দিয়ে মামলা খারিজ করে দেয়। বাস্তবতা বুঝতে চায়নি অষ্ট্রেলিয়ার আদালত। দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো সংখ্যালঘুদের জীবন কঠিন। পরিবার চায় আত্মীয়তা তাই তারা কোনভাবেই চায় না আন্তঃধর্মে বিয়ে। ভালবাসার কারণেই অসম্ভবকে অনেকে সম্ভব করে তুলেন এবং সুখে-শান্তিতে থাকেন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার পরেও। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের কাউকে বিয়ে করে ওই ধর্ম গ্রহণ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠরা খুশি হয় কিন্তু যদি উল্টো হয় তাহলেই হাজারটা বিপদ নেমে আসে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র যন্ত্রও সংখ্যালঘুদের প্রতি বিমাতাসূলভ আচরণ করে। আন্তঃধর্মে বিয়ে বিশ্বজুড়েই স্বীকৃত। এটা অধিকার। রাষ্ট্রের প্রতি চাপ তৈরি করতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র কখনোই নাগরিকদের অধিকার নিয়ে ভাবে না- সেটা ভোটের অধিকার হোক কিংবা বিয়ের। আজ সমস্ত অধিকারকে কেড়ে নিতে বাড়তি মৌলবাদীগোষ্ঠী সৃষ্টি করেছে লাভ-জিহাদ!
লাভ জিহাদ নিয়ে যারা হইচই করে তারা কি জানে তাদের কেন শঙ্কর জাতি বলে? আর্য ব্রাহ্মণরা বাইরে থেকে এসেছে, তারপর যুগে যুগে বহু জাতি এসেছে। এভূখণ্ড দখলে নিয়েছে। নারীদেরও দখলে নিয়েছে জোর করেই এবং জন্ম হয়েছে আপনাদের পূর্বপুরুষদের। আজ ভালবাসার নাম হয়েছে লাভ জিহাদ! ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ভীষণ রকম মূর্খতা, মিথ্যাচার আর ভণ্ডামীর নাম লাভ জিহাদ। বাস্তবিক লাভ জিহাদ বলে কিছু নেই। শুধুই লাভই আছে, থাকুক!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

