রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান অবস্থানকে আমি অনেকটাই সমর্থন করি। এক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান কৌশলী। বাংলাদেশ পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। তাদের তাড়িয়ে দেয়নি। সরকার মায়ানমারকে আরাকানে সহিংসতা বন্ধের জন্য বলেছে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছেও আবেদন জানিয়েছে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার জন্য।
বাংলাদেশের এ অবস্থান ইতিবাচক। সরকার এখানে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে। আমি সরকারের এ অব্স্থানের প্রশংসা করলেও দুয়েকটা বিষয়ে আমার কিছুটা আপত্তি আছে। কূটনৈতিক চ্যানেলে সরকারের ভূমিকা আরো জোরালো হওয়া উচিত ছিলো। বিশ্ব জনমত গঠনে সরকার আরো তৎপর হতে পারতো কিন্তু সরকার সেটা করেনি। সময় ফুরিয়ে যায়নি। সরকারের উচিত মায়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা
নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী তীব্র জনমত গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহযোগিতায় যাতে বিশ্বশক্তি এগিয়ে আসে সেজন্য জোরালো কুটনৈতিক তৎপরতা চালানো। কেননা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরাসরি ভিকটিম। তাই আমাদের স্বার্থে এ পদক্ষেপগুলো আমাদের নিতেই হবে।
কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেন যে, বাংলাদেশের উচিত মায়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। এগুলো সস্তা আবেগী কথা। মায়ানমারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ? যুদ্ধ ঘোষণা করবে? কেন, মায়ানমার কি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে? বাংলাদেশ আক্রমণ করেছে? যুদ্ধ করে কি বাংলাদেশ মায়ানমারের সাথে পেরে উঠবে? মায়ানমারের পেছনে তো তাবৎ বড় বড় শক্তিগুলো আছে। বাংলাদেশের পেছনে কে আছে?
সূত্রমতে, কদিন আগে মায়ানমারের হেলিকপ্টার একাধিকবার বাংলাদেশের আকাশসীমা লংঘন করেছে। বিজিবি চাইলে সেই হেলিকপ্টার গুলি করে ভূপাতিত করতে পারতো। কিন্তু সেটা না করে বাংলাদেশ কাপুরুষতার পরিচয় দেয়নি বরং বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। কেননা, আকাশসীমা লংঘন ছিলো মায়ানমারের পরিকল্পিত উস্কানি। বাংলাদেশ তাদের সে ফাঁদে পা দেয়নি। বাংলাদেশও পাল্টা ব্যবস্থা নিলে তাতে পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যেত। ফোকাসটা তখন রোহিঙ্গাদের থেকে সরে গিয়ে দুদেশের মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতো। মায়ানমার চেয়েছিলোও তাই।
কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে পরাশক্তিগুলো আশ্চর্যরকম নীরবতা অবলম্বন করে চলেছে। জাতিসংঘ নামক একচোখা হাতিটির কোন ভূমিকা তো নাই এমনকি পরাশক্তিগুলোর একটিও এখন পর্যন্ত সুচির নিন্দাবাদ করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নীরব, বৃটেন, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া সবাই মুখে কুলুপ এঁটে বসেছে। আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের মুসলিম বিদ্বেষী প্রধানমন্ত্রী তো নৃশংসতার মধ্যেই মায়ানমার গিয়ে সুচির পিঠ চাপড়ে দিয়ে এসেছেন। মানে হলো, সুচি তুমি চালিয়ে যাও - আমরা আছি তোমার সাথে।
জাতিসংঘের কথা আর কী বলবো। রোহিঙ্গারা যদি আজ মুসলিম না হয়ে খ্রীস্টান হতো বা যদি এমন হতো যে, রোহিঙ্গারা অন্য কোন ধর্মাবলম্বী যারা মুসলমানদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে, তাহলে আমরা দেখতাম জাতিসংঘ তুফানবেগে সেখানে হাজির। কিন্তু আফসোস! এখানে নির্যাতিতরা যে মুসলমান! তাই এখানে জাতিসংঘ নীরব। তার মানবাধিকারের বুলি এখানে অচল। কারণ মানবাধিকার মুসলমানের জন্য নয়। কি সেটা ফিলিস্তিন, কি কাশ্মীর, কি আরাকান- সবখানে। Universal Diclaration of Human Rights, Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination against Women, Convention on the Rights of the Child সব এক্ষেত্রে অচল। জাতিসংঘকে আমরা পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের বেলায় যতোটা তৎপর দেখেছি ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আরাকানের বেলায় তারা ততোটাই নীরব। কানা দাজ্জালের মতো জাতিসংঘেরও একচোখ কানা, যেটি সে কেবল মুসলমানদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছুই নেই। প্রত্যেক রাষ্ট্রের কাছেই তার জাতীয় স্বার্থ সবার আগে। চীন মায়ানমারের অকৃত্রিম বন্ধু। তাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকেও তারা এক। তাছাড়া মায়ানমারে রয়েছে চীনের বিপুল বিনিয়োগ। সুতরাং বাংলাদেশ-মায়ানমার সমস্যার ক্ষেত্রে চীন মায়ানমারকেই সমর্থন দেবে এটা পরিষ্কার। কিন্তু ভারত? বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল তো ভারতকে সবচেয়ে বড় বন্ধুরাষ্ট্র মনে করে। ভারতের সাথে আমাদের গোপন সামরিক চুক্তিও রয়েছে (যে চুক্তির ব্যাপারে দেশের জনগন কিছুই জানে না)। কিন্তু এতো বড় বন্ধু হয়েও ভারত এটা কী ধরনের আচরণ করলো? যে মুহূর্তে বাংলাদেশ একটি সংকটের মধ্যে পতিত হলো এমনকি মায়ামারের সাথে অনেকটা সংঘাতের পরিস্থতি তৈরি হলো সেসময়ে নরেন্দ্র মোদী মায়ানমারের সমালোচনা করা তো দূরের কথা উল্টা তিনি সুচির সাথে দেখা করতে গেলেন, একসাথে বসে সুরা পান করলেন, খোশগল্প করলেন কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মুখটি পর্যন্ত খুললেন না। এটা বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের গালে চপেটাঘাতের মতোই। সুচি যেমন রোহিঙ্গাদের রক্তে তার হাত রঞ্জিত করছেন, এককালে মোদীও গুজরাটের মুসলমানদের রক্তে তার হাত রঞ্জিত করেছিলেন। সুতরাং দুই রক্তপিপাসুর মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। ভারত আমাদের শত্রু নয় কিন্তু নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী আমাদের বন্ধু নয় এটা পরিষ্কার। তার ও তার দলের নীতি সেটাই প্রমাণ করে। এটা বুঝতে না পারলে আমাদের সামনে বিপদ আছে।
আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার রাজনীতি করতে গিয়ে অন্যদেশের হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখে। এটা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে শক্তিশালী হতে দিচ্ছে না। আমাদের জাতীয় চরিত্র বলতে কিছুই তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক তো নয়ই আঞ্চলিক রাজনীতিতেও আমাদের অবস্থান খুবই দুর্বল। যে শৌর্য ও বিক্রমের মাধ্যমে আমরা দেশকে স্বাধীন করেছিলাম সেখান থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতি আমাদের সব শক্তিকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। যার কারণে না আমরা সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে পারছি না দৃঢ় জাতীয় মানস গঠন করতে পারছি।
রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। যতোদিন মায়ানমার রোহিঙ্গা সমস্যা না মিটাচ্ছে ততোদিন আমাদের এ সমস্যাটি মোকাবিলা করে যেতে হবে। সুতরাং এ সমস্যা মোকাবিলার জন্য আমাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ ইস্যুর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে রোহিঙ্গা ইস্যুটি জোরালোভাবে বারবার তুলে ধরতে হবে। এটাকে আঞ্চলিক সমস্যা থেকে আন্তর্জাতিক সমস্যায় রূপ দিতে হবে।
বাংলাদেশ যেমন দারিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের কাছে একটি রোল মডেল হতে পেরেছে, আমার বিশ্বাস শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায়ও আমরা তেমনি রোল মডেলে পরিণত হতে পারি। তার জন্য দরকার কার্যকর কূটনীতি ও পরিকল্পিত শরণার্থী ব্যবস্থাপনা। কূটনীতির মাধ্যমে মায়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্যাতনকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে হবে। সেখানে যে তারা নিশ্চিতভাবে জাতিগত নিধন ও গণহত্যা চালাচ্ছে তা বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে। মায়ানমারকে নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধে বাধ্য করতে হবে। অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের যাতে বাংলাদেশে না আসতে হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি যারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপর জোরালো চাপ সৃষ্টি করতে হবে। মায়ানমার তাদের ফিরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে হবে।
আমিতো মনে করি রোহিঙ্গা ইস্যুটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে একটি সুবর্ণ সুযোগ হাজির করেছে। তিনি এই সুযোগটি ইচ্ছে করলে কাজে লাগাতে পারেন। সেই সুবর্ণ সুযোগটি হলো, সুষ্ঠু শরণার্থী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি নোবেল পুরস্কার ছিনিয়ে আনতে পারেন। (যদিও নোবেল পুরস্কারের প্রতি আমার আর বিন্দু পরিমাণ আকর্ষণ অবশিষ্ট নেই)। যে কাজ করে সুচি-ওবামা- ইউনুস- মালালারা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন, বর্তমান ইস্যুটি তার চেয়ে অনেক বেশি মানবিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। এ কাজের জন্য নোবেল কমিটি যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল পুরস্কার নাও দেয় তবুও এটি তাঁকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে আসীন করবে। আবার উল্টাটাও হতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি এ বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভালোভাবে হ্যান্ডেল করতে ব্যর্থ হন তাহলে এটার জন্য তাঁকে চরম খেসারত দেওয়া লাগতে পারে অর্থাৎ তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভাগ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে। সুতরাং বিষয়টি তাঁর জন্য খুবই সংবেদনশীল।
সুতরাং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার নিবেদন, বাজে লোকদের কথায় কান না দিয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি রোহিঙ্গা ইস্যুটি ডিল করুন। তিন লাখ রোহিঙ্গা আশা করি আমাদের জন্য বোঝা হবে না। উল্টা এই রোহিঙ্গা ইস্যুটি আমাদের জাতীয় মর্যাদকে বিশ্বের দরবারে সমুন্নত করতে পারে যদি আমরা তা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারি। যে নোবেলজয়ী সুচি রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন চালাচ্ছে, আমি চাই, সেই রোহিঙ্গাদের মানবিক স্পর্শ দিয়ে বুকে ধারন করে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নোবেল শান্তি পুরস্কার ছিনিয়ে আনুন। এটাই হবে খুনী সুচির বিরুদ্ধে আমাদের পক্ষ থেকে মোক্ষম জবাব। যথার্থ প্রতিশোধ
পুনশ্চঃ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইতিবাচক ও মানবিক ভূমিকার জন্য মুসলিম বিশ্বের সাহসী কন্ঠস্বর তুর্কী প্রেসিডেন্ট এরদোগান ও তাঁর স্ত্রী আমিনা এরদোগানকে যারপরনাই ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তুরস্ক থেকে ছুটে এসে আমিনা এরদোগান রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের বুকে জড়িয়ে চোখের পানি ঝরাচ্ছেন অার এদেশেরই কিছু মানুষ এখনো রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া ঠিক হবে কি হবে না এই টেনশনের মধ্যে আছেন। তারা বসে বসে রোহিঙ্গাদের মাঝে ভবিষ্যৎ চোর-ডাকাত-ইয়াবা পাচারকারী খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অথচ তারা ভুলে যান যে ৭১ এ আমাদের অবস্থাও আজকের রোহিঙ্গাদের মতোই ছিলো। সুতরাং অযথা গন্ডগোল না পাকিয়ে নিজে মানবিক কাজে অংশগ্রহণ করেন এবং সরকারকে সাহস ও উৎসাহ যোগান।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সকাল ১০:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



