একজন নির্লোভ, নির্ভীক, সাহসী কলমযোদ্ধা জি এম বাবর আলী আত্মহত্যা করতে পারেন, এটা মেনে নিতে পারছি না। আমার ব্যক্তিগত গভীর সম্পর্ক ছিল তার সাথে। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। আমাদের দু’জনেরই খুলনায় জন্ম। দু’জনই বরিশালে বাস করতাম। তিনি দৈনিক আমার দেশ বরিশাল ব্যুরো প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। বরিশাল প্রেস কাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ছিলেন। দৈনিক বরিশাল প্রতিদিন-এর উপদেষ্টা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। দৈনিক আমার দেশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে নানা টানাপড়নের মধ্য দিয়ে বাবর ভাইয়ের জীবন-জীবিকা চলত। আমার সাথে জাতীয় প্রেস কাবে দেখা হতো। সেখানে তিনি আমার দেশের সাহসী সম্পাদক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবিতে সভা-সমাবেশে যোগদানের জন্য উপস্থিত হতেন। সেই মুক্তির মিছিলে তার সাথে আমিও অংশগ্রহণ করতাম। বরিশাল মাহ্মুদুর রহমান মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের তিনি সদস্যসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। আমি সেখানে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছি। গত শুক্রবার পটুয়াখালী সদর উপজেলার সবুজবাগ এলাকার অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দীনের ভাড়া বাসা থেকে গলায় ফাঁস দেয়া ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। রাতেই তার লাশ পটুয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। বরিশালের সাংবাদিকসহ সবস্তরের মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাবার পাশে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার থুকরা গ্রামে তাকে দাফন করা হয়। ৫৭ বছর বয়সী এই মানুষটি কখনো অন্যায়ের কাছে আপস করেননি। তার কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে বারবার ঝলসে উঠেছে। আর বলবেন না ‘আমার বেতনের প্রয়োজন’। অনেক কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রণা আর অভিমান নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ, তার মৃত্যুরহস্য অচিরেই সঠিক তদন্ত করে প্রকাশ করা হোক। তিনি যদি সত্যিই আত্মহত্যা করেন, তার জন্য দায়ী কে? বরিশাল প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক পুলক দা, মুরাদ ভাইসহ বাবর ভাইয়ের লাশের গাড়ি নিয়ে যখন রাত ৯টায় গ্রামের বাড়ি পৌঁছলাম, তখন বৃষ্টি পড়ছে; কিন্তু তার মা বানুয়ারা বেগমের কান্নার কাছে আকাশের বৃষ্টি পরাজিত হয়েছিল। তার স্ত্রী তাহেরুন বেগম বারবার কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যা”িচ্ছলেন। প্রথম ছেলে সৈকত ১৯৯৭ সালের ১১ এপ্রিল মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। এখন তার তিন ছেলে তারিকুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম ও জামিউল ইসলাম। তারা আর কাউকে বাবা বলে ডাকতে পারবে না। এমন তিনটি সোনার ছেলেকে রেখে কোনো বাবা আত্মহত্যা করতে পারেন? তার কাছ থেকে যে চিরকুট পুলিশ উদ্ধার করেছে, সেখানেও রহস্য। নিজের আত্মহত্যার কথা এত লম্বা করে কেউ লিখতে পারেন না। পত্রিকার পাতা উল্টালেই রহস্যের তীর গিয়ে বিদ্ধ হয় তার দ্বিতীয় স্ত্রীর দিকে। তার বেপরোয়া জীবনযাপনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সে যে সাংবাদিক বাবর আলীর স্ত্রী এ তথ্য তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কেউ জানত না। তিনি হয়তো সেখানে এমন কিছু দেখেছেন, যা তার হত্যার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সব কিছুই অনুমানের কথা। তার দ্বিতীয় স্ত্রী যে বাড়িতে ভাড়া থাকত সেই বাড়িওয়ালাকে নিয়েও পটুয়াখালী শহরে রয়েছে নানা গুঞ্জন। ৩ মে বরিশাল প্রেস কাবে বাবর ভাইয়ের লাশ আনা হয়েছিল। সমাজের সব স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তি তাকে দেখতে এসেছিলেন। ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছিল কফিন। সাবেক চিফ হুইপ, সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ এসে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসককে এই বিষয়ে পুনঃতদন্তের জন্য মোবাইল ফোনে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনিও বিশ্বাস করতে পারেননি, বাবর ভাই আত্মহত্যা করেছেন। বরিশাল বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে প্রথম জানাজা শেষে তাকে যখন তার মাতৃভূমি খুলনার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত সবাই বলেছিলেন এটা পরিকল্পিত হত্যা। বাবর ভাইয়ের মৃত্যুর আগে একটি বই লিখেছিলেন দুর্যোগ সংকট। সেখানে সমাজের অনেক সঙ্কটের কথা বলেছিলেন। সেই মানুষটি এত তাড়াতাড়ি সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যাবেনÑ এ কথা এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। বাবর ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি খুলনার বয়রা পাবলিক কলেজের পেছনে। তার শাশুড়ি কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলেছেনÑ আমার জামাতা আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে কেউ হত্যা করেছে। বাবর ভাইয়ের ভাই আবুল কালাম আজাদও একই কথা বলেছেন। তিনি এ বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে হত্যারহস্য উদঘাটনে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। এতেই আমাদের প্রিয় বাবর ভাই বাবার কবরের পাশে শায়িত থেকে আত্মার শান্তি লাভ করবেন।
সাংবাদিক বাবর আলীর মৃত্যুরহস্য মো: মঞ্জুর হোসেন ঈসা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন
ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন
কবিতাঃ পাখির জগত

টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।
টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।
বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন
মোহভঙ্গ!

পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।