
স্মার্টফোনে non-removable ব্যাটারি ব্যবহারের কারণ এবং মোবাইল ও ব্যাটারির নিরাপত্তায় কিছু করণীয়ঃ
ইদানিংকালে আধুনিক সব স্মার্টফোনের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়, যাতে ফোনের সাথে ব্যাটারিগুলো যুক্ত করে দেয়া হয় যাতে সহজেই তা খুলে ফেলা না যায়। মোবাইল ব্যবহারের প্রথম দিককার অবস্থা কিন্তু এমন ছিল না। এই পরিবর্তনের পেছনে কারণ কি?
non-removable হলেও খোলা যায় সব ব্যাটারিইঃ
বর্তমানে প্রায় সব স্মার্টফোনে non-removable ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। নন-রিমুভেবল ব্যাটারি বলতে কিছু নাই। এটা হচ্ছে নন-ইউজার রিমুভেবল ব্যাটারী আর একটা হচ্ছে ইউজার রিমুভেবল ব্যাটারী। অর্থাৎ, একটা ইউজার খুলতে পারে, অন্যটা পারে না।
আপাতদৃষ্টিতে যদিও দেখে মনে হয় এসব ব্যাটারি খোলা সম্ভব নয়, প্রকৃতপক্ষে সকল মোবাইলের ব্যাটারিই খোলা সম্ভব। এর জন্য একটু জানাশোনা প্রয়োজন, একটু কৌশল বুঝতে হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে ব্যাটারি খোলার প্রয়োজন হলে, নিজে নিজে তা করার চেষ্টা না করে বরং সর্বাবস্থায় মোবাইল এবং ব্যাটারির নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে সার্ভিসিং সেন্টার কিংবা অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের দ্বারস্থ হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

মূলতঃ কয়েকটি কারণে এই non-removable ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। এর একটি কারণ হচ্ছে, স্মার্টফোনগুলোকে বার্স্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা, নকল ব্যাটারির ব্যবহার বন্ধ করা, ডিজাইনে নান্দনিকতা আনয়ন, ইত্যাদি। যেমনঃ
প্রথমতঃ বার্স্ট হওয়ার ঝুঁকি এড়াতেঃ
একসময় স্মার্টফোনগুলোতে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ব্যবহার করা হতো। যা সহজেই খোলা সম্ভব ছিল। এই ব্যাটারিগুলোর বার্স্ট হওয়ার প্রবণতা ছিল অনেক বেশি। তাছাড়া লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারের একটি বড় সমস্যা ছিল, এই ব্যাটারি অধিক ব্যবহারের ফলে ফুলে যেত, যা ছিল খুবই বিপজ্জনক। আমার নিজেরই ব্যবহৃত একটি মোবাইলের ব্যাটারির এমন অবস্থা হয়েছিল একবার। ফুলেছে তো ফুলেছেই। গা গতরে তুলতুলে নরমও আবার। শরীর স্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নতিতে অবশেষে মোবাইলের ভেতরে তার আর জায়গাই হচ্ছে না, এমন একটা অবস্থা। শেষমেষ সাধের সে ব্যাটারিটা ফেলে দিয়ে নতুন একটি কিনে নিতে হয়েছিল।
দ্বিতীয়তঃ নকল ব্যাটারির ব্যবহার বন্ধ করাঃ
কিন্তু বর্তমানে স্মার্টফোনগুলোতে লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি থেকে অনেক বেশি টেকসই এবং এই ব্যাটারি বার্স্ট হওয়ার হার অনেক কম। কিন্তু লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারির কিছু খারাপ দিক রয়েছে। এগুলো বাতাসের সংস্পর্শে আসলে এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন পেলে সহজে আগুন ধরে যাওয়ার একটা ঝুঁকি থাকে। তাই এই ব্যটারি স্থাপনের ক্ষেত্রে অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এ কারণে মোবাইল কোম্পানিগুলো এখন non-removable পদ্ধতিতে মোবাইলের ব্যাটারি স্থাপন করে। এর ফলে যে কেউ ইচ্ছে করলেই সহজে যাতে মোবাইলের ব্যাটারি খুলতে অথবা পরিবর্তন করতে না পারে। এতে ব্যাটারীতে আগুন ধরার ঝুঁকি থাকে না এবং ব্যাটারি বাস্ট হওয়ার হার অনেক কমে যায়। এছাড়া মোবাইলের ব্যাটারি non-removable হওয়ায় আমরা যে কেউ বাজার থেকে একটি ব্যাটারি কিনে এনে স্থাপন করতে পারি না এর জন্য আমাদের সার্ভিস সেন্টার অথবা টেকনিশিয়ানের দ্বারস্থ হতে হয় এর ফলে নকল ব্যাটারি ব্যবহারের হার কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তৃতীয়তঃ স্লিমি এবং ফার্স্ট চার্জিং টেকনোলজি ব্যবহার নিশ্চিত করতেঃ
এর বাইরে non-removable ব্যাটারি ব্যবহারের ফলে স্মার্টফোনগুলোকে অনেক স্লিম করা সম্ভব হয়েছে। নাম যেহেতু স্মার্ট ফোন, স্মার্ট তো তাকে হতেই হবে। কতটা স্মার্ট করা যায়, কতটা স্লিম করা যায় এখন চলছে তার প্রতিযোগিতা। এরপরে রয়েছে স্মার্টফোনগুলোতে ফার্স্ট চার্জিং টেকনোলজির একটি বিষয়। কোনো কিছুতে দেরি করা আমাদের সহ্য হয় না। সবকিছু দ্রুত চাই। আমরা সময়ের মূল্য দিতে চাই। জীবনের কানাকড়ি সময়ও যেন বেহুদা না যায়, সেজন্য আমরা মুহূর্তগুলোকেও হিসেবের আওতায় নিতে মরিয়া। তাই ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে মোবাইলে চার্জ দেয়ার জন্য অপেক্ষা? সম্ভব নয়। এ সমস্যার সমাধানে অনেকটা কাজে দিয়েছে non-removable ব্যাটারি ব্যবহার। এসব ব্যাটারিতে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়ে থাকে যা খুব দ্রুত চার্জ গ্রহণে সক্ষম।
চতুর্থতঃ ডিজাইনে নান্দনিকতা আনার জন্যঃ
ডিজাইন সুন্দরের জন্য। আগে যে রিমুভেবল ব্যাটারীগুলা ছিল সেগুলো দেখতে স্লিম ছিল না এবং ভারী ছিল। তাতে করে সেটের লুকিং সুন্দর হতো না সাথে ওজনে বেশি হতো।
পঞ্চমতঃ নন-রিমুভেবল ব্যাটারিগুলো পাতলা হওয়ায় ডিভাইজের ভেতরে কম জায়গা নেয়ঃ
নন-রিমুভেবল ব্যাটারিগুলো অনেক পাতলা হয়, ডিভাইজের ভেতরে কম জায়গা নেয়, এতে ফোনে আরো আলাদা প্রয়োজনীয় মডিউল ইন্সটল করার স্পেস পাওয়া যায়। যেমন- বেশি ক্যামেরা সেন্সর, ওয়্যারলেস চার্জিং, ওয়াটার কুলিং ফিচার, স্টেরিও স্পীকার, ইত্যাদি কুল ফিচারগুলো নন-রিমুভেবল ব্যাটারির জন্যই সহজ হয়েছে।
পাশাপাশি রিমুভেবল ব্যাটারিগুলো চারকোনা আকৃতির হয়ে থাকে। যেখানে নন-রিমুভেবল ব্যাটারিগুলোকে যে কোনো আকৃতি দেওয়া যেতে পারে। এখন আপনি তো আর L আকৃতির ব্যাটারি পকেটে নিয়ে ঘুরবেন না, তাই না? নন-রিমুভেবল ব্যাটারিগুলোর যে কোনো আকৃতির জন্য ফোনের মধ্যে আরো বেশি ব্যাটারি আঁটানো সম্ভব, সাথে ফোনের ডিজাইনও কার্ভ রাখা সম্ভব হতে পারে।

ব্যাটারি ফোনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই ব্যাটারির চাই যথাযথ যত্নঃ
মনে রাখা প্রয়োজন, ফোনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো ব্যাটারি। যদি ব্যাটারি সঠিকভাবে চার্জ করা না হয়ে থাকে তাহলে কম সময়ে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। প্রতিটি ব্যাটারির একটি নির্দিষ্ট জীবন মেয়াদ বা লাইফ টাইম থাকে। ফোন ব্যবহারের উপর ব্যাটারির আয়ু অনেকাংশে নির্ভর করে। অনেকেই জানেন না যে, কখন, কিভাবে ফোনটি চার্জ দিতে হবে। এছাড়া কোন চার্জার দিয়ে চার্জ দেয়া উচিত বা কোন চার্জার ব্যবহার করা উচিত নয় তাও অজানা অনেকের। ফোনের ব্যাটারি ভালো রাখতে তেমনই প্রয়োজনীয় কিছু টিপস উল্লেখ করছি-
ফোনের নিজস্ব চার্জার দিয়ে চার্জ দেওয়াঃ
শখের ফোনটি যদি সেই ফোনের সাথে পাওয়া চার্জারে চার্জ দেওয়া হয় তবে ব্যাটারির আয়ু বাড়ে। এখন অবশ্য ফোনে চার্জ দেওয়ার জন্য রয়েছে মাইক্রোইউএসবি পোর্ট। তাই যে কোনো চার্জার দিয়ে ফোনে চার্জ দেওয়া যায়।তবে যদি চার্জিংয়ের সময় ফোনের নিজস্ব চার্জার ব্যবহার না করা হয় তাহলে ধীরে ধীরে ব্যাটারির চার্জ ধরে রাখার ক্ষমতা কমতে থাকে। কেননা ফোনের সঙ্গে থাকা চার্জারে নির্দিষ্ট পরিমাণ আপটপুট ভোস্টেজ এবং কারেন্ট রেটিং থাকে। যা ফোনের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে।
সস্তা চার্জার ব্যবহার না করাঃ
অনেক সময় ফোনের জন্য নির্ধারিত চার্জারটি হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেকেই বাজার থেকে সস্তা ও অখ্যাত ব্র্যান্ডের চার্জার কেনেন। এসব চার্জারে চার্জ দিলে ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। চার্জ হতেও সময় বেশি নেয়। আর অ্যাডাপ্টারে সমস্যা দেখা দিলে ফোন ও ব্যাটারি দুটোই নষ্ট হতে পারে। তাই সস্তা চার্জার ব্যবহার না করাই ভালো।

কেস খুলে রাখাঃ
যখন ফোন চার্জে দেওয়া হয় তখন ব্যাটারি কিছুটা গরম হয়ে যায়। ব্যাটারি গরমের প্রভাব ফোনে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ফোনকে অতিরিক্ত গরমের হাত থেকে রক্ষা করতে চার্জে থাকা অবস্থায় ফোনের নিরাপত্তামূলক কেসিং বা কভার খুলে রাখা উচিত ।
সারা রাত চার্জ নয়ঃ
অনেকেই রাতের বেলা ফোন চার্জে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এতে ফোনটি সারা রাত ধরে চার্জ হয়। এর ফলে ওভার চার্জিং হয়ে থাকে। যা ফোনের জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়। এছাড়া সারা রাত ফোনে চার্জে দেওয়ার ফলে ব্যাটারি অতিরিক্তি গরম হয়ে বিস্ফোরণও ঘটতে পারে।
ফোন ঠাণ্ডা রাখুনঃ
ফোন যতটা সম্ভব ঠাণ্ডা রাখুন। লি-আয়ন ব্যাটারি বেশি চার্জ হলেও কোনো সমস্যা হয় না। তবে ফোনটি যেখানে চার্জ দিচ্ছেন বা রাখছেন, সে জায়গা যেন অতিরিক্ত গরম না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। এতে ফোন অতিরিক্ত গরম হতে পারে। ফোন আবার অতিরিক্ত ঠাণ্ডা জায়গায় রাখাও ঠিক নয়। খুব বেশি ঠাণ্ডা বা অতিরিক্ত গরম ব্যাটারির কার্যক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।
ব্লুটুথ, ওয়াইফাই বন্ধ করে রাখুনঃ
প্রয়োজনের বাইরে কখনো ব্লুটুথ, ওয়াইফাই চালু করে রাখবেন না। এতে করে ব্যাকগ্রাউন্ডে বা প্রসেসরে বেশি করে শক্তি খরচ হয়। ফলে চার্জ যায় বেশি।
ভাইব্রেশন ও অপ্রয়োজনীয় সাউন্ড বন্ধ রাখুনঃ
প্রয়োজন ছাড়া ফোনের ভাইব্রেশন চালু রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। আর বিভিন্ন অ্যাপ বা সেটিংস থেকে অপ্রয়োজনীয় সাউন্ড অফ করে রাখুন। এতে চার্জ কম খরচ হয়।

ফোনে আলাদা ব্যাটারি অ্যাপ ব্যবহার থেকে বিরত থাকুনঃ
ব্যাটারি অ্যাপ্লিকেশনফোনের জন্য অনেক থার্ডপার্টি ব্যাটারি অপটিমাইজ অ্যাপ রয়েছে। এই অ্যাপগুলো ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ডে চালু থাকে। এতে করে ফোনের চার্জ আরও বেশি ব্যয় হয়। এছাড়া লকস্ক্রিনটি অ্যাপগুলো এড লোড করে থাকে। তাই ফোনে আলাদা কোনো ব্যাটারি অ্যাপ ব্যবহার করা উচিত নয়।
কখন চার্জে দিবেন ফোনঃ
ফোনে ২০ শতাংশের উপরে চার্জ থাকলে চার্জ দেওয়া উচিত নয়। আবার ব্যাটারি চার্জ শূন্য করেও চার্জে দেওয়া ঠিক নয়। কেননা অপ্রয়োজনীয় রিচার্জে ব্যাটারির আয়ু কমে যায়। সেক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫-২০ শতাংশ চার্জ থাকা অবস্থায় ফোন চার্জে দেওয়া ভালো।
পাওয়ার ব্যাংক ব্যবহারের সময়ঃ
পাওয়ার ব্যাংকের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া অবস্থায় ফোন ব্যবহার করা উচিত নয়। কেননা পাওয়ার ব্যাংকের সাহায্যে চার্জ করার সময় ব্যাটারি গরম হয়ে যায়। একই সময় ফোনটি ব্যবহার করলে তা আরও গরম হয়ে যাবে। যা ব্যাটারির জন্য ক্ষতিকর।
অ্যানিমেশন বন্ধ রাখুনঃ
আপনি কি জানেন আপনার ফোনের কিছু ফ্ল্যাশি এনিমেশন আপনার ফোনের ব্যাটারি লাইফ কমিয়ে দিতে পারি। আগে এগুলো অফ করা না গেলেও এখন আপনি সেগুলো অফ করতে পারবেন।
কাজ শেষে অ্যাপ বন্ধ রাখুনঃ
বেশিরভাগ সময়ই আমরা কাজের শেষে অ্যাপ বন্ধ না করে মিনিমাইজ করে রাখি। এটি ফোনের চার্জ দ্রুত শেষ হয়। তাছাড়া এমন কিছু অ্যাপ আছে যেগুলোতে বেশি চার্জ লাগে। তাই এগুলো বন্ধ রাখুন।
ব্রাইটনেস কমিয়ে রাখুনঃ
ফোনে সবসময়ই বেশি ব্রাইটনেসের প্রয়োজন হয় না। তাই যখন ব্যবহার করবেন না তখন ব্রাইটনেস কমিয়ে রাখলেই চলে। খুব বেশি ফোন ব্যবহারের সময় ব্রাইটনেস ৫০ শতাংশের এর নিচে রাখা ভালো। এতে চার্জ থাকবে বেশিক্ষণ।

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০২০ সকাল ১১:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


