somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

......শামীমরা নির্দোষ; মেয়ের বাবা হিসেবে....... দোষ আমারই, আমি আমার উপযুক্ত বিচার চাই......'।

১০ ই অক্টোবর, ২০২০ সকাল ৯:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবিঃ অন্তর্জাল।

......শামীমরা নির্দোষ; মেয়ের বাবা হিসেবে....... দোষ আমারই, আমি আমার উপযুক্ত বিচার চাই......'।

রাত দুপুরে ঘুমিয়ে আছি, কেউ একজন আমাকে সজোরে লাত্থি মারে। বলে ওঠে, মেয়েকে বাড়ি থেকে সরিয়েছো? ব্যাটা, তোর সাহস তো কম না! দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা... ঐ পিটা, শালারে রড দিয়া পিটা...

তারপর শুরু হয় আমার উপর নির্যাতন...

হ্যাঁ, ঠিকঠিক চিনতে পেরেছেন, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় মাসখানেক আগে একবার আটকে রেখে ধর্ষণ করা তরুণীর (২৭) বাবা আমি। আমার মেয়েকে গত ০৫ অক্টোবর ২০২০ সোমবার রাত ১২টার দিকে শামীম মিয়ার নেতৃত্বে লিটন মিয়া (৩০), আকাই মিয়া (২৭), আলম মিয়া (২৮) ও দিলাক মিয়া (২৫) সহ পাঁচ জন ধর্ষন করতে আসে। এরা ইতোপূর্বে গত মাসখানেক আগে, আমার মেয়েকে আমার নিজ বাড়ি থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখে ধর্ষন করেছিল। আমি না বুঝে সেসময় এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে তাদের বিরুদ্ধে নালিশ করেছিলাম। কিন্তু গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমি এ ঘটনায় কোনো বিচার না পাওয়ায় পরে বুঝতে পারি, মেয়ে ধর্ষিত হওয়ার ঘটনায় এইভাবে নালিশ করা আমার একান্তভাবেই উচিত হয়নি। সমাজ, সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও জনপ্রতিনিধিগণ এই কথা বিশ্বাস করতে আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই।

যাই হোক, শামীম তার দলবল নিয়ে উল্লিখিত ০৫ অক্টোবর ২০২০ পুনরায় ধর্ষন করার উদ্দেশ্যে আমার বাড়িতে এসে মেয়েকে খুঁজতে থাকে। তাকে না পেয়ে একপর্যায়ে আমাকে রড দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। আমাকে বেদম প্রহার করে। তাদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করতে তখন কেউ এগিয়ে আসার মত ছিল না। প্রথমবার মেয়েকে তুলে নিয়ে ধর্ষন, তার বিচার চেয়ে বিচার না পাওয়া, দ্বিতীয় দফায় ধর্ষন করতে এসে মেয়েকে না পেয়ে আমাকে মেরে রক্তাক্তকরণ ইত্যাদি ঘটনার পূর্বাপর বিশ্লেষনে আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রকৃত অপরাধী এখানে শামীম এবং তার সাঙ্গপাঙ্গগণ নন, বরং আমি নিজেই। এক অদেখা অপরাধবোধ ভেতর থেকে বারবার আমাকে বলে দিচ্ছে, 'অপরাধী তুমি নিজেই।'

আমার অদেখা পোড়া আত্মা ক্ষণে ক্ষনে আমাকে জানান দিয়ে যাচ্ছে, 'তুমি তোমার মেয়ের সাথে সংঘটিত ঘটনাবলীর আদ্যোপান্ত নানান দিক থেকে চিন্তা করে দেখো, এই ঘটনা এবং দেশে চলমান অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার দিকে চোখ খুলে তাকাও- তাকিয়ে দেখো, দেখবে, তোমাকে প্রহারের ঘটনাটিতে শামীম এবং তার সঙ্গীদের তেমন কোনো দোষ নেই, দায় নেই। এটাকে তাদের একপ্রকার অধিকার বলে মনে হবে তোমার কাছে। কারণ, তুমি হয়তো বুঝতে পারছো না, এই সমাজ, এই সমাজের মানুষের ধুয়েমুছে সাফ হওয়া বিবেক আর আইনের নানাবিধ মারপ্যাচে ধর্ষন যেখানে পরোক্ষভাবে অধিকার হিসেবে স্বীকৃত, সেখানে তাতে বাধা দেয়া বা বাধা হয়ে দাঁড়ানোকে ন্যায়সঙ্গত কোনো কাজ হিসেবে অভিহিত করার সুযোগ থাকে না। সেই কারণে নিজেকে তোমার অপরাধী মনে করা অবান্তর নয় বলে ভাবতে শেখো।'

সঙ্গত কারণে আমার মেয়ের ঘটনা এবং দেশে চলমান ও ক্রমবর্ধমান অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করে একজন মেয়ের বাবা হিসেবে আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। প্রথমতঃ কন্যা সন্তানের পিতা হওয়ার কারণে সকল দায় তো আমাকে বহন করতেই হবে। দ্বিতীয়তঃ আমি আমার মেয়েকে অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজে নিযুক্ত করেছিলাম তার নিরাপত্তার কথা ভেবে। এটা আমার কোনোক্রমেই উচিত হয়নি। মেয়েকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়াটা আমার নিতান্ত অন্যায় ছিল। অপরাধ ছিল। তৃতীয়তঃ আমার মেয়েরও কিছু অপরাধ ছিল। তার চক্ষুলজ্জার কারণে আমাকেও বিপদে পড়তে হয়েছে। শামীমগংরা তাকে কয়েকদিন আটকে রেখে ধর্ষন করার ঘটনায় বিচার না পেয়ে লোকলজ্জার ভয়ে সে এলাকা ছেড়ে গৃহপরিচারিকার কাজ নিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। বলি, বাবা- এখন কি আর চক্ষুলজ্জা, লোকলজ্জা এইসবে কেউ বিশ্বাস করে! আধুনিক যুগের সাথে এইসব শব্দ কি কোনোভাবে যায়! তুমি আধুনিকা হতে পারোনি, মা। তোমার এই ব্যর্থতার দায়ও মূলতঃ আমার উপরেই বর্তায়। তুমি এখানে নির্দোষ। পিতা হয়েও আমি তোমাকে 'লজ্জাহীন' হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি বলে আমাকে ক্ষমা করো, মা!

পরিশেষে, আমি নিজের এই সকল অপরাধ স্বজ্ঞানে স্বীকার করে নিচ্ছি। আমার উচিত ছিল, মেয়েকে সুসজ্জিত করে তাদের হাতে সপে দেয়ার জন্য তৈরি করে রাখা। যেন যে কোনো সময় তারা এলেই আমি মেয়েকে তাদের হাতে তুলে দিতে পারি। তারা যাতে ইচ্ছেমত ধর্ষন করে যেতে পারে। আদিম উল্লাসে মেতে উঠতে পারে। পাশবিক আনন্দের অট্টহাসির শব্দে কাঁপিয়ে দিতে পারে গোটা প্রান্তর। কিন্তু তা আমি না করে গর্হিত অন্যায় করেছি, যা আইনত, জ্ঞানতঃ কোনোভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। তাই দেশবাসী এবং মাননীয় আদালতের কাছে আকুল আর্জি, আমার ৬৫ বছর বয়স বিবেচনায় নিয়ে আমার উপরোক্ত ভুল এবং অপরাধগুলো মার্জনার দৃষ্টিতে দেখে আমাকে উপযুক্ত শাস্তিদানের আওতায় নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করুন, এর বিহিত ব্যবস্থা করুন। কারণ, আমার এই বিচারটি গুরুত্বপূর্ণ, এরকম একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ফলে, ভবিষ্যতে কোনো মেয়ের বাবা আমার মত করে যুবকশ্রেণির সাথে এই ধরণের তামাশাপূর্ণ অন্যায় আচরণ করার সাহস পাবে না এবং নিজ কন্যা সন্তানকে বাঁচানোর নাম করে এইভাবে বাড়ি থেকে অন্যত্র সরিয়ে রাখার অপচেষ্টায় লিপ্ত হওয়ার দুঃসাহসও দেখাবে না। এই লক্ষ্যে আমি আমার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমার ফাঁসির হুকুম প্রদান করে দেশের সকল কন্যা সন্তানের পিতাদেরকে একটি বার্তা প্রদান করতে সকলে সোচ্চার হবেন বলে একান্তভাবে আশা করছি।

দেখে-শুনে-বুঝে পচনধরা ব্যধিযুক্ত আমার পাপাত্মা আমাকে বারবার বলে ওঠে, 'তুমি সালাম দাও, তোমার দেশকে, সমাজকে, সমাজের নেতাকে সালাম দাও। সালাম করো, বেশি বেশি সালাম করো, পারলে কুর্ণিশ করো। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, কারণ, তারা তোমাকে মেরে ফেলেনি। তোমার মেয়েকে সামান্য ক'দিনের জন্য উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাতে কি এমন সমস্যা হয়েছে! একটু আধটু এমন আনন্দ ফুর্তি করার অধিকার তাদেরকে তো দিতেই হবে। তুমিই বরং অন্যায় করেছো, এতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে। তারা দ্বিতীয়বার এসে রাগের মাথায় তোমাকে হয়তো মৃদু রডের আঘাত করেছে, খুবই সামান্য আঘাত, মারা যাওয়ার মত কিছু নয়, আর এতে তুমি তো আর মরেও যাওনি, সুতরাং, এর জন্য নিজেকে তোমার ভাগ্যবান মনে করা উচিত, অসংখ্য অপমৃত্যুর ভিড়ে তুমি মরোনি, গুমের অন্ধকারে তোমাকে হারিয়ে যেতে হয়নি, ভাগ্যিস, তুমি বেঁচে আছো এখনো, তাই নমিত মস্তকে বলো, বলে ওঠো- যে দেশ এবং সমাজব্যবস্থা শামীমদের তৈরি করে সেই সমাজকে সালাম! শামীমরা নির্দোষ, মেয়ের বাবা হিসেবে, এমন সোনার সমাজের একজন হিসেবে দায় আমার, দোষও আমারই, আমি আমার উপযুক্ত বিচার চাই......'।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০২০ সকাল ৯:৩৬
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×