
ফযীলতপূর্ণ যেসব আমল গোলাম আযাদ করা বা দাস মুক্ত করার মত অনন্য
প্রাককথনঃ
ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব লগ্নে পৃথিবীর দেশে দেশে দাস প্রথা চালু ছিল। প্রাক ইসলামী যুগে এ প্রথার প্রচলন ছিল আরও ব্যাপকতর। মানুষ কেনাবেচার হাট বসতো সেসময়। কালের আবহমানতায় মানুষের জীবনে সে এক অচিন্তনীয়, অমানবিক এবং অব্যবস্থাপনাময় দুঃসময়। দুর্বল, অসহায় এবং অভাবী কিছু মানুষের তখন স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সামান্য অধিকারটুকু পর্যন্ত ছিল না। তাদেরকে দাসে পরিণত করেছিলেন সমাজের বিত্তশালী ও শক্তিমানগণ।
অমানবিক দাস প্রথার ভয়াবহ চিত্র অবলোকনে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোমল হৃদয়ে ব্যাথার ঢেউ বয়ে যায়। তিনি ব্যথিত হন। কষ্ট পান। দরদে ভরা তাঁ অন্তরে এই কুপ্রথা দাগ কাটে। তিনি এটা মেনে নিতে পারেননি। এ কারণে দাস প্রথার প্রতি মানুষদেরকে তিনি বিভিন্নভাবে নিরুৎসাহিত করতে থাকেন। ইসলামের অভ্যুদয়ের পরে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাস প্রথা বিলুপ্তির লক্ষ্যে মানুষের ভেতরে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মগ্ন হন এবং মানুষের পারস্পারিক অধিকারের বিষয়ে সকলের ভেতরে সচেতনতা আনয়নের চেষ্টা করেন। তিনি নিজ উদ্যোগে এবং সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে অসংখ্য দাসকে মুক্ত করে স্বাধীন জীবনে ফিরিয়ে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। একই সাথে শৃঙ্খলিত পরাধীন মানুষকে দাসের কলঙ্কজনক জীবন থেকে মুক্ত করে স্বাধীন জীবনে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়ার গুরুত্ব, ফযীলত এবং সাওয়াব বর্ণনা করে অন্যদেরও এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পাপের কাফ্ফারা আদায়ের জন্য দাস মুক্ত করার বিবিধ পন্থা ইসলামী শরী‘আতে বিধিবদ্ধ আছে। যেমন- হত্যা, কসম ভঙ্গ, যিহার এবং রামাযান মাসে দিনের বেলায় সহবাস প্রভৃতির কাফ্ফারা আদায়ের অন্যতম উপায় হ’ল দাস মুক্ত করা। -বিস্তারিত দেখুন, হত্যার কাফ্ফারা (সূরা নিসা ৪/৯২), যিহারের কাফ্ফারা (মুজাদালাহ ৫৮/০৩), কসম ভঙ্গের কাফ্ফারা (মায়েদা ৫/৮৯), রামাযানে দিনের বেলায় সহবাসের কাফ্ফারা (বুখারী হা/১৯৩৬; মুসলিম হা/১১১), দাসকে প্রহার করার কাফ্ফারা (মুসলিম হা/১৬৫৭; আবূদাঊদ হা/৫১৬৮) প্রভৃতি।
গোলাম আযাদ বা দাস মুক্ত করা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের অন্যতম একটি মাধ্যম। কিন্তু এ যুগের কোন কোটিপতি ব্যক্তিও যদি দাস মুক্ত করার এই ফযীলতপূর্ণ আমল সম্পাদনের ইচ্ছা করেন, তার সে ইচ্ছা পূরণ করার সুযোগ নেই বললেই চলে। কেননা বর্তমান যুগে দাস প্রথার প্রচলনই নেই। কিন্তু মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা ইসলামী শরীআতে এমন কিছু আমল প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে যুক্ত করে দিয়েছেন, যা দাস মুক্ত করার মতই ফযীলতপূর্ণ। বক্ষমান নিবন্ধে আমরা সে বিষয়ে সামান্য আলোকপাত করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ-
গোলাম আযাদ করা বা দাস মুক্ত করার ফযীলতঃ
গোলাম আযাদ করা বা দাসমুক্ত করার অনেক ফযীলত রয়েছে। এ কাজের সবচেয়ে বড় ফযীলত হ’ল জাহান্নাম থেকে মুক্তি। আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি,
مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُؤْمِنَةً، أَعْتَقَ اللهُ بِكُلِّ عُضْوٍ مِنْهُ عُضْوًا مِّنَ النَّارِ، حَتَّى يُعْتِقَ فَرْجَهُ بِفَرْجِهِ،
‘যে ব্যক্তি কোন মুমিন দাসকে আযাদ করবে, আল্লাহ তা‘আলা এর প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে আযাদকারীর প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দিবেন। এমনকি এর (দাসের) লজ্জাস্থানের বিনিময়ে তার (মুক্তকারীর) লজ্জাস্থানকে মুক্তি দিবেন’। -বিস্তারিত দেখুন, মুসলিম হা/১৫০৯; তিরমিযী হা/১৫৪১; ইরওয়াউল গালীল হা/১৭৪২।
অপর বর্ণনায় তিনি বলেন,
مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُؤْمِنَةً كَانَتْ فِدَاءَهُ مِنَ النَّارِ،
‘যে ব্যক্তি একজন মুমিন দাসকে আযাদ করে দিবে, এর বিনিময়ে তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করে দেওয়া হবে’। -সূত্রঃ. আবূ দাঊদ, হা/৩৯৬৬, সনদ ছহীহ।
ছাহাবায়ে কেরাম এই হাদীছগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গোলাম আযাদ করার জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতা করতেন। নাফে‘ (রহঃ) বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) তার জীবদ্দশায় একশত দাস আযাদ করেছিলেন। -সূত্রঃ ছিফাতুছ ছাফওয়া, ১/২৪০ পৃ.।
অনুরূপভাবে সচ্ছল ছাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর পথে নির্যাতিত গোলাম ছাহাবীদেরদে কিনে আযাদ করে দিতেন। কল্পনায় নিজেকে একজন পরাধীন ক্রীতদাস ভেবে সেই দাস প্রথা প্রচলিত সমাজের দিকে নযর দিলে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।
দাস মুক্ত করার মত মর্যাদাপূর্ণ এবং ফযীলতের আমল সমূহঃ
এক. পবিত্র বাইতুল্লাহ তথা কা‘বা ঘর তাওয়াফ করাঃ
উমাইর (রহঃ) বলেন, ইবনু ওমর (রাঃ) ভিড় ঠেলে হ’লেও হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর নিকটে যেতেন (তা স্পর্শ করার জন্য)। অথচ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অন্য কোন সাহাবীকে আমি এরূপ করতে দেখিনি। আমি বললাম,
يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ، إِنَّكَ تُزَاحِمُ عَلَى الرُّكْنَيْنِ زِحَامًا مَا رَأَيْتُ أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُزَاحِمُ عَلَيْهِ
‘হে আবূ আব্দুর রহমান! আপনি ভিড় ঠেলে হলেও এই দুই রুকনে গিয়ে পৌঁছেন, কিন্তু আমি তো রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অন্য কোন সাহাবীকে এভাবে ভিড় ঠেলে সেখানে যেতে দেখিনি। তিনি বললেন, আমি এরূপ কেন করব না? রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি,
إِنَّ مَسْحَهُمَا كَفَّارَةٌ لِلْخَطَايَا وَسَمِعْتُهُ، يَقُولُ: مَنْ طَافَ بِهَذَا البَيْتِ أُسْبُوعًا فَأَحْصَاهُ كَانَ كَعِتْقِ رَقَبَةٍ وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: لَا يَضَعُ قَدَمًا وَلَا يَرْفَعُ أُخْرَى إِلَّا حَطَّ اللهُ عَنْهُ خَطِيْئَةً وَكَتَبَ لَهُ بِهَا حَسَنَةً،
‘এই দুইটি রুকন স্পর্শ করলে গুনাহসমূহের কাফ্ফারা হয়ে যায়। আমি তাঁকে আরো বলতে শুনেছি যে, সঠিকভাবে যদি কোন লোক বাইতুল্লাহ সাতবার তাওয়াফ করে, তাহলে তার জন্য একটি ক্রীতদাস আযাদ করার সমান নেকী হবে’। আমি আরো বলতে শুনেছি যে, যখনই কোন ব্যক্তি তাওয়াফ করতে গিয়ে এক পা রাখে এবং অপর পা তোলে, তখন আল্লাহ তাআ'লা তার একটি করে গুনাহ মাফ করে দেন এবং একটি করে সাওয়াব লিখে দেন’। -তিরমিযী, হা/৯৫৯; মিশকাত হা/২৫৮০, সনদ ছহীহ।
সুতরাং, আমাদের কর্তব্য হ’ল নেকী লাভের এই সুযোগ হাতছাড়া না করা। কেননা অনেকে এমন আছেন, যারা হজ্জ বা ওমরাহ করতে গিয়ে ঘোরাঘুরি, অধিক খানাপিনার পেছনে এবং বাজার ঘাটে, দোকানপাটে কেনাকাটায় প্রচুর সময় অপচয় করেন। মহান আল্লাহ আমাদের নেকীর কাজে অগ্রগামী হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন।
দুই. তাওয়াফের পর দুই রাকাআত ছালাত আদায় ও ছাফা-মারওয়ায় সাঈ করাঃ
ছাফা ও মারওয়া দু’টি পাহাড়ের নাম, যা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। -সূরাহ আল বাক্বারাহ, ২/১৫৮
হজ্জের অন্যতম একটি রুকন হ’ল ছাফা-মারওয়ায় সাঈ করা, যার মাধ্যমে গোলাম আযাদ করার নেকী লাভ করা যায়। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি,
وَأَمَّا رَكْعَتَاكَ بَعْدَ الطَّوَافِ كَعِتْقِ رَقَبَةٍ مِنْ بَنِي إِسْمَاعِيلَ وَأَمَّا طَوَافُكَ بِالصَّفَا وَالْمَرْوَةِ بَعْدَ ذَلِكَ كَعِتْقِ سَبْعِيْنَ رَقَبَةً،
‘জেনে রাখ! তওয়াফের পর দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করার নেকী ইসমাঈলের বংশ থেকে একজন দাস আযাদ করার মত। এরপর ছাফা-মারওয়ায় সাঈ করার ছওয়াব সত্তর জন দাস মুক্ত করার সমান’। -মুসনাদে বায্যার, হা/৬১৭৭; ছহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১১১২, সনদ হাসান।
তিন. অপরকে খাদ্য খাওয়ানো এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধঃ
দাস মুক্ত করার নেকী লাভের অন্যতম বিকল্প মাধ্যম হ’ল ক্ষুধার্তকে খাদ্য খাওয়ানো, তৃষ্ণার্তকে পান করানো এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। বারা ইবনু আযেব (রাঃ) বলেন, একদিন এক গ্রাম্য লোক রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর নিকট এসে বলল,
يَا رَسُولَ اللهِ عَلِّمْنِي عَمَلًا يُدْخِلُنِي الْجَنَّةَ،
‘হে আল্লাহর রাসূল, সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। দারা-কুৎনীর বর্ণনায় এসছে, সে বলল,
دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ يُقَرِّبُنِي مِنَ الْجَنَّةِ وَيُبَاعِدُنِي مِنَ النَّارِ،
‘আমাকে এমন একটি আমলের সন্ধান দিন, যা আমাকে জান্নাতের নিকটবর্তী করবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে। -দারাকুৎনী হা/২০৫৫;
শু‘আইব আরনাঊত হাদীছটি ছহীহ বলেছেন। তিনি বললেন,
لَئِنْ كُنْتَ أَقَصَرْتَ الْخُطْبَةَ، لَقَدْ أَعْرَضْتَ الْمَسْأَلَةَ. أَعْتِقِ النَّسَمَةَ، وَفُكَّ الرَّقَبَةَ، قَالَ: أَوَلَيْسَا وَاحِدًا؟ قَالَ: لَا، عِتْقُ النَّسَمَةِ: أَنْ يَنْفَرِدَ بِعِتْقِهَا، وَفُكُّ الرَّقَبَةِ أَنْ يُعِينَ فِي ثَمَنِهَا، وَالْمِنْحَةُ الْوَكُوفُ، أَظُنُّهُ قَالَ: وَالْفَيْءُ عَلَى ذِي الرَّحِمِ الظَّالِمِ، فَإِنْ لَمْ تُطِقْ ذَلِكَ، فَأَطْعِمِ الْجَائِعَ، وَاسْقِ الظَّمْآنَ، وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ، وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ، فَإِنْ لَمْ تُطِقْ ذَلِكَ، فَكُفَّ لِسَانَكَ إِلَّا مِنْ خَيْرٍ،
‘যদিও তুমি অল্প কথায় বলে ফেললে, কিন্তু তুমি ব্যাপক বিষয় জানতে চেয়েছ। তুমি একটি প্রাণী মুক্ত কর এবং গোলাম মুক্ত কর। সে বলল, এ কাজ দু’টি কি একই নয়? তিনি বললেন, (অবশ্যই) না। কেননা প্রাণী মুক্ত করার অর্থ হ’ল একাকী একটি প্রাণ মুক্ত করা, আর গোলাম মুক্ত করার অর্থ হ’ল তার মুক্তিপণের মাধ্যমে সাহায্য করা। অধিক দুগ্ধদানকারী প্রাণী দান করা এবং অত্যাচারী আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দয়াশীল হওয়া। যদি তুমি এসব কাজ করতে সক্ষম না হও, তাহ’লে ক্ষুধার্তকে খাদ্য খাওয়াও এবং তৃষ্ণার্তকে পান করাও। সৎকর্মের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজে বাধা দাও। আর যদি তুমি এ কাজ করতেও অক্ষম হও, তাহ’লে উত্তম কথোপকথন ছাড়া তোমার জিহবাকে সংযত রাখ’।-বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৪০২৬; মিশকাত হা/৩৩৮৪; ছহীহুত তারগীব হা/১৮৯৮, সনদ ছহীহ্।
চার. ঋণ দেওয়া এবং পথহারাকে পথ দেখানোঃ
বারা ইবনু আযেব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ مَنَحَ مِنْحَةَ وَرِقٍ أَوْ مِنْحَةَ لَبَنٍ أَوْ أَهْدَى زُقَاقاً فَهُوَ كَعِتْقِ نَسَمَةٍ،
‘যে ব্যক্তি একবার দহন করা দুধ দান করে অথবা টাকা-পয়সা ধার দেয় অথবা পথহারা ব্যক্তিকে সঠিক পথ দেখায়, তার জন্য রয়েছে একটি গোলাম মুক্ত করার সমপরিমাণ ছওয়াব’। -তিরমিযী, হা/১৯৫৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৫৫৯, ছহীহ হাদীছ।
আলোচ্য হাদীছে ঋণ বলতে কর্যে হাসানাহ এবং পথহারা বলতে রাস্তা ভুলে যাওয়া ব্যক্তিকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া, অন্ধ ব্যক্তিকে পথ দেখানো প্রভৃতি বুঝানো হয়েছে।
পাঁচ. অসহায় আত্মীয়-স্বজনদেরকে দান করাঃ
আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের জন্য দান করা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে গোলাম আযাদ করার নেকী অর্জন করা যায়। একবার উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা বিনতে হারেছ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অনুমতি না নিয়ে নিজের দাসীকে আযাদ করে দেন। তারপর তার ঘরে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অবস্থানের দিন তিনি বললেন,
أَشَعَرْتَ يَا رَسُولَ اللهِ أَنِّي أَعْتَقْتُ وَلِيدَتِي
‘হে আল্লাহর রাসূল, সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি কি জানেন আমি আমার দাসীকে আযাদ করে দিয়েছি? তখন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, أَوَفَعَلْتِ؟ ‘তুমি কি তাই করেছ?’ মায়মূনা (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন,
أَمَا إِنَّكِ لَوْ أَعْطَيْتِهَا أَخْوَالَكِ كَانَ أَعْظَمَ لِأَجْرِكِ،
‘শোন! যদি তুমি তোমার মামাদেরকে এটা দান করতে তাহ’লে তোমার জন্য তা অধিক নেকীর কাজ হ’ত’। -বুখারী হা/২৫৯২; মিশকাত হা/১৯৩৫।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনু বাত্ত্বাল (রহঃ) বলেন,
أن صلة الرحم أفضل من العتق،
‘দাস মুক্ত করার চেয়েও ফযীলতপূর্ণ আমল হ’ল আত্মীয়তার সুসম্পর্ক বজায় রাখা’। -মির‘আতুল মাফাতীহ্, ৬/৩৭২ পৃ.।
ছয়. পরিবারের জন্য খরচ করাঃ
সাধারণ দান-ছাদাক্বার চেয়ে উত্তম দান হ’ল পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করা। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
دِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللهِ وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِينَارٌ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مِسْكِيْنٍ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ، أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ،
‘কোন একটি দীনার তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করেছ, একটি দীনার তুমি ব্যয় করেছ ক্রীতদাসকে মুক্ত করার জন্য, একটি দীনার তুমি ছাদাক্বাহ করেছ মিসকীনের জন্য এবং একটি দীনার তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করেছ। এর মাঝে ছওয়াবের দিক দিয়ে সর্বোত্তম হ’ল সেটি, যা তুমি তোমার পরিবারের জন্য খরচ করেছ’। -মুসলিম হা/৯৯৫; মিশকাত হা/১৯৩১।
ইমাম ত্বীবী (রহঃ) বলেন,
فيه دليل على أن إنفاق الرجل على أهله أفضله من الإنفاق في سبيل الله، ومن الإنفاق في الرقاب ومن التصدق على المساكين،
‘এই হাদীছে দলীল রয়েছে যে, আল্লাহর পথে ব্যয় করা, দাস মুক্তির জন্যে দান করা এবং মিসকীনদেরকে ছাদাক্বাহ করার চেয়েও কোন ব্যক্তির জন্য উত্তম কাজ হ’ল পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করা’। -মির‘আতুল মাফাতীহ্, ৬/৩৬৭ পৃ.।
সাত. শ্রমিকের কাজে সাহায্য করা এবং বেকারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাঃ
ইসলাম ছোট-বড়, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকলকে পরস্পর সহযোগিতা করতে অনুপ্রাণিত করেছে। আবূ যার (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি জিজ্ঞেস করলাম,
يَا رَسُولَ اللهِ، أَيُّ الْأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: الْإِيمَانُ بِاللهِ وَالْجِهَادُ فِي سَبِيلِهِ قَالَ: قُلْتُ: أَيُّ الرِّقَابِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: أَنْفَسُهَا عِنْدَ أَهْلِهَا وَأَكْثَرُهَا ثَمَنًا قَالَ: قُلْتُ: فَإِنْ لَمْ أَفْعَلْ؟ قَالَ: تُعِينُ صَانِعًا أَوْ تَصْنَعُ لِأَخْرَقَ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، أَرَأَيْتَ إِنْ ضَعُفْتُ عَنْ بَعْضِ الْعَمَلِ؟ قَالَ: تَكُفُّ شَرَّكَ عَنِ النَّاسِ فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ مِنْكَ عَلَى نَفْسِكَ.
‘হে আল্লাহর রাসূল! কোন আমল সর্বোত্তম? তিনি বললেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং তাঁর পথে জিহাদ করা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন ধরনের গোলাম আযাদ করা উত্তম? তিনি বললেন, যে গোলামের মূল্য অধিক এবং যে গোলাম তার মনিবের কাছে অধিক আকর্ষণীয়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি যদি এটা করতে না পারি? তিনি বললেন, তাহ’লে কাজের লোককে (তার কাজে) সাহায্য করবে কিংবা বেকারকে কাজের সংস্থান করে দিবে। আমি (আবারও) বললাম, যদি আমি এটাও করতে না পারি? তিনি বললেন, ‘তাহ’লে মানুষকে তোমার অনিষ্টতা থেকে মুক্ত রাখবে। বস্ত্ততঃ এটা তোমার নিজের জন্য তোমার পক্ষ থেকে ছাদাক্বাহ’। -বুখারী হা/২৫১৮; মুসলিম হা/৮৪, শব্দাবলী মুসলিমের।
বোঝা গেল, শ্রমিক বা কাজের লোককে তার কাজে সহযোগিতা করা এবং অদক্ষ ও কর্মহীন লোকের জন্য কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া দাস মুক্ত করার ন্যায় মর্যাদাপূর্ণ আমল।
আট. সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার একশত বার করে পাঠ করাঃ
উম্মু হানী (রাঃ) বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর নিকট এসে বললাম,
يَا رَسُولَ اللهِ، دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ فَإِنِّي قَدْ كَبِرْتُ وَضَعُفْتُ وَبَدُنْتُ،
‘হে আল্লাহর রাসূল, সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাকে একটা আমলের কথা বলে দিন। কেননা, এখন আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, দুর্বল হয়ে গেছি এবং আমার দেহও ভারী হয়ে গেছে। তখন তিনি বলেন,
كَبِّرِي اللهَ مِائَةَ مَرَّةٍ، وَاحْمَدِي اللهَ مِائَةَ مَرَّةٍ، وَسَبِّحِي اللهَ مِائَةَ مَرَّةٍ خَيْرٌ مِنْ مِائَةِ فَرَسٍ مُلْجَمٍ مُسْرَجٍ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَخَيْرٌ مِنْ مِائَةِ بَدَنَةٍ، وَخَيْرٌ مِنْ مِائَةِ رَقَبَةٍ
‘তুমি একশত বার আল্লাহু আকবার, একশত বার আলহামদুলিল্লাহ এবং একশত বার সুবহা-নাল্লাহ পড়। এটা তোমার জন্য জিনপোষ ও লাগামসহ একশত ঘোড়া আল্লাহর পথে (জিহাদে) দান করার চেয়ে উত্তম, একশত উটের চেয়ে উত্তম এবং একশত গোলাম আযাদ করার চেয়ে উত্তম’। -ইবনু মাজাহ হা/৩৮১০; ছহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১৫৫৩; সনদ হাসান।
বর্তমান যুগে যদি দাস প্রথা থাকত, তাহ’লে একশটি দাস আযাদ করতে কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন হ’ত। অথচ পাঁচ-সাত মিনিটের মাধ্যেই আমরা এই আমলটি করতে পারি।
নয়. মাগরিব ও ফজর ছালাতের পর দশ বার তাহলীল বা কালেমা তাওহীদ পাঠ করাঃ
যে ব্যক্তি মাগরিব ও ফজরের ফরয ছালাতের পর দশবার করে বিশেষ তাহলীল পাঠ করে, তার আমলনামায় দশজন মুমিন ক্রীতদাস মুক্ত করার নেকী লিপিবদ্ধ করা হয়। উমারাহ ইবনু শাবীব আস-সাবাঈ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الـمُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ، يُحْيِي وَيـُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ عَشْرَ مَرَّاتٍ عَلَى إِثْرِ الـمَغْرِبِ بَعَثَ اللهُ لَهُ مَسْلَحَةً يَحْفَظُونَهُ مِنَ الشَّيْطَانِ حَتَّى يُصْبِحَ، وَكَتَبَ اللهُ لَهُ بِهَا عَشْرَ حَسَنَاتٍ مُوجِبَاتٍ، وَمَحَا عَنْهُ عَشْرَ سَيِّئَاتٍ مُوبِقَاتٍ، وَكَانَتْ لَهُ بِعَدْلِ عَشْرِ رِقَابٍ مُؤْمِنَاتٍ،
‘যে ব্যক্তি মাগরিবের ছালাতের পর দশবার বলবে, ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহূ লা-শারীকা লাহূ লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ইয়ুহ্য়ী ওয়া ইয়ুমী-তু ওয়াহুয়া ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর’ (অর্থ- আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ্ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই, সকল রাজত্ব তাঁর এবং তিনিই সকল প্রশংসার অধিকারী, তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন এবং প্রতিটি জিনিসের উপর তিনিই মহা ক্ষমতাশালী)’, তাহ’লে আল্লাহ তার (পাঠকারীর) নিরাপত্তার জন্য একদল ফেরেশতা পাঠান, যারা তাকে শয়তানের ক্ষতি হ’তে ভোর পর্যন্ত নিরাপত্তা দান করেন, তার জন্য (আল্লাহর অনুগ্রহ) আবশ্যক করার ন্যায় দশটি নেকী লিখে দেন, তার দশটি ধ্বংসাত্মক গুনাহ মুছে দেন এবং তার জন্য দশজন ঈমানদার দাস মুক্ত করার সমপরিমাণ ছওয়াব রয়েছে’। -তিরমিযী হা/৩৫৩৪; নাসাঈ হা/১০৩৩৮; ছহীহুত তারগীব হা/৬৬০, ছহীহ হাদীছ।
দশ. কালেমা তাওহীদ প্রতিদিন একশত বার পাঠ করাঃ
আবূ হুরায়ারা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَالَ: لاَ إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الـمُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، فِي يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ، كَانَتْ لَهُ عَدْلَ عَشْرِ رِقَابٍ، وَكُتِبَتْ لَهُ مِائَةُ حَسَنَةٍ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ مِائَةُ سَيِّئَةٍ، وَكَانَتْ لَهُ حِرْزًا مِنَ الشَّيْطَانِ يَوْمَهُ ذَلِكَ حَتَّى يُمْسِيَ، وَلَمْ يَأْتِ أَحَدٌ بِأَفْضَلَ مِمَّا جَاءَ بِهِ، إِلَّا أَحَدٌ عَمِلَ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ،
‘যে ব্যক্তি এই দো‘আটি দিনে একশ’ বার পড়বে যে, ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহূ লা-শারীকা লাহূ লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর’, তাহ’লে তার জন্য দশটি গোলাম আযাদ করার সমপরিমাণ নেকী অর্জিত হবে, তার জন্য একশটি নেকী লিপিবদ্ধ করা হবে এবং একশটি গুনাহ মোচন করা হবে। আর সেই দিনের সন্ধ্যা অবধি এই দো‘আটি তার জন্য শয়তান থেকে বাঁচার রক্ষাকবচ হবে এবং তার চেয়ে সেদিন কেউ উত্তম আমল করতে পারবে না। তবে তার কথা স্বতন্ত্র, যে এর চেয়ে আরো বেশী আমল করে’। -বুখারী হা/৩২৯৩; মুসলিম হা/২৬৯১; মিশকাত হা/২৩০২।
এগারো. আল্লাহর পথে জিহাদ করাঃ
গোলাম আযাদের মত বিশাল নেকী লাভের অন্যতম আরেকটি উপায় হল আল্লাহর পথে জিহাদ করা। কিন্তু জিহাদের কথা উঠলে তো কারও কারও আবার দেখা দেয় সমস্যা। তারা জিহাদের অর্থ এবং মর্ম, সংজ্ঞা এবং হুকুম কোনোটাই হয়তো সঠিকভাবে না জানার কারণে এমনটি হয়ে থাকে। সময় সুযোগ পেলে জিহাদ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা লাভের উদ্দেশ্যে পরবর্তীতে লেখার ইচ্ছে থাকলো ইনশাআল্লাহ। আমর ইবনু আবাসাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি,
مَنْ رَمَى الْعَدُوَّ بِسَهْمٍ، فَبَلَغَ سَهْمُهُ الْعَدُوَّ، أَصَابَ أَوْ أَخْطَأَ، فَعَدْلُ رَقَبَةٍ،
‘যে ব্যক্তি শত্রুবাহিনীর প্রতি একটি তীর নিক্ষেপ করল। অতঃপর সেই তীর শত্রুর নিকটে পৌঁছে ঠিক লক্ষ্যে আঘাত হানুক বা লক্ষ্যচ্যুত হোক, এর বিনিময়ে একজন দাস মুক্ত করার নেকী রয়েছে’। -ইবনু মাজাহ, হা/২৮১২; ছহীহুত তারগীব হা/১২৮৬, সনদ ছহীহ্।
অপর বর্ণনায় তিনি বলেন,
مَنْ رَمَى بِسَهْمٍ فِي سَبِيلِ اللهِ فَهُوَ لَهُ عَدْلُ مُحَرَّرٍ،
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একটি তীর নিক্ষেপ করবে, তার জন্য একটি গোলাম আযাদের নেকী রয়েছে’। -তিরমিযী, হা/১৬৩৮; নাসাঈ হা/৩১৪৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৬২৬।
সময় স্বল্পতার মাঝেও এই লেখাটির সমাপ্তি টানার আগে কিছু কথা না বলে পারছি না বলে দুঃখিত! জিহাদের প্রসঙ্গ এলেই কিছু ভাইদের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি আসতে দেখা যায়। সত্যিকারের একজন মুসলিম জিহাদ শব্দের মধ্যে কখনো সমস্যা অনুভব করতে পারেন না। বরং, এই শব্দটিতে তার আপত্তি অনুসন্ধানের প্রশ্নই আসতে পারে না। কারণ, এটি মহাগ্রন্থ আল কুরআনের অন্যতম একটি পরিভাষা। কুরআনুল কারিম এবং হাদিসের কিতাবগুলোতে বহুল ব্যবহৃত একটি টার্ম বা পরিভাষাকে হাস্যকরভাবে নেয়া কখনো ঈমানদার ব্যক্তির কাজ হতে পারে কি না, সে ফয়সালার ভার সম্মানিত পাঠকের প্রতি রেখে দিলাম। এটা কেবলমাত্র তাদের পক্ষেই শোভনীয় ও মানানসই যারা মৃত্যুভয়ে ভীত এবং সত্যের পথ থেকে পলায়নপর মানসিকতা যাদেরকে বিভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত করে পার্থিব সামান্য মোহে আবদ্ধ ও বিভ্রান্ত করে রেখেছে। এদের অবস্থা দর্শনে মনে হয়, এরা 'জিহাদ' শব্দটাতেই যেন মৃত্যুর গন্ধ পান। মৃত্যুর ঘ্রাণ যেন তাদের নাকে এসে লাগে। কিন্তু বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করি, ভাই! এত ভয় পাবার আসলেই কিছু আছে কি? জিহাদ মানে তো কারও উপরে অন্যায় আক্রমন নয়। জিহাদ মানে, কারও প্রতি অবিচার জুলূম চাপিয়ে দেয়া নয়। জিহাদ মানে, কাউকে কষ্ট দেয়া নয়। কাউকে আঘাত করা নয়। কাউকে হত্যা করা জিহাদ নয়। জিহাদ মানে, চেষ্টা প্রচেষ্টা, সত্যের পথে সাধনা। আর প্রকৃত জিহাদ হচ্ছে, আল্লাহ তাআ'লার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে দ্বীনের পথে অটল অবিচল থাকার আমৃত্যু অবিরাম সংগ্রাম।
উদাহরণতঃ মন তো চায় অন্যায় করতে, কিন্তু মনের সাথে বোঝাপড়া করলেন, যুদ্ধ করলেন, দীর্ঘ বোঝাপড়ার একপর্যায়ে মনের চাহিদামত সে অন্যায় কাজটি আপনি করলেন না। ফিরে আসলেন। আপনি জয়ী হলেন। এটাও জিহাদ। এটা নফসের সাথে জিহাদ। আর এই যে নফসের সাথে জিহাদ, রাগের সময় নিজেকে কন্ট্রোল করা, নিজের প্রতি নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মত মহৎ গুণকে হাদিসের ভাষায় অভিহিত করা হয়েছে, 'জিহাদের আকবার' বা 'সবচেয়ে বড় জিহাদ' হিসেবে। এর বাইরে সশস্ত্র জিহাদের যে বিষয়টি রয়েছে তার জন্য জিহাদ সম্মন্ধে ভালোভাবে স্বচ্ছ ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। সশস্ত্র জিহাদ কোথায়, কখন এবং কোন পরিস্থিতিতে করা বিধেয়, তার রয়েছে ইসলামে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। সুতরাং, এগুলো গভীরভাবে অনুধাবন না করে, জিহাদের হুকুম সঠিকভাবে অবগত না হয়ে, না জেনে, না বুঝে কোনো ষড়যন্ত্রকারী মহলের ইন্ধন, চক্রান্ত কিংবা লোভ লালসায় বিভ্রান্ত হয়ে জিহাদের নামে অন্যায় পথে পা বাড়ানোর কোনো অনুমতি ইসলাম কখনো দেয় না। বরং, এসব চক্রান্তকারীদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়া থেকে নিজেকে সতর্কতার সাথে বাঁচিয়ে রাখা যেমন প্রত্যেকের দায়িত্ব, তেমনি অন্যদেরও বাঁচতে সাহায্য করা একান্তভাবে উচিত।
জিহাদকে অযথা অযাচিতভাবে ভয় শুধু তারাই পান যারা মৃত্যুকে ভয় পান তীব্রভাবে। বলি, প্রিয় ভাই, শ্রদ্ধেয়া বোন, মৃত্যুকে ভয় পেলেই কি মৃত্যু আমাদের ছেড়ে চলে যাবে? মৃত্যু থেকে বাঁচার তো কোনো পথ নেই। মৃত্যু অবধারিত। সুতরাং, অহেতুক ভয় পেয়ে লাভ কি? মৃত্যু আসবেই। তা সুরক্ষিত, সাউন্ডপ্রুফ আবদ্ধ কুঠুরির ভেতরে থাকলেও।
তবে, আমরা যারা অতি ভীত, জিহাদ কথাটা শুনলেই ভয়ে কেঁপে উঠি, আমাদের জন্য সুসংবাদ হচ্ছে, জিহাদের নাম শুনলেই ভীত না হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, জিহাদ কুরআনে বর্ণিত আল্লাহ তাআ'লার দেয়া অন্যতম একটি বিধান। তবে জিহাদের নামে শান্তিপূর্ণ সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা তৈরি করে শান্তি বিনষ্ট করার কোনো সুযোগ ইসলাম কখনো কাউকে দেয় না। জিহাদের নাম করে যেখানে সেখানে, যখন তখন উম্মাদনা সৃষ্টি করার সুযোগও আদৌ ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলাম শান্তির ধর্ম। অন্য জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের জান মাল ইজ্জত আবরু নিরাপত্তায় ইসলাম সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
শেষের কথাঃ
সালাম তথা শান্তির সম্ভাষন শুরুতে ও শেষে। প্রিয় পাঠক! যে সকল আমল সম্পর্কে অত্র নিবন্ধে আলোকপাত করা হল, তা সম্পাদন করা আমাদের কাছে আদৌ কোন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু আবহেলা ও অলসতার দরূন নেকীর ভান্ডার সমৃদ্ধ করার এই সুযোগগুলো আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। কোন কোন আমল এমন রয়েছে যেগুলো একটু ইচ্ছা করলেই স্বল্প সময়ে করা সম্ভব। তাই আসুন! নেকী লাভের সুযোগগুলোকে আমরা যথাযথভাবে কাজে লাগাই এবং উপরোক্ত আমলসমূহ সম্পাদনের মাধ্যমে গোলাম আযাদ করার নেকী অর্জনে ব্রতী হই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা আমাদের সহায় হোন। কল্যানকর প্রত্যেক কাজে আমাদের তাওফিককে বাড়িয়ে দেন। আমাদের প্রতিটি আমলকে দৃঢ়তার সাথে করার সাহস এবং শক্তি দান করুন।
লেখা ও তথ্য সূত্রঃ
[1]. হত্যার কাফ্ফারা (সূরা নিসা ৪/৯২), যিহারের কাফ্ফারা (মুজাদালাহ ৫৮/০৩), কসম ভঙ্গের কাফ্ফারা (মায়েদা ৫/৮৯), রামাযানে দিনের বেলায় সহবাসের কাফ্ফারা (বুখারী হা/১৯৩৬; মুসলিম হা/১১১), দাসকে প্রহার করার কাফ্ফারা (মুসলিম হা/১৬৫৭; আবূদাঊদ হা/৫১৬৮) প্রভৃতি।
[2]. মুসলিম হা/১৫০৯; তিরমিযী হা/১৫৪১; ইরওয়াউল গালীল হা/১৭৪২।
[3]. আবূদাঊদ হা/৩৯৬৬, সনদ ছহীহ।
[4]. ছিফাতুছ ছাফওয়া, ১/২৪০ পৃ.।
[5]. তিরমিযী হা/৯৫৯; মিশকাত হা/২৫৮০, সনদ ছহীহ।
[6]. মুসনাদে বায্যার হা/৬১৭৭; ছহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১১১২, সনদ হাসান।
[7]. ইবনু মাজাহ হা/২৮১২; ছহীহুত তারগীব হা/১২৮৬, সনদ ছহীহ্।
[8]. তিরমিযী হা/১৬৩৮; নাসাঈ হা/৩১৪৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৬২৬।
[9]. তিরমিযী হা/১৯৫৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৫৫৯, ছহীহ হাদীছ।
[10]. বুখারী হা/২৫৯২; মিশকাত হা/১৯৩৫।
[11]. মির‘আতুল মাফাতীহ্, ৬/৩৭২ পৃ.।
[12]. মুসলিম হা/৯৯৫; মিশকাত হা/১৯৩১।
[13]. মির‘আতুল মাফাতীহ্, ৬/৩৬৭ পৃ.।
[14]. বুখারী হা/২৫১৮; মুসলিম হা/৮৪, শব্দাবলী মুসলিমের।
[15]. দারাকুৎনী হা/২০৫৫; শু‘আইব আরনাঊত হাদীছটি ছহীহ বলেছেন।
[16]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৪০২৬; মিশকাত হা/৩৩৮৪; ছহীহুত তারগীব হা/১৮৯৮, সনদ ছহীহ্।
[17]. তিরমিযী হা/৩৫৩৪; নাসাঈ হা/১০৩৩৮; ছহীহুত তারগীব হা/৬৬০, ছহীহ হাদীছ।
[18]. বুখারী হা/৩২৯৩; মুসলিম হা/২৬৯১; মিশকাত হা/২৩০২।
[19]. ইবনু মাজাহ হা/৩৮১০; ছহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১৫৫৩; সনদ হাসান।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

