
হিযরতের আলোকিত সেই পথ ধরে...
হ্যাঁ, হিযরতের সেই পথ ধরেই চলবেন পর্যটকরা। মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় যাওয়ার পথ ধরে চলতে চলতেই পর্যটকরা পৌঁছে যেতে পারবেন মদিনাতুল মুনাওওয়ারায়। মক্কা হতে মদিনা যেতে বর্তমানে যে পথ ব্যবহৃত হচ্ছে ঠিক এ পথে মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিযরতের সময় মদিনায় যাননি। মূলত: তাঁর হিযরতের সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে জাগরুক রাখতেই নেয়া হয়েছে মহতি এই উদ্যোগটি। হজযাত্রী, উমরা আদায়কারী এবং অন্যান্য পর্যটকগণ চলবেন মদিনার পথে, প্রিয় নবীজীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে করে, আর বুকের ভেতরে তাদের অনুভূত হতে থাকবে প্রিয় নবীজীর থেমে থেমে চলার সেই ছন্দময় আওয়াজ, অন্তর্চক্ষু মুদলেই তারা যেন অনুভবে দেখে নিতে পারেন প্রিয়তম সহচর আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহুকে সাথে নিয়ে প্রিয় নবীজীর আলোকিত সেই কাফেলার এগিয়ে চলার অসম্ভব সুন্দর আলোকিত দৃশ্য, দীর্ঘ পথ চলতে চলতে ক্লান্ত শ্রান্ত অবয়বে প্রিয় নবীজীর ক্ষনিকের জন্য বিশ্রাম, পুনরায় আবার পথচলা, এমনি করে দীর্ঘ বার দিনের মাথায় কোনো এক আলোকদীপ্ত প্রভাতে উপনীত হওয়া মদিনার উপকন্ঠে প্রিয় কুবা পল্লীতে। চলমান এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে অনেকটা এগিয়েও গেছে। এখন চলছে এর নথিভূক্তির কাজ।
৬২২ সালের ২৭ সফর মোতাবেক ১২ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিযরতের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক এই পথ ধরে প্রিয় জন্মভূমি মক্কার মায়া ত্যাগ করে মদিনার পথে যাত্রা করেছিলেন। দীর্ঘ ১১/১২ দিন পথচলার পরে ৮ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ২৩ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের সোমবার মদিনার উপকন্ঠে কুবা পল্লীতে গিয়ে উপনীত হন তিনি। ১৪ শত বছর আগের প্রিয় নবীজীর মদিনায় যাত্রার সেই পথে পুনরায় মদিনা গমনের পথ নথিভূক্ত করার এই কাজটি করছে সউদী আরবের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ইতিমধ্যে ‘রিহলাত মুহাজির’ নামের একটি সংস্থা নথিভূক্তকরণ উদ্যোগের প্রথম ধাপ সম্পন্নের কথা জানিয়েছে।
পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে আরো সমৃদ্ধ করতে মক্কা নগরীতে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে 'দ্য জাবালে সাওর কালচারাল সেন্টার'। এ লক্ষ্যে মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের নিয়ে কাজ করছে সংস্কৃতি ও জাদুঘর বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত 'সামায়া ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি'।
'সামায়া ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি'র প্রধান নির্বাহী ফাওয়াজ মেরহেজ জানান, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বায়বীয় ডকুমেন্টেশন ও প্যানোরামিক ৩৬০ ডিগ্রি ফটোগ্রাফি ব্যবহার করে মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিযরতের পথ নথিভূক্ত করতে ‘মুহাজির’ নামের উদ্যেগের কাজ চলছে। গত বছরের ২০ ডিসেম্বর এ উদ্যোগের প্রথম পর্ব উদ্বোধন হয়।
তিনি আরো বলেন, মক্কা নগরীর সাওর পর্বতের গুহা থেকে শুরু করে ৪০টি স্টেশন অতিক্রম করে মদিনার মসজিদে কুবা পর্যন্ত পথ নির্ধারণ করা হয়। 'দ্য জাবালে সাওর কালচারাল সেন্টারে' মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিযরতের ঘটনা উপস্থাপনের চিন্তা থেকে হিযরতের পথ নথিভুক্ত করার ধারণাটি আসে।
প্রধানত প্যানোরামিক ৩৬০ ডিগ্রি ফটোগ্রাফি ব্যবহার করে মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিযরতের দীর্ঘ এ পথ নথিভূক্ত করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে এসব স্থানে ফোর কে ড্রোন ব্যবহার করে ডিজিটালভাবে এ পথ নথিভূক্ত করা হবে। পথ নথিভূক্তির সময় এবড়োথেবড়ো রাস্তাঘাট ও সময়ের পরিক্রমায় ঐতিহাসিক স্থানের নাম পরিবর্তন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে তিনি জানান।
পথ অনুসন্ধানে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন ইসলামের ইতিহাস ও মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী বিষয়ক একটি বিশেষজ্ঞ দল। তাদের মধ্যে আছেন মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ইসলামী সভ্যতা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বিন সামিল আল সালামি ও অধ্যাপক সাদ বিন মুসা আল মুসা।
আরো যুক্ত আছেন রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগের অধ্যাপক ও এটলাস বায়োগ্রাফি অব প্রফেট -এর সায়েন্টিফিক কমিটির সদস্য সুলাইমান বিন আবদুল্লাহ আল-সুওয়াইকেত ও অধ্যাপক আবদুল আজিজ বিন ইবরাহিম আল উমারি। এছাড়াও মদিনা নগরী ও মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ বিন মুস্তাফা আল শানকিতিও এ প্রকল্পে নানাভাবে সংযুক্ত আছেন।
শেষের কথা...
নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিযরত পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম একটি স্মরণীয় ঘটনা। শুধু স্মরণীয়ই নয়, এটি এমনই একটি তাৎপর্যপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ ঘটনা যে, হিযরতের আলোকিত এই পথ ধরেই বিশ্বময় ছড়ি দেয়া সম্ভব হয়েছিল ইসলামের সুমহান বানী আল্লাহু আকবারের ধ্বনি, এই হিযরতের মাধ্যমেই বিজয়ের সূচনা হয়েছিল ইসলাম এবং মুসলমানদের, হিযরতের পরপরই প্রিয়তম রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে সূচিত হয়েছিল নবতর এক অধ্যায়ের, সর্বোপরি আরবের সীমানা পেরিয়ে তৎকালীন পৃথিবীর মানব বসতি গড়ে ওঠা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকার দিকে দিকে এবং প্রান্তে প্রান্তে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ারও সুযোগ হয়েছিল এই হিযরতেরই ফলশ্রুতিতে। প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদধূলিধন্য এই বরকতময় পথে একটিবার আমারও যদি মক্কা থেকে মদিনার পথে যাত্রা করার তাওফিক হতো! সর্বোত্তম তাওফিকদাতা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা! তাঁর নিকটেই সাহায্যপ্রার্থী হচ্ছি সর্বান্তকরণে, সিজদাবনত চিত্তে, বিগলিত অন্তরে!
তথ্যসূত্র: আর রাহিকুল মাখতূম, সীরাতে ইবনে হিশাম, দৈনিক ইনকিলাব, আরব নিউজ ও ইসলামের ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য অন্যান্য উৎস
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৪:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


