
তুষারঝড়ে যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছেন। বহু অঞ্চলের রাস্তাঘাট কার্যত অচল। ঘরের ভেতরেও মানুষ কাঁপছে, বাইরে গাড়ি জমে আছে বরফে। অথচ এটাই সেই দেশ, যার প্রেসিডেন্টের হম্বিতম্বির শেষ নেই, মদমত্ততার সীমা পরিসীমা নেই। নিজেকে তিনি ভাবেন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ। যার কাছে আইন আদালতের গুরুত্ব নেই, তার কথাই আইন, তার ইচ্ছাই চূড়ান্ত।
এমনই ক্ষমতাধর যে বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে আঙুল বুলিয়ে যেদিকে খুশি সেদিকেই দাগ টানেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়া তার কাছে বৈধ, গ্রীনল্যান্ড দখলের স্বপ্ন দেখা তার অধিকার, কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকি দেওয়া তার কাছে ডালভাত। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের জনগণের জীবন তছনছ করে দিয়ে তিনি অপার্থিব এক তৃপ্তি অনুভব করেন।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী মানুষটি একটি তুষারঝড়ের সামনে এসে একেবারে অসহায়। বোমা মেরে দেশ ওলটপালট করা যায়, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মানুষের ঘরে আগুন লাগানো যায়, টুইট ছুড়ে দিয়ে গোটা দুনিয়াকে অস্থির করা যায়। কিন্তু আকাশ থেকে নামা বরফ থামানো যায় না, এইটা একটা কথা হইলো? এখানে এসে তার সব ক্ষমতা, সব দাম্ভিকতা, সব হুংকার ঠান্ডায় জমে যায়, এটা মেনে নেওয়া কঠিন। কারন, তার অবস্থা দেখে তো মনে হয়, হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকে কেউ যদি বলে ওঠে, “স্যার, ঝড়টা থামাবো?” তাহলে ট্রাম্প চোখ কুঁচকে আগেই এই প্রশ্নটা করবেন যে, “এর ওপর পাল্টা শুল্ক বসানো যাবে নাকি?”
ট্রাম্পের ইতিহাস দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাপ দাদার ব্যবসায়িক ঐতিহ্য, রিয়েল এস্টেট, ক্যাসিনো, বারবার দেউলিয়াত্ব আর সীমাহীন আত্মপ্রচারের মিশেল থেকে বেরিয়ে আসা এক খল চরিত্র তিনি। রাজনীতিতে এসেও সেই ব্যবসায়ীর মানসিকতা একচুলও বদলায়নি। লাভ হলে ভালো, না হলে ভেঙে দাও। দেশ নয়, মানুষ নয়, নীতি নয়, সবকিছুই তার কাছে ডিলের বিষয়। লাভ ক্ষতির হিসেব ছাড়া তার কাছে আর কিছুই নেই। তাই বিশ্বজুড়ে অশান্তি, বিভাজন আর উম্মাদনার খলনায়ক হিসেবে তিনি যেন একেবারে পারফেক্ট কাস্টিং।
এই মানুষটাই বিশ্ব বাণিজ্যকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছেন। চীন, ইউরোপ, কানাডা, মেক্সিকো সবাইকে শুল্ক চাপিয়ে দিয়ে অশান্তি উপহার দিয়েছেন। শান্তি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষেরও হারাম হয়েছে, কারণ, পাল্টা শুল্কের ফলে তারাও বিপদে পড়েছে। পাল্টা শুল্ক এসেছে, বাজার কেঁপেছে, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের কাছে এসব ছিল দর কষাকষির খুঁটিনাটি। যেন গোটা পৃথিবী তার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক টেবিল, আর দেশগুলো কেবল দরপত্রের ফাইল।

এবারের তুষারঝড়ই প্রথম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ দাবানলেও পুড়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার পাহাড়ে পাহাড়ে আগুন, আকাশ লাল, শহর ছাই, মানুষ উদ্বাস্তু। তখনও দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে কেবল প্রেস ব্রিফিং করছেন। আগুন নেভাতে টুইট কাজে আসেনি, হুমকি কাজে আসেনি, শুল্ক তো মোটেই নয়। তখনও ক্ষমতার সেই গল্পগুলো ধোঁয়ার সঙ্গে মিলিয়ে উড়ে গেছে।
প্রকৃতি কোনো ডিল মানে না। সে কোনো নিষেধাজ্ঞা বোঝে না, কোনো পাল্টা শুল্ক টুল্ক তাকে ভীত করতে পারে না, কোনো টুইটও সে পড়ে না, কোনো প্রেস কনফারেন্স সে গোনায় ধরে না। বরফ নামার সময় হলে ঠিকই নেমে আসে, আগুন জ্বলার প্রয়োজন হলে সময়মতই জ্বলে ওঠে, ঝড়ের তাণ্ডবের সময় হলে সঠিক নিয়মেই হাজির হয়ে যায়। তখন হোয়াইট হাউসের শক্ত দেয়ালও তা থামিয়ে দিতে পারে না।
এই তুষারঝড় আর দাবানল মিলিয়ে আমাদের একটা খুব সাধারণ সত্য মনে করিয়ে দেয়। প্রেসিডেন্ট যতই মহান(!) হোক, ক্ষমতা যতই সীমাহীন বলে প্রচার করা হোক, দম্ভ অহংকার যতই জাহির করা হোক, সেটা মূলত মানুষকে নিয়েই। প্রকৃতির সামনে এসে সেই ক্ষমতা, উম্মত্ততা, মদমত্ততা স্রেফ একটি ঠান্ডায় জমে যাওয়া, কিংবা দাবানলের ধোঁয়ায় হারিয়ে যাওয়া টুইট মাত্র।

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


