somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

''একটি বিলবোর্ড কিংবা একজন মানুষের হারিয়ে যাবার গল্প ''

১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ বিকাল ৫:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.

ছয় বছরের বালকটি যেন উড়ে উড়ে আসছিল খালের পাড় ধরে।বালকের মুখে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি।আপন মনেই হাসতে হাসতে পথ চলে বালকটি।মাত্রই সজলপুর হাট থেকে ফিরছে সে।বালকের হাসির কারণ হাতে ধরা বস্তুটি,মাত্রই হাট থেকে কিনল ।শখের জিনিসটিকে পরম মমতায় বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে রাখে সে।

হাঁটতে হাঁটতে পথের পাশের মাঠে দেখা হয়ে যায় বন্ধুদের সাথে।বন্ধুরা ব্যস্ত তখন ঘুড়ি-নাটাই নিয়ে,বালক কাছে আসতেই সবার চোখ গিয়ে পড়ে আঁকড়ে ধরা জিনিসটার উপর।সবার আবদার ওটাকে ছুঁয়ে দেখবে,বালক হাসি মুখেই তা বাড়িয়ে দেয় বন্ধুদের দিকে।বন্ধুরা চোখ গোলগোল করে চেয়ে থাকে আজব জিনিসটার দিকে।অনেক দূরের আকাশে উড়ে চলা এরোপ্লেন বাস্তব হয়ে নেমে আসে ছেলেদের হাতের মুঠোয়।বালক স্পষ্ট দেখতে পায় ছেলেদের চোখের কোণে চিকন ঈর্ষা,বালকের ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসির রেখা ফুটে উঠে অবহেলায়।মনটা আর্শ্চয একটা খুশিতে ভরে উঠে তার।দুটো ডানা থাকলে এরোপ্লেনের মত যেন উড়ে চলে যেত সে!বাড়িতে গিয়ে মাকে কি বলে ধন্যবাদ দিবে ভেবেই পায় না বালক।বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির পথ ধরে সে।লাফাতে লাফাতে পথ চলে বালক,এক পা মাটিতে পড়ে তো অন্য পা শূন্যেই রয়ে যায়।হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে পথের দূরত্ব-টুকে যেন একনিমেষেই পার করবে সে।তর সয় না বালকের কখন পিছন থেকে মাকে আচমকা জড়িয়ে ধরে বলবে-মা,তুমি কত্ত ভাল!!কি মজাটাই না হবে,গনগনে চুলোর আগুনের পাশে বসে থাকা মা তখন কালি-ঝুলি মাখা হাতেই জড়িয়ে ধরবে বুকে,মাথায় আলতো করে চুমো খেয়ে বলবে-পাগল ছেলে,কি যে করিস তুই,আরেকটু হলেই তো আগুনের মধ্যে গিয়ে পড়তি।মা তারপর ওকে হাত-মুখ ধুঁয়ে আসতে বলবেন,বলবেন বাবা তুই আমার সামনে বসে পায়েসটুকু খা,তোর পছন্দমত ঘন দুধের পায়েস করেছি আজ ।বালকের জিভে পানি আসবে তবুও আজ সে পায়েস ছুঁয়ে দেখবে না।যতক্ষণ না মাকে এরোপ্লেনটা দেখাবে সে আজ কিছুই মুখে দিবে না,মনে মনে ঠিক করে বালক।


ধূর!!পথটা যেন আজ শেষই হয় না।মায়ের স্নেহভরা র্স্পশের কথা ভাবতেই বালকের মনে আর্শ্চয এক শিহরণ জাগে।মুখ থেকে অজান্তে বের হয়ে আসে মা তোমাকে অনেক অনেক বেশি ভালবাসি।আরে ঐতো বাড়ির গেইট দেখা যাচ্ছে।বিকালের শেষে সন্ধ্যা প্রায় হয় হয়,এই সময়টাতে কি যেন একটা অদ্ভূত নিরবতা ছড়িয়ে থাকে প্রকৃতিতে।কিন্তু বাড়ির মানুষ গুলো কোথায় গেল আজ,,বালক ভেবে পায় না।বাড়ির চত্বরে পা দিয়ে আরো অবাক হয় সে,চারদিকে কেমন একটা আজব ধরনের শূন্যতা।সবসময় কোলাহলমুখর এই বাড়ির বেমানান হঠাৎ শূন্যতা বালককে হতবিহ্বল করে তোলে।অন্ধকারে ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে ডাকে বালক-‘মা’

এভাবেই তের বছর আগের এক গোধূলিক্ষণে বালকের জীবন থেকে হঠাৎ করেই হারিয়ে যায় তার ‘মা’।

২.

কাঁচঘেরা আইসিইউ’র ওপাশে তিন নম্বর বেডে যে রোগীটি বোধহীন,সংজ্ঞাহীন পড়ে আছে দিনের পর দিন,সেই রোগীটিই নতুন ইন্টার্ণ ডক্টর আমরীন এর কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।কেউ মানুষটিকে দেখতে আসে না,মানুষটিও কার জন্য অপেক্ষা করে না।দিনের পর দিন একই ভাবে নীরব,নিথর,নিশ্চল পড়ে থাকে মানুষটি।আমরীনের মনে প্রশ্ন জাগে এই মানুষটির কি কোন অতীত নেই কিংবা প্রিয়জন??

কৌতূহলের বশেই হাসপাতালের পুরোনো রেজিস্টার খাতা থেকে আমরীন জানতে চেষ্টা করে জীবনমৃত এই মানুষটি সম্পর্কে।তের বছর আগের এক সন্ধ্যায় মুমূর্ষ অবস্থায় এই মহিলাটিকে এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন একজন ।তিনিই এখন পর্যন্ত এই রোগীর চিকিৎসার সব খরচ বহন করছেন।আমরীন সেই শুভাকাঙ্খী মানুষটির সাথে যোগাযোগ করে,শুভাকাঙ্খী মানুষটি আমরীনকে জানায় তিনি সজলপুর গ্রাম থেকে এই মহিলাটিকে উদ্ধার করে এনে এই হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন।মহিলাটি ওই গ্রামের এক প্রভাবশালীর স্ত্রী ছিলেন,পারিবারিক কলহের জের ধরে ওই প্রভাবশালী নিজের স্ত্রীকে মেরে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রাস্তায় ফেলে রেখে গিয়েছিল।প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে পুলিশও কোন ব্যবস্থা নেয়নি সবকিছু জানার পরও।সব কিছু শোনার পর আমরীনের মুখ থেকে একটাই শব্দ বের হয়ে আসে-‘পশু’

৩.

ব্যস্ত নগরীর ততোধিক ব্যস্ত রাস্তায় প্রায়ই একটি ছেলেকে হেঁটে যেতে দেখা যায়।জনবহুল শহরের ব্যস্ত সড়ক দিয়ে কত মানুষই তো হেঁটে যায়,কে তাদের খবর রাখে!কিন্তু এই ছেলেটা যেন একটু অন্যরকম।সে হেঁটে যায় এলোমেলো পায়ে,তার চোখের দৃষ্টি থাকে রাস্তার পাশের বিলবোর্ডে।বিলবোর্ডগুলো যেন তার চোখে এক একটা জীবন্ত ছবি হয়ে ধরা দেয়।ছবির এ্যালবাম দেখতে দেখতে ছেলেটি এগিয়ে চলে।চলতে চলতে কখনো থমকে দাঁড়ায় একটি বিলবোর্ডের সামনে।মা আর শিশুর অন্তরঙ্গতা নিয়ে দেওয়া বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডটাকে কেন যেন বড় শূন্য মনে হয় ছেলেটির কাছে।ছেলেটির মনের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা স্নেহ-মমতার যে হাহাকার,তা যেন বিলবোর্ডের বিশালতায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।তের বছরের পুরনো শূন্যতা আবার জেগে ওঠে মনের গভীরে।জীবন্ত হয়ে উঠে প্রিয় মানুষটিকে অবেলায় হঠাৎ করে হারিয়ে ফেলার কষ্ট।বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে যায়,রোদ এসে তপ্ত পরশ বুলিয়ে যায়,ছেলেটি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।হঠাৎ কখনো কখনো ছেলেটির মুখ থেকে অস্ফুটে বের হয়ে আসে একটি করুণ আর্তনাদ-‘মা’,দুচোখ বেয়ে বয়ে যায় যা তাকে খালি চোখে অশ্রু মনে হলেও ছেলেটির চোখ থেকে অশ্রু হয়ে বয়ে যায় প্রিয় মায়ের জন্য অনেক অনেক ভালবাসা।





সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ বিকাল ৫:৩০
৯টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×