somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভাষা দৈন্যতার পরিনতি - এক

০১ লা ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক ডাক্তার বন্ধুর মুখে শোনা সত্য কাহিনী দিয়েই গল্পটি শুরু করছি।

আমার সেই ডাক্তার বন্ধুটি একজন গবেষকও। কর্মোপলক্ষে তাকে নানান দেশে যেতে হয়, এছাড়া তিনি নানান সময়ে বিভিন্ন দেশে নিজের লেখাপড়া এবং অধ্যাপনার কাজও করেন। একবার পড়াশুনার জন্য বেশ কিছুকাল তাকে সুইডেন থাকতে হয়েছিল।

উত্তর ইউরোপের দেশ হলেও ইউরোপের অনেক দেশের মতোই সুইডেনেও ইংরেজী ভাষার তেমন প্রচলন নেই। তাই দায়ে পড়ে শেখা দু’চারটি সুইডিশ শব্দের পাশাপাশি মানব সভ্যতার অতি পুরাতন ও আদি ভাষা – ইশারা ও অঙ্গভঙ্গিতেই দৈনন্দিন চলাফেরা ও স্থানীয় লোকজনের সাথে ভাবের আদান প্রদান করতে হত।

দেশ-বিদেশে যাদের যাতায়াত আছে তারা ভাল করেই জানেন যে, বিদেশ বিভূঁইয়ে বিশেষতঃ যেখানে হাতের কাছে স্বদেশী খাবারের ব্যবস্থা নেই সেখানে দেশী খাবারের কথা কল্পনাও করা যায় না। নিজের দেশে থেকে আমরা বিদেশী খাবারে প্রতি যত অনুরক্তই থাকি না কেন বিদেশে অবস্থান করা বাঙালী মাত্রই জানেন, স্বদেশী খাবারের স্বাদ নিতে তাদের মন যে কত আঁকুপাকু করে। বিদেশ বিভূঁইয়ে বাস করে একনাগাড়ে ভিনদেশী খাবার খেতে খেতে অরুচি ধরে গেছে তাই প্রবাসী বন্ধুরা একদিন স্থির করলেন; যেমন করেই হোক দেশী খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।

যেমন ভাবা তেমনি কাজ; দুই বন্ধু গেলেন স্থানী্য় ’চেইন স্টোরে’। উদ্দেশ্য দেশী খাবার তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে আনবেন। আগেই বলেছি; সেখানে ইংরেজী ভাষার তেমন প্রচলন নেই কাজেই তাদের যেসব পণ্যের প্রয়োজন তা সংশ্লিষ্ট পণ্য বা প্যাকেটের আকার আকৃতি ও ছবি দেখেই সংগ্রহ করতে হবে। দোকানে সাহায্যকারী থাকলেও ভাষা দৈন্যতার কারণে তার কাছে কোন সহায়তা পাওয়ার আশাও খুব কম। এছাড়া কোন পণ্যের গায়ে বা প্যাকেটে কোথাও ইংরেজীতে কিছু লিখা নেই। অতএব, প্রয়োজনীয় জিনিস নিজেদেরকেই খুঁজে নিতে হবে।

বিশাল ’চেইন স্টোরে’ হাজারো পণ্যের আড়তে ঘুরতে ঘুরতে টিনজাত মাংশ দেখতে পেয়ে দুইবন্ধু বেশ খুশী হলেন। যুক্তি-পরামর্শ করে ঠিক হল মাংশই কিনবেন, আজ মাংশই রান্না হবে। শেষমেষ, এককৌটা টিনজাত মাংশ ও প্রয়োজনীয় সওদা নিয়ে দুইবন্ধু বেশ খুশী মনে ঘরে ফিরলেন।

ঠিক হল – আজ দেশী কায়দায় মাংশ রান্না হবে, দেশী বন্ধুদের দাওয়াত করে স্বদেশী খাবার খাইয়ে তাক লাগিয়ে দিবেন। মহা সমারোহে রান্না-বান্না হল, নিমন্ত্রিত স্বদেশী বন্ধুরা এলেন, তাদের নিয়ে বেশ উল্লাসে বিদেশে বসে ঘরোয়া খাবার খেয়ে সবাই তৃপ্তও হলেন। আমন্ত্রিত অতিথি বন্ধুরা তাদের রান্না ও আয়োজনের খুব প্রশংসা করলেন। এমন একটা সুন্দর আয়োজন স্বচ্ছন্দে করতে পারায় আয়োজক বন্ধুরাও বেশ পুলকিত হলেন যে, এখন থেকে যখনই ইচ্ছা হবে এভাবেই মাংশ এনে স্বদেশী খাবারের স্বাদ উপভোগ করা যাবে। বন্ধুরাও এই ভেবে আশ্বস্থ হলেন; যাক বাবা বাঁচা গেল। অনবরত ভিনদেশী খারার খেয়ে খেয়ে আর অরুচিতে ভোগতে হবে না, শেষ পর্যন্ত তবু একটা স্বদেশী খাবারের ব্যবস্থা হাতের নাগালে পাওয়া গেল।

কিছুদিন পর আবারো স্বদেশী ভোজ খাওয়ার ইচ্ছে হলে বন্ধুরা আবার সেই দোকানে গেলেন। খুঁজেপেতে সেই টিনজাত মাংশের কৌটাও পাওয়া গেল। প্রথম দিন তো মাংশ দেখা মাত্রই আবেগের অতিসহ্যে কৌটা নিয়ে দৌড় দিয়েছিলেন। আজ সেসব কৌটার পাশে আরো কিছু মাংশের কৌটা দেখতে পেয়ে সেগুলোও হাতে নিয়ে দুই বন্ধু পরামর্শ করছেন যে, আগেকার সেই কৌটাটিই নিবেন নাকি আজ অন্যটি নিয়ে দেখবেন কোনটি ভাল। তাদের মধ্যে ব্র্যান্ড নির্বাচনের এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখে দোকানের কর্তব্যরতা এক সুন্দরী তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন….

তরুণী এসে সুইডিশ ভাষায় অত্যন্ত বিনীত ভাবে জানতে চাইলেন; তোমাদের ‘প্যাটের’ জাত কি? ‘জার্মন শেফার্ড’ হলে এটা ভাল হবে, ‘হাউন্ডস্’ হলে ঐটা, আর যদি ‘এ্যল্‌সেশিয়ান’ হয় তাহলে দাঁড়াও তোমাদেরকে যথার্থ ম্ংশটাই এনে দিচ্ছি। এই বলে কর্তব্যরতা সুন্দরী যেই না অন্য ব্র্যান্ডের মাংশ আনতে গেছেন তখন দুই বন্ধু একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন….

বন্ধুদের বুঝতে আর বাকি রইল না যে; আগে যে কৌটাটা কিনে নিয়ে মাংশ রান্না করে এতো তৃপ্তি ভরে খেয়েছেন ওটা সহ এখানকার অন্য সব কৌটার মাংশের কোনটাই মানুষের ভোজ্য নয়। ওগুলো ছিলো কুকুরের ভোজ্য….

বাল্যবন্ধুর এমন একটি করুণ রসের গল্প শোনার পর কৌতুহল হওয়াটাই স্বাভাবিক যে, আতঃপর – কখনো কি তাদের ঘেউ-ঘেউ করতে বা লেজ নাড়াতে ইচ্ছে হয়েছিলো কি না? তা না করে থাকলে যে মাংশ খেয়েছেন তাতে দোষের কিছু নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১:২০
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা এবং "দি ম্যাট্রিক্স" এর নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যানে এদের ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার নাফসকে আচ্ছা করে টাইট দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭

মানুষের ভিতরে এমন একটি অংশ আছে, যা মানুষকে খারাপ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, খারাপ কাজের বুদ্ধি দেয়। ইসলামী পরিভাষায়, আমরা মানুষের এই অংশকে নফস বলি। আপনি খারাপ কাজ থেকে দূরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×