somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধারাবাহিক গল্পঃ পরভৃতা-৩

২০ শে মার্চ, ২০২১ সকাল ৮:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
১ম পর্ব


২য় পর্ব



দুদিন পরে দুপুর বারোটার দিকে এসে পলাশ বলল,
- একটা কথা বলেছিলাম সেদিন মনে আছে তো ফুফু?
-কোন কথা? কত কথাই তো বলিস।
-ওই যে সেদিন বললাম না আমার সহপাঠী স্নেহলতা,ওর সাথে দেখা করতে যেতে হবে।
-ও ওই মেয়েটি?
- হ্যাঁ, আজ আমরা যাবো দেখা করতে মনে রেখো। তোমার তো আবার ভুলো মন। ।
কামরুন্নাহার কি যেন ভাবছেন।তার মন যেন অন্য কোন জগতে বিচরণ করছে এখন। পলাশের কথার তেমন একটা গুরুত্ব দিলেন না। প্রতি উত্তরে তিনি কিছু বললেনও না।
এমনিতে আজ সকাল থেকে তাঁর মনটা বেশ খারাপ। বাপজানের কথা মনে পড়ছে খুব ,সময়ের সাথে সাথে মানুষ কোথায় না কোথায় হারিয়ে যায়। চারিদিকে ভাগাভাগির ডামাডোল , হিংসা বিদ্বেষের ছড়াছড়ি এটাও তার মন খারাপের আরেক কারণ। সবাই একটু মিলে মিশে থাকলে সমস্যা কি? দুনিয়া তো দুদিনের।
কামরুন্নাহার মত আকাশেরও বুঝি আজ সকাল থেকে মন ভালো নেই । বেশ দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াই বলা যায়। মুষলধারে বৃষ্টিতে ফুল পাখি, লতা পাতা সহ সমস্ত প্রকৃতি ভিজে একেবারে জবুথবু অবস্থা।
দুরে দরদালানে এ পাড়ার কুকুরগুলো গুটি সুটি মেরে বসে আছে কখন বৃষ্টি থামে এ আশায় হয়তো। বৃষ্টি থামলেই তারা খাবারের খোঁজে বের হবে সেটুকু তাদের চোখ দেখলেই বোঝা যায়। প্রকৃতির কাছে প্রাণিকূল যে কতটা অসহায় তা দূযোগকালীন সময়ে বোঝা যায়। পাখিগুলোর অবস্থা আরো বেশি করুণ।একটুও খাবার জোটেনি তাদের। কামরুন্নাহারের ব্যালকনি কয়েকটা চড়ুই একটানা ডেকে চলেছে। ওরা এ বাড়িই বাসিন্দা। এক ফাঁকে তিনি কিছু চাল ছিটিয়ে দিতেই কোথা থেকে কয়েকটি শালিকও এসে জুটে গেল। তিনি দাড়িয়ে রইলেন যেন চড়ুইগুলোকে শালিকের দল তাড়িয়ে না দেয়।

দুপুরের পর থেকে বৃষ্টিটা বিদায় নিল। তিনটার দিকে পলাশ তাড়া দিলো,
-গুছিয়ে নাও তাড়াতাড়ি, গুছিয়ে নাও ।
-আজ থাক না হয়, আমার মনটা ভালো নেই।
- তোমার মন ভালো থাক বা না আজ আমার সাথে বেরুবে, ব্যস।
-জোর করোনা তো , মনটা সত্যি ভালো না।
-আজ দেখা না হলে আর কোনদিনই তোমার সাথে ওর দেখা হবে না।
-মানে কি ? ওর সাথে দেখা হওয়াটা কি সত্যি গুরুত্বপূর্ণ?
-গেলেই জানতে পারবে।গুছিয়ে নাও, চলো, ওর কিন্তু খুব অভিমান। প্লিজ তুমি না করো না,প্লিজ।এরকম করলে ও হয়তো আর কোনদিন আমাদের সাথে দেখা করতে চাইবে না।
কামরুন্নাহার কি জানি কি ভাবলেন, মেয়েটির প্রতি তারও কিছুটা কৌতুহল তৈরি হয়েছে। তার সাথে তো এভাবে কেউ কোন দিন দেখা করে না বা করতে চায় না।
কিন্তু মেয়েটি কে ? কি চায়? আজকাল তো সবই স্বার্থের মোড়কে বন্দী। তাহলে? তিনি আবারও বলেন,
-বাসায় আনতে পারতে?
-ও বাসায় আসবে না আমি তো বলেছি, অসুবিধা আছে, কেন যে তোমাকে বোঝাতে পারছি না বুঝতে পারছি না।
-কি সমস্যা ,আসবে না কেন বাসায়?
-তুমি না আজকাল অনেক অবুঝ হয়ে উঠছো ফুফু।শেষবার বলছি তুমি কি যাবে, না যাবে না?
সাজগোজ তেমন একটা তিনি কোন দিনই করেন না পাশের ঘরের থেকে কাপড়টা পাল্টিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় চুলগুলো ঠিক ঠাক করে নিয়ে বললেন,
-চল কোথায় নিয়ে যাবে। এই বাদলা বর্ষার দিনে এসব ভালো লাগে? বলো? চারদিকে কাঁদা পানি থইথই অবস্থা।
-ফুফু আমি ওকে কথা দিয়েছি তোমার সাথে ওকে দেখা করাবো বলে। ওকে দেখলে তোমার ভালো লাগবে। আমি নিশ্চিত। আর কথা বাড়িও না আমার কিন্তু রাগ উঠে যাচ্ছে।
-ঠিক আছে রাগ করতে হবে না যাচ্ছি তো। এত অবুঝ তুমি।
সারা শহর কাঁদা পানিতে ছয়লাব। এদিকে গাড়ি চলছে তো চলছেই।
তারা চলে এলো একেবারে শহরের শেষ প্রান্তে। জায়গাটা পৌরসভার মধ্যে হলেও গ্রাম্যভাব কাটেনি এখানকার। আশেপাশে অনেক কাঁচা পথ দেখা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও মাটির বাড়িও আছে।
কামরুন্নাহার জানতে চাইলেন,
- কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?আর কত দূর?
-এই তো প্রায় চলে এসেছি।
হঠাৎ কামরুন্নাহার বলে উঠলেন।
-আচ্ছা, আমি কি কোন ঘটকালি করতে যাচ্ছি? আগে তো ভাবিনি,সেরকম কিছু।
কথাটা শুনে পলাশ প্রথমে অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। তারপর হো হো করে হেসে উঠলো ,
- কি বলো কি ফুফু? হো হো হো.....
-তোমার কল্পনা শক্তির উপর আমার কোনদিনই ভরসা নেই। হো হো হো...... যাহোক চলো দেখতে পাবে। আর তো কিছুটা সময়।

পনেরো মিনিটের মধ্যে ওদের গাড়িটি একটা পুরানো একতলা বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো।
বাসাটির সদর দরজার সামনে একটা বেশ পুরানো সজনে গাছ হেলে পড়ে গেছে। সম্ভবত অতি বর্ষায় মাটি নরম হয়ে গাছ উপড়ে গেছে। অনেক কষ্টে সেটুকু পথ পেরিয়ে টিনের দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে গাছের পাতার পানিতে দুজনে অনেকটা ভিজে গেলো।
দরজা খুলতে দেরি দেখে কী মনে করে স্নেহকে ফোন দেবে ভাবতেই দরজা হাট করে খুলে গেল।
- কাকে চাই। কর্কশ কন্ঠটি জানতে চাইলো। মহিলাটির পোষাকে না, চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ প্রবল।
- আমি পলাশ আর ইনি আমি ফুপু।
- ও তুমি, মহিলাটি যে তাদের দেখে বিরক্ত তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কি যেন মনে মনে বিড়বিড় করলেন, তারপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললেন,
-কল পাড়ে পানি আছে, পা ধুয়ে সোজা ডানদিকের ঘরে বসো তোমরা। ঘর যেন নোংরা না হয় দেখো,আমি কেবলি সব পরিষ্কার করলাম। আর স্নেহ তো ঘুমাচ্ছে, ওর এখন ঘুমানোর সময়। এমন সময় তোমরাই বা এলে কোন আক্কেলে ,জানোই তো সব। তা যখন এসে পড়েছো কী আর করবে, বসো,ও ঘরে বসো। আমি গোসল সেরে আসছি।আমার এখনো নাওয়া খাওয়া হয়নি। দরজা খোলা রইলো দেখো বিড়াল ঢুকে না পড়ে যেন। এ বাড়িতে খুব বিড়ালের উৎপাত।

আধা ঘন্টাখানেক পরে ওরা যখন স্নেহলতার ঘরে এলো। ঘরে ঢুকতেই কামরুন্নাহার চমকে গেলেন।
বিছানায় শুয়ে আছে রোগে শোকে জীর্ণ শীর্ণ একটি মেয়ে আর এই মেয়েটি যে স্নেহলতা তা বুঝতে তাঁর কোন অসুবিধা হলো না।।
তিনি অবাক চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কামরুন্নাহার ধীরে ধীরে বিছানার পাশে রাখা চেয়ারটাতে বসলেন, তিনি এখনও বুঝতে পারছেন না পলাশ তাকে কেন এই অসুস্থ মেয়েটির কাছে তাকে নিয়ে এসেছে। তবু তিনি যখন এসেই পড়েছেন। একটু খোঁজ খবর নিতে,কথা বলতে তো আর দোষ নেই।


-তোমার নাম নিশ্চয়ই স্নেহলতা?

-মেয়েটি চোখ বন্ধ করে ছিলো এবার চোখ খুলল,রোগে শোকে শীর্ণ কিন্তু বড্ড মায়া মায়া চাহনি। সে আস্তে আস্তে মাথা নাড়লো ।কি একটা কথা বলল কিন্তু ততটা স্পষ্ট নয়।
-তুমি নাকি আমাকে দেখতে চেয়েছো? পলাশ বলছিলো।
-হ্যাঁ।
-তুমি কি আমাকে চেন বা জানো? মানে আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছো এই জন্য বলছিলাম আর কি।
- ঠিক না চিনলেও আপনার কথা অনেক শুনেছি। মেয়েটি চিকন গলায় বলল, এখন খানিকটা হাঁপাচ্ছে সে।
-আমার কথা শুনেছো? আশ্চর্য! কোথেকে শুনেছো?
- আমার দাদুর কাছ থেকে।
-তোমার দাদু? কে তোমার দাদু?
স্নেহলতা লম্বা করে শ্বাস নিলো। তারপর খানিকটা ধাতস্হ হয়ে সেই বয়স্ক মহিলাটিকে বলল,
-মামণি তুমি এনাদের চা বিস্কুট দাও।এনারা আমাদের অতিথি।
- না না ঠিক আছে, ওসবের দরকার নেই। তোমাদের ব্যস্ত হতে হবে না।
স্নেহলতার মামণি বলল,
- ঘরে চিনি নেই তো। শুধু বিস্কুট দেই।
-দাও। যা আছে দাও।
স্নেহলতা আবার শুরু করলো,
-আপনি পলাশের ফুফু তো? শিকদার বাড়ির ছোট মেয়ে। নাম কামরুন্নাহার। ঠিক বলছি তো আমি?
-হ্যাঁ আশ্চর্য , তুমি আমার সম্পর্কে এত খোঁজ জানো কি করে?
স্নেহলতা উত্তর দিলো না,সে শুধু বলল,
- খুব ভালো লাগলো আপনার সাথে দেখা হয়ে । অনেক শান্তি পেলাম মনে।জানেন কিনা জানিনা আপনার সাথে দেখা করার আমার অনেকদিনের ইচ্ছা ছিলো। আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
- তাই নাকি?তোমাকেও আমার খুব পছন্দ হয়েছে মেয়ে । তোমার নামটাও খুব সুন্দর। কিন্তু তুমি কে? তোমার পরিচয় কী?আচ্ছা তুমি তো হাঁপাচ্ছো। কথা বলতে তোমার বেশ কষ্ট হচ্ছে। তোমার কী হয়েছে? মানে অসুখটা কী?
এবার স্নেহলতার মামণি হড়গড়িয়ে বলল,
- রাজরোগ হয়েছে রাজরোগ গরীবের রাজরোগ হলে যা হয় সব শেষ করে দিলো। ওর ক্যান্সার হয়েছে ,কোলন ক্যান্সার।
স্নেহলতার চোখে জল ভরে গেলো। আকুল হয়ে কাঁদছে সে।তার শরীরে যত না যন্ত্রণা মনের ভিতরে তার থেকে বেশি যন্ত্রণার বিষে দগ্ধ হচ্ছে সে । কষ্টের প্রকোপে সে কথা বলতে পারছে না।
চলবে
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
ছবিঃ গুগোল
ফুটনোটঃ পরভৃত ১. /বিশেষণ পদ/ পরপুষ্ট, পরের দ্বারা প্রতিপালিত। ২. /বিশেষ্য পদ/ পরের দ্বারা প্রতিপালিত এইজন্য. কোকিল। /পর+ভৃত/। /বিশেষণ পদ/ স্ত্রীলিঙ্গ. পরভৃতা।
গল্পটি সাত পর্বে সমাপ্ত। আশা করি সবাইকে পাশে পাবো। শুভকামনা।

সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৩ রাত ৯:৩৯
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×