somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

গায়েন রইসউদ্দিন
আমি রইসউদ্দিন গায়েন। পুরনো দুটি অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করতে না পারার জন্য আমি একই ব্লগার গায়েন রইসউদ্দিন নামে প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছি এবং আগের লেখাগুলি এখানে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আবার প্রকাশ করছি।

দানবের পেটে দু'দশক (মূল গ্রন্থ- IN THE BELLY OF THE BEAST) পর্ব-১৭

২৮ শে ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এখন সওয়া ছ-টা। শিক্ষক হুইসিল বাজালেন। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। শিক্ষক তাদের মন্ডল আকারে বসতে বলেন। ধুলোর ওপর বসে পড়ে তারা। এর পর কী কী অনুষ্ঠান আছে সেগুলো জানান শিক্ষক। এগুলো অবশ্য বাংলায় বলা হয়, হিন্দিভাষী এলাকায় হিন্দিতে; কারণটাও পরিষ্কার—না শিক্ষক না ছাত্র, কেউই সংস্কৃতে কথা বলতে বা বুঝতে পারে না—সংস্কৃতে নির্দেশ দেওয়াটা “হিন্দু সংস্কৃতি”-র প্রতীক, যেমন সামরিক ধরণের মার্চ করানোটা সামরিক শৃঙ্খলার প্রতীক।
এবার শুরু হয় “চর্চা” (তাত্ত্বিক আলোচনা): “আমাদের সংগঠনের পুরো নাম কী?” কয়েকজন উত্তর দেয়, বাকিরা চুপ। “আমাদের লক্ষ্য কী?” “হিন্দু সংগঠন—হিন্দুদের সংগঠিত করা”। “আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা কে?” একজন উত্তর দেয়, “ডঃ কেশবরাও বলিরামরাও হেডগেওয়ার”। “সঙ্ঘ আর জনসঙ্ঘ (এখন বিজেপি) কি এক?” “না”—সমস্বরে উত্তর আসে। এই প্রশ্নোত্তর পর্বটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রায় প্রতিদিনই এটি অনুষ্ঠিত হয়।
এবার গান শুরু হয়। সঙ্ঘ-সদস্যদের কাছে খুব চেনা এ গানটি। প্রাচীন দেশ ভারত আর তার হিন্দু সংস্কৃতির প্রশংসাসূচক এই গান। প্রধান গায়ক এক লাইন গায়, তারপর অন্যরা সেটা কোরাসে গায়। পুরো ব্যাপারটাই প্রায় একঘেয়ে। কোনও কিছুতেই স্বতঃস্ফূর্ততার কোনও ছাপ নেই। সব কিছুই পূর্ব নির্ধারিত, শৃঙ্খলা-বদ্ধ একটা ব্যাপার। আনন্দ পাওয়াটা বাড়তি। খোলাখুলি আলোচনা একবোরেই পাত্তা পায় না। আসল জিনিস হল শৃঙ্খলা। সঙ্ঘ এভাবেই তার সদস্যদের, তাদের “অখন্ড” ভারতের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রশিক্ষিত করতে চায়।
এরপর হবে প্রার্থনা। সবাই গেরুয়া পতাকা বা “ভাগোয়া ধ্বজ”-এর দিকে মুখ করে নিজ নিজ লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। আজ দূর থেকে একজন অতিথি স্বয়ংসেবক এসেছেন। তিনি হয়ত পুরো শহরের একজন অন্যতম প্রধান কার্যনিবার্হী। তাঁর সঙ্গে মোটর সাইকেলে তাঁর এক সহকারীও এসেছেন। এঁরা ঝান্ডার কাছে নতমস্তক হন আর তারপর মুখ্য শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে ভেতরে আসার অনুমতি চান। অতিথি হিসেবে আলাদা একটা লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন তাঁরা। সঙ্ঘে অভিবাদন জানানো হয় ঊনবিংশ শতকের মহারাষ্ট্রের বয়- স্কাউট ধরনে—ডান হাতের কনুই ভাঁজ করে সোজা জড়ো করে বুকে ঠেকানো হয়, বাঁ হাত ও পা থাকে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে, তারপর মাথা নিচু করা হয়।
পূর্ব নির্ধারিত একজন স্বয়ংসেবক শিক্ষকের দিকে এগিয়ে যায়। মনোনীত এই সদস্যটি কুড়ি লাইনের সংস্কৃত প্রার্থনা স্তোত্রটি আবৃত্তি করে—প্রতিটি লাইন আবৃত্তির পর সবাই একযোগে সেটি আবৃত্তি করে। মুখ্য শিক্ষক এবার ঝান্ডাকে অভিবাদন জানানোর নির্দেশ দেন—“ধ্বজপ্রণাম এক, দো, তিন”। ঐ মনোনীত ছেলেটি এবার ঝান্ডার দিকে এগিয়ে যায়, আরএসএস-এর ঢঙে পতাকাকে অভিবাদন জানিয়ে সেটিকে নামিয়ে আনে। বাঁ হাতটি সমকোণে মুড়ে সে গেরুয়া পতাকাটিকে ভাঁজ করে শিক্ষকের দিকে এগিয়ে যায়। শিক্ষক এবার সেদিনের মত জমায়েতের সমাপ্তি ঘোষণা করেন—“সঙ্ঘ বিকিরঃ” (সবাই যে যার দিকে চলে যাও)। বেশির ভাগ ছেলে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।
সন্ধে ৭-৪৫। মুখ্য শিক্ষকের সঙ্গে কিছু কথাবার্তার পর ঐ দুই বরিষ্ঠ কর্মকর্তা চলে গেছেন অনেক্ষণ হল। তারপর ঘন্টাখানেক যেসব স্বয়ংসেবক আজকের শাখায় আসেনি। তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন মুখ্য শিক্ষক। এর পর কী অনুষ্ঠান আছে তা জানিয়েছেন এইসব নিয়মিত ও অনিয়মিত সদস্যদের। এখন তিনি তার ঘনিষ্ঠ সদস্যদের মিষ্টির দোকানে নিয়ে গিয়ে জিলিপি বা অন্য কিছু খাওয়াবেন। তাদের সঙ্গে আসল ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে কথাবার্তা বলবেন—সামনের নির্বাচন, স্থানীয় জনসংঘ প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা ভোটকেন্দ্রে কাকে কাকে পার্টির এজেন্ট রাখা যায়, কার কার কাছে অস্ত্র আছে, কংগ্রেসের গুন্ডারা বোমা মারলে কর্মীদের উদ্ধার করবে কারা—এই সমস্ত সিরিয়াস ব্যাপার!
এবার সবাই বিদায় নিচ্ছে। এর পর আজকের কাজ কী হল সেগুলো নিয়ে চিন্তা করার আর কালকে কী হবে তা নিয়ে ভাবার পালা। মুখ্য শিক্ষককে কাজকর্ম সব ঠিকঠাক করতে হবে। শহরের প্রধান কার্যালয়ে সাপ্তাহিক মিটিং আছে। “ভেতরকার মূল” সেবকরা এবার বাড়ির পথ ধরে। স্কুল-কলেজের পড়াশোনা? সাধারণ মানের ছাত্রদের জন্য সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। অনেকেই কবে পড়া শেষ হবে তার প্রতীক্ষায় আছে। অতি মধ্য বা নিম্নমানের ছাত্র প্রায় সবাই। অনেকে বাড়ির ব্যবসায় কাজ শুরু করে দিয়েছে। বাবার বকুনি, মায়ের চোখের জল? বাড়ির কাজ? আরে, বাড়িতেই তো আছি (আর ভারতীয় পুরুষরা আবার ঘরের কাজ করবে কেন? সে তো মেয়েদের কাজ!)। “দেশের কাজ” হল সবার আগে।
হিন্দু মাতৃভূমিকে উদ্ধার করতে হবে। স্থানীয় জনসংঘ বা এবিবিপি প্রার্থীকে জেতাতে হবে। এগুলো আগে—অন্য কাজ পরে। নইলে “ভারতবর্ষের পুণ্যভূমি” চলে যাবে “লোভাতুর ধর্মান্ধ মুসলমান, বিদেশি মিশনারি আর কমিউনিস্টদের” হাতে!
“হিন্দুত্ববাদী দেশপ্রেমিকরা” কি তা হতে দিতে পারে?... (ক্রমশ)

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:০১
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) যুদ্ধের দায় হযরত আলীর (রা.) হলে আমরা হযরত মুয়াবিয়াকে (রা.) কেন দোষ দেব?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৪



সূরাঃ ৯ তাওবা, ৬০ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬০। সদকা বা যাকাত ফকির, মিসকিন, এর কর্মচারী, মোয়াল্লাফাতে কুলুব (অন্তর আকৃষ্ট),দাসমুক্তি, ঋণ পরিশোধ, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান।... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ভালোবাসি I love you

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৩:০২

তোমাকে ভালোবাসি বাতাসের মতো,
যেমন শিশুর কাছে বালি একটা খেলনা,
অথবা ঝড়ের মতো, যাকে কেউ বোঝে না।

I love you like the wind,
Playing like a child in the sands,
Or a storm that no... ...বাকিটুকু পড়ুন

গর্ব (অণু গল্প)

লিখেছেন আবু সিদ, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৪০

একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুল। ক্লাস শুরু হয়েছে বেশ আগে। স্কুলের মাঠে জন মানুষ নেই। কয়েকটা গাছ, দু'একটা পাখি আর চিরসবুজ ঘাস তাদের নিজের মতো আছে। একান্ত চুপচাপ একজন মানুষ শিক্ষক-রুমে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দায় নেওয়ার কেউ নেই ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৫


বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকট নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, যত টকশো হচ্ছে, যত বিশেষজ্ঞ মতামত দিচ্ছেন, তার কিছুই ব্যাংকের সামনে লাইনে দাঁড়ানো মানুষটার কাজে লাগছে না। তিনি জানতে চান একটাই কথা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্য ধর্মের মানুষদের মাঝেও 'উত্তম মানুষ' আছেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৪৭



পবিত্র কোরআনে অসম্ভব সুন্দর একটি আয়াত আছে। মহামহিম খোদাতায়ালা পুরো বিশ্বের মানুষদের দিকে একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে পবিত্র কোরআনে জিজ্ঞাসা করেছেন - "আর ঐ ব্যক্তি থেকে কে বেশি উত্তম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×