somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বিলোপ : দক্ষিণ এশিয়ার নব্য ইজরায়েল ভারত

০৫ ই আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৫:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কাশ্মীর দখলের জন্য আজ ভারতের যে সাম্প্রদায়িক স্বৈরাচারিতার ভয়ংকর রূপ দেখা গেল, বাবরি মসজিদ ভাঙার পরে এটিই সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। পুরোপুরি ফিল্মি স্টাইলে সংবিধান থেকে আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে দখলদারির ন্যাক্কারজনক ইতিহাস তৈরি করল ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার নব্য ইজরায়েলের আবির্ভাব ঘটল এরই মধ্য দিয়ে।

ভারত সমগ্র রাজ্যে কার্ফ্যু জারি করে, হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করে, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে দিয়ে, ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ করে দিয়ে, রাজ্যের সাবেক তিন তিনজন মূখ্যমন্ত্রীকে গৃহবন্দী করে, সমগ্র রাজ্যকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্ত্বশাসন আজ ছিনিয়ে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এমনকি, জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দুপ্রধান অঞ্চল লাদাখকে রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সরাসরি কেন্দ্রের শাসনের আওতায় নিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি চলমান। এ যেন ঠিক বলিউড, অস্ত্রের মুখে পরিবারকে জিম্মি করে আদালতে ভুয়া সাক্ষীর মাধ্যমে আইনের বিচার প্রতিষ্ঠা।

কাশ্মীরের জনগণ ভারত রাষ্ট্রের সাথে যে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ ছিল এতকাল, আজ তার শেষ সুতাটাও ছিন্ন হয়ে গেলো। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় জম্মু-কাশ্মীর ভারতের কোনো অঙ্গরাজ্য ছিল না৷ রাজা হরি সিং-এর স্বাধীন রাজতন্ত্র ছিল। কিন্তু, ১৯৪৭ সালের ২২শে অক্টোবর কিছু পার্বত্য দস্যুরা কাশ্মীর আক্রমণ করলে, রাজা হরি সিং ভারতের কাছে সেনা সাহায্য চান৷ তখন ভারত সরকার রাজা হরি সিংকে ভারতভূক্তির শর্তে সাহায্য করে। তখন ভারতের সংবিধানে জম্মু-কাশ্মীরকে ৩৭০ আর্টিকেল অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসনের 'বিশেষ মর্যাদা' দেবার সংস্থান রাখা হয়৷ ৩৭০ ও ৩৫ ধারার ওপর নির্ভর করে কাশ্মীরে নিচের কয়েকটি আইন বলবৎ ছিল-

এক. ৩৭০ আর্টিকেল অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিকদের বিশেষ অধিকার দেয়া হয়েছে।

দুই. এই ধারা অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভা স্থির করতে পারে রাজ্যের ‘স্থায়ী নাগরিক’ কারা এবং তাদের বিশেষ অধিকার কী হবে? অর্থাৎ কাশ্মীরে কারা স্থায়ী নাগরিক সেটা কাশ্মীরের রাজ্য সরকার ঠিক করবে। ভারতের কেন্দ্র সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার থাকবে না।

তিন. কেবল স্থায়ী নাগরিকরাই ওই রাজ্যে সম্পত্তির মালিকানা, সরকারি চাকরি বা স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেয়ার অধিকার পাবেন। ভারতের অন্য রাজ্যের কেউ সেখানে সম্পত্তি ক্রয় করার অধিকার রাখে না।

চার. রাজ্যের নাগরিক কোনো মহিলাও যদি রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করে তাহলে সে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তার উত্তরাধিকারীদেরও সম্পত্তির উপরে অধিকার থাকবে না। (যদিও ২০০২সালে একটি ঐতিহাসিক মামলায় জম্মু কাশ্মীরের হাইকোর্ট ৪নম্বর আইনটি স্থগিত করে দেয়।)

আজকের ৩৭০ অনুচ্ছেদটি বাতিলের অবৈধ বিল পাশের মাধ্যমে কাশ্মীর হারালো তাদের স্বায়ত্তশাসনের গৌরব। এখন কাশ্মীরকে দুটি ভাগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে আরো ভাগ করতে করতে হায়দারাবাদের মত করে ফেলবে। ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ একসময় ছিল স্বাধীন হায়দারাবাদ, যার এখন কোনো অস্তিত্ব নেই৷

৩৭০ আর্টিকেলের কারণে জম্মু-কাশ্মীর অন্য যে কোনো ভারতীয় রাজ্যের চেয়ে বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত। সেখানে অন্য অঞ্চলের লোকজন সম্পত্তি কিনতে পারতেন না। এখন থেকে সেটি পারবেন। এ অনুচ্ছেদের কারণেই মূলত কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এ অনুচ্ছেদ নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দেয়। এ ছাড়া পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়াদি, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ বাদে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও দেয়। এটি বাতিল হওয়ার ফলে অনুচ্ছেদ ৩৫এ হিসেবে পরিচিত সংবিধানের অনুচ্ছেদটিও হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছে বিবিসি।

এ অনুচ্ছেদের কারণে ভারত শাসিত কাশ্মীরের ‘স্থায়ী নাগরিক’ কারা তা সংজ্ঞায়িত করা যেত। এখন আর সেটি করা যাবে না। অর্থাৎ যেকোনো রাজ্য থেকে সাধারণ মানুষ সেখানে থাকা শুরু করলে রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর নাগরিকত্ব পাবেন। সেটি যদি হয়, তাহলে সংখ্যাগুরু মুসলিমরাই অদূর ভবিষ্যতে সংখ্যালঘু হয়ে পড়তে পারে।

প্রকৃতপ্রস্তাবে আর্টিকেল ৩৭০ না থাকলে কাশ্মীরের সাথে ভারতের সম্পর্কের সাংবিধানিক ভিত্তিটাও আর থাকে না। আর সেজন্যেই সমগ্র কাশ্মীর এখন ভারতীয় সেনাদের করদরাজ্যে পরিণত হইছে। সাংবিধানিকভাবে কাশ্মীরের দখল পুরাপুরি না নিতে পেরে, বিজেপি এখন সরাসরি অসাংবিধানিক পথেই, সেনা-আগ্রাসনের মাধ্যমে কেড়ে নিতে চাইতেছে কাশ্মীরের মানুষের স্বাধিকার। ভারত রাষ্ট্রের আগ্রাসনের এই চূড়ান্ত সময়টিতেও, বিশ্বের যাবতীয় মানবতাবাদ ও অন্যান্যরা নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কেবল কাশ্মীরিরা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াইলেই তারা মুখ খুলবেন।

হিন্দুত্ববাদের এ ভয়াবহ আগ্রাসনের ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করা দরকার। কাশ্মীরের আজাদির আন্দোলনকে যারা বছরের পর বছর 'জঙ্গিবাদ' হিসেবে চিহ্নিত করছে, তাদেরও একহাত নেয়া প্রয়োজন। এদের হাতে দেশের রাজনীতি ও মানুষ নিরাপদ নয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৫:৪০
২৬টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কাজে যোগদান ভুল হচ্ছে, ইউরোপ আমেরিকায় শীপমেন্ট বন্ধ থাকার কথা

লিখেছেন চাঁদগাজী, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২০ দুপুর ২:১৭



গত ৪০ বছরে, গার্মেন্টস'এর মালিকরা ও অন্যান্য মধ্যভোগীরা যেই পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে, তাতে তাদের কর্মচারীদের বিনা কাজে ২/১ বছর মিনিমাম বেতন দেয়ার ক্ষমতা তারা রাখে। গার্মেন্টস'এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ কেলা?

লিখেছেন মোহাম্মাদ আব্দুলহাক, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০৮




মানুষ মারার সব আছে, আহত অথবা অসুস্থ মানুষকে সম্পূর্ণ সুস্থ করার কিচ্ছু নেই। কেন জানেন? আঁতেলরা বলেন, মানুষ মানুষকে মারতে পারে, মানুষ মানুষকে বাঁচাতে পারে ন। জন্ম মৃত্যু মুসলমানদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

— করোনার সাথে পথে চলতে চলতে———

লিখেছেন ওমেরা, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২২



সারা পৃথিবী লক-ডাউন হয়ে আছে কভিড- ১৯ করোনা আতংকে। মানুষের প্রতিটা মূহুর্ত কাটছে ভয় আর উৎকন্ঠায়। এই মূহুর্তে সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র ব্যাতিক্রম দেশ,সেই দেশের বাসিন্দা আমি, নাম তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

থটস

লিখেছেন জেন রসি, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২০ রাত ১১:৪৬





১৮৪৬ সালে মার্কস এবং এঙ্গেলস মিলে “The German Ideology” নামে একটা বইয়ের পান্ডুলিপি লিখেছিলেন। কিন্তু বইটা প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। এই বইতে তারা শুধু ভাববাদকেই না ফয়েরবাখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কমপক্ষে গার্মেন্টস'এর ছুটিটা নিজ হাতে কন্ট্রোল করতে পারতো

লিখেছেন চাঁদগাজী, ০৫ ই এপ্রিল, ২০২০ রাত ১১:৫২



শেখ সাহেব জানতেন যে, উনার মেয়ে বুদ্ধিমতি নন, সেজন্য মেয়েকে রাজনীতিতে আসতে দেননি; কিন্তু রাইফেল জিয়া শেখ হাসিনার জন্য পথ রচনা করে গেছে। কমবুদ্ধিমানরা অনেক সময় খুবই নিবেদিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×