somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নির্বাচনে মার্কিন ছলাকলা*

১৬ ই জানুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৫:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নির্বাচনী প্রচারণা সছক ‘প্রতারণার শিল্প’। এর আদুরে নাম ‘ভোটযুদ্ধ’। যুদ্ধে জিততে কোন পদ্ধতিই নাকি ব্রাত্য নয়। প্রেম আর যুদ্ধে ছলনা দোষের নয়--এমন কথা মুরুব্বিরা তো হামেশাই বলে থাকেন। ভোটের এই যুদ্ধশিল্পে--অথবা শিল্পযুদ্ধে--মিথ্যার কারুকাজ যার যত সূক্ষ্ম তার সাফল্যের সম্ভাবনা তত বেশি। প্রচারণায় নিজস্ব অর্জন এবং প্রতিপক্ষের ব্যর্থতা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলা তো এখানে সাধারণ ব্যাপার। নিজ পাপ ঢাকা এবং সেই পাপ থেকে ভোটারদের মনোযোগ সরানোর জন্য নাই-ঘটনাকে মহাঘটনা করে তোলাও খুব সহজ-স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে কোন নিরীহ দেশকে ‘সন্ত্রাসী’ বানিয়ে ফেলা এবং তার উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া নিতান্তই এক মার্কিন পদ্ধতি।

ওয়্যাগ দ্য ডগ (১৯৯৭) এমন একটি যুদ্ধ-প্রকৌশলের ছবি। এই যুদ্ধের প্রয়োজন আদতে নির্বাচন-প্রকোশলেরই প্রয়োজন। নির্বাচনের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতির (দ্বিতীয়বারের মত রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীও সে) যৌন কেলেঙ্কারি থেকে জনগণের মনোযোগ সরিয়ে নিতে একটি যুদ্ধ ‘তৈরি’ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনীতি, হলিউড, অন্যান্য গণমাধ্যম এমনকি জনগণও অবিচ্ছেদ্যভাবে কাজ করে। এসবেরই মৃদু বিদ্রুপ ব্যারি লেভিনসনের এই ছবি।

মার্কিন নির্বাচনের সবেমাত্র ১১ দিন বাকি। রাষ্ট্রপতির যৌন কেলেঙ্কারির খবর ফাঁস হয়ে গলে প্রাক্তন রাজনৈতিক উপদেষ্টা কনরাড ব্রিনের (রবার্ট ডি নিরো) উপর তা লুকিয়ে ফেলার দায়িত্ব বর্তায়। দুষ্কর্ম ঢেকে ফেলার সহজ উপায় আরো উত্তেজনাকর কোন দিকে মনোযোগ ঘুরিয়ে দেওয়া। এ কাজের জন্যই উপদেষ্টা ব্রিন হলিউড প্রযোজক স্ট্যানলি মসের (ডাস্টিন হফম্যান) দ্বারস্থ হন। হলিউড প্রযোজকের কাছে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। পুরোদস্তুর একটি ‘যুদ্ধ’ নির্মাণ করাও তার জন্য ছেলেখেলা। সদা আশাবাদী মস নানা প্রতিকূলতার পরও হাল ছাড়েন না, স্টুডিওতে বসেই একটি যুদ্ধ নির্মাণ করে দেন।


ওয়্যাগ দ্য ডগ ছবির প্রধান তিন যুদ্ধ-প্রকৌশলী



জানা আছে, আধিপত্য না মানার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে যুদ্ধ করা যায়। উঠতি শক্তির মাথা ছেঁটে ফেলতে যুদ্ধ করা যায়। তেল গ্যাসের খনি দখলে যুদ্ধ করা যায়। জাতিতে জাতিতে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে হানাহানি কমে আসলে অস্ত্রব্যবসা চাঙ্গা রাখতেও আমরা যুদ্ধ করতে দেখি পরাশক্তিগুলোকে। তবে রাষ্ট্রপতির যৌন কেলেঙ্কারি ঢাকতে যুদ্ধ বাঁধিয়ে ফেলা সম্ভবত এই প্রথম। হোক না রুপালি পর্দায়! অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যাওয়ার পাশাপাশি কাহিনীর টানটান ভাবের জন্য এ আপাত ফ্যান্টাসিকেও মনে হয় সম্ভব এবং সত্যির চেয়েও বেশি।

‘কুকুরের লেজের সামর্থ বেশি হয়ে গেলে কুকুর আর লেজ নাড়াতে পারবে না, লেজই কুকুরকে নাড়াবে’--এমন মন্তব্য দিয়ে নির্মাতা ব্যারি লেভিনসন শুরু করেন ওয়্যাগ দ্য ডগ। ছবির প্রথম তিন দৃশ্যই বলে দেয় পুরো ছবির গতিপথ। ভ্যাকুম ক্লিনার দিয়ে ময়লা পরিষ্কারের দৃশ্য থেকেই আমরা বুঝতে পারি--এই ছবি কোন অন্যায় ঢেকে ফেলার, কোন আবর্জনা সাফ-সুতরো করার ছবি। আর এই পাপ, এই অপরাধ পেন্টাগন বা সরকার সম্পর্কিত। প্রথম দৃশ্যের সাথে জুড়ে নিয়ে বলা যায় রাষ্ট্রপতির কোন অপরাধ এবং তা লুকিয়ে ফেলাই এই ছবির কেন্দ্রীয় বিষয়। তৃতীয় দৃশ্যে উইনফ্রে আমেসের (অ্যান হেচ) সাথে কনরাড ব্রিনকে আমরা অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নেমে যেতে দেখি। বিষয়টি গোপন রাখার গুরুত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির অপরাধ ধামাচাপা দিতে তারা পরবর্তীতে কতটা নিচে নামবেন সেই ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই দৃশ্যে। তাঁরা যে এর শেষ দেখে ছাড়বেন, মাঝপথে হাল ছেড়ে দিবেন না, নির্বাচন প্রচারণার প্রথম বিজ্ঞাপন-দৃশ্য সেই কথায় বলে: ‘মাঝপথে বাজির ঘোড়া বদলাতে নেই’।

‘কানে শোনায় বিশ্বাস শূন্য, পড়ায় অর্ধেক আর চোখে দেখায় বিশ্বাস কর পুরোটাই!’--প্রচলিত এই প্রবাদ মসের মুখস্থ। একটির পর একটি দৃশ্য রচনা করতে তাই তাঁর কোন সমস্যাই হয় না। ধর্ষকের কবল থেকে বেঁচে পালানো আলবেনীয় কিশোরী, আলবেনিয়ায় আটকে পড়া একমাত্র সৈন্যের মোর্সকোডের মাধ্যমে পাঠানো ‘কারেজ মম’ অর্থাৎ ‘তুমি ভয় পেয়ো না মা’ বা ‘তোমার ভয় নেই মা’--বার্তার মাধ্যমে দেশপ্রেমের ধোঁয়া তোলা হয়। সেই বার্তা প্রচার করতে রাষ্ট্রপতির ভাষণ এবং ভাষণ-উদ্ভূত ‘ম্যানিপুলেটেড’ দেশপ্রেম--সবকিছুর নির্মাণ খুব সহজেই হয়ে যায়। পরবর্তীতে সৈনিকের সগৌরব প্রত্যাবর্তন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুও নির্মিত হয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে।


সৈনিক খুন হওয়ার পর সাময়িক হতাশা

স্টুডিওতে বসে মস ও তাঁর দল এসব ঘটনার চিত্রনাট্য লিখেন এবং সে অনুযায়ী দৃশ্যধারণ করেন। আলবেনিয়ার যে সংবাদচিত্র তা-ও তাঁদের স্টুডিওতেই গড়া। আটকেপড়া সেনা চরিত্রে উপস্থাপন করার জন্য ‘শুম্যান’ নামের এক সার্জেন্টকে খুঁজে বের করা হল। রাষ্ট্রপতির ভাষণও মসের কাহিনীর অংশ; তাঁদেরই লেখা ও নির্দেশিত। ভাষণেই জানানো হয়, সেনাটিকে সবাই ‘ওল্ড শু’ নামে ডাকত। বানানো এই নামে আগেই একটি গান বাঁধা হয়ে গেছে, এবার তা প্রচারের পালা। রেকর্ড করা গানটিকে ১৯৩০ দশকের পল্লীগীতি বলে রেডিও-টিভিতে চালিয়ে দেওয়া হল। গণমাধ্যমের চোখে জনতা সবই ‘স্বচক্ষে’ দেখল এবং কাঙ্ক্ষিতভাবেই দেশাত্মবোধে বুঁদ হয়ে গেল।

ওদিকে মস-ব্রিন জুটি গাছে, রাস্তার বৈদ্যুতিক তারে জুতা ঝুলিয়ে জনতার সাথে সরাসরি যোগাযোগও স্থাপন করলেন। এরপর ভূত থেকে ভূতে গিয়ে দেশপ্রেমের জোয়ার বইতে বেশি সময় লাগল না। মিডিয়া তো ছিলই! জুতা দেশপ্রেমের সাথে সাথে প্রতিবাদ আর সেনা-ফেরানো দাবির ভাষায় পরিণত হল।

জনগণও সব কিছু নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে সক্রিয়ভাবেই অংশ নিল। সম্ভবত আম জনতা ঠকতে ভালবাসে। পরীক্ষা করে দেখা, তলিয়ে দেখার মন ও মনন তার কবেই মারা গেছে। দ্রুতলয়ের দুনিয়ার সাথে তাল মেলাতে পারাই আসল কথা। তারও বড় কথা উত্তেজনা আর দেশপ্রেম--এগুলো অস্বীকার করতে কেউ পারেনি কোন দিন।

যুদ্ধনির্মাতারাও আগেই জানতেন জনগণ এগুলো বিশ্বাস করবে, সন্দেহের প্রশ্নই আসবে না। জনগণের চোখে ধুলা দিয়ে উপসাগরীয় যুদ্ধেও এমন হাজারো প্রচারণা চালানো হয়েছে। সেবারের মত এই যুদ্ধের সত্য সম্পর্কেও মার্কিন জনগণ কিছুই জানতে পারবে না। কারণ সমাজ ও জনগণ অত্যন্ত সরল, তারা বিনা প্রশ্নে গণমাধ্যমের প্রচারণায় বিশ্বাস করে। জনগণের এমন সারল্য বোকামির নামান্তর এবং প্রকারান্তরে গণমাধ্যমকে আরো বেশি শক্তিশালী এবং আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। গণমাধ্যম আর বিশ্বাসের এই দুষ্টচক্রেরও সমালোচনা করেছেন লেভিনসন।



যুদ্ধের জন্য আর কিছু না হোক শত্রু তো অন্তত চাই। কে হবে শত্রু? কাকে শত্রু করা যায়? আলবেনিয়া। কিন্তু আলবেনিয়া কেন? আলবেনিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কী করেছে? কিছুই করেনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও তো কিছু করেনি আলবেনিয়া। ফলে যুদ্ধ তার প্রাপ্য। এই যুক্তিতেই আলবেনিয়াকে প্রতিপক্ষ করে যুদ্ধ বাঁধানো হয়। বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চরিত্র এখানে খুব সহজভাবেই তুলে ধরেছেন লেভিনসন। এই রাজনীতিতে পশ্চিমের--বিশেষ যুক্তরাষ্ট্রের--সহজ ও প্রধান প্রতিপক্ষ ইসলাম।

মুসলমানের বেটা মার্কিনদেশের রাষ্ট্রপতি হলে কপাল ফিরবে বলে আশায় বুক বেঁধেছিলাম আমরা। তবে কালা-চামড়া বারাক হোসেনের সাদা-মন বেরিয়ে আসতে বেশি সময় লাগেনি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই সেই ধারাবাহিক নাটকের এক এক পর্ব প্রচারিত। তামাম দুনিয়ার মোড়লিপনার দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনিই প্রমাণ করলেন--সাদায়-কালায় ভেদ নাই। মার্কিন স্বার্থই সবচেয়ে বড়। গদিতে বসার আগেই দক্ষিণ এশিয়ার ‘জঙ্গিদের’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য--এমনকি সারা দুনিয়ার জন্যও--বড় হুমকি বলে বসেছেন ওবামা। কালাদের, অ-সাদাদের, দখিন-পুবের আর বিশেষ মুসলমানের মনে বাসা বাঁধা শান্তির আশা মাটি হতে কত সময় লাগে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

‘অপরায়ন’ ছাড়া যুদ্ধ বাঁধে না, যুদ্ধ জমে না। অপরায়ন ছাড়া সিনেমাও জমে ওঠে না। পশ্চিমা--বিশেষ মার্কিন--গণমাধ্যমের এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য মুসলমান ‘অপর’। যেই অপরের বৈশিষ্ট্য ‘সস্ত্রাস’, ‘জঙ্গিবাদ’, ‘অশিক্ষা’, ‘বহুবিবাহ’, ‘টুপি দাঁড়ি পাঞ্জাবি’, ‘পর্দা’, ‘বোরখা’, ‘স্কার্ফ’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সিনেমাতেও--অল্প পরিসরে হলেও--এমন অপর তৈরি করা হয় ‘মুসলমান সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করে আর নির্মিত আলবেনীয় ‘ধর্ষিত যুবতী’র মাথায় স্কার্ফ পরিয়ে দিয়ে। ‘আলবেনীয় যুদ্ধ’ নির্মাতার কথাতেই জানা যায় আলবেনিয়া ও আলবেনীয় জনগণ সম্পর্কে তার কোন ধারণাই নাই। তবু তিনি পিছপা হন না। কারণ এই অপর অনেক দিন ধরে এবং একই ছাঁচে নির্মিত হয়ে আসছে। গৎবাঁধা এই নির্মাণের পাশাপাশি ইসলামের বিরুদ্ধে ‘নয়া ক্রুসেডে’ লিপ্ত পশ্চিমা মিডিয়ার চরিত্রও এভাবে ধরা পড়ে ওয়্যাগ দ্য ডগ ছবিতে।


নির্মিত সংবাদচিত্রে আলবেনীয় তরুণী

যুদ্ধের বাজারে গাজির চেয়ে শহিদের কদর বেশি। যুদ্ধের দামামা বাজাতে মরাসেনার জুরি নাই। ময়দান থেকে বীরবেশে ঘরে ফিরলে নির্বাচন হয়তো জেতা যাবে। কিন্তু এই ‘হয়তো’ নিশ্চয়তা পায় যদি সে না ফেরার কারণে বা মৃত-ফেরার কারণে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। উপরি হিসেবে থাকে অস্ত্রব্যবসা আর দুনিয়ার খবরদারি। তো সে-ই ভাল...

পাঠক, বলতে পারেন, একজন মার্কিন সেনার জীবন তৃতীয় বিশ্বের কত শত ‘সাধারণ’ লোকের জীবনের সমান? অঙ্ক কষতে খুব বেশি পিছনে তাকাতে হবে না। ইরাক-আফগানিস্তান এখনো মরার কাফেলায়। ওয়্যাগ দ্য ডগ ছবির নারীলোভী সৈনিক--যাকে মহানায়ক করে তোলা হয়েছে ইতোমধ্যে--আরেক নারীকে ধর্ষণ করতে গিয়ে খুন হলে পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে বীরবেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রচারণা অনুযায়ী, আলবেনিয়া থেকে শরীরে ক্ষত নিয়ে ফেরা সেই সেনা মারা যাবার ফলে যে যুদ্ধ বাঁধতে বাঁধতেও বেঁধে উঠছিল না তা ফরজ হয়ে ওঠে। ছবির মাঝামাঝি যে যুদ্ধের কথা বলা হচ্ছিল, নির্বাচনে জেতার পর তা সত্যি করার বাস্তব প্রয়োজন আর থাকত না। কিন্তু জনতার কাছে মহাবীর করে তোলা সেই সৈনিকের মৃত্যুর পর যুদ্ধ থেকে মার্কিন সরকারের সরে আসার আর কোন পথ খোলা রইল না।

বেশি জানা সব সময়ই বিপদজনক। আলবেনীয় কিশোরী চরিত্রের অভিনয়শিল্পীকে, রাষ্ট্রপতির প্রেস কর্মকর্তাদের যুদ্ধনির্মাণ গোপন রাখতে যে হুমকি দেওয়া হয়, তা-ই পরবর্তীতে সত্য হতে দেখা যায় যুদ্ধনির্মাতা প্রযোজক স্ট্যানলি মসের ক্ষেত্রে। যুদ্ধ নির্মাণে সাফল্য এবং রাষ্ট্রপতিকে পুনরায় নির্বাচিত করার সম্ভাব্য সাফল্যের পরও তিনি তাঁর হাতে নির্মিত ‘শ্রেষ্ঠ কাজ’ যুদ্ধ নির্মাণের ক্রেডিট চাওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। সত্যিই তো, রাজনীতিকে চিরবন্ধু বলে কিছু নেই!

এত এত আয়োজন কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার জন্যই। ছবিতে যুদ্ধ বাঁধানোর প্রচারণা সফল হয়েছিল কি হয়নি বলা কঠিন। ছবির নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পুনর্নিবাচিত হয়েছিলেন কি না বলতে চাননি পরিচালক।



এদিকে, বাস্তব দুনিয়ায়, ২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাঁধিয়ে বসেন ছোট বুশ। বলা নিষ্প্রয়োজন, মোটা দাগে একই উদ্দেশ্যে (সাথে ছিল তেল ও অস্ত্র বাণিজ্য)। তিনি ২০০৪ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মত নির্বাচিতও হন। তাঁর প্রচারণা প্রতারণা তাই নিঃসন্দেহে সফল। তার আগেই, এই ছবি মুক্তির কয়েক মাসের মাথায়, তখনকার রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের পরিচ্ছন্নতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মনিকা লিউনস্কির সাথে তাঁর একই রকম যৌন কেলেঙ্কারির খবর ফাঁস হয়ে যায়। এই ঘটনা অবশ্য ধামাচাপা দেওয়া যায় নাই। প্রয়োজনও হয়তো ছিল না। ক্লিনটনের সেটা দ্বিতীয় পর্ব।

এই দুই ঘটনার কারণে ওয়্যাগ দ্য ডগ ছবির গুরুত্ব বেড়ে যায় অনেকখানি। ছবির নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার বা কাহিনীকার কি ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন? নাকি ক্লিনটন আর বুশ এই ছবি দেখে শিখেছেন? এসব প্রশ্ন আমি করব না।

এই সিনেমাই প্রথম জোতিষী বা শিক্ষক নয়। দুই বছর আগেই মাইকেল মুর একই রকম কাহিনীর একটি ছবি বানিয়ে ফেলেছেন। কানাডিয়ান কানকুন (১৯৯৫) কাহিনীচিত্রে রাষ্ট্রপতির জনপ্রিয়তায় ধস নামলে যুদ্ধের এক ঢিলে তিনি অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে মনোযোগ হঠানো এবং অর্থনীতি চাঙ্গা করা--এই দুই পাখি মারেন। কয় বছর আগেই মাত্র জাতশত্রু সোভিয়েত ইউনিয়ন মরে গিয়ে বেঁচে গেছে, আর শত্রুহীন করে গেছে মার্কিনদেশকে। তাই সেখানে নতুন শত্রুর ভূমিকায়--ওয়্যাগ দ্য ডগ ছবির আলবেনিয়ার মত--কানাডাকে হাজির করা হয়। এই সেই কানাডা যে কি না ওয়্যাগ দ্য ডগ ছবিরও এক জরুরি চরিত্র।

নির্বাচনের আগেই প্রতারণা, জালিয়াতিসহ সব রকম প্রচারণার চালিয়াতি ধরা পড়ে যাওয়া ভাল কথা নয়। চালিয়াতি অধরা থাকাই এই শিল্পের আরেক বড় গুণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেই শুধু নয়, মার্কিন সিনেটর নির্বাচনেও প্রচারণা প্রতারণা কী গুরুত্ব বহন করে টিম রবিনসের বব রবার্টস ছবিতে আমরা তা দেখেছি। সিনেট নির্বাচনের অল্প কদিন আগে সাজানো হত্যাচেষ্টার ফলে রবার্টসের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। নির্বাচনে ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন তিনি।

সিনেমাটিক শৈলীর দিক থেকে ওয়্যাগ দ্য ডগ ছবিটি বিশেষ নয়, অতি সাধারণ। সাধারণ হলিউড ছবির চেয়েও নিম্নমানের। কিন্তু এর বক্তব্য কঠোর এবং সমসাময়িক। তাই শৈলীগত বিশ্লেষণের চেয়ে এর কাহিনী নিয়েই বেশি আলোচনা করা হল।


পরিচালক ব্যারি লেভিনসন

ল্যারি বিনহার্টের আমেরিকান হিরো গ্রন্থ অবলম্বনে ওয়্যাগ দ্য ডগ ছবির চিত্রনাট্য রচনা করেন হিলারি হেনকিন এবং ডেভিড মামেট। ছবিটি ব্যরি লেভিনসন, ডাস্টিন হফম্যান এবং রবার্ট ডি নিরোর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের যৌথ নির্মাণ। মাত্র দেড় কোটি ডলার বাজেটের এই ছবির চিত্রধারণের কাজও শেষ হয় এক মাসের কম সময়ে, মাত্র ২৯ দিনে।

এই ছবিতে এত সত্য করে মিথ্যার নির্মাণ দেখানো হয়েছে, যা দেখলে পরে পত্রপত্রিকা, রেডিও-টিভি, সিনেমার কোন কথায় জনগণ আর বিনা বাক্যে বিশ্বাস করতে পারে না। এজন্যই সমালোচকরা বার বার এই ছবিকে ‘রিকমেন্ডেশন’ তালিকায় রেখেছেন। কিন্তু কেন যেন মার্কিন জনগণ সেই সত্যভাষণ শোনার সাহস পায়নি; ছবিঘরে যায়নি। সেই শিক্ষিত মার্কিন জনতাই ২০০৪ সালের নির্বাচনে বোকা হওয়ার মিছিলে আবারো ঝাঁকে ঝাঁকে সামিল হয়েছে--আরো চার চারটি বছর দুনিয়া জ্বালানোর সুযোগ পেয়েছেন বুশ।


* রচনাটি সাপ্তাহিক কাগজ কর্তৃপক্ষের ফরমায়েশ; ঐ পত্রিকার নতুন রূপে ও নবতর মেজাজে ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যার (২১ ডিসেম্বর ২০০৮), ৫৬-৫৭ পৃষ্ঠায় প্রথম প্রকাশিত। শিরোনাম ছিল ‘আমার সোনার হরিণ চাই’। সামহোয়্যার সংস্করণে আগের অনেক ভুল ত্রুটি সংশোধন, পরিমার্জনা এবং কিছু ক্ষেত্রে বক্তব্যের সম্প্রসারণ করা হল।

কৃতজ্ঞতা: ঢাকা চলচ্চিত্র সভা পাঠচক্র অথবা তুষার, আজাদ, তানজু, শিশির ভাইসকল; সলিমুল্লাহ খান, ফাহমিদুল হক, শহিদুর রহমান।

মন্তব্য: এখানে যারা মন্তব্য করতে পারছেন না, তাঁরা আমার ইডাকে ([email protected]) মন্তব্য পাঠালে কৃতজ্ঞ থাকব।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:০৩
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×