somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

`দ্য আলকেমিস্ট`- পাওলো কোএলহো ডি’সুজা

১৭ ই জুন, ২০১৬ রাত ১১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একদিন এক কিশোর তার মাকে বলল, ‘মা, আমি একজন লেখক হতে চাই।’ এই কথা শুনে তার মা বললেন, ‘প্রিয়, তোমার বাবা একজন প্রকৌশলী। তিনি একজন যুক্তিবাদী ও দায়িত্ববান মানুষ। তিনি জীবন ও জগৎ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন। তুমি কি স্বচ্ছ ধারণা রাখ যে একজন লেখক হওয়া বলতে ঠিক কী বুঝায়?’ সেদিন হয়তো কিশোরটি সে প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখনীশক্তির যাদুতে জগৎ, জীবন সম্পর্কে অসাধারণ বক্তব্য তিনি দিয়েছেন। তিনি ব্রাজিলিয়ান লেখক ও গীতিকার পাওলো কোএলহো ডি’সুজা। ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট, রিও ডি জেনেরিও-তে জন্মগ্রহণ করা এই মানুষটি তাঁর কৈশোরের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের ভেতর দিয়ে, মানুষ ও তার স্বপ্ন, আকাক্সক্ষার ব্যাখ্যা, গন্তব্যে পৌঁছানোর ইতিবাচক প্রণোদনাসহ জগৎ ও জীবন সম্পর্কে ভাবনার বিভিন্ন দ্বার উন্মোচন করেছেন।


তাঁর সবচে’ জনপ্রিয় রচনা ‘দ্য আলকেমিস্ট’ ইতোমধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৮০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ২০০ মিলিয়নের মতো কপি বিক্রি হয়েছে। এই রচনাই তাঁকে বিশ^খ্যাত লেখকের পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
‘দ্য আলকেমিস্ট’-এর এই জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় রচনাটির বিষয়বস্তু। গঠনশৈলির জায়গাতে একেবারে সাদামাটাভাবে সরাসরি বর্ণন প্রক্রিয়ায় গিয়ে লেখক বিষয়বস্তুকে উপলব্ধি ও বুঝে উঠতে পারার পথটি সুগম করেছেন।
সান্তিয়াগো নামের একটি মেষপালক স্পেনের একটি চারণভূমির পাশে ভগ্ন গির্জায় একটি পরিত্যক্ত কক্ষে ঘুমোতে ঘুমোতে পরপর দু’বার একটি স্বপ্ন দেখে। সে দেখে মিশরের পিরামিডের নিচে গুপ্তধন রয়েছে। দু’বার একই স্বপ্ন দেখার জন্য সে মিশরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তার এই যাত্রারম্ভের ভেতর দিয়ে উপন্যাসটির আখ্যানভাগের সূচনা হয়। সান্তিয়াগোর গুপ্তধনের অনুসন্ধানে যাত্রা, পথে বাধা-বিপত্তি, ব্যক্তিগত ও পারপ¦ার্শিক নানা প্রতিকূলতা- ইত্যাদির চমৎকার বয়ান ও বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে লেখক মানবজীবনের একটি বিশেষ অর্থ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। সান্তিয়াগো যেন আমরা প্রত্যেকেই, তার গুপ্তধন হচ্ছে আমাদের সেই স্বপ্ন বা আকাক্সক্ষা যা আমরা নিজের ভেতর পুষে রাখি। কিন্তু সে স্বপ্ন বা আকাক্সক্ষা পূরণ করে উঠতে পারি না অনেকেই। সেই না পেরে ওঠার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন পাওলো কোএলহো। তিনি তাঁর ‘দ্য আলকেমিস্ট’-এর ভূমিকাতেই লিখেছেন- আমরা অনেকেই ব্যক্তিগত হৃদয়ের আহ্বানে সাড়া দিতে পারি না। এই ব্যক্তিগত হৃদয়ের আহ্বান হচ্ছে ঈশ^রের আর্শীবাদের মতো। এটা হচ্ছে তা, যা আমাদের হৃদয় আমাদের করতে বলে। চারটি বাধার কারণে আমরা সাড়া দিতে পারি না। প্রথমত, শৈশব থেকেই আমাদের পারিপ¦ার্শিকতা আমাদের শেখায়, যা কিছু আমরা করতে চাই না কেন, সে সবকিছুই অর্জন অসম্ভব। এই ধারণা নিয়ে বড় হতে হতে আমাদের মন বদ্ধপরিকর হয় যে আসলেই তা অসম্ভব। দ্বিতীয় বাধা হচ্ছে, ভালোবাসা। আমরা জানি যে আমাদের চাওয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে প্রয়োজন হয় অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার। আর তা করতে গেলে আমাদের অনেত প্রিয়জনই আঘাত পাবে। তৃতীয় বাধা হিসেবে আসে পরাজয়ের ভীতি। যদি ব্যর্থ হই? যদি লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারি- এই ধরনের ভাবনাগুলো আমাদের স্বপ্নপূরণের অভিযাত্রাকে বিঘিœত করে। আর চতুর্থ বাধা হলো, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার ভয়। যদি স্বপ্ন পূরণ হয়, তখন যদি ঠিক যেমনটা ভেবেছিলাম, সবকিছু তেমনভাবে না পাই- এই ভীতিও মানুষকে স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা সৃষ্টি করে। লেখক অবশ্য এই চারটি বাধা অতিক্রমের পথও দেখিয়েছেন। মূলত সান্তিয়াগো এই চারটি বাধা অতিক্রম করার ভেতর দিয়ে সে তার গুপ্তধনের কাছে পৌঁছেছে। মজার বিষয় হলো, পিরামিডে পৌঁছে সে কোন গুপ্তধনই পায়নি বরং উপজাতীয় যুদ্ধে উদ্বাস্তু একদল মানুষের আক্রমণের শিকার হয়। তারা সান্তিয়াগোর সবকিছু কেড়ে নেয় এবং প্রচ- প্রহার করে। কিন্তু সান্তিয়াগো যখন ওর গুপ্তধন অনুসন্ধানের কথা বলে, তখন ঐ দলের দলনেতা তাকে বলে সেও এই এখানে দু’বছর আগে বেশ কয়েকবার স্বপ্ন দেখেছিল যে স্পেনের একটা চারণভূমিতে তার যাওয়া দরকার, সেখানে একটা ভগ্ন গির্জা রয়েছে, একজন মেষপালক এবং তার ভেড়ার পাল সেখানে রাত কাটায়। সেই গির্জাটার একটা কক্ষের ভেতর জন্ম নিয়েছে একটা সাইকামোর গাছ; সেই সাইকামো গাছের নিচে লুকানো গুপ্তধন রয়েছে কিন্তু এসব স্বপ্নকে বিশ^াস করে পুরো একটা মরুভূমি পাড়ি দেয়ার মতো নির্বোধ সে নয়। সান্তিয়াগো সমস্তটাই বুঝতে পারে। আসলে সে তার গুপ্তধনের ঠিকানা পেয়েছে। ঠিক যেখানে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে গুপ্তধনের স¦প্ন দেখেছিল ঠিক সেখানেই লুকনো রয়েছে গুপ্তধন। এই ধরনের চমৎকার সমাপ্তির ভেতর দিয়ে লেখক রূপকের আড়ালে আমাদের জীবন সম্পর্কে গূঢ় কিছু কথা বলেছেন। সমগ্র কাহিনির পরতে পরতে রয়েছে জীবন, স্বপ্ন, ব্যক্তিগত উপাখ্যান এবং সর্বাপরি ‘পৃথিবীর সংকেত’ নিয়ে বহু দার্শনিক কথাবার্তা। পৃথিবীর সংকেত বলতে এখানে বোঝানো হয়ে প্রতিটি মানুষের জন্য কোনটা করা উচিত বা কোনটা করা উচিত নয়- পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিজ নিজ অবস্থান থেকে তার সংকেত দেয়। লেখকের মতে বিশে^ও প্রতিটি প্রাণ ও জড়ের ভাষা রয়েছে। সে ভাষাটা সংকেতের ভাষা। এই ভাষা বুঝতে পারাটা কোন ব্যক্তির জন্য খুব জরুরি। তাহলেই সে তার ব্যক্তিগত আহ্বানে যথাযথভাবে সাড়া দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।
‘দ্য আলকেমিস্ট’ রচনাটি লেখা হয় ১৯৮৮ সালে। ঐ বছরই ব্রাজিলের একটি ছোট্ট প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশ করা হয়। ৯০০ কপি ছাপানোর পরই প্রকাশক জানিয়ে দেন বইটি আর ছাপানো সম্ভব নয়। পরে ১৯৯৪ সালে আমেরিকার সবচেয়ে বড় প্রকাশনী সংস্থা ঐধৎঢ়বৎপড়ষষরহং ‘দ্য আলকেমিস্ট’ ছাপাতে আগ্রহ প্রকাশ করে। এরপরই উপন্যাসটি সারাবিশে^ ছড়িয়ে পড়ে। অনূদিত হতে শুরু করে বিভিন্ন ভাষায়। বাংলা ভাষায় ‘দ্য আলকেমিস্ট’ উপন্যাসটির চমৎকার অনুবাদ করেন সাঈদা সানী। যদিও বইটি মূল ভাষার ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা করা হয়েছে। কিন্তু যতটা সম্ভব সহজ ও সাবলীল ভাষার ব্যবহার করে মূল স্বাদ অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। বই বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। বইয়ের ছাপামূল্য ১৫০ টাকা।

সুব্রত দত্ত
জুন ১৭, ২০১৬।

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০১৬ রাত ১১:১৫
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গাজীপুর থেকে কক্সবাজার: চার বাইকে ছয় সহকর্মীর ১৪ ঘণ্টার নাইট রাইড অ্যাডভেঞ্চার

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০২


আমি শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, থাকি সাভার এলাকায়। ভ্রমণের নেশা আর মোটরসাইকেলের প্রতি ভালোবাসা আমার দীর্ঘদিনের। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব গাজীপুর থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের দিকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

Personal Cancer Vaccine: আশার আলো দেখাচ্ছে

লিখেছেন কলাবাগান১, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২


আপনি কি কখনও চিন্তা করে দেখেছেন যে ক্যান্সার টিউমারকে কেন শরীর এর রোগ প্রতিরোগ করা ইমিউন সেল (যেমন টি সেল) একেবারে ধ্বংস করতে পারে না!!! যেখানে টি সেল... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৮



মাঝে মাঝে খুব অবিশ্বাস্য ব্যাপার সহজ ভাবে ঘটে যায়।
এই যে আমি শাহেদ। শাহেদ জামাল। রমিজ উদ্দীনের ছেলে। আমাকে একটা ঘরে বন্ধী করে রাখা হয়েছে। ছোট ঘর। ঘরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২



শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

গতকাল এক বাবার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে একটি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল যৌন নিপীড়ন করেছেন। বাবার প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×