অ্যাঁ… আইছে…… রাবণের পাল গুলা। এখন কাছে আসবে মিষ্টি মিষ্টি দুইডা কথা বলবে তারপর আবার কিছু নেওয়ার আবদার করবে। প্রয়োজন ছাড়া এদের ছায়াও দেখা যায়না। উহঃ যত্তসব জ্বালা হইছে আমার!
পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা বৃদ্ধা দাদীর এই অভিমানী কথা গুলো কখনো পুরানো শোনায় না। যদিও সেই ছোট থেকেই কথা গুলোর সাথে পরিচিত হয়েছি। আজ দীর্ঘ ১২ বছর পর এ বাড়ীতে পা রাখলাম। ব্যস্ততা কখনো আমাকে একাকীত্ব করেনি। সেই ছোট বেলায় গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে দলবেঁধে দাদী বাড়ী আসতাম হৈ হুল্লো চলতো। দিন সাত আটেক পর আবার সেই কালো ধোয়া, জঞ্জাল আর রাজপথের ব্যস্ত গাড়ীর টো টো হর্ণের নগরীতে ফিরে আসতাম। সঙ্গে থাকত দাদীর হাতে বানানো পিঠা, পায়েস, নাড়ু আরো কত কি যে!
এতদিন পর আসলাম, এখানকার সব কিছুর পরিবর্তন চোখে পরার মত। রাস্তাঘাট আর সেই আগের মত এবড়োখেবড়ো মাটির নেই, পিচ ঢালা হয়েছে। কালো রঙ্গের পিচ ঢালা রাস্তা দূর থেকে দেখলে যেন মনে হয় শহুরে কোন কালো নর্দামা একেবেকে গেছে। দোকানপাটও ছিল তখন নগণ্য। এখন শহরের আবছা ছায়া এখানে লক্ষ্য করা যায়।
যাইহোক, কাকীমার সাথে কুশল বিনিময় শেষে দাদীর ঘরে এলাম। দাদীর চশমা, দাদীর সেই প্রিয় আয়না সেই আগের মতই পরিপাটি সাজানো আছে টেবিলে। বিছানার উপরে দাদীর ব্যবহৃত সেই চাদরটা ভাজ করা। বিছানার কাছে গেলাম, দাদীর পানের বাটিটাও স্বযত্নে রাখা। ভয়ে ভয়ে দাদীর চাদর টা হাতে নিয়ে দেখছিলাম এই বুঝি দাদী হুঙ্কার ছাড়ে। হতছ্যাড়া, আমার অনুমতি না নিয়ে আমার ঘরে ঢুকেছিস কোন সাহসে, বের হ, জলদি বের হ, আমি মরলে তখন আসিস।
আমাদের প্রতি দাদীর এই অভিমান গুলোর যথেষ্ট কারন ছিল, দাদী সব সময় চাইতো আমরা যাতে এখানেই থেকে যাই। বাবার অফিস আর আমাদের পড়াশুনার জন্য শহরেই থাকতে হয়েছে। দাদী যেখানে চাইতো তার এই শেষ বয়সে আমরা তার পাশে থাকি, সেখানে আমরা বছরে ১/২ বার এ বাড়ীর চৌকাঠে পা দিতাম। দাদা গত হবার পর থেকেই দাদী একা মানুষ, একাকীত্বের সঙ্গী হিসেবে খুব করে আমাদের পাশে চাইত। আজ দাদী নেই, দাদীর সেই হুঙ্কারটাও নেই। কাছে আসার কিছু পরেই দাদী সব ভুলে আমাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরতেন। সব নাতী নাতনীদের বুকে নিয়ে দাদী একটাই কথা বলতেন "তোরা আমার চান্দের বাজার" । দাদীর মততাময়ী সেই স্পর্শগুলা কখনোই কোন কিছুর সাথে তুলনা করা যাবেনা। এখন, আমাদের জন্য দাদীর সেই নিষিদ্ধ ঘরে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকি। দাদীর বিছানায় গা এলিয়ে দেই যেন দাদীর কোলেই শুয়ে আছি। দাদীর আদুরে হাত গুলো আর মাথায় এসে পরে না।
দাদীর চাদর নাকে নিয়ে শুখে দেখলাম, আজো সেই দাদী দাদী ঘ্রাণ অষ্টেপৃষ্ঠে লেগে আছে…
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ৮:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


