somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রোকসানা লেইস
স্রোতের অজানা টানে সমুদ্র বালিয়াড়ি বেয়ে বোহেমিয়ান- গৃহকোন, জীবন যাপন ফেলে চলে যায়। তুমি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাও জোছনা গলে হারিয়ে যায় সুখ । আছড়ে পরা ঘূর্ণিজল মনে বাজায় অচেনা সবুজ দিগন্ত ..

এ্যাবস্ট্রাক্ সময়

২৬ শে অক্টোবর, ২০১০ ভোর ৪:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এ্যাবস্ট্রাক সময়

কোন দিকেই নজর ছিল না । ভারাক্রান্ত মনের কষ্ট ভুলে থাকার তাড়নায় হনহন হাঁট ছিল নিলিম। ’সখি ভালোবাসা কারে কয়’ ক’দিনের সংসার রিনির সাথে । তাইতে মনে হচ্ছে যেন কত জনম কেটে গেল এক সাথে। সমস্ত আকর্ষণ ফুরিয়ে গেছে। অথচ রিনি কে পাবার আগে কি আবেগে থরথর করত, সকাল হওয়ার অপেক্ষায় সারারাত ব্যাস্ত থাকত । কখন দেখা হবে কখন কথা হবে সে ভাবনায় সময় পার হতো না। প্রতিদিন নতুন করে পাওয়ার তীব্রতায় মন প্রাণ আকুল হয়ে থাকত।
ভালো একটা কোম্পানিতে মোটা বেতনে চাকরি করে নিলিম । দুজনার সংসার কোন ঝুট ঝামেলা নেই । নিরিবিলি পরিবেশে ছিমছাম একটি বাড়িতে সমস্ত আধুনিক সুযোগ সুবিধাসহ একটি অ্যাপার্টমেন্টে। বিয়ের পরপরই নিজেদের পছন্দের ফার্নিচার কিনে সাজিয়ে নিয়েছে ওরা। এত অল্প সময়ে গুছিয়ে নেয়ার পিছনে বিশাল কারণ।
নিলিম বরাবরই খুব গোছানো এবং পরিকল্পনা প্রিয় একটি ছেলে।
জীবনের সাজানো সুন্দর একটি ছক ওর মোটামুটি কিশোর বয়স থেকেই করা ছিল। তখনকার পরিকল্পনা অনুযায়ী এপর্যন্ত ভালোই চলছিল। সব কিছুই ওর ইচ্ছা মতোই যেন ঘটে যাচ্ছিল।
আর চলছে না, প্রতিদিন ছন্দপতন ঘটছে। অভ্যাস অনুযায়ী নিয়মমাফিক চলা জীবনে হঠাৎ এই ছন্দপতন নিলিমের জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠছে।
কেন এমন হচ্ছে ? নিলিম মিলাতে পারেনা, বুঝেতে পারে না। বন্ধুরা এক কথায় ঈর্ষান্বিত ওদের সুন্দর সাজানো নির্ঝঞ্জাট সংসার দেখে। কাছাকাছি সময়ে রিনি ও নিলিমের যে সব বন্ধু বান্ধবীর বিয়ে হয়েছে, তাদের সংসারে হাজারো সমস্যা। টাকা পয়সার ঘাটতি, বাড়িতে মানুষ, দায়দায়ীত্ব, মা বাবা ভাই, বোনের দেখা শোনা। পছন্দ মতন জিনিস কিনতে না পারা। পছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে না হওয়া। অনেক অনেক সমস্যা সবার ।
এই অল্প সময়ে সব গুছিয়ে পছন্দের মানুষের সাথে জীবন যাপন কতটা ভাল ভাগ্য হলে হয়? সেই সৌভাগ্যের কপালে শনির আচড় পরেছে। চোখ লেগে গেছে যেন।
জীবনের শুরুতে নিলিম অনেক র্দূভাগ্য দেখেছে।
দেখেছে ওর মায়ের জীবনে বাবার কারণে অনেক অশান্তি। সংসারে দায়দায়িত্ব পালন না করা । রাতবিরাতে প্রায়ই বাবার ঘরে না ফিরা । ঘরে থাকলেও বাবা ছিলো সব কিছু থেকে উদাসী এক মানুষ । কেন তার এই জীবনযাপন নিলিমের খুব ভালো জানা নেই। যত টুকু জানে, বাবা ছিলেন ভিষণ টেলেন্টেড স্টুডেন্ট। স্কুলজীবন থেকেই বরাবর প্রথম হওয়া ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিভাগে প্রথম হওয়া ছাত্রটি বিভাগীয় অধ্যাপকের পদে যোগ দেয়ার জন্য বিদেশের লোভনীয় চাকুরি ছেড়ে দেন। ঠিকঠাক হওয়া চাকরিটি কি কারণে যেন বাবা আর পান নাই।

পছন্দের বিয়ে মার সাথে। দুই বছরের জুনিয়ার মেয়েটি কে ভালোবেসেছিলেন। পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথে বিয়ে করে ফেলেছিলেন দু’জনে । চাকুরি পেয়ে যাচ্ছেন সব ঠিকঠাক, সুন্দর জীবনের আয়োজনে হারাতে চেয়েছিলেন, সারা জীবনের পড়ুয়া ছাত্রটি। মা তখন অর্নাস ফাইন্যাল ইয়ারের ছাত্রি । মার ফাইন্যাল পরীক্ষা দেওয়ার আগে ওরা বিয়ে করেন।
মা ছিলেন নাম করা বনেদি পরিবারের মেয়ে। মার বাবা ছিলেন ঢাকার খুব নাম করা ব্যারিষ্টার। বাবার পরিবারে বাবা ছাড়া কেউ শিক্ষিত ছিলেন না। দাদু নিতান্তই কৃষক। নিজের হাতে হাল চাষ করেন। মাঠে লাঙ্গল দেন। ফসল ফলানোর যাবতীয় কাজ একা করতে হয়। কামলা রাখার ক্ষমতা ছিলনা। দাদুর চার ছেলে, তিন মেয়ে। বাবা সবার ছোট হওয়ায় স্কুলে যাওয়ার সুযোগ তার কপালে জুটেছিল। বড় ভাইয়েরা প্রাইমারী স্কুল শেষ করার আগেই বাবার সাথে মাঠে কাজ করতে শুরু করে। এভাবেই তারা পড়ালেখা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সবার ছোট ভাইটি পড়ালেখায় ভালো হওয়ায় স্কুলের মাস্টাররাও তাকে স্কুলে রাখতে আগ্রহী ছিলেন । আর মাঠের কাজে তিন ছেলের সহযোগিতা থাকায় এই ছোট ছেলেটির উপর কাজের অত চাপ ছিল না। তার নিজের পড়ালেখার আগ্রহের কারণে সে একটার পর একটা ক্লাস খুব ভালো ভাবে পাশ করে এসএসসি পরীক্ষায় যখন প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে গেলো তখন গ্রামের বাইরে গিয়ে ঢাকা শহরের ভালো কলেজে ভর্তি হওয়ার কোনো দিক দিয়ে কোন বাধা থাকলো না।

পড়ালেখায় মনযোগী ছাত্র, অন্য কিছুর প্রতি আগ্রহ ছিলো না। ছেলেবেলা থেকেই বাবার জীবনবোধ বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন ছিল। অন্য ভাইবোনরা যখন জীবনের কঠিন সময় দুহাতে আগলে চলেছেন সে সময়ে বাবা সবার আদর আহ্লাদ পেয়ে এবং ভালো ছাত্র হিসাবে সব কিছুতে বেশী মনযোগ পেয়ে বড় হয়েছেন। যার ফলে জীবন জিবিকার কঠিন বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন ছিলেন না। অবেগ আর সহজ সরল চিন্তা ধারায় জীবন যায় না। জীবনের পাতা আর বইয়ের পাতা এক নয়। কিন্তু যতদূর নিলিমের জানা, বাবা যা জানতেন, যা বুঝতেন তার বাইরে,ধুরন্ধর চিন্তা ভাবনায় জীবন চালানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি তাই চাকুরির আশ্বাস পাওয়ার সাথে সাথে আবেগের স্বপ্ন জালে জীবনের ছক একে মাকে বিয়ে করে ফেলেন। মার পরিবার এ বিয়ে কিছুতেই মেনে নিবেনা। পালিয়ে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে হয়। এ বন্ধু ও বন্ধুর বাড়িতে কিছু দিন কাটিয়ে, প্রতিক্ষা করেন চাকরিতে যোগদানের । সুখের সে পত্র আসে না দিনের পর দিন কাটে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় পরিণত হয়। বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংসার করা সম্ভব না। বাবা উপায় না পেয়ে মাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি গিয়ে হাজির হন।


দাদু মারা গেছেন । বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে ভাইরাও বিয়ে থা করে যে যার সংসারে আলাদা ভাবে নিজেদের প্রচেষ্টায় জিবিকা নির্বাহ করছেন। সবারই দ’ুটো বা তিনটে বাচ্চা কারোরই অবস্থা খুব সচ্ছল নয়। তাই দাদীর দেখা শোনার দায় কেউ একা নিচ্ছিল না। তাকে ঘুরে ফিরে এক, এক ছেলে মেয়ের বাড়ি থাকতে হয়। এ অবস্থায় বাবা শহরের একটি আধুনিক পরিবারের মেয়ে কে নিয়ে বাড়ি পৌঁছুলে রীতিমতো তুলকালাম কালাম বেঁধে যায়। বাবা কাউকে না জানিয়ে এমন একটি মেয়ে কে বিয়ে করেছেন। তারপর বাবার পিছনে এত দিন সবাই কোন রকম প্রশ্ন ছাড়া সকল সুযোগ সুবিধা দিয়ে এসেছেন। যে পড়ালেখা শেষ করে বাবা পরিবারের সুখ সুবিধার দিকে নজর দিবেন । বড় চাকরি করে সকলের দুঃখ র্দূদশা দূর করবেন। তার বিয়ের খবরে প্রতিটি মানুষের আশার গুড়ে, বালি পড়ে। তাই সবার চোক্ষুশূল হয়ে উঠেন মা। যে বেচারা বোকার মত পরিবার পরিজন কোন কিছুর খোঁজ-খবর না নিয়ে শুধুই বাবাকে ভালোবেসে নিজের আত্মীয়-স্বজন সব ছেড়ে চলে এসেছেন।
ভালোবাসার এমন জীবন মার কি কাম্য ছিল? হৈ চৈ অস্থিরতার ভিতর অর্ধেক দিন বাড়ির বাইরে নিমগাছ তলায় বসে কাটে মার। জীবনে কখনো যে মেয়ে গ্রামে যায়নি। গ্রামের মানুষ সম্পর্কে তার ধারনা হয় এমন। যারা বউ বরণ করে না । যারা পাওনা দেনার হিসাব মিলাতে ব্যাস্ত।
পাপড়ি নামের মেয়েটি ছিন্ন পাপড়ির মত দলিত মথিত হয়ে যায়। জীবনের সুখ স্বপ্ন, সুখের ঘর বাঁধতে গিয়ে জীবনের সব কিছু তার এলোমেলো হয়ে যায়। যেদিন থেকে তানভীর নামের লোকটির সাথে বিয়ে হলো তারপর দু’টো মাস থাকা খাওয়ার ঠিক নেই । এলোমেলো জীবন যাপন চলছে।
কতবার বললো পাপড়ি নিজের মতে বিয়ে করেছো, বাড়ির লোকদের তখন বলোনি, এখন কি তারা মানবে? ভেবে দেখো। ঢাকায় থেকে একটা কিছু কাজ করো নিদেন কিছু না পেলে টিউশনি খুঁজো আপাতত বাঁচা যাক। আস্তে আস্তে ভালো কিছু পেয়ে যাবে। কে শুনলো কার কথা।
চাকরিটি হলো না আর কিছু করলো না, পৃথিবীতে যেন মানুষ একবারই কাজের জন্য শুধু চেষ্টা করে। বাড়ির তো এই দরিদ্র অবস্থা। কি হবে এখন ? পাপড়ির পৃথিবী টালমাটাল করে। ক্ষিদা,তৃষ্ণা, ক্লান্তিতে ভাবার শক্তি হারায়।
দুপুর বারোটার দিকে ওরা এখানে পৌঁছেছে। এখন সূর্য ডোবে ডোবে। তানভীর কোথায় কে জানে । ভিতরের দিকে কথা শোনা যাচ্ছে উচ্চকন্ঠে। ওরা গ্রামে পৌঁছার পর থেকেই কিছু ছেলে-মেয়ে ওদের ঘিরে ওদের পিছন পিছন হেঁটে বাড়ি পর্যন্ত এসেছে। বউ, ঝি, বেটাছেলেরাও এসে ভীড় করে থেকেছে। মুখ পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু ভীড়টা আছেই।
পাপড়ি আর পাড়ছে না এভাবে এখানে বসে কত যুগ কাটাবে সে? তানভীর কে খুঁজে নিয়ে ফিরে যাবে ঢাকায়। এই অজ পাড়াগাঁয়ে পড়ে থাকার জন্য সে তানভীর কে বিয়ে করেনি।
ঢাকায় একটা না একটা কিছু হবেই। তানভীর না করলে ও কাজ খুঁজবে। ও কাজ করে সাজাবে নিজের সংসার।বাবার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সব পথ বন্ধ। তানভীর কে ভালোবেসে বিয়ে করেছে, সে ভালোবাসে,যে কোন অবস্থায় থাকবে তানভীরের সাথে।

তানভীর কে খোঁজার জন্য পাপড়ি উঠতে যাবে ঠিক তখনি ওর সামনে একটি ঘুমটা টানা মহিলা এসে দাঁড়ালেন। মিষ্টি কোমল কণ্ঠে বললেন, চলো বোন ঘরে চলো। এ কী কথা! সারাদিন পর ঘরে নেয়ার জন্য ইনি কে এলেন?

মহিলা আবার বললেন, কিছু মনে নিও না বোন, আমারে মাফ করে দিও । আমি তো সকাল থেকেই তোমাকে ঘরে উঠানোর কথা বলছি। মনে করছিলাম সবে মিলে সুন্দর ভাবে কাজটা করব কিন্তু আর কেউ রাজী না । না থাকুক আমি তোমার অযতœ হইতে দিব না । আমরা খাইলে তুমিও খাইবা । তোমরা শিক্ষিত মানুষ কদিন পর কাজবাজ পেয়ে নিজের সংসার পাতবা । তোমরা কি সারা জীবন আমাদের কাছে থাকবে নাকি। এত বুদ্ধিমান মানুষ সব এই টুকু মাথায় ঢুকে না। আসলে বইন গো কারো দোষ না। গরিবীর জন্য সবাই ভয় পায়। কথা বলতে বলতে পাপড়ির হাত ধরে হাঁটতে থাকেন মহিলা । উঠান পেরিয়ে ঘরের ভিতর নিয়ে আসেন পাপড়িকে। এই প্রথম গ্রামের বাড়ির ভিতরে ঢ়–কে পাপড়ি। বেশ একখানা টিনের ঘরের ভিতর পরিপাটি সাজানো ঘর। খাটের উপর পাপড়িকে বসতে দিয়ে এক গ্লাস সরবত এগিয়ে দেন এবং সাথে সাথে বলেন খাও গো বোন খাও দুপুর থেকে না খাওয়া । কোন সকালে মেলা দিছিলা কে জানে। কারো মনে একটু দয়া মায়া নাই। এই মহিলার এই আন্তরিকতায় পাপড়ির কান্না এসে যায়। আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিয়ে, সরবতের গ্লাস মুখে তুলে দেন। পাপড়ির ভিতর সত্যি প্রচন্ড রকম শুকিয়ে উঠেছিলো। মহিলা যেন বুঝতে পেরেছেন। সরবত খেয়ে ভিতর শীতল হয়, বড় আরাম পায় সেই সাথে আবার খুব কান্না পায় ওর। ও কে জড়িয়ে ধরে আদর করেন মহিলা। পাপড়ি একটু শন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে আপনি আমার কি হন? আমি হলাম তোমার বড় জা এই বলে মিষ্টি করে হাসেন মহিলা। তারপর ডাক দেন এই সুরভি, সুমন তোরা কইরে এদিকে আয় নতুন চাচীর সাথে পরিচয় হো। কিশোর বয়সের দুটি ছেলে মেয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় ডাক শুনার সাথে সাথেই, বোঝা যায় ওর কাছে পিঠেই ছিল। এই যে আমার ছেলে সুমন, আর মেয়ে সুরভি। সালাম কর । দু’ভাই বোন ইতস্থত করে, পাপড়ি বলে, না সালাম করতে হবে না। আমার কাছে এসে বসো তোমরা । সুরভি পাপড়ির গা ঘেঁষে বসে সুমন ওর পাশে। পড়ালেখা করো তোমরা? পাপড়ি জানতে চায়। আমি নাইনে আর ভাই ক্লাস টেনে পড়ে। আচ্ছা কথা বার্তা পরে হবে যাওতো সুমন বাবা তোমার ছোট চাচারে ডেকে নিয়ে আসো। আর সুরভি তুমি চাচীরে নিয়া কুয়া পাড়ে যাও হাত মুখ ধুয়ায়ে আনো। পাপড়ি বলল আমি শুধু হাত মুখ ধোবনা না, গোসল করতে চাই। অবেলায় গোসল করে ঠান্ডা লাগবো নাতো? না আরাম হবে। তা হলে যাও তাড়াতাড়ি সাইরা আস। সবতে যখন ঝগড়া নিয়া ব্যস্তছিল আমি তার মধ্যে মোরগ জবাই দিয়া রান্না করছি তোমারে খাওয়ানোর জন্য। জলদি আস আমি ভাত সাজাই ফেলি এর মধ্যে।
যখন চলে যাওয়ার মনস্থির করে ফেললো তখনি বরণ করে ঘরে ডাকলেন একজন। কী, অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছে পাপড়ির জীবনে গত কিছুদিন ধরে। এমন এক অবস্থার শিকার হয়েছে, নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই। রাগ করে যে চলে যাবে তেমন কোন জায়গা নেই। এত অসহায় হয়ে যেতে হয় এতো অনিচ্ছার জীবন যাপন করতে হয় বিয়ে করলে, কই প্রেম করে ঘুরে বেড়ানোর সময় তো এত অনিশ্চয়তা, এত নিষ্ঠুর বাস্তবতা কখনো সামনে আসেনি। তানাভীরের বিষয়টাও বুঝতে পারছে না পাপড়ি। ও এমন করছে কেন? এমন চৌকস একটি ছেলে লেখা পড়া, গল্প, আড্ডা, একাই যে মাতিয়ে রাখত সে কেন হঠাৎ এমন বোকা র্নিবোধ টাইপ হয়ে গেল। যে চাকুরিটি পাওয়ার কথা, সেটা না পাওয়ার জন্য। আর কি নতুন করে কিছু পাওয়া যাবে না? আর কি নতুন করে কোন চেষ্টা করা যাবে না? এই গ্রামে বসে কি করবে তানভীর, খোলাখুলি কোন কথাও বলছে না। কেন আসল গ্রামে, কি পরিকল্পনা কিছুই বুঝতে পারছেনা পাপড়ি। মাথায় পানি ঢালতে ঢালতে অদ্ভুত সব চিন্তা ভাবনায় আচ্ছোন্ন হয়ে উঠছিল পাপড়ি।


বড় জা মনিরা বয়স চল্লিশ বিয়াল্লিশ হবে দেখায় অনেক কম কিন্তু আচার অচরণে মনে হয় মহা মুরব্বি। মহিলাদের জন্য দেয়া ঋণ নিয়ে নিজে হাঁস মোরগ, ছাগল,গরুর খামার করেছেন সাথে শাক সবজি মাছের চাষ আছে। বড় ভাই খুব একটা কর্মঠ নন। মহিলা একাই সব তদারকি করেন ভালো দাপটের সাথে। উনার আয় ভালো । বেশ ক’জন কামলা খাটে উনার অধিনে। মনিরার মন খুব ভালো । গ্রামের অনেক পরিবার মনিরার উপর র্নিভরশীল। চুপচুপ করে সাহায্য সহযোগিতা করেন। পরিবারের সবার মধ্যে সুন্দর সুসম্পর্ক রাখার জন্য উনার আগ্রহ প্রবল। কিন্তু অন্যান্য সদস্যরা নিজেদের অসফলতা বা অকৃতকার্যের হীনমন্যতায় ভুগে, মনিরার সাথে সহজ হতে পারে না । অনেকেই গায়ে পড়ে মনিরার সাথে ঝগড়া করার চেষ্টা করে । মনিরার তাতে কিছুই আসে যায় না। সে সবার সাথে সহজ থাকে, সবাইকে আদর করে, ভালোবাসে, সুখ দুঃখের ভাগিদার হওয়ার চেষ্টা করে। তার মহত¦এভাবেই প্রকাশ পায় । সে নিজেও তা জানেনা । তার মায়ায় ভরা মন নিয়ে সে ভালোবাসা বিলিয়ে যায়।
মনিরা তত্ত্বাবধানে থেকে পাপড়ি নিজের অসহায় জীবন কে একটু গুছিয়ে নেয়ার সুযোগ পায় ক’টা দিন স্থির ভাবে এক জায়গায় কাটিয়ে নিজের জীবনের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার অবকাশ পায়। গ্রামের একজন মহিলার নিজের জীবনে সাফল্য দেখে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদি হয় পাপড়ি। যে যতই ঝগড়া করুক কথা বলুক তারপরও কোথায় যেন সবারই মনিরার প্রতি একধরনের শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে। মনিরার সিদ্ধান্তের উপর শেষ পর্যন্ত কেউই কথা বলে না। ওর কথাই শেষ কথা। পাপড়ি কে ঘরে তোলা নিয়া সারাদিন ঝগড়া বিবাদ চলে কিন্তু মনিরা যখন ডেকে নিয়ে যায় পাপড়িকে তখন আর কেউ কিছু বলে না।

সপ্তাহ চলে যায়, তানভীরের কোন কিছুতে কোন উদ্যোগ দেখেনা পাপড়ি। কেমন বসে বসে গ্রামে ঘুরে ফিরে দিন কাটাচ্ছে। ও যেন কোন পড়ালেখা জানা লোক না । ও যেন এই গ্রামের সাধারণ একজন মানুষ। গত চার পাঁচটা বছর যে সে বাড়ি আসে নাই বা গ্রামে কাটায়নি তার বিন্দু মাত্র আভাস ওর ভিতর দেখা যাচ্ছে না। আচ্ছা ও না হয় গ্রামের জীবনে অভ্যস্ত মাঝখানে কিছু সময় এজীবনে ছিল না কিন্তু ও কি একবারের জন্য ও ভাবছে যে, পাপড়ি কখনোই এরকম অবস্থায় অভ্যস্ত নয়। তাছাড়া পাপড়ির ফ্যাইনাল পরীক্ষা মাসখানেকের মধ্যে,এভাবে দিন কাটালে তো চলবে না। ঘুম থেকে উঠেই প্রতিদিন কোথায় চলে যায়। দুপুরে খেতে আসে খাওয়া দাওয়ার পর পাপড়ি কিছু বলতে গেলে দেখে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। বিকালে বেরিয়ে যায়, আবার গভীর রাতে ফেরে। খেয়ে নিয়ম মাফিক ঘুমিয়ে পড়ে। ভাব ভালোবাসা আদর আহ্লাদ কিছুই নাই। যেন কত জীবন ওরা এক সাথে আছে। আরো পাঁচ দিনের মাথায় সকালে নাস্তা করে তানভীর যখন বেড়িয়ে চলে যাচ্ছিল পাপড়ি তখন পথ আটকিয়ে দাঁড়ায়।
-তানভীর তোমার সাথে আমার কথা আছে।
-বলো তাড়াতড়ি বলো আমার কাজ আছে যেতে হবে
-কি কাজ করছো তুমি? সেটাই জানতে চাচ্ছি?
-তুমি বুঝবে না কাজটা হোক তারপর বলব
-তানভীর, তুমি কি করছো তা জানার অধিকার আমার আছে, আমি এখনই জানতে চাই তুমি কি করছো।
-বললাম তো পরে বলব
-কেন ?
-কারণ কাজটা এখনো হয়নি
-না হোক, আমাকে তোমার জানাতে হবে তুমি কি করছো। আর আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার জন্য কি তুমি আমাকে বিয়ে করেছো? এখানে পড়ে থাকার জন্য তো তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেয়ার দরকার ছিলনা। আমার পরীক্ষা দিতে হবে তুমি একবার ও কি ভাবছো ?
-পরীক্ষা দিয়ে কি হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দিয়ে শেষ পর্যন্ত চাকরি তো পাওয়া যাবে না?
-এটা কি বলছো তুমি তানভীর একটা কাজ না পাওয়ার মানে তো এই না যে আর কখনোই তুমি কাজ পাবে না? কাজের কথা বাদ দিলেও আমাদের এই সম্পের্কের মানে কি? আমার জন্য তোমার কোন সময় নাই কোন কথা বার্তা নাই। তোমার ডিসিসন তুমি নিজেই যা খুশি তাই নিচ্ছো। একবারো ভাবছো না তোমার সাথে আমার জীবনটা জড়িত এখন।
-আমাকে কি করতে হবে?
-আমরা ঢাকা যাবো আমার পরীক্ষা দিতে হবে। তুমি চাকরি খুঁজবে বিদেশের স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা করবে।
-এখন ঢাকায় গিয়ে কিভাবে থাকব?
-এখানে বসে কোন ব্যবস্থা হবে না ঢাকায় যেতে হবে আমি কাল ঢাকা যাবো হলে উঠব। পাপড়ি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।

ওদের কথা বার্তার মাঝে মনিরা ঘরে আসেন তানভীরকে বলেন, ছোটভাই শান্ত হয়ে বসো। কথা শুনো, তুমি যে এমন উল্টা পাল্টা কাজ করছো এটা ঠিক না । তুমি কত শিক্ষিত মানুষ তোমারে আমি কি বলবো তারপরও মুরব্বী হিসাবে দু’ইটা কথা কই মন দিয়া শোন। পাপড়ি বইনে যা বলছে ঠিকই বলছে । তুমি এই গ্রামের মুদি দোকানে সারা দিন চা খাইবা আর তাস খেলবা এইটা ঠিক না । মুরব্বী কাউরে না জিগাইয়া নিজের মতো বিয়া করছো, চাকরী বাকরী পাওয়ার আগে এইটা ঠিক করো নাই। এখন এই মেয়েটার দায়িত্ব তোমার । তারে এই গ্রামে ফেলাইয়া রাখবা এটা ঠিক না। তোমাদের সংসার হবে অন্য রকম । তোমরা শিক্ষিত মানুষ তোমরা কেন গাওঁ গ্রামে পড়ে থাকবা? তোমাদের বাড়ি হবে শহরে সাজানো সুন্দর অফিসারের বাড়ি। সেখানে আমরা বেড়াতে যাবো । যাও সে সংসার সাজাও এখানে পইড়া থাইকা এই তাসের নেশায় জীবন শেষ কইরো না। তোমার ভাই এই নেশায় মইজা সংসার কিছুই দেখল না । জীবনটা শেষ কইরা আজ আমি এইখানে দাঁড়াইছি। এই মেয়েটারে আমার মতো কষ্ট দিও না ভাই। মনিরার গলা বুজে আসে কান্ন্ায়।
মনিরা ঠিক করে দিলেন আপাতত তিনি কিছু সাহায্য করবেন মাস কয়েক । আলাদা থাইকো না ছোটমোট একটা বাসা নিয়া এক সাথে থাকো দুইজনে।
এই মহিলার সহযোগীতায় দুজনে সংসার শুরু করে ঢাকায়। এ সাহায্য না পেলে হয়তো সংসার সেদিন ভেঙ্গে যেত। হয়তো পাপড়ি চলে আসতো একা । অভিমান নিয়ে আর কখনো খুঁজতো না তানভীর কে। হয় তো হারিয়ে যেত দুজন দু’দিকে । কেমন হতো সে জীবন? হয় তো ভালো সারা জীবন ধরে এই অসহনীয় কষ্টের বোঝাটা চেপে থাকত না বুকের উপর। পাপড়ির মেঘলা আকাশে ঝলমলে রোদ উঠল না কোনদিন।
পড়ালেখায় অসম্ভব মোনযোগ দিল ঢাকায় ফিরে পাপড়ি । ভালো রেজাল্টও করলো সে অনার্সে। সাথে খুঁজে নিল কয়েকটা টিউশনি জীবন যাপনের জন্য। হঠাৎ করে এক গহীন গভীর জঙ্গলে যেন হারিয়ে গেল পাপড়ি। জীবনের সমস্ত উজ্জলতা, আনন্দ, হৈ,চৈ,যেন ওর কাছে হয়ে গেল বহু দূরের এক বাঁশি।

প্রথম কিছুদিন কেটে গেলো পড়ালেখা শেষ করার অস্থিরতায়। তার মধ্যে জীবিকা র্নিবাহের প্রচেষ্টা। এম এ পাশের সাথে সাথে নিলিমের আগমন। বিসিএস পরীক্ষায় বসা শেষ পর্যন্ত কলেজের অধ্যাপিকার কাজটা পাওয়ার পর কিছুটা সুস্থির হয়ে যখন তানভীরের দিকে মনোযোগ দিল, ততদিনে তানভীর বহু দূরের মানুষ হয়ে গেছে। তানভীর ভিতরে ভিতরে মানসিক ভাবে কোলাপস হয়ে গেছে যা বাইরে দেখে কেউ কিছু বুঝতে পারেনা এমন কি সময় থাকতে বুঝতে পারেনি পাপড়ি নিজেও।
প্রথম থেকেই তাকে কোন কথা শুনাতে পারে নাই পাপড়ি। কি এক দুঃখ নিয়ে চাকরি বাকরি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখল। মেধাবী একটা মানুষ পৃথিবীকে কিছুই দিলো না । নীরবে নিভৃতে নিজেকে ক্ষয় করলো । ভালোবাসার মূল্য দিতে কিছুই পেল না পাপড়িও ।
চলবে....
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০১০ সকাল ৮:২৯
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×