
বই মেলা শেষ আজ। আমার এ বছর বই মেলায় যাওয়া হলো না। কিন্তু এতবার মেলায় গিয়েছি। এত সব স্মৃতির সাথে বাস করছি। মেলায় না যাওয়ায় তেমন কোন খারাপ লাগা কাজ করছে না। বই মেলার একমাস বই কেনার জন্য মেলায় যাওয়ার চেয়েও মিলন মেলা দেখা সাক্ষাত আড্ডার আকর্ষন বেশী ছিল। এখন ঠিক সেভাবে আর জমবে বলে মনে হয় না।
বই মেলাটা মূলত বইয়ের প্রকাশ বই কেনা কাটার জন্য। মাস জুড়ে বিশাল লেনদেন বইকে কেন্দ্র করে। বই যা ধারন করে রাখে মেধা। লেখকের চিন্তা ভাবনা, জ্ঞান। ছড়িয়ে যায় পাঠকের মনে মননে।
আমার যখন কিশোর বয়স তখন বই কেনার জন্য যেতাম শহরের বইয়ের দোকানে। বই কিনতাম পড়ার জন্য আর বই কিনতাম উপহার দেয়ার জন্য। সে সময় বিয়ে, জন্ম দিনে , যে কোন কারণে উপহার দিতে হলে বই উপহার দেয়ার প্রচলন ছিল। এবং এই প্রথাটা আমার খুবই পছন্দ। বই কেনা হতো সারা বছর জুড়ে।
কিন্তু বর্তমানে অনেক বেশী লেখক কিন্তু পাঠক সে তুলনায় আরো বেশী হওয়ার কথা কিন্তু মনে হয় এখন পড়ার মনোযোগ সবার মধ্যে নাই। চারপাশে অনেক বেশী কিছুর আকর্ষন বই পাঠ থেকে মনোযোগ দূরে নিয়ে যাচ্ছে। তবু কিছু পাঠক সত্যিকারের পাঠক জোঁকের মতন রক্ত শুষে নেয় বইয়ের পাতা থেকে জীবন ধারনের খাদ্য যেন সঞ্চয় করেন তারা বইয়ের মধ্য থেকে।
আগে অবসর সময়ে বই পড়া একটা বিশাল কাজ ছিল। বিছানায় বালিশের পাশে বই থাকা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। হাতে বই নিয়ে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পরাটাও ছিল পরিচিত একটা দৃশ্য।
আমাদের বাসায় একটি নতুন বই আসলে সেটা কে আগে পড়বে তা নিয়ে টানাটানি পরে যেত। অর্ধেক পড়া বইটা রেখে গেলে পাওয়া যেত না। আরেকজন দখল করে পড়া শুরু করে দিয়েছে। বাকিটুকু পড়ার তাড়নায় ঝগড়াও হয়ে যেত অনেক সময়। বই টানাটানি করে। কেউই বাকি অংশ আগে পড়ে ফেলার আকর্ষণ ছাড়তে পারতাম না। সারা বছর জুড়ে বই কেনার জন্য ঘুরে বেড়ানো নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোয় কখনো মুক্তধারার বইয়ের দোকানে। আমার একটা ভালোলাগার বিষয় ছিল ঢাকায় থাকার সময়।
মেলার শেষের দশদিন বই কিনে বাড়ি ফিরা ছিল নিয়ম। কারণ এ সময়ে সব লেখকের বই মোটামুটি মেলায় পাওয়া যায়। এরপর পড়া শুরু। তখন লিটিল ম্যাগাজিন খুব জনপ্রিয় ছিল। এটা পাঁচ টাকা দশ টাকা করে বিক্রি হত। আমার সংগ্রহে লিটল ম্যাগের বিশাল একটা ভান্ডার ছিল। সেখানে আমার নিজের লেখাও থাকত।
বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহ সব সময়ই প্রচুর। আর সে কারণে ষোল সতের বছর বয়সে অদ্ভুত সুন্দর একটি বইয়ের সেলফের ছবি পেয়ে সেটা স্বযত্নে সংগ্রহ করে রাখলাম। বই সাজানো এবং সংগ্রহের জন্য বুকসেলফ করব বলে। এবং একসময় সে বইয়ের সেলফটি তৈরি করে নিলাম। ঘরে অন্য কোন আসবাব না করে । অনেক বেশী বই ধারন করার জায়গা ছিল এই নানা রকম হেরিং বেরিং খোপগুলো জুড়ে। এবং আলাদা সৌন্দর্য ছিল আসবাব শূন্য ঘরে বইয়ের সংগ্রহে।
কিন্তু এত জায়গার পরও আমার সব বই রাখার জায়গা ছিল না। বই রাখতাম মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত । মাঝে মধ্যে অবশ্য কোন অতিথি বেড়াতে এসে না বলে, নিজের মনে করে আমার শেলফে সাজানো বই তুলে নিয়ে যেতেন । অন্য বই রাখার জায়গা করে দিয়ে।
এখন সংগ্রহের অনেক বই গ্রামের পাঠাগারে দিয়ে দেয়া হয়েছে।
বইমেলার প্রতিদিনের রুটিন ছিল বটতলায় আসর জমানো। যেখন এখন নজরুল মঞ্চ। প্রতিযোগীতা হয় মোড়ক উন্মোচনের জন্য। সে জায়গাটা ছিল ফাঁকা এবং অনেক ছবিদিয়ে সাজানো।
প্রতিরাতে মেলা শেষে ফিরে যেতে যেতে একজন আরেকজনের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে যেতেন বটতলায়। কথায় কথায় আবার একটা গল্পের আসর শুরু হতো। আসে পাশে চলে যেতে যেতে অনেকে এসে জুটতেন। আসরে থাকতেন হুমায়ুন আজাদ, আসাদ চৌধুরি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বর্তমান মেয়র আনিসুল হক এক সময়ের টেলিভেশনের উস্থাপক। থাকতেন নির্মেলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা। রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ এবং আরো অনেকে এখন যারা বেশ পরিচত কবি লেখক তারও। । সে আসরে বড় বড় মানুষদের জীবনের অনেক ঘটনা জানার সুযোগ হতো। হাসি ঠাট্টা গল্পের রেশ বয়ে পরদিন ফিরে আসার আকর্ষণ নিয়ে বাড়ি ফিরতাম।
প্রতি বছর প্রতিদিনের বইমেলার যাওয়ার দিনলিপি লিখলে বই হয়ে যাবে একটা। সে সব আসরের একটা গল্প বলি সেটা হয়ত আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার, আর কোথাও বলেননি অথবা বলেছেন আমি জানি না।
উনারা তখন যুবক, কবিতা এবং লেখার উচ্ছাস মনের মধ্যে। একটা কবিতা বা গল্প, প্রবন্ধ লেখা হলে আরেকজনকে শুনানোর জন্য অপেক্ষা করে থাকেন অধীর হয়ে। ভালো মন্দ বন্ধুর থেকে শুনে লেখা সম্পর্কে সঠিক ধারনা করা। আবুল হাসান দারুণ কবিতা লিখছেন। তিনি তখন সুরাইয়া খানমের প্রেমে ডুবে আছেন। প্রেমিকাকে দেয়ার জন্য একটি দারুণ কবিতা লিখেছেন, মনের আবেগ কিছুতেই চেপে রাখতে পারছেন না। কখন বন্ধুদের সাথে কথা হবে কখন কবিতাটি প্রেমিকাকে দিবেন সে আবেগে আপ্লুত কবি।
তখন তো আর এমন মোবাইল ফোনে টেক্সট দিয়ে বা ফোনে কথা বলে কাউকে ডেকে আনার সুযোগ ছিল না। যেতে হবে দেখা করতে। অথবা যদি বন্ধুটি রিকসায় চড়ে বা পায়ে হেঁটে জুতার সুখতলা ক্ষয় করে এসে হাজির হয় তবেই দেখা হওয়া।
অধীর আগ্রহে অপেক্ষারত আবুল হাসান, বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ার সাথে সাথে সার্টের বুক পকেট থেকে ভাজ করা একটি কাগজ বের করে বললেন। আগে আমার এই কবিতাটি শোন, তিনি পড়তে লাগলেন উচ্ছাসিত হয়ে, সদ্য লেখা আবেগময় প্রেমের কবিতাটি সাজানো সুন্দর পংক্তিমালায়।
কবিতা পড়া শেষ হলে সায়ীদ স্যার বললেন, এই কবিতা পেলে প্রথম লাইন পড়েই, তোমার প্রেমিকা তোমাকে মারতে আসবে।
অবাক আবুল হাসান, কেনো কি সুন্দর শব্দটি, এই শব্দ দিয়ে আবেগটা প্রকাশ করতে খুব ভালোলাগছে।
তা লাগছে তবে শব্দটার অর্থ জানলে আর লাগবে না। অতঃপর শব্দের অর্থ জেনে অনেক হাসাহাসি হলো এবং কাটছাট করে নতুন ভাবে কবিতাটি ঠিক করা হলো পরদিন প্রেমিকাকে দেওয়ার জন্য।
কবিতাটির প্রথম লাইন তুমি আমার ভালোবাসার সারমেয়।

সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০১৭ সকাল ১০:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


