somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রোকসানা লেইস
স্রোতের অজানা টানে সমুদ্র বালিয়াড়ি বেয়ে বোহেমিয়ান- গৃহকোন, জীবন যাপন ফেলে চলে যায়। তুমি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাও জোছনা গলে হারিয়ে যায় সুখ । আছড়ে পরা ঘূর্ণিজল মনে বাজায় অচেনা সবুজ দিগন্ত ..

হাওয়ায় হাওয়ায় উড়া

১৪ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুদিন আগে একটা খবর দেখলাম বাতাস হচ্ছিল ভীষণ জোড়ে। প্রায় একশ কিলোমিটার বেগে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাইড লোকটিকে বাতাস ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে। হাতে ধরা ছাতা উল্টে গেছে অনেক আগেই। বিশাল দেহী আফ্রিকান লোকটা বাতাসের সাথে যুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। মাটিতে পরে গেলো। বাতাস মাটিতেও অনেকটা দূর ঠেলে নিয়ে গেল লোকটাকে।
চার বছরের একটি মেয়ে গাড়ি থেকে নেমে দরজা খোলার জন্য দরজার হাতল ধরতেই মেয়েটিকেসহ দরজা পিছনে চলে গেলো বাতাসের ধাক্কায়। মেয়েটি শক্ত করে হাতল ধরে ঝুলছিল। সাহসী মেযে মায়ের সেল ফোনটাও ছাড়েনি। ও মজা পেয়ে হাসছিল। এই হঠাৎ দোল খাওয়ার অবস্থায়। ভয়াবহ ব্যাপার হতে পারত। তবে সে বেশ ভালোভাবে নিজেকে রক্ষা করেছে।
বিদেশে বাড়ির সদর দরজায় সাধারনত দুটো পাল্লা থাকে। প্রথমটা কাঁচের ওটাকে স্ট্রমডোর বলে, যা তালা দেয়া হয়না। বাইরের দিকে খুলে আর অন্য পাল্লাটি মূল দরজা, ঘরের ভিতর দিকে খুলে।
কিছুদিন আগে আমার বাড়িতেও একটা দূর্ঘটনা ঘটেছিল। বাতাসের প্রবল চাপে কাঁচের দরজাটি আঙ্গুলে বসে গিয়েছিল মূহুর্তের মধ্যে।
বাতাসের দাপটে উড়ে যাওয়া দেখে আমার মনে পরে গেল ছোটবেলার স্মৃতি। পাঁচ বছর বয়স হবে আমার তখন। আমরা মামা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসে বৈশাখ মাসের এক দুপুরে বাস থেকে নেমেছি শহরে। অনেকক্ষণ বাক্স পেটরা নিয়ে অপেক্ষা করা হচ্ছে রিকসার জন্য। একটা রিকসায় হবে না লাগবে কয়েকটা। অথচ একটিও পাওয়া যাচ্ছে না। বাক্স পেটরা আর লটবহরসহ আমাদের মামা বাড়ি যাওয়ার গল্পগুলো অনেক মজার।
এখন একদিনে আমরা বাংলাদেশ থেকে সাত সাগর পেরিয়ে ভিন দেশে পৌঁছে যাই। আর সে সময় তিনশ মাইল যেতে তিনদিন কম পক্ষে লেগে যেত। কত রকমের যানবাহনে চলে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা আমাদের শেষ হতো মামা বাড়ি পৌঁছানোর আবার ফিরে আসার। এই ভ্রমণের উপর গল্পগুলো আমার আত্মস্মৃতিমূলক বইয়ে আসবে। অনেকটাই লেখা হয়ে আছে।
যা বলছিলাম, শহরে রিকসার প্রচলনও শুরু হয়েছে খুব বেশীদিন না। বৈশাখ মাসে শহরে রিকসা পাওয়া সে সময় কঠিন ছিল। রিকসাওলারা ধান কাটতে চলে যেত। রিকসা চালিয়ে যে আয় হয় তারচেয়ে বেশি আয় ধানকাটায়।
তিনদিনের একটানা ট্রেন বাস স্টিমারে পথচলার পর শরীরের অবস্থা এমনিতেই কাহিল। চোখে ঘুম ঢুলু ঢুল করছিল। সেবার আবার অনেকটা পথ বাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ট্রাকের পিছনে বসে আসতে হয়েছিল। ট্রাকের একটু খানী সিটে মা বসেছিলেন। আর আমরা সবাই ট্রাকের পিছনে। এক একটা ঝাঁকুনিতে মনে হচ্ছিল ছিটকে বাইরে না পরে যাই। পাটাতন থেকে অনেকটা উপরে উঠে যাচ্ছিলাম আর পরছিলাম ধপাস করে। ছোট হাতে শক্ত করে ট্রাকের কিনারা ধরে রেখেও স্থির থাকা যাচ্ছিল না। কারন রাস্তা তো এমন পীচ ঢালা মশৃণ ছিল না। রাস্তা ছিল বড় বড় বোল্ডার দেয়া এবং খানাখন্দ গর্তে ভরা। মাঝে মাঝে ট্রাক যখন ব্রেক করে থামছিল তখন পিছন থেকে সামনে গড়িয়ে যাচ্ছিলাম। নাক মুখ ট্রাকের দেয়ালে ধাকাকা খাচ্ছিল প্রায়। আর বৈশাখ মাসে বৃষ্টিহীন রাস্তার শুকনো ধূলার পাউডার উড়ে এসে আদরে পলেস্তরা দিয়ে দিচ্ছিল সারা শরীরের জুড়ে। উড়ুখুড়ু ধূলা ভর্তি চেহারা। এমন দারুণ ট্রাকের পিঠে জাম ঝাঁকানো হয়ে কিমভুত চেহারা নিয়ে, নেমে এখন আবার রিকশার জন্য অপেক্ষা চলছে সদর রাস্তার উপর। মন চাইছে বাড়ি গিয়ে বিছানায় গড়াব। অথচ রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছি আমরা অনেকক্ষণ। বৈশাখের রুদ্র খরতাপ মাথায়। এক সময় বাবা বললেন তোমরা হাঁটতে থাকো। আসে পাশে কয়েকজন পরিচিত লোকজন এসে গেছে। কিছু ব্যাগ স্যুটকেস মাথায় তারা হাঁটতে শুরু করেছে তাদের সাথে আমি আর ভাই মিলে হাঁটছি। পিছনে মা বাবা আরো বাক্স ট্রাংক নিয়ে ঠেলা বা কিছু পাওয়ার অপেক্ষায় রয়ে গেছেন। ছোট ছোট পায়ে আর শরীরে শক্তি নাই আমার। কয়েকটা রাস্তা ঘুরে আমরা বাসায় আসার শেষ রাস্তায় পৌঁছেছি। এর মধ্যে আকাশের রঙ পরিবর্তন হয়ে কখন প্রখর রোদ ঢেকে দিয়েছে, নীল আকাশ ঘন মেঘে কালো হয়ে নানা রকম ফনা তুলে ছুঠে আসছে খেয়াল করিনি।
সুইপার কলোনি পেরিয়ে আর কয়েকটি বাড়ি পেরুলেই আমাদের বাড়ি। ঐ তো দেখা যায় বটগাছটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পেছনে দোতলা কাঠের বাড়ি। এক একটা বাড়ি মানে তো এখনকার মতন বাক্সর ভিতরে অনেক মানুষের বাস ছিল না তখন। এক বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুপা পেরুলেই অন্য বাড়িতে যাওয়া যায় এখন।
সে সময় শহরের এক একটা বাড়ি অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো ছিটানো। উঠান পুকুর চারপাশে তার মাঝে কাছরী রান্নাঘর থাকার ঘর চারপাশ ঘিরে। চারটা বাড়ি পুরো এটা রাস্তা জুড়ে। এই বাড়িগুলো পেরুলেই আমাদের বাড়ি।
আমার ছোট পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছাতে অনেকটা সময় লাগে রাস্তা শেষ হতে চায় না। তেপান্তরের মাঠ পেরুচ্ছি যেন। গলা শুখিয়ে যাচ্ছে। বুক ধরফর করছে। তবু চোখে দেখতে পাচ্ছি বাড়ি, তাকে ধরে ফেলব সে আসায় চলছি। সুইপার কলোনি পার হওয়ার পরই উত্তর পাশে বিশাল খেলার মাঠ। খোলা ধূধূ প্রান্তর। হাওয়া ভেসে আসে নদীর পার থেকে পাহাড়ের কোল থেকে। সেই ধূধূ প্রান্তর থেকে ঈষান কোনের প্রবল হাওয়া উড়ে এলো হঠাৎ দমকা হাওয়া। বৈশাখের ঝড় তাণ্ডব। ঈষানকোনে ঝড় উঠেছে আর আমি উড়ে যাচ্ছি বাতাসের সাথে। সুইপার কলোনির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতেই বাতাস আমাকে উড়াতে লাগল। রাস্তার উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে চলে যাচ্ছি বাতাসের ঠেলায়, কিছুতেই পুব মুখো হাঁটতে পারছি না। দক্ষিণে রাস্তার পাশে ডোবা। আমি সেই ডোবার জলে হাবুডুবু খাব এই ভয়ে নিজেকে প্রাণ পণে রাস্তার সাথে সেটে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি । কিন্তু কিছু তো ধরার নেই। ফাঁকা ধূধূ রাস্তায়। আর একটু হলে আমি উড়েই যেতাম হয়ত। হঠাৎ অনুভব করলাম কেউ একজন পিছন থেকে আমার বাম হাতটা ধরলেন। বাতাস আমাকে উড়িয়ে নিতে চাচ্ছে পূবে বা দক্ষিণে আর উনি আমাকে ধরে রেখেছেন। এবং আমি বাতাসের সাথে উড়ে গেলাম না। আমাদের পাড়াতুতো চাচা। আমার বান্ধবীর বাবা উনাকে চারপাশে কোথাও দেখিনি আগে উনি যেন দেবদুতের মতন আমাকে ধরার জন্য ওখানে হাজির হলেন। বাড়ি পর্যন্ত হাত ধরে এনে আমাকে পৌঁছে দিলেন বাতাসের সাথে টানাটানি করে।
সেই উড়ে যাওয়ার অনুভবটা এখনও আমি টের পাই যেন । কিছুতেই আমি মাটির সাথে পা সেটে রাখতে পারছি না। বিদেশে অনেক সময় তেমন প্রবল বাতাসের পাল্লায় পরেছি। এখানে প্রায় সময় অমন তুমুল উড়িয়ে নেয়া বাতাস বয় ঝড় হওয়া ছাড়াও।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ১:৫৩
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৫

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছ- সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×