somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রোকসানা লেইস
স্রোতের অজানা টানে সমুদ্র বালিয়াড়ি বেয়ে বোহেমিয়ান- গৃহকোন, জীবন যাপন ফেলে চলে যায়। তুমি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাও জোছনা গলে হারিয়ে যায় সুখ । আছড়ে পরা ঘূর্ণিজল মনে বাজায় অচেনা সবুজ দিগন্ত ..

বঙ্গোপসাগরের তীরে

০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেখতে দেখতে এক মাস চলে গেল আবার পূর্ণিমা এসে চলে গেলো। লেখাটা শুরুই করা হচ্ছে না। আজলিখবই সব কাজ পরে থাক প্রতিশ্রুতি নিয়ে বসলাম নিজের কাছে। এবার দেশে যাওয়ার পর, পরিবারের সবাই মিলে বেড়াতে যাবো দেশের বাইরে, এমন ইচ্ছা ছিল খুব। দেশের মানুষের বিদেশে যাওয়ার জন্য ভিসা পাওয়া এখন বেশ সমস্যা। আগে যেসব দেশের ভিসা সহজে পাওয়া যেত, যাওয়া যেত কম খরচে ঘুরতে যাওয়া যেত পাশে কয়েকটা দেশে। এখন সেসব দেশের ভিসা পাওয়া দুঃসাধ্য। ভিসা ছাড়া দেশ গুলিতে যাওয়ার জন্য আবার সময়টা এখন ভালো না।
তাই বিদেশে না দিয়ে গিয়ে দেশের মধ্যে কোথাও বেড়াতে যাব ভাবছিলাম। কেউ বলছিল, রিসোর্টে গিয়ে দুই একদিন কাটাতে। কেউ বলছিল বোট হাউসে বেড়ানোর কথা। কেউ বলছিল আশেপাশে, নানা অপশন আলোচনায় ছিল। রিসোর্টে গিয়ে সময় কাটানোটা আমার কাছে খুব একটা আগ্রহের বিষয় না। যদি যাওয়া যেত সুন্দরবনের গভীরে। বা বান্দরবনের অরণ্যে তাহলে কিছুটা আনন্দ পেতাম প্রকৃতির মধ্যে। কিন্তু সে সব জায়গায় যাওয়া এই আষাঢের ভরা মৌসুমে বন্ধ। আর সেন্টমার্টিন দ্বীপ তাও এখন সংরক্ষিত, জনগনের কাছ থেকে।
বাংলাদেশে যে কোন জায়গায় যাওয়া যা দেখা যায় তার চেয়ে বেশি খরচ এখন। অকারণ মানুষের থেকে বেশি টাকা নিয়ে বানিজ্য করা, ব্যবসায়ীরা খুব ভালো বুঝে গেছে। সাথে এক শ্রেণীর মানুষের হাতে প্রচুর টাকা এখন। তাদের কাছে সাজানো গোছানো রিসোর্টের আনন্দ মানে অনেক কিছু পাওয়া।
তবু কোথাও যেতেই যদি হয়, আমি বললাম তাহলে চলো সমুদ্র পাড়ে যাই। সেই নব্বই সনের মাঝামাঝি শেষ গিয়েছিলাম এরপর আর যাওয়া হয়নি কক্সবাজার। সেবার যেতে চেয়েছিলাম সেন্টমার্টিন দ্বীপে। কিন্তু টেকনাফে থাকার ব্যবস্থা না থাকায় কক্সবাজার থেকে বাসে করে যেতে হয়ে ছিল টেকনাফ। রাস্তা এবং বাসের অবস্থা ছিল তথৈবচ। যার জন্য সময় লেগেছিল অনেক। তারপরও বারোটার আগে পৌঁছালেও স্থানীয়রা জানাল এখন আর দরিয়ায় যাওয়া যাবে না। ফিরার পথ কঠিন হবে। যাওয়ার একটাই ব্যবস্থা শাম্পানে করে যেতে হবে। নীল দরিয়ায় একটাও শাম্পান ভাসতে দেখলাম না। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুই অন্তহীন নীল দিগন্তে মিশে ছিল।
সাথে আবার বাচ্চা ছিল সে সময়। বুঝতে পারছিলাম না এত সুন্দর একটা ঝকঝকে দিনে দুপুর হওয়ার পর কেন সাগরে যাওয়া নিষেধ। তবে স্থানীয়রা অভিজ্ঞ তাদের কথা শুনতে হলো। দুপুর থেকে টেকনাফের নীল সাগর ভালোলাগায় মুগ্ধ করে ছিল বিকাল পর্যন্ত। শেষ বাসে চড়ে ফিরেছিলাম কক্সবাজার। এত নীল তখন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে যা চট্টগ্রামে দেখিনি, কক্সবাজারেও না। পৃথিবীর আর কোন দেশের নীল সৈকত তখনও দেখা হয়নি। এখনও সেই নীলের মায়া চোখে লেগে আছে যেন। সেই সময় টেকনাফ ছিল জনবিরল সমুদ্র সৈকত। পরিবেশ দূষণ বলে কিছু ছিল না। কক্সবাজার থেকে পথটা ছিল অসম্ভব সুন্দর সবুজের গালীচা বিছানো আঁকাবাঁকা রাস্তার দুইপাশে পহোড় আর সমুদ্রের মায়ায় বাঁধা। যত সবুজ পথ ছিল তত গভীর নীল ছিল সমুদ্রের জল।
থেকে যেতে চাইলাম, পরদিন সকালে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাওয়ার জন্য কিন্তু থাকার কোন জায়গা ছিল না। এমন কি খাওয়ার হোটেল ছিল মাত্র দুটো। যেখানে কেবল মাঝি মল্লারা এবং ব্যবসায়ীরাই খাওয়া দাওয়া করে। প্রচণ্ড ঝাল দেয়া সাগরের মাছ ছাড়া আর কোন কিছু ছিল না খাওয়ার জন্য। জীবনে প্রথম তাজা কোরাল মাঝের তরকারী খেয়ে ছিলাম মনে আছে।
অনেক বড় বড় ঝিনুকও পেয়েছিলাম সৈকত ভর্তি টেকনাফে। কক্সবাজারে তখন ঝিনুক কুড়িয়ে নিত খুব ভোরে ব্যবসায়ীরা। পর্যটকের জন্য তেমন কিছু থাকত না, কুড়ানোর জন্য ঝিনুক। ঝিনুকের তৈরি নানা রকম গহনা,শো পিস বিক্রি করত অনেকে সাগরপাড়ে। সে সব কিনে সাধ মিটাতে হতো।

আট দশজন মিলে যাওয়ার প্রোগ্রাম কমতে কমতে শেষে দুজন রইলাম, আমরা দুজন যাবই ঠিক করলাম আমরা দুই বোন। চলে যাবো টেকনাফে প্রথমে পরে আসব কক্সবাজার। এখন নিশ্চয়ই থাকার জায়গা কিছু হয়েছেে টেকনাফে। কিন্তু জানলাম এখনও টেকনাফে তেমন কিছু নেই, একটি গেস্ট হাউস আছে শুধু।
প্লেনের টিকিট কাটতে গিয়ে আবার পিছিয়ে গেলাম বাংলাদেশের সব কিছুর দাম খুব বেড়ে গেছে, প্লেনের টিকিটের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ভাবলাম ট্রেনে গেলে মন্দ হয় না তাছাড়া টিকেট সস্তা। কিন্তু দেখা গেল সময়ের হিসাবে ট্রেনের টিকেট পাওয়া যাবে না। ট্রেনের টিকেট করতে হয় দশ পনের দিন আগে। বোন বললো চলো রাতের স্লিপিং বাসে করে চলে যাই। রাত বারোটায় রওনা হলে সারারাত বাসে ঘুমিয়ে সকালবেলা পৌঁছে যাব কক্সবাজার। বাসের টিকেট যে কোন সময় পাওয়া যায়। দশ ঘন্টা লাগবে পৌঁছাতে। এর মধ্যেই আগের দিন আমরা ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়ালাম সারাদিন, নানা কাজে এবং আনন্দে। পরদিন রাতে কক্সবাজার রওনা হবো বাসে করে তিন দিন সময় আছে আমি ফিরে যাওয়ার আগে। আগের দিন সন্ধ্যাবেলা চলে আসবো।
সারাদিন ঘোরাফেরা করে বাসায় ফেরার পর বোন বলল ওর চোখে অসম্ভব ব্যথা। ব্যাস প্রোগ্রাম বাতিল করে দিলাম। কয়েকদিন ধরে খুব বেশি ঘোরাফেরা হচ্ছে, রাত জাগা হচ্ছে। চোখের বিশ্রাম দরকার কোথাও না গিয়ে ঘরে বসে গল্প করে কাটানো যাক। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও চোখের আরাম হবে।
সাড়ে বারোটায় ছেলে বলল, মা চলো তোমার জন্মদিন উপলক্ষে কক্সবাজার যাই। খুবই অবাক হলাম। ওর সাথে বলা হয় নাই আমাদের পরিকল্পনা। ওরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত ওদের সাথে আমাদের ভাবনা বলিনি কিন্তু নিজে থেকেই আমার জন্য কক্সবাজার যাওয়ার প্রোগ্রাম করেছে, বিষয়টা ভালো লাগলো। কিন্তু ওরা একদিন পরে যেতে চাচ্ছে আর ফিরবে যেদিন আমার ফিরে আসার কথা সেদিন। আমার যেদিন প্লেন সেদিন ফিরলে একটু বেশি রিস্কি হয়ে যায়। কিছুক্ষণ কথা বলে তাই আবার না করে দিলাম। যোগ করলো পূর্ণিমার আলো দেখা যাবে সাগরে সময়টা ভালো। ছেলে আবার এত কিছু ভাবে। মা পূর্ণিমা দেখবে সাগর জলে। চাঁদের আলোর মতনই আলোময় হলো আলোচনা।

ঢাকায় কয়েকদিন রাতের বেলা, কখনো দিনেও মাঝেমধ্যে বেশ বৃষ্টি হচ্ছিল। এটা স্বাভাবিক বর্ষাকালে বৃষ্টি তো হবেই। রোদ থাকলে ভালোই লাগে ঘোরাফেরা করতে।
খানিক পরে ছেলে আবার বলল ভেবে দেখো চল যাই। তোমার জন্যই এখন যেতে চাচ্ছি আমরা নাহলে আরো পরে যেতাম।
অবশেষে ঠিক করলাম যাওয়াই ভালো এমনিতে একটা অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলাম ঢাকায়, সেটা না হওয়ায় মন খারাপ। একটা কিছু করতে পারলে ভালোই লাগবে।
তবে আমরা আগের দিন চলে যাব। আর ওদের আগেই দুপুরের মধ্যে আমি ফিরে আসব। রাতে আমার লম্বা ফ্লাইট শুরু হবে।
মাঝ রাতে আবার নতুন করে টিকেট দেখা শুরু হলো। ট্রেন, বাস ফিরার প্লেনের টিকেট। সময় পার হচ্ছে শেষে সিদ্ধান্ত হলো প্লেনেই যাওয়া, আসা হোক। সময় বাঁচবে। টাকা নাহয় কিছু বেশিই খরচ হবে।
অবশেষে পরদিন দুপুরে আমরা তিনজন রওনা হওয়ার টিকেট কেটে ফেললাম। ফিরে আসব আবার দুপুরের মধ্যেই। আরেক দিন বেশি না থাকলে বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানো হবেই না।
সকালে উঠে সব ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। ফিরে এসে শুধু বিশ্রাম করব সারা দুপুর আবার প্লেনে উঠার আগ পর্যন্ত।

দুপুরে ঝকঝকে রোদের আকাশে আমাদের প্লেন উড়াল দিল ঢাকা থেকে। এক ঘন্টা পার হলে পৌঁছে যাবো কক্সবাজার। প্লেন নামার মিনিট দশ আগে দেখলাম আকাশ বেশ মেঘলা। মেঘের উপর দিয়ে বিমান চললে বোঝা যায় না, নিচের আবহাওয়া। এক সময় ক্যাপ্টেন ঘোষনা দিলেন আর কিছু সময়ের মধ্যেই আমরা নামছি বিমানবন্দরে। আমরা ঘন মেঘের স্তর পেরিয়ে মাটির কাছাকাছি চলে এসেছি। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। আর জল জমে আছে অনেক ল্যান্ডিংয়ের জায়গা জুড়ে। মাটির একদম কাছে এসেও হুস করে উপরে উঠে গেল বিমান আবার।
বুঝতে পারছি অবতরণ করা যায়নি। কিন্তু ককপিট একদম চুপচাপ। কোন কথা আসছে না। মিনিট পাঁচ পরে ক্যাপ্টনে কথা বললেন। আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন অবতরণ করাটা কঠিন ছিল তাই আমরা আবার উপরে উঠে এসেছি।
আমরা কিছুটা সময় আবার ভেসে বেড়াবো, বৃষ্টি কমে যাবে এবং ভালোভাবে অবতরণ করতে পারবো আশা করছি অল্প সময় পরে। নিচে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, ঘন মেঘের আস্তরণ ছাড়া। উপরে ঝকঝকে রোদের আলো অদ্ভুত বৈষম্য। অনেকটা সময় উড়ার পরে ক্যাপ্টেন আবার নামতে শুরু করলেন। এবার ভালোভাবেই অবতরণ করতে পারলেন । বৃষ্টি হচ্ছিল ল্যান্ডিং এরিয়াতে বেশ ভালো বৃষ্টির পানি জমা ছিল। আগে যেখানে অবতরণ করতে যাচ্ছল বিমান,সেখানে এক ফুটের মতো পানি হবে। যা হোক শেষমেষ ভালো ভাবেই ল্যান্ডিং হলো আরো বিশ মিনিট আকাশে চক্কর দেয়ার পর। আবহাওয়ার কারণে বিমান অনেকটা বেশি সময় বিমানে উড়াল যাত্রীদের।

লাইন ধরে বিমান কর্মীরা ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ছাতা নিয়ে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে আমাদের বিমানবন্দরের ঘরের ভিতরে ঢুকতে হলো। কক্সবাজার বিমানবন্দর মনে হল ষাটের দশকের বিমান চড়ার বিমানবন্দর। অনেকটা সময় অপেক্ষা করার পরে লাগেজ আসলো। বৃষ্টির মধ্যে বিল্ডিংয়ের বাইরে থেকে আমাদের লাগেজ সংগ্রহ করতে হলো। তারপর বৃষ্টির ভিতর দিয়ে হেঁটে, শহরে যাওয়ার গাড়ি খোঁজার জন্য ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে যেতে হলো। বৃষ্টি হালকাভাবে পড়ছিল। টেকনাফ যাওয়ার জন্য সিএনজি এবং ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদেরকে টেকনাফে একটি হোটেল ঠিক করে দিবে এই ব্যবস্থায় আমাদের পছন্দের দামে, গাড়ি ঠিক করতে বেশ অনেকটা সময় কেটে গেলো।
আমাদের ঘিরে বেশ একটা ভিড় জমে উঠেছে। দামাদামি করে অনেকটা সময় কেটে গেল। ট্যাক্সিওয়ালা অনেক দাম চাইলেও আমাদেরকে নানা রকম সুবিধা দেওয়ার অনেক রকম প্রতিশ্রুতি দিল। একজন এসে এই বৃষ্টির ভিতরে আজ যেন টেকনাফ না যেয়ে কক্সবাজার থেকে যাই এবং তিনি আমাদেরকে ভালো একটি হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত করে দিবেন এমন অনেক সুন্দর কথা দিয়ে আমাদেরকে আকৃষ্ট করছিলেন। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা করা ছিল তাই তিনি আমাদের টলাতে পারলেন না।
আমরা শেষমেষ একটা সিএনজিতে রওনা দিলাম। ড্রাইভারকে বললাম আমাদের সমস্যা হবে কিনা পথে কোন। ড্রাইভার সাহেব জানালেন যদি কিছু হয়, বিপদ আসে আগে আমার জান যাবে তারপর আপনাদের কাছে কেউ পৌঁছাতে পারবে। ড্রাইভারকে বললাম থাক মৃত্যুর কথা বলতে হবে না। ঘুরতে এসেছি সুন্দর মতনই যেন ঘুরে চলে যেতে পারি সেটাই জরুরী। কোন সমস্যা চাই না। আপনি ভালো একটা হোটেলে আমাদেরকে পৌঁছে দেন।
ক্রমাগত বৃষ্টি হচ্ছিল। সেদিন দুপুর থেকেই নাকি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কক্সবাজারের রাস্তা পানির নিচে। পানির ওপর দিয়ে চলছে সিএনজি। ট্যাক্সিয়োলার কথা মনে পরল। সে বলেছিল বৃষ্টি হচ্ছে, আপনারা ভিজে যাবেন। নোহা গাড়িতে করে আরামে এয়ারকন্ডিশনে বসে যাবেন কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু উনার চাওয়া ভাড়া ভীষণ বেশি ছিল। আর নোহা গাড়িতে বসে আনন্দে সুরক্ষিতভাবে যাত্রার চেয়ে, সিএনজিতে কিছুটা ভিজে ভিজে প্রকৃতি উপভোগ করে যাওয়ার মধ্যে যেন বেশি মজা ছিল। সিএনজি ড্রাইভার বড় রাস্তার পানি এবং ভিড় এড়িয়ে ছোট রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে টেকনাফ যাওয়ার রাস্তা ধরলেন। শহরের ভিতর বারবারই মনে হচ্ছিল নোংরা পানির ছিটা গায়ে লাগলে অথবা সিএনজি উল্টে গেলে রাস্তার জমা নোংরা পানিতে গড়াগড়ি খেলে কেমন লাগবে। খুব দ্রুতই সে অবস্থা থেকে যত্ন করে ড্রাইভার সাহেব আমাদেরকে হাই ওয়ের উপরে তুলে আনলেন। নোংরা পানিতে গড়াগড়ি খাওয়ার ভয়টা চলে গেলো।
হাইওয়ে খুব একটা ব্যস্ত ছিলনা সেদিন বিকালে। মাঝে মধ্যে দু চারটা গাড়ির সাথে দেখা হচ্ছিল। তুমুল বৃষ্টিতে ভেজা মেঘলা বিকেল, খোলা সিএনজিতে বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজে দীর্ঘ আটাত্তর কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া হয়তো বিপদসংকুল। কিন্তু পথ চলাটা রোমাঞ্চকর লাগছিল, মন্দ লাগছিল না অন্য রকম ভাবে যেতে। আজকাল গাড়িতে চড়ে সহজ এবং সুবিধা ভোগ করে তো সব সময়ই চলা হয়। অন্যরকম খোলা সিএসজিতে হালকা বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজে, গল্পে, হাসিতে, পুরানো স্মৃতিচারণে, খুবই আনন্দের সাথে আমাদের যাত্রা উপভোগ করছিলাম।
মজার বিষয় ছিল আমরা যে কথাই বলি, ড্রাইভার সাহেবের কান খাড়া ছিল। আমাদের সব কথার সাথেই তিনি কখন, কোথায় কি হয়েছে, কোনটা, কোন জায়গা, বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছিলেন। একটা বিষয় মনে হলো কক্সবাজারের মানুষ বেশ সহজ সরল। বিমানবন্দরে যাদের সাথে আমাদের কথা হয়েছিল সরল ছিল মানুষগুলো, ধূর্ত ছিল না। ঢাকায় যেমন ড্রাইভার কর্কশ ব্যাবহার এবং ভাষা ব্যবহার করে অনেক সময় দরদাম করার পরও বেশি টাকা দিতে হয় তাদের দাবীর কাছে। এদের ব্যবহার নমনীয় এবং সহনীয় ছিল। আন্তরিকও ছিল। তিনজন নারী একা ঘুরতে বেড়িয়েছে সেজন্য কোনরকম অপশব্দ বা ব্যবহার পাইনি। বরং আন্তরিকতা ছিল যেন আমাদের এই বৃষ্টিমুখর বিকালে সাহায্য করার। আমরাই এক মাত্র যাত্রী ছিলাম যাদের অনেকে মিলে সাহায্য করার চেষ্টা করছিল। চারপাশ ঘিরে অনেক মানুষের ভিড় থাকলেও অস্বস্তিকর কিছু মনে হয়নি।

মেঘলা বিকালে আলো খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। আমরা তখন বোধহয় টেকনাফের দিকে, অর্ধেক পথ পেরিয়েছি। দিনের আলো সম্পূর্ণ অন্ধকার হওয়ার আগে একটি হোটেলে আস্তানা নিয়ে নিতে চাইলাম আজকের রাতের মত। ড্রাইভারও জানাল টেকনাফে ভালো হোটেল পাব না আমাদের থাকার মতন। আমাদের দেখেই তিনি আন্দাজ করে নিয়ে ছিলেন আমরা কেমন হোটেলে থাকতে পারব। বিষয়টা বেশ ভালো।
পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার পার হওয়ার পর ইনানী বীচ পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। দিনের আলোও নিভে এসেছে আমরা ঠিক করলাম এখানেই হোটেল খুঁজে নেই। টেকনাফে আজ আর যাওয়া ঠিক হবে না। ড্রাইভার নিজে উৎসাহি হয়ে আমাদের কয়েকটা হোটেলে নিয়ে গেলো। আমরা নিজে অনলাইনে সার্চ করে কিছু হোটেল দেখতে গেলাম।
কিছু হোটেলের ভাবসাব বেশী মনে হলো তাদের সুবিধার চেয়ে। আর দাম সে তো সীমাহীন। আবার কিছু হোটেল দামের দিক দিয়ে সহনীয় কিন্তু তাদের পরিবেশ একদমই পছন্দের মধ্যে নেই। বোন আর বোনের মেয়ে কয়েকবার এসেছে তাদের অভিজ্ঞতায় আমি চুপচাপ এখানে ওখানে নেমে হোটেল দেখছিলাম। কিন্তু কিছুই পছন্দ হচ্ছিল না। একটা হোটেল পাওয়া গেলো মন মত কিন্তু সমুদ্র দেখা যায় বা সাগরপাড়ে চট করে যাওয়া যায় তেমন কোন ব্যবস্থা তাদের নেই।
সমুদ্রমুখী যে রুমটা তাদের আছে তার দাম বিশ হাজার এক রাতের জন্য। আবার তৃতীয় ব্যাক্তির জন্য দিতে হবে অর্ধেক অর্থাৎ প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা।
বিদেশের ভালো মানের বড় বড় হোটেল গুলোতেও এমন খরচ করে থাকিনি।
এমন সময় আমি অনলাইনে সার্চ দিলাম নতুন একটা হোটেল দেখাল আমরা যেখানে ছিলাম তার কাছেই। কিন্তু কেউ তেমন আগ্রহ দেখাল না ঐ হোটেলে যাওয়ার। ওই জায়গায় রাস্তাটা ছিল ভয়ঙ্কর ভাবে ভাঙ্গা কাজ চলছে রাস্তা ঠিক করার। পাশ দিয়ে নেমে যেতে হচ্ছে তুমুল ঝাঁকুনির মাঝে চলছি আমরা পাশেই দামী একটা হোটেল দেখতে। সেখানে গিয়ে কোন রুম পাওয়া গেলো না। অতপর আবার ভাঙ্গা রাস্তা দিয়ে ফিরে আসলাম আমার পাওয়া হোটেল দেখতে।
ওদের হোটেলটা খুব বড় নয় কিন্তু একদম শেষ প্রান্তে কিছুটা অন্ধকার রাস্তার উপর। সাগর খুব কাছেই। আর যে রুমটা আছে সেখানে শুয়ে থেকেই সাগর দেখা যায়। সাগরের গর্জন শোনা যায়। ঘরের মাঝেই বাতাসও পাওয়া যায়। বাড়তি পাওয়া নাগরিক আলোর ঝলকানি নেই।
একদম নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ। বেশি হাইফাই নয় কিন্তু রুমের ভিতর সব সুবিধা বাথরুমসহ বেশ ভালো। বারান্দাও আছে ঘরের সাথে। অন্য পাশে পাহাড় আর গাছের অরণ্য। বেশ ভালোলাগল রুম দেখে। দামটাও পছন্দ হলো। তার উপর আরো কিছু কমিয়েও দিল আমাদের চাওয়ার কাছে। কাঠের বাড়িটা বেশ অন্য রকম একটা আবহো ধরে রেখেছে। বেশ মজার ফ্রেশ জুস দিয়ে আমাদের বরণ করল।
রুমে জিনিসপত্র রেখে হাত মুখ ধুয়ে, আমরা রাতের খাবার খাওয়ার জন্য পাশেই পালঙ্কি নামের একটা খাবার রেস্টুরেন্টে গেলাম। কথা ছিল আমাদের সিএসজিওয়ালা আমাদের রাতের খাবার খাইয়ে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে চলে যাবে। যেহেতু টেকনাফ পর্যন্ত যাওয়া লাগল না। কিন্তু আমরা হোটেলে পৌঁছাতেই সে কক্সবাজার যাওয়ার যাত্রী পেয়ে গেলো। আর তাকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করতে লাগল।
যাহোক তাকে চলে যেতে দিলাম। স্থানীয় সিএনজি আমাদের খাবার রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলো এবং নিয়ে আসল।
পালঙ্কি রেস্টুরেন্টের খাবার নিয়ে বিশাল বড় লেখা যায়। প্রতিটি খাবার এত অথেন্টিক স্বাদের এমন রেস্টুরেন্টে অনেকদিন খাওয়া হয়নি। খাওয়ার শুধু নয় তাদের পরিবেশটাও আদর্শ দেশীয়। সমুদ্রের খোলা হাওয়ায় খোলামেলা কাঠের ঘর। মেহগীনি কাঠের ভাড়ি চেয়ার দেশী কাজের ডিজাইন করা কুশান। ভাড়ি টেবিল। দেয়ালে নানা রকম দেশীয় সাজ সজ্জা। আর সব চেয়ে বিনোদন মনে হলে থালা, বাটি পরিবেশনের যাবতীয় বাসন চামুচ সব কিছু সুন্দর ডিজাইনের কাসার। খুব সাধারন অবস্থার একটা দোকানে অসাধারন দেশীয় ঐতিহ্যবাহী মেহগুনী কাঠের আসবাব, কাসার থালা বাটি সত্যি আভিজাত্যের দারুণ পরিবেশনা।
তাদের মেনুটা ছিল সত্যি দেখার মতন। ওটা পড়তে যেমন মজা পাচ্ছিলাম তেমন ভালো লাগছিল তাদের উপস্থাপনার নতুনত্ব দেখে। মেনুতে শুধু খাবারের নাম লেখা ছিল না প্রতিটি খাবারের মজার বিবরন দেয়া ছিল তাদের নাম করণে।
পালঙ্কিতে গিয়ে জানলাম ঐ এলাকর নাম ছিল পালঙ্কি এক সময়। অনেক পালকিতে করে রাজা এসে থেমেছিলেন ঐ এলাকায়। সেই থেকে ঐ নামকরণ হয়েছিল।
আমারা সবাই ছিলাম ক্ষুদার্থ আর দেশীয় নানা খাবার দেখে বুভুক্ষের মতনই অর্ডার করছিলাম নানা রকমের পদ। অনেক রকমের ভর্তা ভাজি থেকে নানা রকমের মাছের তরকারি। আর পাহাড়ি মোরগের ভুনা তরকারি। অনেক কিছু আমাদের টেবিলে আসল। ঝরঝরে মজাদার ভাতের সাথে প্রতিটি খাবার তার বিশেষ বৈশিষ্ট নিয়ে উপস্থিত। যেখানে বলা হয়েছে ঘিয়ের কথা সেখানে যেমন ঘিয়ের ঘ্রাণে ভরপুর। যেখানে থাকবে কাঁচা লঙ্কা সেখানে ঠিক পাওয়া যাচ্ছে তার ঘ্রাণ এবং ঝাল। সরিষা বাটা আলাদা ভাবে জানান দিচ্ছিল আমি আছি। আর নারিকেল মালাইকারীতে নারিকেলের দুধের ঘ্রাণ ঠিক ততটাই উপস্থিত ছিল যতটা থাকা দরকার।
শুটকি তার সঠিক স্বাদ নিয়ে মুখের ভিতর যেমন আনন্দ দিচ্ছিল রূপচাঁদা ভাজা মাছের মুচমুচে ভাবও ঠিকঠাক পরিমিত ভাবে জিভের মাঝে মজা ছড়াচ্ছিল। যতটুকু খাওয়ার কথা নয় আমরা এক একজন তার দ্বিগুন মনে হয় খেয়ে ফেললাম ভালোবাসতে বাসতে।
খেয়ে তৃপ্তি পাওয়া খুব সহজে হয়না আজকাল। অনেকদিন পর পালঙ্কি সেই ভালোলাগার অনুভুতিটা দিয়েছিল। আমরা যখন গিয়েছিলাম। তখন সাড়ে আটটার বেশি বেজে গিয়েছিল। রাতের ভিড়টা কমে গিয়ে ছিল। ফাঁকা ফাঁকা পরিবেশে চারপাশটা আমরা বেশ উপভোগ করতে পেরেছিলাম।
খাওয়ার পরিমানের তুলনায় দাম সহনশীলতার মধ্যে ছিল। বলা যায় খুবই কম ছিল।
খাওয়ার পরে সামনে সমুদ্র পাড়ে হাঁটাহাঁটি করে ফিরে এলাম আমাদের রাতের ডেরায় কাঠের বাড়িতে, যার সামনে সমুদ্র খেলছে।
অন্ধকার ঘর চাঁদের আলোয় আলোকিত ছিল। আর ছিল সমুদ্রের জলের কলতান। সাগরের নোনা বাতাস আমাদের ঘুম পাড়িয়ে দিল আদর করে চাঁদের আলোর আল্পনা আঁকা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে দিয়ে।


সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৩৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মানবতা, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে জাতীয় কবি নজরুলের চিরন্তন আহ্বান

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:০৪

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগীতজ্ঞ, দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক। তাঁকে শুধু “বিদ্রোহী কবি” বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না;... ...বাকিটুকু পড়ুন

Humans are (not) from Earth- তবে কি আমরা মহাবিশ্বের ভৃত্য?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৫

Humans are not from Earth: A Scientific Evaluation of the Evidence বইটির লেখক ডক্টর এলিস সিলভার (Dr. Ellis Silver)-এর ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবন নিয়ে মূলধারার তথ্যমাধ্যমে এক ধরনের রহস্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ২

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:০১


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।

একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/30393976|প্রথম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:০৩



আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

২০১০, এক-এগারোর পর থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত- যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, যারা গুম, নির্যাতন, কারাবাস, মামলা, চাকরি হারানো, পরিবার ভেঙে যাওয়া- সবকিছুর মূল্য দিয়েছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৭


আজ দেশজুড়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ২৪ -এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভ্ন্নি সময়ে বহু নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরেছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ছাড়াও নাম জানা-অজানা হাজারো ব্যাক্তি তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×