আমাদের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই এই ধারণা যে পানি একটি ইসলাম ধর্মের সঙ্গে যুক্ত শব্দ এবং জল একটি হিন্দু শব্দ।
আমি কিছু বন্ধুর কাছে শুনেছি যে "পানিকে জল বলিলে সে হিন্দু হইয়া যায়"। কয়েকদিন আগে আমি যে শব্দ মুসলমানদের ব্যবহার করা উচিত নয় শীর্ষক প্রবন্ধ পরছিলাম যেখানে লেখক লিখেছেন-
"জলঃ “পানি” শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা “জল” শব্দটি ব্যবহার করে থাকি যা । যেমনঃ অশ্রু জল, জল দাগী ইট, জিভে জল আসে ইত্যাদি কিন্তু এই শব্দটি হিন্দুদের জন্য খাছ শব্দ। তাই এই শব্দটি পরিহার করে “পানি” শব্দটি ব্যবহার করা উচিত। যেমনঃ চোখের পানি, পানি দাগী ইট, জিভে পানি আসে ইত্যাদি।"
এবার আমি বলি কি পানি এবং জল এই শব্দদুটি মোটেও কোনো দুটি পৃথক ধর্মাবলম্বীদের চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। এরা দুটি সমার্থক শব্দ ছাড়া আর কিছুই না যা স্থানবিশেষে বিভিন্ন মানুষ নিজেদের সুবিধামত ব্যবহার করে। যেমন কেউ বলে 'মুড়ি' আবার কেউ বলে 'হুড়ুম', কেউ বলে 'বিড়াল' আবার কেউ বলে 'মেকি', কেউ বলে 'মরিচ' তো কেউ বলে 'লঙ্কা'। সুতরাং এই শব্দগুলির উপর ধর্মসংকীর্ণতার আরোপ না থাকলে কেন জল ও পানির উপর ধর্মের তকমা লাগানো হলো?
এবার আমি যদি 'পানি' শব্দটির উৎপত্তি বর্ণনা ব্যখ্যা করি তাহলে দেখা যাবে উল্টে পানি শব্দটি পুরোমাত্রায় একটি প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু শব্দ। 'পান' একটি সংস্কৃত শব্দ এবং যা পান করা হয় তাকে 'পানীয়' বলে এবং এই 'পানীয়' শব্দটি পরবর্তীকালে বিবর্তিত হলে 'পানি' শব্দটির জন্ম হয়েছে।
এছাড়া আমাদের অনেকের ধারণা যে 'পানি' একটি ঊর্দু শব্দ কিন্তু ঊর্দু ভাষার বেশিরভাগ শব্দ আসলে হিন্দী এবং হিন্দী ভাষা সেই সংস্কৃত ভাষা থেকে আমদানি হয়েছে।
সেখানে জল একটি নিতান্তই বাংলার নিজস্ব শব্দ। সুতরাং জল যেরকম বাংলা শব্দ পানিও সেরকম বাংলা শব্দ (তৎসম) এবং এদের নিয়ে ধর্মীয় বিবাদ করা উচিত নয়। তাছাড়া হিন্দুরা যেমন পানিফলকে পানিফল বলে সেরকম মুসলমানরা জলপাইকে জলপাই বলে, কেউ জলফল বা পানিপাই বলে না।
আর এইভাবে যদি আমরা ভাষার মধ্যে হিন্দু শব্দ আর মুসলিম শব্দ বলে আলাদা করি তাহলে মুসলিমদের বাংলা ভাষায় কথা বলাই দায় হয়ে দাড়াবে এবং মিথ্যা হয়ে যাবে সেই ২১শে ফেব্রুয়ারীর আন্দোলন, কারণ বাংলা ভাষার প্রায় ৮০ শতাংশ শব্দই সংস্কৃত।
সবশেষে বলি মুক্তিযুদ্ধের একটি ঘটনা -
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কয়েকজনে গিয়েছিলেন খেতে কলকাতার এক রেস্তোঁরাতে। পেটপুরে ভাত খাবার পরে বেয়ারাকে “পানি” দিতে বলাতে রেস্তোঁরার গোঁড়া মালিক সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জেরা করেছিলেন, “আপনারা কি মোহামেডান”?
জবাবে রসিক এক খেলোয়াড় বলেছিলেন, “কী যে বলেন দাদা, মোহামেডান হতে যাবো কেনো!! আমরা সবাই ভিক্টোরিয়ান”।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০১৬ সকাল ৮:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



