বিষয়টা অনেকেই ভুল করে আসলে। ঠিক যেমন একজন বৃটিশ বা ফরাসী বা রাশিয়ান কিংবা ইটালিয়ান বা জার্মান একজন ইউরোপীয়ানও বটে, আমরাও যেমন মুলত একজন এশিয়ান। ঠিক তেমনই আমরা আবার ভারতীয়ও বটে। কারণ বাংলা ভারতীয় উপমহাদেশেরই অন্তর্গত একটি দেশ। সেই হিসেবেই ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক কারণেই সকল বাঙালিই ভারতীয়। কিন্তু সেটা কোন পৃথক জাতিসত্ত্বা নয়। কারণ ভারত কোন দেশ নয়। ভারতীয় জাতি বলে কিছু হয় না। একটি দেশে একটি জাতি ও একটি ভাষা নিয়ে গড়ে ওঠে। সেই কারণেই আমরা বাঙালি। বাংলাই আমাদের দেশ। যা আজ খণ্ডিত। আমরা জাতিগত ভাবে ভারতীয় নই। কিন্তু ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক ভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশের অন্তর্গত একটি দেশ। কিন্তু তাই বলে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার বিসর্জন দিয়ে নিজেদের বাঙালি না ভেবে ভারতীয় ভাবি, এটাই এই পারের মানুষের সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ। এই অভিশাপ থেকে মুক্ত না হলে খণ্ডিত বাংলা অখণ্ড হবে না। একটি দেশের একটি সংস্কৃতি থাকে। তার আবার অনেক শাখা প্রশাখাও থাকে। দেশের মানুষের জাতিসত্ত্বা গড়ে ওঠে সেই ভিত্তিতে। কিন্তু বাঙালির মস্ত বড়ো দুর্ভাগ্য আমরা মনে করি আমাদের সংস্কৃতির আধার হলো আমাদের ধর্ম। তাই আমরা হিন্দু আর মুসলমান হয়েই রইলাম। বাঙালি হয়ে উঠতে পারলাম না আজও। হিন্দু মনে করে উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্তই তার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। আর মুসলমান মনে করে বিদেশী আরবী ইসলামই তার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এই যে এত বড়ো ফাঁকি, এই ফাঁকিতে কোন দেশ বড়ো হয়ে উঠতে পারে না কোনদিন। একটা বিদেশী ধর্মকে আমি ভালোবাসতে পারি। অনুসরণ করতেও পারি। ঠিক যেমন ইংরেজীতে কথা বলতে পারা। কিন্তু আমরা তো জানি ইংরেজি আমার মাতৃভাষা নয়। একটি বিজাতীয় ভাষা। অথচ আমরা যখন ইসলামের চর্চা করি, ভুলেও মনে করি না ইসলাম আরব দেশের ধর্ম! সেই দেশের সংস্কৃতিকে বহন করে। আমরা হাজার বছর ধরে সেই বিজাতীয় সংস্কৃতিকে বহন করছি নিজের মনে করে। এত বড়ো ফাঁকিই আমাদের উন্নতির অন্যতম প্রধান অন্তরায়। আমি আবারও বলছি। ধর্ম যার যার। কিন্তু সংস্কৃতি সবার। আমি কালকে ধর্মান্তরিত হতেই পারি। কিন্তু স্বদেশী সংস্কৃতি ত্যাগ ইচ্ছে থাকলেও করা সম্ভব নয়। আমরা হিন্দুরা তাই ভারতকে নিজের দেশ মনে করে নিজের বাঙালি সত্ত্বাকে দুইবেলা ঠকাই। আর আমরা মুসলিমরা ইসলামকে নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি মনে করে দুইবেলা নিজের বাঙালি সত্ত্বাকে ঠকাই। এই ভাবে ১০০% বাঙালি যেখানে নিজেকে ঠকাতেই ব্যস্ত, সেখানে বিদেশীরা আমাদের যে মানুষ বলে মানবে না, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবে সেটাই তো স্বাভাবিক। আর সেটাই আমাদের জাতি হিসেবে খণ্ডিত হয়ে পিছিয়ে যাওয়ার আসল কারণ। পিছিয়ে পড়া জাতিকে কেউই সম্মান দেবে না, কোনদিনও নয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



