somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিঃশব্দ দূরত্বে (৫)

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সন্ধ্যার সময় বড় বাড়ির খোলায় দুলাল গিয়ে উপস্থিত হয়।হারান জ্যাঠা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে হুঁকো ফুঁকছেন।তার ছেলে আশুতোষ পাশের চেয়ারে বসে আছে।জেলে পাড়ার কালু জেলে,পালপাড়ার বিরেনসহ আরও কয়েকজন গল্প করছিল।দুলালকে দেখে কালু নমস্কার জানায়।
-দুলাল আসলে? বস আমার পাশে।
হারান জ্যাঠা হুঁকো টানতে টানতে বলে।
দুলাল পাশের চেয়ারে গিয়ে বসে।
বিরেন পাল কথা তোলে।
-যা শোনা যাচ্ছে তাতে মনে হয় পাকিস্থানে আর থাকা যাবেনা।ওপারে চলে যেতে হবে।
-জ্যাঠা বিবিসির খবর শুনলাম,দেশের বিভিন্ন স্থানে আর্মির সাথে সংঘর্ষ চলছে।ছেলে-ছোকরারা সব দলে দলে ওপারে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরে যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে।আজ নাহয় আমাকে আর্মিরা কি মনে করে ছেড়ে দিয়েছে।বারবার এমন নাও হতে পারে।কানাঘুঁষা শুনছি আর্মিরা বাড়ির মেয়েদের ধরে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে।আমাদের সবার বাড়িতে সমত্ত মেয়ে।এ অবস্থায় ওদের এখানে রাখা ঠিক হবে?
বিরেনের কথা শেষ হলে দুলাল কথাগুলি হারানকে বলে।
হারান হুঁকা খাওয়া থামিয়ে দেয়।সোজা হয়ে বসে।
-রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় নল-খাগড়ার প্রাণ যায়।
হারানের কথা শুনে কেউ কোন উত্তর দেয়না।সবাই চুপ করে থাকে।
-কোনদিক দিয়ে যাবে তোমরা? সবটুকু পথ নৌকায় যাওয়া যাবেনা।
হারানের কথার পর সবাই আলোচনা শুরু করে।
-জ্যাঠা,আমরা কালিগঞ্জ পর্যন্ত নৌকায় যাই।তারপর ওখান হতে গরু বা মোষের গাড়ি ভাড়া করে জয়পুরহাটের মঙ্গলবাড়ি হয়ে বর্ডার পার হই।
বিরেন পাল প্রস্তাব রাখে।
বিরেনের কথা সবার মনে ধরে।আর ওদিকের বর্ডারেও কড়াকড়ি কম।
-আমাদের এখন হিসাব করা দরকার নৌকা কয়টা লাগবে।
আশুতোষ বলে।
আশুতোষের চার ছেলে আর চার মেয়ে।আশুতোষ আর দুলাল সমবয়সি।এই ছেলেদের কারণে দেশ স্বাধীনের কয়েক বছর পর ওদের মধ্যকার বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়।যার ফলে পাড়াও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
সবাই হিসাব করে ছয়টা মোষের গাড়ি লাগবে ওদের সবার জন্যে।আর নৌকা লাগবে পাঁচটি।ঠিক হয় এপ্রিলের বরো তারিখ অর্থাৎ চৈত্রের শেষে এখান থেকে রওনা দেবে।
-ওতোগুলি মোষের গাড়ি একসাথে কালিগঞ্জে পাওয়া যাবে?
দুলাল জানতে চায়।
-কাকা আমার ছোট ভাই ভীমকে আগামীকাল পাঠিয়ে দিই কালিগঞ্জে।ওর শ্বশুর বাড়ি কালিগঞ্জ।ঠিক যোগাড় করে ফেলবে দেখেন।
কালু দুলালকে আশ্বস্ত করে।
বিরেনকে উসুখুস করতে দেখে,হারান কারণ জানতে চায়।
-জ্যাঠা,বলতে খারাপও লাগছে, তবুও বলি।নগেনদের কয়েক ভাই সবার ইজ্জত মারছে।
-কেন কি করেছে ওরা?
হারান জানতে চায়।
-জ্যাঠা চারিদিকে শোনা যাচ্ছে রিফুজি আর রাজাকার মিলে আর্মিদের সাথে নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম লুট করছে।এদিকে দেখছি হিন্দু হওয়া সত্বেও ওরা কয়েক ভাই মিলে লুটপাট চালাচ্ছে।
বিরেন এক নিঃশ্বাসে বলে যায়।
দুলালের মনে পড়ে রিমিও গতকাল খাবারের সময় একই কথা বলেছিল।হারান আবার হুকো টানতে শুরু করে।চারিদিকে নিরবতা নেমে আসে।শুধু গোয়াল ঘর হতে গরুর গলার ঘন্টির টুংটুং শব্দ ভেসে আসে।আচমকা হারান নিরবতা ভাঙ্গে।
-দেশের মধ্যে গন্ডগোল আগে থামুক তারপর ব্যবস্থা নেবোখন।
আশুতোষ হারানকে ধরে বাড়ির ভেতর নিয়ে যায়।দুলাল বাড়ি ফেরার আগে ওর বড়দার বাড়িতে যায়।কয়েকদিন ধরে ওর বড়দা অসুস্থ।বড়দার ঘরে দুলাল যখন প্রবেশ করে তখন সেজো ভাতিজি মিলি বাপের মাথায় জল ঢালছিল।দুলালকে দেখে প্রমিলা মাথায় ঘোমটা টেনে দেয়।
-কে দুলাল?
শম্ভু কাঁপাকাঁপা গলায় বলে।
-এখন কি অবস্থা?রবি ডাক্তার এসেছিল?
-আগের চেয়ে তোমার দাদার জ্বরের প্রকোপ কম।বিকেলের দিক হতে আবার জ্বর একটু বেড়েছে।ঠাকুরপো তোমরা কি সিদ্ধান্ত নিলে?
প্রমিলা দুলালকে বলে।
-দুর্জয়ের সাথে মেয়েদের আর জামাইকে ওপারে পাঠিয়ে দেবো।দেশের পরিস্থিতি শান্ত হলে ফিরিয়ে আনবো।তোমরা কি ঠিক করলে?
-তাহলে আমরাও তাই করি।মিলি আর লিপি আর তোমার ভাজতেদের ওদের সাথে পাঠিয়ে দিই ,কি বলো ঠাকুরপো?
-ঠিক আছে বৌদি।
দুলাল বেরিয়ে আসে বড়দার বাড়ি হতে।

সিঁথি বাড়ির সব গয়না এক জায়গায় করে।দুর্জয় বেডিং বাঁধায় ব্যস্ত।দুলাল তার বড় তিন মেয়ে আর দুর্জয়কে ভারতে পাঠিয়ে দেবে।সাথে জামাই রঘুনাথও যাবে।বাকীরা বাড়িতে থেকে যাবে।
-গয়নাগুলো কার কাছে রাখবি আর কিভাবে রাখবি?
সিঁথি দুর্জয়ের কাছে জানতে চায়।
দুর্জয় কিছুক্ষণ চিন্তা করে।তারপর আলমারীর মাথার উপর হতে রেডিওটি টেনে নামিয়ে রেডিওটি খুলে ফেলে।মায়ের হাত হতে গয়নাগুলি নিয়ে রেডিওর মধ্যে ভরে ফেলে।হাতে নিয়ে ওজন করে।
-অনেক ওজন হয়ে গেলো মালো বা রিমি হাঁটার সময় টানতে পারবেনা।
দুর্জয় জানায়।
-তোর জামাই বাবুর হাতে দিস তখন।
সিঁথি বলে।
-তাহলেই হয়েছে।ওই গয়না আর পাওয়া লাগবেনা।
-ছিঃ জামাই বাবু সম্পর্কে ওমন কথা বলেনা।
-তোমার জামাই পারেইবা কি?পারার মধ্যে পারে বিড়ি খেতে আর ঘুমাতে।
মালবিকা ওর পেটিকোটের ভাঁজে টাকা ভাঁজ করে করে ঢুকাতে ব্যস্ত ছিল।দাদার কথা শুনে হেসে উঠে।
-তোদের কাজ শেষ হলো?
সিঁথি রিমি আর মালবিকার কাছে জানতে চায়।
-সোনার চেইনগুলি দিদির পেটিকোটের ডুরির ভেতরে ভরা শেষ। আর টাকাও সব ভেরেছি।
রিমি বলে।
-মালো তোর কতদূর?
-আমারও প্রায় শেষ মা।
মালবিকা চটজলদি জবাব দেয়।

রাত্রে খাওয়া শেষে সবাই বারান্দায় বসে।
-আগামীকাল সকালে তোরা রওনা দিবি।বাবা দুর্জয়,দুই বোনকে তোর হাতে তুলে দিলাম।দেখে রাখিস বাবা।
দুলাল দুর্জয়কে বলে।
-আমি দেখে রাখবো বাবা।
এই সময় জামাই রঘুনাথ আসে।রিমি বারান্দায় পিঁড়ি পেতে দেয়।
-জামাই গোছগাছ শেষ?
-হ্যাঁ বাবা।আপনার মেয়ে সব গুছিয়ে নিয়েছে।
-বাবা,চয়নতো একদম গ্যাদা।পথে খাওয়া-দাওয়া দেখে শুনে করিও।
রঘুনাথকে সিঁথি বলে।
পরদিন সকালে সবাই নৌকায় উঠে।নৌকা ছেড়ে দেয়।নদীর পারে সবাই দাঁড়িয়ে।রিমির ছোট ভাই খুব কান্নাকাটি করছে।মা ওকে কোলে নিয়ে আছে।ধ্রুব জেদ ধরেছে দিদিদের সাথে সেও যাবে।সিঁথি আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে।দুর্জয় খেয়াল করে ওর বাবাও ধুতির কোছা দিয়ে চোখ মুছছে।রিমি ওর বান্ধবী ভবানীর পাশে বসেছে।ভবানী আশুতোষের সেজো মেয়ে।পরবর্তি জীবনে রিমি আর ভবানী আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়।রিমির ছেলে নিলয়ের সাথে ভবানীর মেয়ে প্রিয়তির বিয়ে হয়।

কালিগঞ্জে যখন দুর্জয়দের দল পৌঁছায় তখন বেলা পড়ে এসেছে।সবাই মিলে ভীমের শ্বশুর বাড়ির পাড়ায় আশ্রয় নেয়।জেলে পাড়া।সবই ছন আর মাটির ঘর।কালু জেলে ভীমের কাছে জানতে চায় গাড়ির কি ব্যবস্থা হয়েছে।ভীম জানায় এখন পর্যন্ত গাড়ি পায়নি।তবে পাবে।মোষের গাড়ি পাবার কোন আশা নেই। সব গরুর গাড়ি।কালিগঞ্জে দুইদিন থাকার পর দুর্জয়রা গাড়ি পায়।চারটি গরুর গাড়ি একটি মোষের গাড়ি।দলটিকে খুব আপ্যায়ন করে জেলে পাড়ার সকলে মিলে।

পাঁচদিন লেগে যায় শুধু জয়পুরহাটে পৌঁছাতে।পথে নানা রকম খারাপ খবর শুনতে শুনতে দলটি জয়পুরহাট পৌঁছায়।দুর্জয় বোনদের একটা কথা শিখিয়ে দেয় আর্মি আক্রমণ করলে কোন বাড়ির মধ্যে যেন না লুকায়।বিশেষ করে মালবিকাকে।জয়পুরহাটে দলটি একদিন বিশ্রাম নেয়।এখন ওদের কাফেলাটি দীর্ঘ গরুর গাড়ির মিছিলে পরিণত হয়েছে।প্রায় আশি নব্বইটি গরু-মহিষের গাড়ি এক লাইনে।
নিঃশব্দ দূরত্বে (১) (Click This Link)
নিঃশব্দ দূরত্বে (২) (Click This Link)
নিঃশব্দ দূরত্বে (৩) (Click This Link)
নিঃশব্দ দূরত্বে (৪) (Click This Link)

চলবে…………
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৩৪
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন কাওসার চৌধুরী ও তার গল্পগুচ্ছ 'পুতুলনাচ' (বই রিভিউ)

লিখেছেন আকতার আর হোসাইন, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ২:১৫



লেখকের প্রথম বই--- বায়স্কোপ: যে বইয়ে কাওসার চৌধুরী এঁকেছেন জীবনের বায়স্কোপ

আর সবার মতন একজন লেখকেরও রয়েছে স্বাধীনতা। যার যে বিষয়ে ইচ্ছে সে সেই বিষয়েই লিখবে। জোড় করে কোন লেখকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

যীশুর রহস্যময় বাল্যকালঃ মিশর অবস্থান কাল বার বছর পর্যন্ত

লিখেছেন শের শায়রী, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৩:৩০



যীশুর জীবনের অন্যতম রহস্যময় ঘটনা হিসাবে যা আমার কাছে মনে হয় তা হল যীশুর বাল্যকাল। ইতিহাস প্রসিদ্ধ ধর্মপ্রচারকদের মাঝে যীশুর জীবনির একটা অংশ নিয়ে আজো কোন কুল কিনারা পাওয়া যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাড়ী ভাড়া বিষয়ক সাহায্য পোস্ট - সাময়িক, হেল্প/অ্যাডভাইজ নিয়েই ফুটে যাবো মতান্তরে ডিলিটাবো

লিখেছেন বিষন্ন পথিক, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ৯:১৭

ফেসবুক নাই, তাই এখানে পোস্টাইতে হৈল, দয়া করে দাত শক্ত করে 'এটা ফেসবুক না' বৈলেন্না, খুব জরুরী সহায়তা প্রয়োজন।

মোদ্দা কথা...
আমার মায়ের নামে ঢাকায় একটা ফ্লাট আছে (রিং রোডের দিকে), ১৬০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে...

লিখেছেন পদ্ম পুকুর, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ১০:৪৫


জীবনানন্দ দাস লিখেছেন- সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে...। বনলতা সেন কবিতার অসাধারণ এই লাইনসহ শেষ প্যারাটা খুবই রোমান্টিক। বাংলা শিল্প-সাহিত্যের রোমান্টিসিজমে সন্ধ্যার আলাদা একটা যায়গাই রয়ে গেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবার ঘরেও খেতে পাইনি, স্বামীর ঘরেও কিছু নেই!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৪৪



"বাবার ঘরেও খেতে পাইনি, স্বামীর ঘরেও কিছু নেই!", এই কথাটি আমাকে বলেছিলেন আমাদের গ্রামের একজন নতুন বধু; ইহা আমার মনে অনেক কষ্ট দিয়েছিলো।

আমি তখন অষ্টম শ্রেণীত, গ্রাম্য এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×