somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সাইয়িদ রফিকুল হক
আমি মানুষ। আমি ত্বরীকতপন্থী-মুসলমান। আমি মানুষ বলে আমার ভুলত্রুটি হতেই পারে। বইপড়তে আমার ভালো লাগে। সাহিত্য ভালোবাসি। লেখালেখি আমার খুব শখের বিষয়। বাংলাদেশরাষ্ট্র ও গণমানুষের জন্য আমি লেখনিশক্তিধারণ করেছি।

ছোটগল্প(জীবনের গল্প): অদ্ভুত এক আংটি

০৮ ই জুন, ২০১৬ রাত ৯:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ছোটগল্প(জীবনের গল্প): অদ্ভুত এক আংটি
সাইয়িদ রফিকুল হক

হাসিবের চাকরি চলে গেছে। সকালে অফিসে আসার পর সে কিছুই জানতে পারেনি। তখন কোনো ঘটনাও ঘটেনি। কিন্তু দুপুরের লাঞ্চের আগে সারা-অফিসে রটে গেল—হাসিবের আর চাকরি নাই!

খবরটা কানে আসা মাত্র হাসিব খুব মুষড়ে পড়লো। চাকরি চলে যাওয়ার কারণে সে ভেঙ্গে পড়েনি। তার এতোদিনের চাকরির প্রতি তেমন একটা দয়ামায়া নাই। তার শুধু আফসোস মোহসিনার সঙ্গে তার প্রেমটা বুঝি এখানেই শেষ হয়ে গেল! আর একটি লজ্জাও তাকে ঘিরে ধরলো। চাকরি চলে যাওয়াটা এই সমাজে খুবই লজ্জার বিষয়। কিন্তু এদেশে যারা কথায়-কথায় লোকের চাকরি খায়, তাদের কোনো লজ্জাশরম নাই।

চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর হাসিব সোজা অফিস থেকে রাস্তায় নেমে এলো। তারপর কোনোকিছু না ভেবেই সে উদভ্রান্তের মতো বড় রাস্তার পাশ ঘেঁষে ক্রমাগত হাঁটতে লাগলো। তার এখন কিছুই ভালো লাগছে না। এতোদিনের অমৃতময় পৃথিবীটাকে আজ তার বড় বিস্বাদ মনে হচ্ছে। আর তার আরও মনে হচ্ছে: সে এখন এই বিস্বাদময় ও বিষাদযুক্ত পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে পারলেই ভালো হতো।
সত্যি আজ তার মনটা খুবই খারাপ। আর এতোটা খারাপ যে—জীবনে তার মন কখনও এতোটা খারাপ হয়নি। কিন্তু বিধির বিধান তো মানতেই হবে। তাই, সে নিরুত্তাপ ও নিরুপায় হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। এতোবড় একজন গ্রুপ—অব-কোম্পানির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সে একা-একজন হয়ে কিছুই করতে পারবে না। তার কোনো অপরাধ ছিল না—আর এখনও তার কোনো অপরাধ নাই। তার চাকরি যাওয়ার কারণটা অবশ্য সে জানে। আর এটা অনুমান হলেও এটিই একমাত্র যুক্তি ও সত্য। তবুও সে মনের ভিতরে আরও কোনো কারণ খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও সেখানে সে আর-কিছু খুঁজে পেলো না।

মুহূর্তের মধ্যে সারা-অফিসে রটে গেছে: হাসিবের চাকরি চলে গেছে। আর কোম্পানি-মালিকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার অপরাধেই তার চাকরি চলে গেছে। এটা এখন অনেকের কাছে খুব হাসির ব্যাপার। আর এতে কেউ-কেউ তো ভীষণ খুশি। নইলে প্রেমটা সফল হলে হাসিব তাদের সবাইকে ডিঙ্গিয়ে রাতারাতি ডিরেক্টর-জাতীয় একটা পদ পেয়ে যেতো। আর এখন তার চাকরিই নাই! এই খুশিতে আজ তার অফিসের অনেক কলিগ দুই-দুইবার লাঞ্চের অর্ডার দিয়েছে। এমনকি অনেকের দুইবার লাঞ্চ করাও হয়ে গেছে। এই হচ্ছে আজকের দিনের ভদ্রবেশী-আপনজন-কলিগ!

হাসিব হাঁটতে-হাঁটতে একসময় মতিঝিলের অফিসপাড়া ছেড়ে কমলাপুরের দিকে একটা অপরিচিত জায়গায় এসে পড়লো। সে এখানকার বড় একটা ফুট-ওভারব্রিজ অন্যমনস্কভাবে পায়ে হেঁটে পার হলো। তারপর এই অপরিচিত জায়গাটা ধরেই হাঁটতে লাগলো। এদিকটায় সে আগে কখনও আসেনি।
একসময় সে হাঁটতে-হাঁটতে আরও দূরে চলে এলো। আর ভাবলো: হয় সে আজ-এক্ষুনি আত্মহত্যা করবে—আর নয়তো নিজগ্রামে ফিরে যাবে। তবুও সে এই মুখ আর কাউকে দেখাবে না। এইসব ভাবতে-ভাবতে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। আর সে কখন-কী করবে তা-ই ভাবছে। তবে সে দেখলো: আত্মহত্যার দিকেই তার মনের জোর সবচেয়ে বেশি। শেষমেশ সে একটা স্থির সিদ্ধান্ত নিলো: সে আজ আত্মহত্যাই করবে। আর এজন্য সে কাউকে দায়ী করবে না। অপরাধ একমাত্র তারই। কারণ, সে কেন এমন একজন ধনীলোকের একমাত্র মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে গিয়েছিলো! নিজের অপরাধ সে আত্মহত্যার আগে খুব ভালোভাবে স্বীকার করে নিচ্ছে। পৃথিবীর মানুষের কাছে সে অসৎলোক হয়ে থাকতে পারবে না। তাই, সে আত্মহত্যার আগে স্বীয়-অপরাধ স্বীকার করে মনুষ্যত্বের পরিচয় দিচ্ছে।

সে এখন ভাবছে: কীভাবে আত্মহত্যা করবে? এইসব এলোমেলো ভাবতে-ভাবতে একসময় সে আরও দূরে এলো। এদিকটায় এসে একটা জায়গায় তার চোখ আটকে গেল। আর সে হঠাৎই যেন দেখলো: রাস্তার পাশে একজন খুব বয়স্ক-লোক একজায়গায় বসে তাবিজ-কবচ বিক্রি করছেন। সে এমন কত দৃশ্য এর আগেও দেখেছে। এর আবার দেখার কী আছে? তবুও এই লোকটাকে তার আজ অন্যরকম মনে হলো। এই লোকটাকে তার খুব অদ্ভুত মনে হলো। সে অবাক হয়ে আরও কাছে গিয়ে দেখলো: বয়স্ক-লোকটি কোনোদিকে না তাকিয়ে তার সামনে উপবিষ্ট দু’জন লোককে সুন্দর পাথর-বসানো একটি আংটি দেখাচ্ছেন। আর তিনি লোক দু’জনের উদ্দেশ্যে খুব আস্তে-আস্তে বলছেন, “এটার দাম একটু বেশি—একদাম পাঁচশ’ এক টাকা। তবে এটায় কারও-কারও অসুবিধাও হতে পারে। এর আগে দু’জন লোক এটা কিনে পরদিনই ফেরত দিয়ে গেছে। শুনেছি, তারা নাকি এটা ব্যবহার করে প্রায় মরতে-মরতে বেঁচে গেছেন। সবাইকে এটা পছন্দ করতে নাও পারে। এটা সবার সইবে না। আর যার জীবনে এটা সইবে—সে রাজা হয়ে যাবে। তাই,...।”
বৃদ্ধলোকটির কথা শুনে লোক দুটো দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। তারা আংটি কেনার সাহস পেলো না। আর হাসিব সেখানে বসে পড়লো। আর তাকে দেখে বৃদ্ধলোকটি একবার শুধু অদ্ভুত-চোখে তার দিকে তাকালেন। কিন্তু কিছু বললেন না।
হাসিব সিদ্ধান্ত নিলো এই আংটিটাই সে কিনবে। সে তো এখন মরতেই চায়। আর আংটি পরে যদি সহজে মরণ এসে যায়—তাহলে, কত ভালো!

হাসিব শুধু তার পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে দেখলো তার কাছে পাঁচশ’ টাকার একটা নোট আছে কিনা। আর এটা দেখতে তার বেশি সময় লাগলো না। দেখে সে ভীষণ সন্তুষ্ট হলো। তার মানিব্যাগে এখন দুইটা পাঁচশ’ টাকার নোট শুয়ে আছে। একটাকে এই মুহূর্তে সেখান থেকে বের করে দিলে তার কোনো অসুবিধা হবে না।
হাসিব কোনো কথা না বলে দুঃখভারাক্রান্ত-মনে কোনোকিছু না ভেবে সে আংটিটা মুহূর্তের মধ্যে পাঁচশ’ এক টাকায় কিনে নিলো। এইবার বৃদ্ধলোকটি তার দিকে চেয়ে মিটমিট করে হাসলেন। কিন্তু মুখে কিছু বললেন না।
হাসিব আংটিটা কেনার সঙ্গে-সঙ্গে নিজের ডান-হাতের মধ্যমা-অঙ্গুলিতে পরে নিলো। সে আগের মতো কমলাপুরের সেই বিশাল ফুট-ওভারব্রিজটা পায়ে হেঁটে পার হলো।
আশ্চর্য এখন তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছে না। আর তার একবারও মরার ইচ্ছে জাগছে না। সে খুবই অবাক হলো। আর কিছুক্ষণ আগের ভাবনাচিন্তার জন্য সে মনে-মনে ভীষণ লজ্জিত হলো। একসময় সে সন্তুষ্টচিত্তে বাসায় ফিরে এলো। এখন তার মনে হচ্ছে: চাকরি না থাকলে কী হয়? আর চাকরি গেলেই বা কী? মানুষ কি শুধু চাকরির জন্য বাঁচে?

বাসায় ফিরে হাসিব সবেমাত্র একটুখানি সুস্থির হয়ে বসেছে, এমন সময় এলো তার অফিসের জেনারেল-ম্যানেজার-সাহেবের ফোন। হাসিব খুব শান্তভাবে ফোনটা রিসিভ করে শুধু বললো, “হ্যালো, স্যার, আমি হাসিব।”
আর ওপাশ থেকে ম্যানেজার-সাহেব তাকে জানালেন: “গুড নিউজ ফর ইউ, হাসিব! তোমাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তোমার জন্য আরও একটা সুখবর আছে। তোমাকে এই কোম্পানির পরিচালক(প্রশাসন) নিযুক্ত করা হয়েছে।...আর আমাদের বড়সাহেব তোমার সঙ্গে তার আদরের একমাত্র কন্যা তাবাসসুম জান্নাত মোহসিনা ম্যাডামকে বিয়ে দিতে রাজী হয়েছেন। থ্যাংক ইউ হাসিব।”—বলে তিনি ফোনটা কেটে দিলেন।

আর এমন একটা শুভসংবাদ শুনে হাসিব কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর সে সব বুঝতে পারলো। আর সে তার হাতের আংটিটায় পরম ভক্তিভরে চুমু খেলো। আর তার কাছে মনে হলো: এটি কেমন অদ্ভুত এক আংটি! আর এরই উছিলায় এরই জন্য সে তার জীবনের সবকিছু ফিরে পেলো।


সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০২/০৬/২০১৬

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০১৬ রাত ১০:০২
১৪টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নজির

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০২

নজির
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

সুখ নাই, আনন্দ নাই, নাই শান্তি
একলা চলতে চলতে উদাসী
আত্মভোলা, মনভোলা, বেখেয়ালি
প্রতিমুহূর্ত লাগে যেন গোধূলি!
আমার ব্যক্তিত্বে, চিন্তা, চেতনায়
কেউ আটকায় না, হয় না আকৃষ্ট!

নিঃসঙ্গ বিষাদযুক্ত ঘুরতে ঘুরতে
হয়ে গেছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বাস আর সংগ্রামই একদিন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২



আওয়ামী লীগের ইতিহাস কোনো সহজ পথে হাঁটেনি। রক্ত, ত্যাগ আর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এই দলের জন্ম, আর সেই জন্মসূত্রের গৌরব আজও অক্ষুণ্ণ- ণ্কারণ ইতিহাস সাক্ষী, এই দল কখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×